Loading...
Loading...

story about susunia pahar

আপনি যদি susunia pahar বেড়াতে আসার কিংবা পিকনিক আসার কথা ভাবছেন তাহলে এই গল্পটা পড়া আপনার ভীষণ
দরকার। নতুবা…
ডিসেম্বর মাসের মাঝামাঝি থেকেই Susunia pahare লোকের মেলা শুরু হয়ে যায়। শুশুনিয়া পিকনিক করতে প্রচুর মানুষ দূরদূরান্তর থেকে আসেন। Susunia pahare চাপেন কিন্তু আপনি কী জানেন শুশুনিয়া পাহাড়ে কাদের রাজত্ব? পুরো গল্পটা পড়ুন। 

Susunia pahar এ ওদের বসবাস

শুশুনিয়া পাহাড়ের গল্প নয় অভিজ্ঞতাকে গল্পের আকার দেওয়া হয়েছে।

‘রাজু…উ…উ, রাজু…উ…’ নাম ধরে আমারা প্রায় এক ঘণ্টা চিৎকার করেছি। রাজুর কোনও সাড়া-শব্দও নেই। রাতের পাহাড় যেন বারবার প্রতিধ্বনিতে ব্যাঙ্গ করেছে। পা আর চলতে চায় না। চোখের সামনে দৈত্যের মতো পাহাড়টা দাঁড়িয়ে রয়েছে। হাসছে? হয়তো বা…

এক
Morning at susunia Pahar
প্রত্যেক বছরের মতো এবারেও আমরা সকাল সাতটার আগেই শুশুনিয়া পাহাড়ের পায়ের তলায় হাজির। হাজার হাজার লোক পিঁপড়ের মতো পিলপিল করছে। দোকানের ঘুম ভেঙেছে কী ভাঙেনি খদ্দের হাজির। তবে দোকানিদের ঘুম যে এখনো ভাঙেনি সেটা পরিষ্কার। রোদ ঝলমলে আকাশ আর পাহাড়ি বাতাস গায়ে মেখে খুব ইচ্ছে করছে দরাজ গলায় একটা গান গাইতে। না এটা বাড়াবাড়ি রকমের বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে। ওঃ হো আমার পরিচয়টা তো দেওয়াই হয়নি। আমি, শ্রীমান নবকুমার মহাপাত্র। বাবা ‘কপালকুণ্ডলা’ উপন্যাস পড়তে শুরু করার সময় ধরাধামে আমার আগমন। তাই আমি নবকুমার। পাড়ার দুষ্টু ছেলেরা আমার নামের থেকে ‘ব’-কে ‘মার’ দিয়ে আমাকে নকু বানিয়েছে। হেব্বি বদ সবকটা। ইচ্ছে করে…। না, ইচ্ছে করলেও উপায় নেই। তালপাতার সেপাই শরীর নিয়ে পেঁয়াজি করতে যাওয়াটা সংবিধান সম্মত নয়। যাই হোক আমরা দশজন বন্ধু মিলে পিকনিক করতে এসেছি শুশুনিয়া পাহাড়ে।
হাঁড়িতে ভাত ফুটছে। কিছুক্ষণ পর পল্টু দুটোও চিকেন হয়ে কিচেনে চলে আসবে। আমাদের বাড়িতে আগে মুর্গী হত না। এখন তো মুর্গী আর মুর্গী নয়, মুর্গী এখন রামপাখি। তাই নিরামিষ ভাবনায় সহজেই চালিয়ে দেওয়া যায়। আর এই নিরামিষ ভাবনা নিয়েই পোল্ট্রি এখন বাঙালীর ঘরে-ঘরে পল্টুতে পরিনত। যাই হোক আমার আবার গল্প বলতে বলতে পথ হারানোর বাতিক।
বাঁধাকপি লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। ভাত নামলেই লাফ মেরে কড়াইয়ে চড়বে। তারপর চাটনি আর পল্টু হলেই খেল খতম। আপাতত রানা বাবু বুড়া হাঁড়ি-কড়া নিয়ে ব্যস্ত। রান্না করছে। বাবাই বাপি নিতাই কেউ জানে না কোথায়। মনে করা হচ্ছে ওরা মেলায় ঘুরছে। আমি পটলা রাজু আর সুশান্ত চার হতভাগা হন্তদন্ত হয়ে জল আনাছি। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পিকনিক প্রাঙ্গণে লোক বাড়ছে। আর বাড়বে নাই বা কেন ? এখানে দেখার প্রচুর জিনিশ। শুশুনিয়া পাহাড়ের বুকচিরে বেরিয়ে আসছে রহস্যময় জলের ধারা। কতজন এলো গেল কেউ বলতে পারল না এই জলের উৎসমুখ কোথায়। এছাড়া রয়েছে শুশুনিয়ার পাথরশিল্প। সত্যি অবাক করে দেওয়ার মতোই হাতের কাজ। পঁচিশপয়সা মাপের পাথরের দুর্গামূর্তি! ভাবা যায় না। তবে আজকে সাত টাকার শিব সতেরো টাকায় বিকিয়ে যাচ্ছে। পিঁপড়ের পা’ধুয়ে গুড় খাওয়া লোকগুলোরও ভাবখানা এমন, ‘মাত্র সতেরো ? ওয়াও…। দিয়ে দাও।’ আমরা যারা দমকল বিভাগে কর্মরত তারা শুধু দামগুলো হাঁ করে শুনছি। দাঁতের দোকান ঠোঁটের উপর বিছিয়ে একজন দোকানিকে বলতে শুনলাম, ‘বাইরের মানুষ পিকনিকে এসেছেন তাই প্রচারের জন্যই এত কমদামে…’ ইচ্ছে করছিল…। আগেই বলেছি ইচ্ছে করলেও উপায় নেই।

