Premer golpo, sraboner dharar moto

Bangla premer golpo jodi porte valobasen tahole sraboner dharar moto premer golpota pore dekhun.

ভালবাসার গল্প

Premer golpo                    

Premer golpo

শ্রাবণের ধারার মতো…

                              বাপ্পাদিত্য মুখোপাধ্যায়

Premer golpo 2019-20

‘মেলাবেন তিনি মেলাবেন…’ এই আশায় দিন গুনে-গুনে পাঁচ বছর পেরিয়ে আজকে আবার সুযোগ এসেছে। এবারেও সেই শ্রাবণ মাস। এবারেও সেই বিয়ে বাড়ি। সেদিন ছিল তারক কাকুর বিয়ে আর এবারে তারক কাকুর ভাই অরূপ কাকুর। সেদিন আমি ক্লাস নাইন। আজ কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। সেদিন ছিল লম্বা চুল। চোখে চশমা। আজকে চুল ছোট করে ছাঁটা। চশমাটা পরি না আর। 
 
 
 
 
তারক কাকুর বিয়ের দিন সকাল বেলায় আমার পিসতুতো ভাই ছোটন আমাকে এসে বলেছিল, ‘একটা দারুণ মেয়ে দেখলাম সমু।’ গল্পটা শুরু ওখান থেকেই। যদিও আমি ছোটনের কথাটা প্রথমে বিশ্বাস করিনি। কারণ যে গ্রামে হাজার চেষ্টা করে একটা ডাভ সাবান পাওয়া যায় না, সেই গ্রামে সুন্দরী মেয়ের দেখা মিলবে সেই ভাবনাটা ছিল দিবাস্বপ্নের মতোই। কিন্তু পাত্রদের পুকুরে স্নান করতে গিয়ে যখন দেখলাম তখন বিশ্বাস হল। পানা পুকুরেও পদ্ম ফোটে। সেদিন আমরা পঞ্চপাণ্ডব একসঙ্গে স্নান করতে গিয়েছিলাম। আমি আর আমার দুই পিসির দুই দুই চার ছেলে। ছোটন আমার কানের কাছে ফিসফিস করে আবার বলেছিল, ‘সমু দ্যাখ,- সেই মেয়েটাই।’ 
একটা গামছাকে শাড়ির মতো করে পেঁচিয়ে আপন মনে হাঁটু জলে দাঁড়িয়ে মুখে সাবান মাখছিল মেয়েটা। মনে আছে আমাদেরকে পুকুর আসতে দেখে লজ্জায় পিছন ফিরে দাঁড়িয়েছিল ও। মজার বিষয়, ওর হাতের সাবানটা ছিল ‘ডাভ’। বুকের উপরের অংশ আর হাঁটুর নীচের অংশ অনাবৃত ছিল ওর। জ্যোৎস্না রঙের পিঠে ছড়িয়ে থাকা লম্বা চুলগুলোই সেদিন বেশি আকর্ষণ করেছিল আমাকে। আমি নির্লজ্জের মতো পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে দু’চোখ দিয়ে সেদিন জানি না কি সুরা গোগ্রাসে গিলে নিয়েছিলাম। আজ পাঁচ বছর পরেও মনে সেই নেশা অনুভব করি। আমাকে বেহায়ার মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বাপন’দা মানে ছোটনের দাদা হেঁয়ালি করে বলেছিল, ‘ডাভ সাবান দেখছিস ? কিন্তু ওটা নট ফর সেল…’ আমি কিছু শুনতে না পাওয়ার ভঙ্গিতে অপলক ভাবে তাকিয়েই ছিলাম মেয়েটার দিকে। 
সেদিন ভাত খাবার পরে আমি সারা দুপুর মেছো বেড়ালের মতো ওকে খুঁজেছিলাম। কিন্তু ভর-দুপুরে দেবীর দর্শন মেলেনি। দেখলাম সেদিন বিকেল বেলায়। একটা বাড়ির সদর দরজার চৌকাঠে বসে আপন মনে কতক গুলো নুড়ি পাথর নাচাচ্ছিল। দু’একবার চোখ তুলে লাজুক ভাবে দেখেছিল আমাকে। মৌটুসি পাখিরাঙা নীলাভ চোখ দু’টোতে কত স্বপ্ন আঁকাছিল সেদিন। এমন চোখ ভুলে যাওয়ার মতো নয়। 
 
