X

If you like Bengali detective story, Bengali ghost story, Sunday suspense, bomkesh bakshi, then this novel is for you

If you like Bengali detective story, Bengali Ghost story, Sunday suspense, bomkesh bakshi, feluda then this novel is for you. রহস্যময় মেরিন দ্বীপ, সেরার সেরা উপন্যাস

Rahashyomoy merin Deep

Bengali detective story Bengali Ghost story Sunday Suspense bomkesh bakshi, feluda

রহস্যময় মেরিন দ্বীপ, বাপ্পাদিত্য মুখোপাধ্যায় a detective novel

মাঝে মাঝেই দৈত্যাকার ঢেউয়ের ধাক্কায় জাহাজটা দুলে দুলে উঠছে। রূপ পাল্টে যাচ্ছে সমুদ্র দেবতার। গাড় নীল জলরাশির গম্ভীর ভাবখানা দেখে ভয় না পাওয়াটাই আশ্চর্যের। তবুও ডুবছে না নির্ভীক জাহাজটা। হেলতে দুলতে এগিয়ে চলেছে সে। সুদূর আকাশ থেকে দেখলে হয়তো মনে হতে পারে নীল সমুদ্রের বুকে একটা কাগজের নৌকা ভেসে যাচ্ছে। হাজার চেষ্টা করেও সমুদ্র দেবতা তাকে ডোবাতে পারছে না। প্রায় ঊনচল্লিশ বছর আগে ৩/১১/১৯৭৬ মতান্তরে ৩/৭/১৯৭৬ সালে এই পথ ধরেই একদিন জীবনের শেষ পাড়ি দিয়েছিলেন পুয়ের্টো রিকোর বাসিন্দা ক্যাপ্টেন অলিভার আর্নল্ড আর হেনরি লুই। ওঁরা আজও ফেরেনি। হয়তো ফিরবেও না কোনও দিন। অচেনাকে চেনার, অজানাকে জানার, অদেখাকে দেখার নির্ভেজাল ইচ্ছে গুলোই মাঝে মাঝে কিছু মানুষকে বোহেমিয়ান বানিয়ে দেয়। সেদিন এমনই কোনও এক রহস্যের নেশায় আর্নল্ড আর লুই এসেছিলেন এই পথে। আজকের যাত্রাপথেও পুয়ের্টো রিকোর বাসিন্দা এডগার লি এবং উনার সঙ্গী আমাদের উত্তরবঙ্গ সন্তান সম্রাট বসু।


লিয়ের সঙ্গে সম্রাটের বয়স খাপ না খেলেও দুজনেই প্রায় সম মানসিকতার। এডগার লি যৌবনের বেশ কয়েকটা বছর কর্মসূত্রে জাহাজের ক্যাপ্টেন রূপে কাটিয়েছেন। কাটিয়েছেন সখের গোয়েন্দা রূপেও বেশ কয়েকটা বছর। কিন্তু ‘হেথা নয় হেথা নয় অন্য কোথা অন্য কোনো খানে’- মনোভাবটাই উনাকে স্থির ভাবে কোনও কাজ করতে দেয়নি। তাই খামখেয়ালি ভাবেই কখনো বেরিয়ে পড়েছেন আফ্রিকা। কখনো ইজিপ্ট। কখনো আবার আমাদের সুন্দরবন কিংবা জলদাপাড়া। এই পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘ সাত বছর কাটিয়েছেন লি। একশিরা গণ্ডার আর দৈত্যাকার কাঠবিড়ালির খোঁজে ডুয়ার্সে এসে সম্রাটের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল লিয়ের। সেই থেকেই শুরু দুজনের একসঙ্গে পথ চলা। আজকে দুজনের যাত্রাপথ পৃথিবীর সবচেয়ে রহস্যময় অঞ্চল বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের দিকে। বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের রহস্য যে অন্যান্য রহস্যের চেয়ে কতটা আলাদা সেটা মনে হয় আজকের পৃথিবীতে কারু আর জানতে বাকি নেই।