ওরা থাকে পাহাড়ে

মোবাইল যখন বলছে একটা বেজে আঠারো আমরা তখন খেতে বসেছি। আমাদের কেউ খেতে খেতে ঢেকুর তুলছে কেউ আবার সেলফি তুলছে। পিকনিক করতে আসা অনেক লোক খাবার খেয়ে পাহাড়ে যাবার জন্য প্রস্তুত। আমরাও কেউ কেউ পাহাড়ে চড়ব তবে একটু পরে। যারা বাইরের থেকে এসেছে ওরা অনেকটা নতুন ভিখারির মতো। দুমুঠো চালের জন্য পাঁচটা গ্রাম বেশি ঘুরবে। ইতিমধ্যেই খবর পেয়েছি আসানসোলের এক রামচন্দ্র পাহাড়ের হনুমানের সঙ্গে ফেলফি তুলতে গিয়ে সেলফোনটি হারিয়েছেন। সেটি এখন হনুমানের দখলে। হনুমানটি ফেসবুকে স্ট্যাটাস না দিলে জানাও যাবে না ফোনটির গোপন কাহিনি।
এমনিতে পাহাড়ের হনুমানগুলো খাবারের খোঁজেই ঘোরে। হাত পেতে খাবার নেয়। খাবার নিয়ে চলেও যায়। তবে ওদেরকে বিরিক্ত করলে ওরাও দাঁতের হাজারদুয়ারি বের করে আক্রমণ করে বসে। টেনে চড় কষানোর ঘটনা কিংবা কামড়ে দেওয়ার ঘটনা নতুন নয়।
দুই
শেষ পর্যন্ত শেষ হল আমাদের খাওয়া দাওয়া। এবার একটু বিশ্রাম নিয়ে পাহাড়ে চড়ব। না সবাই না, আমি রানা বুড়া বাপি রাজু আর সুশান্ত। বাকিরা ? ওরা হাঁড়ি-কড়া পাহারা।
মোটামুটি বেলা তিনটা নাগাদ আমরা পাহাড় চড়তে শুরু করলাম। পাথরের পাহাড়ি রাস্তাটা আঁকা-বাঁকা হয়ে উপরের দিকে উঠে গেছে। কোথাও কোথাও বাঁক এত বেশি যে ফুট দশেক দূরের রাস্তাটাও চোখে পড়ে না। আমাদের আগে পিছনে আরও অনেকেই চাপছে। অনেকে আবার নেমে আসছে। পাহাড়ের গায়ে কুয়াশার গন্ধ পাচ্ছি। নীচের চেয়ে ঠাণ্ডাটাও বেশি পাহাড়ের উপরে। অন্যান্য সময় হলে পাহাড়ের উপর থেকে শুশুনিয়া গ্রামটা দেখা যেত। এখন কুয়াশার চাদরে মোড়া।
তিনটা চল্লিশ নাগাদ আমরা পাহাড়ের মাথায়। এখানে তুলনামূলক কুয়াশা কম। তবে পাহাড়ের চির সবুজ গাছগুলোকে হালাকা কুয়াশাতেও ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে। অন্যান্যবার পাহাড়ের মাথায় চাপলে শুশুনিয়া তো বটেই এমনকি পাশাপাশি আরও কয়েকটা গ্রামকে পরিষ্কার দেখা যায়। আজকে সব কেমন যেন মনকেমনের শীত ঘুমে।
‘এখনো তো সন্ধা হতে দেরি আছে, চল না পাহাড়ের পিছন দিয়ে নীচে নামি। পিছনটাও দেখা হবে।’ বেশ উৎসাহের সঙ্গেই কথাগুলো বলল রানা।