[দুই] Bangla valobasar golpo
সন্ধ্যার সময় বড় কাকুর বড় মেয়ে পম্পাকে বললাম মেয়েটার কথা। প্রথমে বুঝতে পারেনি আমি কার কথা বলছি। যখন বললাম, ‘মেয়েটার চোখ দুটো হালকা নীলাভ। ওই বট গাছটার নীচের বাড়িটার মেয়ে।’ পম্পা ঠোঁটে হাসির রেখাটেনে ভ্রু নাচিয়ে বলেছিল, ‘ও মৌ এর কথা বলছিস ? খুব ভাল মেয়ে। আমার সাথে পড়ে।’ মৌটুসি পাখিরাঙা চোখ মৌ ছাড়া আর কারই বা হতে পারে ? পম্পার বুঝতে বাকি ছিল না আমার মনের অবস্থা। তাই আমাকে আর ব্যাখ্যা করতে হয়নি। কিন্তু একটা বড় সমস্যার কথা ওর মুখেই শুনেছিলাম। ছোটনেরও মেয়েটাকে খুব পছন্দ। সেও লাইনে আছে। তবে পম্পা কথা দিয়েছিল পরের দিন স্কুল যাবার সময় ও মৌকে বলবে আমার কথা।
সকালে পম্পা স্কুলের থেকে কী দুঃসংবাদ আনবে এটা ভেবেই বরযাত্রী থেকে ক্লান্ত শরীরে ফিরেও আমার আর সারারাত ঘুম আসেনি। নিদ্রাহীন রাত যে কতটা বড় হতে পারে তা সেদিন প্রথম বুঝেছিলাম। শেষ পর্যন্ত বিছানা ছেড়ে যখন বাইরে বেরিয়ে এলাম তখন ছোটন বাইরের বারান্দায় চুপচাপ বসে। দূরের লাইটগুলোর দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবছিল ও। আমি আবার বিছানায় এসে শুয়ে পড়েছিলাম। জানি না কেন ছোটনের সামনে যেতে পারিনি।
পরেরদিন সকাল দশ’টা নাগাদ পম্পা খবর আনল,- মৌ আমার প্রতি যথেষ্ট ইন্টারেস্টেড। আমার কি নাম? কোথায় বাড়ি? কদিন থাকব এই সব নানান প্রশ্ন জিজ্ঞেস করেছে ওকে। ঘণ্টা খানেক আগে হলে আমি হয়তো প্রশ্নে প্রশ্নে পম্পাকে বিরক্ত করে তুলতাম। পম্পা যখন আমার চোখে স্বপ্নিল মৌটুসি পাখির পালক ছোঁয়াচ্ছিল আমার তখন শুধু ছোটনের নিষ্পাপ মুখটাই বারবার মনে পড়ছিল। আমি একবিন্দুও খুশি হতে পারছিলাম না কিছুতেই। তবে পম্পার কথায় এটুকু বুঝেছিলাম মৌ এর নীল চোখে আমাকেই ভাল লেগেছে।
সেদিন সকালে ঘরের ভেতর ছোটনকে কোথাও খুঁজে পাইনি। বাইরেও না। বরং দূরের থেকেই দেখতে পাচ্ছিলাম মৌ ওদের দো’তলার ছাতে বসে আমাকে দেখছে। আরও কিছুক্ষণ এদিক সেদিক ছোটনকে খুঁজে বাড়ি ফিরে শুনলাম ছোটন সকালের বাসে বাড়ি চলে গেছে। কথাটা শুনেই মনটা কেমন যেন উদাস হয়ে গিয়েছিল। অনেক দিন পরে ছোটনকে জিজ্ঞেস করেছিলাম ওর বাড়ি পালিয়ে যাবার কারণটা। উত্তরের বদলে হেসেছিল ও।
 