Susunia silalipi

‘শিলালিপিটা তো পিছন দিকেই। আমি শুনেছি কিন্তু দেখা হয়নি এখনো…’
‘আমিও দেখিনি। চল না পিছন দিয়েই নামি।’ সুশান্তর কথাটা কাড়িয়ে নিয়ে নিজের ইচ্ছে প্রকাশ করে বাপি।
বলাই বাহুল্য যে, পাহাড়ের পিছন দিক দিয়ে নামার প্রস্তাবে কেউ আপত্তি করিনি। প্রায় মিনিট পনেরো খোঁজাখুঁজির পর আমরা পিছন দিক দিয়ে নীচে নামার রাস্তাও পেয়ে গেলাম। ছোটবড় গুল্মলতা আর ঝোপঝাড়ের ভেতর হামাগুড়ি দিয়ে রাস্তাটা নীচে নেমে গেছে। পাহাড়ের পিছনটা যেন কাঁচা সবুজ রঙে আঁকা। কুয়াশাও নেই বললেই চলে। গাছের পাতায় রোদ পড়ে যেন পিছলে যাচ্ছে। বাতাসে বুনো ফুলের গন্ধ। পাহাড়ি ডালপালা ঝোপঝাড় দুহাতে করে সরিয়ে সরিয়ে আমরা নীচে নামছি। কোথাও কোথাও ঝোপঝাড় এতটাই বেশি যে একে অপরকে দেখতে পাচ্ছি না। রাস্তাটা ক্রমশ আঁকাবাঁকা হতে হতে নীচের দিকে ছুটে গেছে। পাহাড়ের পিছন দিকে লোকজনের যাতায়াত নেই বললেই চলে। যারা আসে তারা হয় মূর্তি বানানোর পাথর খুঁজতে নয় তো শুকনো গাছের ডাল ভাঙতেই আসে। দরকার ছাড়া এদিকটায় তেমন কেউ আসে না। তবুও আশ্চর্যরকম ভাবেই চকচক করছে রাস্তাটা। ঠিক যেন প্রতিদিন পায়ে হাঁটা রাস্তার মতো।
একটা সময় শুশুনিয়া পাহাড়ে হাজার হাজার হায়না ছিল। মেলার সময় পাহাড়ে পড়ে থাকা শুকনো পাতায় যখন আগুন দেওয়া হত ? তখন হায়নাগুলো ঢুকে পড়ত পাশাপাশি গ্রামে। প্রায়দিন ছাগল ভেড়া গায়েব হত গ্রাম থেকে। এখনো হায়না হুড়াল শেয়াল সবই আছে। পাহাড়ি সাপেরও অভাব নেই। শুধু কমেছে সংখ্যা।
আমরা যত নীচের দিকে নামছি পিছন দিকে ততই খাড়াই হচ্ছে পাহাড়টা। কোথাও কোথাও রাস্তাটা এতটাই টানটান ভাবে নীচের দিকে নেমেছে যে মনে হচ্ছে হুমড়ি খেয়ে নীচে না পড়ে যাই! মাঝে মাঝে পা স্লিপ করছে, আঁকড়ে ধরতে হচ্ছে মোটা শাল গাছের গুড়ি কিংবা ঝুলন্ত লতা। মাঝে মাঝেই পথ হারিয়ে যাচ্ছে শর আর শয়েকুল ঝোপের ভেতর। আমরা খুব সাবধানে নামছি। বুকের সাহস বাঁচিয়ে রাখতেই হয়তো মুখে বলছি না, এটা রাস্তা নয়। এটা রাস্তা হতে পারে না। কিন্তু পায়ে পায়ে শ্যাওলার আমন্ত্রণে বুঝতে পারছি এ পথ আমাদের বিপথে নিয়ে যাচ্ছে। বিপদে পড়তে বিশেষ দেরি নেই…

মরণের ডঙ্কা বাজে

তিন
যা ভেবেছিলাম ঠিক তাই। আমরা পায়ে হাঁটা কোনও পথ বেয়ে নামছিলাম না তাহলে! আমরা নামছিলাম বর্ষায় গড়িয়ে পড়া পাহাড়ি জলের রাস্তা দিয়ে। স্বাভাবিক ভাবেই পথটা এসে মিলিয়ে গেল পাহাড়ের একটা জলাশয়ে। আর নীচে নামা সম্ভব নয়, আবার শ্যাওলা মাখা খাড়াই পথ বেয়ে উপরে চড়াও অসম্ভব।
‘এবার কী হবে ?’ জিজ্ঞেস করল সুশান্ত, কিন্তু কেউ কোনও উত্তর দিল না। চোখের সামনে অচেনা পাহাড়ি খাদ। যার গভীরতা কিংবা হিংসতা নিয়ে আমাদের বিন্দুমাত্র ধারনা নেই। পিছনে প্রতিদিন দেখে আসা অচেনা পাহাড়। পাহাড়ের বুকে সন্ধা নামতে সময় লাগে না। যখন তখন ঝাঁপিয়ে পড়বে আঁধার।
খাদটা থেকে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা শাল গাছ গুলোকে আঁকড়ে আমরা পরামর্শ করছিলাম কীভাবে নীচে নামব। ঠিক এমন সময় পাহাড়ের নীরবতা ভেঙে পিছিন দিক থেকে ভংকর একটা গর্জন ভেসে এলো। সঙ্গে সঙ্গে গাছের মাথায় বসে থাকা হনুমানগুলোও শুরু করল চিৎকার করতে। কয়েক ঝাঁক পাখি উড়ে গেল পাহাড়ের চূড়ার দিকে। আমরা একে অপরের আরও কাছাকাছি এসে দাঁড়ালাম। এতক্ষণে যেন বুকের ঘড়ির টিকটিক শব্দটাও শুনতে পাচ্ছি। জিজ্ঞেস করলাম ‘হায়না ?’ কেউ কোনও উত্তর না দিলেও বুঝতে পারলাম হায়না! হায়নার ডাক আমার খুব পরিচিত না হলেও অপরিচিত নয়। হয়না সাধারণত জোট বেঁধে শিকার করে। দল বেঁধে ঘুরতেই ওরা পছন্দ করে।
আরও বেশ কয়েক মিনিট নীরবেই কাটল। আমরা ঠিককরে উঠতে পারছি না সামনে যাওয়ার রাস্তা খুঁজব, না পিছন ফেরার চেষ্টা করব। সন্ধা নামার আগেই আমাদেরকে নামতে হবে। সন্ধার ছোঁয়া পেয়ে রূপ পালটাবে পাহাড়টাও, হায়নার ডাকে তারই পূর্বাভাষ। আমি মনে মনে ভাবছিলাম একবার উঁকি মেরে দেখব খাদটাকে। যদি কোনও ভাবে নীচে নেমে পার হওয়া যায়। এমন সময় ‘সাপ, সাপ’ চিৎকার করে রানা লাফিয়ে কয়েক’পা সরে গেল একটা শেয়াকুল ঝোপের দিকে। রানা সরিয়ে যেতেই চোখ পড়ল পাহাড়ি মালাচিতি সাপটার উপর। সাপটার কালো শরীরে সাদা ডোরাকাটা ডোরাকাটা দাগ। মনে হল রানার লাফানির শব্দে ভয় পেয়েছে সাপটাও। তবে ভারী আহার করে আছে বলেই হয়তো নড়াচড়ার বিশেষ লক্ষণ দেখছি না ওর ভিতর। আমরাই কয়েক মিটার সরে গেলাম ওর থেকে। এখান থেকে খাদটাকে পরিষ্কার দেখাচ্ছে।