[তিন] adhunik premer golpo
‘ভাই কোথায় নামবে?’ আমার সিটের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক ভদ্রলোকের প্রশ্নে আমি মুহূর্তের জন্য বাস্তবে ফিরে এলাম, ‘বদ্যনাথপুরে নামব।’ লোকটার প্রশ্নের উত্তর দিয়েই আবার হারিয়ে যেতে লাগলাম অতীত নগরে। বাসটা তখন ছুটে চলেছে একটা নাম না জানা গ্রামকে পিছনে ফেলে। খেয়াল করিনি কখন বাসটা ভিড়ে ঠাঁসা হয়ে গেছে। দেখলাম আমার পাশে বসে থাকা ঘুমন্ত লোকটাও আর নেই। ওর পরিবর্তে ধুতিপাঞ্জাবি পরা এক বুড়ো বসে বসে ঢুলছেন।
যেদিন সকালে ছোটন চলে গেল সেদিন বিকেলে পম্পা মৌকে পাশের এক বান্ধবীর বাড়িতে নিয়ে এসেছিল আমার সাথে দেখা করাবার জন্য। পম্পা বলেই সম্ভবছিল হয়তো। নতুবা দু’দিনের ভেতর দেখা তো দূরের কথা দু’মাসেও সম্ভব হত না বোধ হয়। দুপুরে ভাত খেতে বসে যখন শুনলাম মৌ বিকেলে দেখা করতে আসবে তখন থেকেই বুকের ভেতর একটা অপরিচিত উত্তেজনা হচ্ছিল। সময় যেন আর কাটতে চাইছিল না। মনের ভেতরে একটা দুশ্চিন্তার নাটক অভিনীত হয়ে চলেছিল বিরামহীন ভাবে। মৌ এটা বললে আমি এটা বলব। তারপর যদি মৌ ওটা বলে তাহলে আমি সেটা বলব। যতসব উল্টো পাল্টা নাট্য সংলাপের প্রস্তুতি চলছিল মনে মনে। পরিষ্কার মনে পড়ে আমার হাতের তালু বারবার ঘেমে যাচ্ছিল উত্তেজনায়। প্রথম কোনও মেয়ের সাথে দেখা করব! জানিও না কী ভাবে প্রপোজ করে। আবার দেখা করতে গিয়ে ধরা পড়লে কেলিয়ে বৃন্দাবন দেখা করাবে কাকুরা। সেই কথা যেদিন বাবা শুনবে সেদিন যে কী কুরুক্ষেত্র হবে ভাল মতোই জানাছিল আমার। তবে এটা অবশ্যই ঠিক যে,- ভয়ের চেয়েও বেশি কিছু ব্যাখ্যাতীত একটা জিনিশ কাজ করছিল ভেতরে ভেতরে। 
শেষ পর্যন্ত ছয় জন ভাইবোনের নিশ্ছিদ্র প্রহরীর সহায়তায় আমি দেখা করতে গেলাম। আমি পৌঁছানোর আগেই মৌ পৌঁছে গিয়েছিল। ঘরের ভেতর ঢুকে দেখলাম মৌ একটা খাটিয়ার উপর বসে দাঁত দিয়ে নখ কাটছে। আমার পিছনে পিছনে পম্পাও এসে ঢুকল আমাদের পরিচয় করিয়ে দেবার জন্য। বুকের ভেতরটা কেমন যেন টিপ টিপ করছিল আমার। পম্পা পরিচয় পর্ব শুরুর আগেই মৌ নিজেই নিজের নাম বলল, ‘আমার নাম মৌ পাত্র। আপনার নাম আমি শুনেছি পম্পার কাছে।’ 
ক্লাস নাইনে পড়ছি তখন কেও তুমি সম্বোধন করেছে বলেও মনে হয় না। তাই ‘আপনার নাম’ শব্দটা শুনে কেমন যেন একটা দাদা দাদা ভাব চলে এসেছিল মনের ভেতর। একটু গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করে ছিলাম, ‘তা একা একা দেখা করতে এলে, তোমার ভয় করল না ?’ 