এতক্ষণ চোখে পড়েনি, খেয়াল করলাম বেশ কিছু বন্যলতা খাদটাকে আড়াআড়ি ভাবে পেরিয়ে গেছে। খাদটার একটা কোনায় শূন্যে ঝুলছে লতাগুলো। মুহূর্তের ভেতর বিদ্যুৎ খেলেগেল মাথায়। ‘ওই ঝুলন্ত লতাগুলো দিয়ে পার হওয়া যাবে না ?’ জিজ্ঞেস করলাম।
‘আমিও সেটাই ভাবছি, কিন্তু…’
রানাকে কথাটা শেষ করতে দিল না রাজু, ‘এছাড়া উপায় তো নেই। পিছল রাস্তা দিয়ে খাড়া পাহাড়ে ওঠা আর কিছুতেই সম্ভব নয়। সন্ধা নামার আগেই খাদটা পার হতে না পারলে বড় রকমের সমস্যায় পড়তে পারি।’
বর্ষার সময় যখন খাদটা কানায় কানায় ভরেছিল তখন হয়তো লতাগুলো জলে ভেসে ওপারে গেছে। জল কমে যেতে শূন্যে ঝুলছে। এখন সমস্যা হল বেশ কয়েকটা। যদি লতাগুলো ওপারে গিয়ে কোনও বড় গাছকে পেঁচিয়ে না ধরেছে তাহলে লতা ধরে ঝুলা মানেই খাদের নীচে… লতাগুলো আমাদের ওজন নিতে পারবে কি না সেটাও ভাবার বিষয়। আরও একটা সমস্যা, কে আগে বা শেষে যাবে! একলা খাদের ওপারে যাওয়া কিংবা এপারে থাকা কোনটাই নিরাপদ নয়। খাদের ওপার থেকে পরপর বেশ কয়েকটা শেয়াল ডেকে উঠল এবার। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও গম্ভীর হচ্ছে পাহাড়ি পরিবেশ। শুরু হয়েছে ঠাণ্ডা হাওয়া। খাদের ধারে দাঁড়িয়ে কনকন করে উঠছে হাত’পা। আর ভাবার সময় নেই…
চার
আমি যখন ঝুলতে ঝুলতে খাদটা পার হচ্ছিলাম তখন একবার চেয়েছিলাম নীচের দিকে। শিউরে উঠেছিলাম আমি। ঘনান্ধকার খাদের ভেতর যেন চিররাত্রি ঘুমিয়ে আছে। খাদের গভীরতা আমার চোখে কূল পায়নি। প্রতিমুহূর্তে মনে হচ্ছিল মৃত্যু হাত বাড়িয়ে ডাকছে আমায়। কাউকে কিছু না বলেই সবার আগে ঝুলে পড়েছিল রানা। লতাগুলো বারকয়েক দুলেছিল মাত্র। সবার শেষে রাজু।
খাদটা পেরিয়ে পড়লাম আরেক সমস্যায়। আর কোনও রাস্তা নেই। ঘন শর ঝোপের আড়ালে নিজের কাছে নিজেই যেন অদৃশ্য। শরীরে ক্ষতচিহ্ন এঁকে দিচ্ছে শেয়াকুল কাঁটা। সন্ধা নেমেছে পাহাড়ে। আমাদের পায়ের শব্দে বেশ কয়েকবার সড়সড় করে কোনও বন্যপ্রাণীর পালিয়ে যাওয়ার শব্দ পেয়েছি। পাহাড়টার যেন শেষ নেই। আমরা নীচে নামছি না পাহাড়ের গায়ে চক্রাকারে ঘুরছি সেটাও বুঝতে পারছি শর ঝোপের ঘনত্বে। আমার কেবলই মনে হচ্ছে, যেন আরও উঠছি। পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে একবার দেখলাম, ছটা বেজে কুড়ি। কোনও নেটওয়ার্ক নেই। ছটা কুড়ি মানে শীতের রাত্রি বলা চলে।
নীচে নামতে নামতে আমরা একে অপরের নাম ধরে ডাকছি মাঝে-মাঝেই। কেউ পিছিয়ে পড়লে দাঁড়াতে হচ্ছে। কিন্তু পাহাড়টা শেষ হচ্ছে না কিছুতেই। আমাদের অপেক্ষায় ক্লান্ত হয়ে বাবাই ওরা যে কী করছে কে জানে।
‘এই সবাই চুপচাপ দাঁড়িয়ে পড় একবার, আমার পিছনে কিছু যেন একটা আসছে।’ রাজুর কথায় চমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম আমরা। কান খাড়া করে রইলাম কয়েক সেকেন্ড। না কিছুই শুনতে পেলাম না। আবার নামতে শুরু করব ঠিক এমন সময় বেশ কিছুটা পিছনে শর ঝোপের ভেতর ঝড়ঝড় করে একটা আওয়াজ হল যেন। আবার দাঁড়িয়ে পড়লাম আমরা। অনেকদূরে ডাকতে থাকা শেয়ালের আওয়াজ ছাড়া কিছুই কানে এলো না।
আমার পা যেন আর চলতে চাইছে না। শর আর শেয়াকুল কাঁটায় কেটে গিয়ে সারা শরীর জ্বালা করছে। একটা বিশালাকৃতির শাল গাছের নীচে দাঁড়ালাম আমরা। মোবাইলের ঘড়িতে সাতটা বাজতে পাঁচ। মিনিট কয়েক বিশ্রাম নেওয়ার পর আমরা সবে নামতে শুরু করেছি এমন সময় ‘ওঁয়া-ওঁয়া’ সুরে ঠিক যেন বাচ্চা ছেলের কান্নার শব্দ ভেসে এলো কানে। এই কান্নার সুর অচেনা হলে বড়-বড় সাহসীরও শীতের রাতে শরীর ভিজে যায়। আমাদের গ্রামের মানুষের কাছে এই সুর অচেনা নয়। খিদের চোটে শকুন শাবক এভাবে কাঁদে। তবে আজীবন শুনে এসেছি শেয়াল-শকুনের কান্না শুভ নয়…
পাঁচ
সারা শরীরে শতাধিক ক্ষতচিহ্ন নিয়ে যখন আমরা রাস্তায় এসে দাঁড়ালাম তখন আটটা পেরিয়ে গেছে। হয়তো খোঁজা-খুঁজি শুরু হয়েছে এতক্ষণে। সৌভাগ্যের কথা, মোবাইলে টিমটিম করছে নেটওয়ার্ক। এমন নিদারুণ অভিজ্ঞতা জীবনে বারবার হয় না। মনের আনন্দে আমরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরলাম। কীসের যেন একটা আনন্দ পেয়ে বসেছে আমাদের। একে একে ফোন করলাম কয়েকটা। ফোনের ওপারে, রাগ; বিরক্তি; বকুনি; চিৎকার; আনন্দ। এই আনন্দটা কান্নায় বদলে যেতে বেশি সময় লাগল না। নীচে নেমে আসার আনন্দে আমরা কেউ খেয়াল করিনি, আমাদের ভেতর রাজু নেই। ওর মোবাইলটাও নেটওয়ার্কের বাইরে।