মৌ একটু মুচকি হেসে পম্পাকে বলল, ‘তোর দাদার ভয় করছে মনে হয়।’ তারপর আমার দিকে চোখ দুটোকে মেলে দিয়ে বলেছিল, ‘ ভয় পাবেন না আমি কিছু করব না।’ এবার মৌ এর হাসির সাথে পম্পাও সুর মেলায়। ওদের হেঁয়ালিতে প্রথম দর্শনের প্রথম মিনিটেই আমার পুরো মুখটাই লাল হয়ে গিয়েছিল। মনে পড়লে এখনো লজ্জা পাই নিজে নিজে। মৌ এর কথায় দাদা দাদা ভাবটা মিলিয়ে গিয়ে কেমন যেন খোকা খোকা লাগছিল নিজেকে। তাও সাধ্য মতো গলার স্বর স্বাভাবিক রেখে বলেছিলাম, ‘সেটা বলিনি আমি, মানে অপরিচিত মানুষের সাথে একলা ঘরে দেখা করতে এলে তাতে ভয় করেনি ? এটা জিজ্ঞেস করলাম।’
মৌ চোখ দুটোকে একটু বাঁকিয়ে নীচের ঠোঁট উল্টে উত্তর দিয়েছিল, ‘মা কে সঙ্গে করে আনলে বুঝি খুশি হতেন ?’  আমি কী বলব কিছুই খুঁজে পাইনি। ওরা দুজনে মুচকি মুচকি হেসেই চলেছিল। আমাকে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে পম্পা বলল, ‘আমার সামনে কথা বলতে দাদার হয়তো অসুবিধে হচ্ছে তোরা গল্প কর আমি বাইরে আছি।’ 
পম্পা চলে যাবার পরেও আমরা দুজনে বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ বসেই ছিলাম। শেষ পর্যন্ত মৌ নিজেই কথা বলল, ‘আপনাকে তুমি দিয়ে কথা বললে কোনো সমস্যা নেই তো ?’ 
এবার যেন আমি পায়ের তলায় মাটি খুঁজে পেলাম, ‘না না সমস্যা আবার কীসের বরং তুমি দিয়ে কথা বললেই বেশি আপন লাগবে।’ 
‘তা আর কী কী বললে বেশি আপন লাগবে শুনি একটু ?’ 
লজ্জায় আমার মুখটা আবার লাল হয়ে গিয়েছিল। কী উত্তর দেবো সেই মুহূর্তে খুঁজেই পাচ্ছিলাম না। চুপ করেই ছিলাম। হঠাৎ করেই মৌ একটা আবেগি প্রশ্ন করে বসেছিল সেদিন, ‘তা এখান থেকে যাবার পর আবার কবে আসবে ? না এখানেই শেষ?’ কথা গুলো জিজ্ঞেস করতে করতেই মৌ এর চোখ দুটো ছলছল করে এসেছিল। নীল আকাশের মতো চোখ দুটো মুহূর্তেই যেন হারিয়ে গিয়েছিল দুশ্চিন্তার কালো মেঘে। যে মেয়েটা একটু আগেই তার বাক্যবাণে আমাকে গেঁথে চলেছিল সে যে নিমেষে এতটা আবেগে তলিয়ে যাবে সেটা ভাবতে পারিনি। 
সেদিন হঠাৎ করেই বৃষ্টি শুরু হওয়ায় প্রায় এক ঘণ্টা কথা হয়েছিল আমাদের। জানি না কোথায় সাহস পেয়ে মৌকে প্রথম দেখাতেই জড়িয়ে ধরেছিলাম। বাধা দেয়নি মৌ। নরম বাহুবলয়ে বেঁধে শুধু একটা কথাই বলেছিল, ‘ভগবানকে বলবে যেন তুমি ভুলে গেলেও আমি মনে রাখি।’ পাঁচ বছর পরেও এই কথাটার জোরেই হয়তো এখনো ভাবতে পারছি মৌ আমাকে ভুলে যায়নি। 