সত্যিকার গল্প

আমরা কেউ ঠিকঠাক মনেও করতে পারলাম না শেষ কখন রাজুকে দেখেছি। এমনকি সেই শাল গাছটার নীচেও রাজু ছিল কি না সেটাও পরিষ্কার নয় আমাদের কাছে। আবার একে-একে ফোন করলাম কয়েকটা, এবার গলায় কোনও আনন্দ নেই।
পুলিশ শুশুনিয়ার লোকাল লোকজন আর আমাদের গ্রামের মানুষ যখন আমাদের কাছে এসে পৌঁছল তখন এক ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে রাজু নেই। ‘রাজু…উ…উ, রাজু…উ…উ’ নাম ধরে আমারা প্রায় এক ঘণ্টা চিৎকার করেছি। রাজুর কোনও সাড়া-শব্দও নেই। রাতের পাহাড় যেন বারবার প্রতিধ্বনিতে ব্যাঙ্গ করেছে। পা আর চলতে চায় না। চোখের সামনে দৈত্যের মতো পাহাড়টা দাঁড়িয়ে রয়েছে। হাসছে ? হয়তো বা…
মাঝরাত পর্যন্ত টর্চের আলোয় খোঁজার পর ক্লান্ত শরীরে সূর্যের অপেক্ষা করছিলাম আমরা। বারবার জ্ঞান হারাচ্ছিল রাজুর মা। আমাদের চোখেমুখে অপরাধ বোধ আর যন্ত্রণা থাকলেও সান্ত্বনা দেওয়ার মতো কিছুই ছিল না। আমরা সবাই মনে মনে প্রার্থনা করছিলাম।
ভোরের আলো ফুটে ওঠার পর আবার শুরু হল খোঁজা। ঘণ্টা খানেক খোঁজার পর রাজুর একটা জুতা পাওয়া গেল একটা শেয়াকুল গাছের গোঁড়ায়। ফোঁটা ফোঁটা রক্তের রেখা পাহাড়ের গভীর জঙ্গলের দিকে। শরের ঝোপ সরিয়ে দ্রুত এগিয়ে চললাম আমরা। এগিয়ে চলল রক্তের রেখা।
রক্তের দাগ ধরে চলতে চলতে একটা টিনের ঘর দেখে দাঁড়িয়ে পড়েছিলাম আমরা। থানার অফিসার জানালেন ওটা চন্দ্রবর্মণের শিলালিপি সংরক্ষণের অসংরক্ষিত ঘর। আরও কাছে যেতেই চোখে পড়ল শিলালিপিটা। অদ্ভুত ভাবে রক্তের রেখাটাও গেছে শিলালিপি ঘরটার দিকে। এদিকটায় ঝোপঝাড় কম বলেই আমরা দ্রুত এগিয়ে যেতে পারছিলাম। শিলালিপি ঘরটার সামনে গিয়ে যা দেখলাম সেটা দেখার জন্য আমরা এক্কেবারেই প্রস্তুত ছিলাম না।
রাজুর ডানদিকের চোয়াল-ঘাড়-গলায় কোনও মাংস নেই। ভয়ংকর ভাবে বেরিয়ে আছে হাড় আর দাঁতের সারি। সারা শরীরে হিংস নখ-দাঁতের আঁচড়। চোখ দুটো বড়বড় হয়ে তাকিয়ে রয়েছে শিলালিপিটার দিকে। চারদিকটা রক্তে ভরে আছে। অসম্ভব এক আতঙ্কে আমি পিছিয়ে এলাম কয়েক’পা। গলাটা যেন শুকিয়ে এসেছে। এক নাগাড়ে ভোঁ-ভোঁ করছে কান দুটো। পাগলের মতো চিৎকার করছে রাজুর মা, দুমদুম করে কপাল ঠুকছে প্রাচীন শিলালিপিটায়। আমার ভয় করছে, কেন যেন ভীষণ ভয় করছে আমার!
Susunia pahar for tourists
[সমাপ্ত]
Share
Published by
admin

Recent Posts

Notun bangla chudi golpo 2020
  • Bangla choti
  • Choti golpo
  • Golpo
  • চটি গল্প
  • প্রেমের গল্প

Notun bangla chudi golpo 2020

Bangla chudi golpo:- ভাল গল্পের খোঁজে পাঠক দিনরাত ঘুরে বেড়ায় কিন্তু তেমন মনের মতো গল্প পায় না। আমাদের আজকের নিবেদন… Read More

4 days ago
Top 100 good morning flower images free download
  • good morning images

Top 100 good morning flower images free download

Top 100 good morning flower images free download. Good morning HD image with quotes, 100 good morning quotes. Good morning… Read More

1 week ago
Ishwar Chandra Vidyasagar Rachana for madhyamik and HS
  • সাহিত্য আলোচনা

Ishwar Chandra Vidyasagar Rachana for madhyamik and HS

Ishwar Chandra Vidyasagar Rachana is very important for all classes এবছর Madhyamik 2020 এবং Uchch Madhyamik 2020 এর জন্য Ishwar… Read More

1 week ago
bangla choties app download android
  • Bangla choti

bangla choties app download android

[smartslider3 slider=2] If you want to bangla choties app download android then please visit here. Bangla choties app available here.… Read More

1 month ago
bangla serial and bangla serial video
  • Bangla serial

bangla serial and bangla serial video

Bangla serial :- আপনি কি Bangla serial দেখতে বা Bangla serial video দেখতে খুব ভালবাসেন? তাহলে এই লেখাটা আপনার জন্য।… Read More

1 month ago
Bangla Kobita 1970-2020
  • Bangla kobita
  • Bangla Kobita abritti
  • Bangla love kobita

Bangla Kobita 1970-2020

Bangla kobita আশির দশক থেকে বর্তমান পর্যন্ত বিভিন্ন ধারায় প্রবাহিত। বাংলা কবিতার দিক বদল হয়েওছে একাধিক শক্তিশালী কবির হাত ধরে।… Read More

1 month ago
Loading...