[চার] sera premer golpo
হাতিরামপুর পেরিয়ে বাসটা বদ্যনাথপুরের রাস্তা ধরল এবার। আমি ব্যাগের ভেতর থেকে মৌ এর দেওয়া একমাত্র উপহার ঝিনুকের ফুলদানিটা বারকরলাম। যেদিন বিকেলে দেখা করেছিলাম তার পরের দিন মৌ আমাকে ফুলদানিটা দিয়েছিল। ‘যখন আমার কথা মনে পড়বে এই ফুল গুলোকে দেখো।’- বলেছিল মৌ। একদিন ফুলদানিটা বুকে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম বলে দুটো ঝিনুক ছেড়ে গিয়েছিল। সেদিন আমি কিছু খেতে পারিনি। মৌ এর আরেকটা কথা খুব মনে পড়ে, ‘পরের বার যখন আসবে একটা সিঁদুর কৌটা এনো। তুমি একবার আমাকে সিঁদুরে বেঁধে নিলে তারপর আমার আর তোমাকে হারানোর ভয় থাকবে না।’ 
আমিও ঝিনুকেরই একটা সিঁদুর কৌটা কিনেছিলাম মৌকে উপহার দেবো বলে। কিন্তু এই পাঁচ বছরে আমার আর বদ্যনাথপুর আসা হয়ে ওঠেনি।
‘কেন ?’
আসলে মৌ অনেকবার বারণ করা সত্ত্বেও আমি মৌকে চিঠি পাঠিয়ে ছিলাম। নিজেকে আটকাতে পারিনি আমি। চিঠিটা পাঠিয়ে ছিলাম পম্পার নামে। কিন্তু চিঠিটা পড়েছিল অরূপ কাকুর হাতে। আমার বাড়ি এসে চিঠিটা বাবার হাতে তুলে দিয়েছিল অরূপ কাকু। তারপর বাস্তবে যা হয় তাই হয়েছিল আমার সাথেও। বদ্যনাথপুর যাবার রাস্তা বন্ধ হল আমার জন্য। স্বপ্নেও ভাবিনি আবার কোনদিন বদ্যনাথপুরের দরজা খুলবে আমার জন্য। কিন্তু কবি যে বলেছেন, ‘মেলাবেন তিনি মেলাবেন…।’ তিনি মেলাতে চাইলে কার সাধ্য যে আটকায়।                
[পাঁচ]
বাস থেকে নামে আমি সোজা হাঁটা লাগালাম বদ্যনাথপুরের দিকে। আজকে পাঁচ বছর পরে আবার বদ্যনাথপুরের মাটিতে পা রাখলাম। বাড়িতে ঢুকেই আমি মিষ্টির খাপটা তারক কাকুর বৌয়ের হাতে ধরিয়ে দিয়ে পম্পার খোঁজ করলাম। পম্পা তখন আত্মীয়দের সঙ্গে গল্প করায় ব্যস্ত। আমি পম্পার ঠিক পিছনে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কিরে কেমন আছিস পম্পা? চিনতে পারছিস ?’ 
পিছন ঘুরে আমাকে দেখেই পম্পার মুখটা কেমন যেন ফ্যাকাসে হয়ে গেল। তবুও একটু হাসার চেষ্টা করে বলল, ‘তুইও না সমুদা চিনতে পারব না কেন। ভালো আছিস?’  
আমি হাঁ না কিছুই বললাম না শুধু বললাম, ‘পরে তোর সাথে অনেক কথা হবে।’কথাটা বলেই সরে গেলাম ওখান থেকে।
খিদের চোটে পেটে ইঁদুর ছুটছিল। স্নান সেরে ভাতের থালা নিয়ে বসে পড়লাম। আমার যখন দু’এক খাবল খাওয়া হয়েছে তখন বাপন’দা আর ছোটপিসি এসে ঢুকল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কিরে বাপনদা ছোটন আসবে না ?’ উত্তরটা দিল ছোটপিসি, ‘না না ও কেমন করে আসবে ? আজকেই তো আমাদের গ্রামের পল্লবের বিয়ে।’ আমি আর কথা বাড়ালাম না। চুপচাপ ভাত গুলো গিলে হাত মুখ ধুয়ে বড় দাদুর ঘরে গিয়ে বসলাম। 
আমাকে বড় দাদুর ঘরে ঢুকতে দেখেছিল পম্পা।  কিছুক্ষণ পরে পম্পাও চুপিচুপি দাদুর ঘরে এসে ঢুকল। আমি কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই পম্পা জিজ্ঞেস করল, ‘তুই কী ভেবেছিলি আমি পাল্টে গেছি ?’ 
আমি একটু হেসে বললাম, ‘না না তা কেন ভাবব। তোর কোন ক্লাস চলছে এখন ?’ 
পম্পা আমার কথাটা শুনতে না পাওয়ার মতো করে বলল, ‘তোকে কিন্তু চশমা ছাড়া বেশ অন্যরকম লাগছে।’ 
আমি হাসলাম। জিজ্ঞেস করলাম না, ভালো লাগছে না মন্দ । কিছুক্ষণ চুপ থেকে আমি বললাম, ‘আজকে বিকেলে একবার মৌ এর সাথে দেখা করাতে পারবি ?’ আমার কথাটা শুনে পম্পার মুখটা এবার যেন আরও বেশি ফ্যাকাসে হয়ে গেল। উত্তর না পায়ে আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, ‘কি পারবি না ?’ পম্পা এবারেও কিছুই বলল না। যেমন ভাবে এসেছিল তেমন ভাবেই বেরিয়ে গেল।
পম্পার অদ্ভুত ভাবে চলে যাবার কারণ খুঁজতে খুঁজতে আমি শুয়ে পড়েছিলাম। কখন চোখ লেগে গিয়েছিল জানতেই পারিনি। সানাই আর বাজনার শব্দে ঘুমটা ভাঙল। জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখলাম সবাই পাত্রদের পুকুরের দিকে জল সইতে যাচ্ছে। একবার ভাবলাম আমিও যাই যদি রাস্তার ধারে মৌ দাঁড়িয়ে থাকে ? অন্তত চোখের দেখা তো হবে কথা না হোক। পরে আবার কেমন যেন লাগল মনটা। আবার শুয়েই পড়লাম। বাজনা আর সানাইয়ের সুরটা কানে বেজেই চলল।
সন্ধ্যার গড়ায় গড়ায় উঠে চোখমুখে জল নিয়ে জামা প্যান্ট পাল্টে বরযাত্রী যাবার পাঞ্জাবী পাজামাটা পরে নিলাম। তারপর রান্না ঘরে এসে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে দিদিমাকে জিজ্ঞেস করলাম বরযাত্রী যাবার বাস কখন আসবে ? দিদিমা কেমন যেন মুখ বাঁকিয়ে উত্তর দিলে, ‘বাস কেন তোর জন্য…’কথাটা শেষ না করেই দিদিমা পাশের ঘরে চলে গেল। এই দিদিমা হলেন বাবার বড় মামি। অরূপ কাকুর মা। দিদিমার এমন মুখ বাঁকানোর একটাই কারণ হতে পারে সেই ধরা পড়ে যাওয়া অভিশপ্ত চিঠিটা। কিন্তু বাস না আসার কারণ কিছু খুঁজে পেলাম না। 
খানিটা বিরক্ত হয়েই চায়ের কাপটা রেখে আমি মৌ’দের বাড়ির দিকে বেরিয়ে পড়লাম। আর ধৈর্য ধরছিল না আমার। কিছুদূর এসে রাস্তার উপর একটা প্যান্ডেল চোখে পড়তেই আমার পা’দুটো কেমন যেন অসাড় হয়ে এল। তবু আরও কিছুটা এগিয়ে এলাম। হাঁ প্যান্ডেলটা মৌ’দের দরজার সামনেই বানানো হয়েছে। এবার চোখ পড়ল প্যান্ডেলের চূড়ার উপর তিনটা পরিচিত শব্দে, ‘মৌ পরিণয় অরূপ।’তিনটা শব্দে আমার তিনটা প্রশ্নের উত্তর মিলে গেল। কেন অরূপ কাকু আমার চিঠিটা বাবার হাতে দিতে এসেছিল, কেন পম্পা অমন করে চলে গেল, কেন মুখ বাঁকিয়ে দিদিমা বলল, ‘বাস কেন তোর জন্য…’
পাঞ্জাবীর পকেটে হাত দিয়ে দেখলাম সিঁদুরের কৌটাটা নেই। প্যান্টের পকেটেই রয়ে গেছে। সব কেমন যেন তালগোল পাকিয়ে গেল এক মুহূর্তে। কোনও রকমে প্যান্ডেলটার সামনের ভিড় কাটিয়ে এসে দাঁড়ালাম শূন্য মাঠে একলা দাঁড়িয়ে থাকা একটা কাঞ্চন গাছের নীচে । 
পশ্চিমের আলো আঁধার আকাশটা এখন আমার চোখের মতোই লাল হয়ে উঠেছে। আর কিছুক্ষণ পরেই হয়তো বৃষ্টি আছড়ে পড়বে বদ্যনাথপুর গ্রামে। তাহলে এই দিনটার জন্যই কী অরূপ কাকু আমার চিঠিটা নিয়ে বাড়িতে…! কিন্তু মৌ? ও তো সত্যিই ভালবেসেছিল। নাকি সেও…। আর নিজেকে প্রশ্ন করে কোনও লাভ নেই। বুঝতে পারলাম আমার প্রশ্নের উত্তরগুলো এই পাঁচবছরে অনেকটা পথ পাল্টে নিয়েছে।
তবুও মনের ভেতর হাজার হাজার প্রশ্নের পোকা কিলবিল করছে কেন ? আমি চোখ দুটোকে প্রাণপণে দমিয়ে রেখে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইলাম প্রশ্নের স্তূপের উপর। বুকের ভেতরটা যেন দুমড়ে মুচড়ে ছিঁড়ে ফেটে যাচ্ছে। দূরের থেকে ভেসে আসছে বিদায় সঙ্গীত, ‘হয়তো কোনও দিন ভুলে যাবে তুমি ভুলতে কি পারব তোমায়।’ যদিও কিছুই বলার নেই তবুও উদাসীন অভিমানে মাথা উঁচু করে ভগবানের দিকে শুধু একবার চাইলাম। চোখে পড়ল কাঞ্চন গাছের একটা ফুলে ঝুলতে থাকা একটা মৌটুসি পাখির উপর। পাখিটা তখন আপন মনে মধু খেয়ে যাচ্ছে। মধু শেষ হলেই পাখিটা উড়ে যাবে আরেকটা গাছে আরেকটা ফুলে। সব মৌটুসি পাখিগুলোই কি এমন হয় ? শুধু একটা গাছ থেকে আরেকটা গাছে মধু খেয়ে খেয়ে উড়ে বেড়ায় ? 
ফোঁটা-ফোঁটা করে বৃষ্টি শুরু হল এবার। আমি ভিজছি। আকাশের দিকে তাকিয়ে ভিজছি আমি। শ্রাবণের ধারায় আমার চোখ থেকে পাঁচ বছরের স্মৃতি ঝরে পড়ছে এখন।
                                [সমাপ্ত] 
serar sera bangla premer  golpo.
Spread the love

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.