পৃথিবীর সবচাইতে অভিশপ্ত স্থানগুলোর মধ্যে বারমুডা ট্রায়াঙ্গল বা ত্রিভুজকে অন্যতম মনে করা হয়। এ পর্যন্ত এখানে যত রহস্যময় দুর্ঘটনা ঘটার কথা শোনা গেছে, অন্য কোথাও এত বেশি এরকম দুর্ঘটনা ঘটেনি। তিনটি প্রান্ত দিয়ে এ অঞ্চলটি সীমানা বদ্ধ। আর তাই একে বলা হয় বারমুডা ট্রায়াঙ্গল বা বারমুডা ত্রিভুজ। তিনটি প্রান্তে এক প্রান্তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা, একপ্রান্তে পুয়ের্টো রিকো এবং অপর প্রান্তে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বারমুডা দ্বীপ অবস্থিত। ত্রিভুজাকার এই অঞ্চলটির মোট আয়তন ১১৪ লাখ বর্গ কিলোমিটার। এটি ২৫-৪০ ডিগ্রি উত্তরাংশ এবং ৫৫-৫৮ ডিগ্রি পশ্চিম দ্রাঘিমাংশের মধ্যে অবস্থিত। এ অঞ্চলের রহস্যময়তার একটি দিক হল, কোনও জাহাজ এই ত্রিভুজ এলাকায় প্রবেশ করার কিছুক্ষণের মধ্যেই বেতার তরঙ্গ প্রেরণে অক্ষম হয়ে পড়ে। উপকূলের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনে ব্যর্থ হয়। একসময় দিক নির্ণয় করতে না পেরে রহস্যজনক ভাবে অদৃশ্য হয়ে যায়। মার্কিন নেভির সূত্র অনুযায়ী, গত ২০০ বছরে এ এলাকায় কমপক্ষে ৫০টি বাণিজ্যিক জাহাজ এবং ২০টি বিমান চিরতরে অদৃশ্য হয়ে গেছে। এর মধ্যে ১৯৬৮ সালের মে মাসে হারিয়ে যাওয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক ডুবোজাহাজের ঘটনাটি সারা বিশ্বে সবচাইতে বেশি আলোড়ন তুলেছিল। ১৯৪৫ সালের ডিসেম্বরে মার্কিন যুক্তরাষ্টের পাঁচটি বোমারু বিমান প্রশিক্ষণ চলাকালীন হারিয়ে যায়। হারিয়ে যাবার মুহূর্তে বৈমানিকদের একজন অতি নিম্ন বেতার তরঙ্গ পাঠাতে সক্ষম হয়েছিলেন মাত্র।


আজ ১৭/০৩/২০১৫। প্রায় তিনদিন ধরে এডগার লি আর সম্রাট বসু ভেসে চলেছে সমুদ্রের নীল জলরাশির বুকে। গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত মাথার উপর রঙবেরঙের পাখির দেখা মিলেছিল। আজকে সকাল থেকেই পাখি শূন্য আকাশ। সমুদ্রের ঢেউ কখনো শান্ত কখনো আবার দানব আকৃতির। সময়ের সঙ্গে সঙ্গেই পাল্টাচ্ছে জলের রঙ। লি জাহাজের ডেকের উপর দাঁড়িয়ে চোখে দূরবীন এঁটে সুদূর নীল জলের দিকে তাকিয়ে আছেন। পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়া সূর্যের শেষ আলোকরশ্মি লিয়ের হালকা বাদামী রঙের দাড়ি গুলোকে আরও উজ্জ্বল বাদামী করে তুলেছে। সম্রাট ডেকের উপর একটা চেয়ারে বসে একমনে দেখছে বারমুডার ম্যাপটা। হাতের ইশারায় এবার সম্রাটকে ডাকলেন লি। দূরবীনটা সম্রাটের হাতে দিয়ে বললেন, ‘মিঃ ইয়াং ম্যান দেখো তো কিছু চোখে পড়ে কী না।’
সম্রাট লিয়ের হাত থেকে দূরবীনটা নিয়ে নিজের চোখে লাগিয়ে সুদূর নীল জলের উপর রহস্যময় কিছু একটা খোঁজার চেষ্টা করে। প্রথমটায় তেমন কিছুই চোখে না পড়লেও একটু ভালভাবে খুঁজতেই সম্রাট দেখতে পায়, অনেক দূরের নীল জলরাশির উপর দিয়ে যেন বিশালাকার কয়েকটা মেঘ ছুটে আসছে। খানিকটা ঘাবড়ে গিয়েই সম্রাট লিকে জিজ্ঞেস করে, ‘ওটা কী ছুটে আসছে আমাদের জাহাজের দিকে ?’


লির গলায় কোনও বিস্ময় বা আতঙ্ক নেই। কয়েক মিনিট আগেও লিয়ের কণ্ঠ যেমন শান্ত ছিল এখনো ঠিক তেমনেই শান্ত, ‘আরে এত ঘাবড়াবার কিছু নেই। ওটা কুয়াশা ঝড়। আসলে আমরা বারমুডার এলাকায় ঢুকে পড়েছি বেশ কয়েক ঘণ্টা আগেই।’
‘তা কেমন করে হয়! ম্যাপ বলছে জাহাজের গতি মতো এখনো ঘণ্টা চারেকের রাস্তা।’ বিস্ময়ের সঙ্গেই কথা গুলো বলে সম্রাট।
‘ম্যাপ অমন অনেক কিছুই বলে। কিন্তু বারমুডা ওসব শুনতে চায় না। আসলে বারমুডার কোনও স্থির এলাকা নেই। ওর আয়তন প্রতিনিয়ত বাড়া কমা করে। মিঃ ইয়াং ম্যান তোমার ঘড়ির সঙ্গে সূর্যের অবস্থানটা একটু মিলিয়ে দেখো তো একবার।’ বেশ শান্ত অথচ গম্ভীর ভাবেই কথা গুলো বললেন লি।


সম্রাটের ঘড়িতে এখন দুটো বেজে পঁয়তাল্লিশ মিনিট। ওদিকে পশ্চিম আকাশে সূর্য ডুববে আর কয়েক মিনিট পরেই। সম্রাটের মুখ দিয়ে আর একটা কথাও বার হয় না। ও শুধু লিয়ের শান্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে থাকে। লি খানিকটা কাছে এসে সম্রাটের দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘এটা কোনও নতুন ঘটনা নয়। আমি আগেও এমন গল্প পড়েছি। ক্যাপ্টেন মার্গারেট কলিং উনার “গ্রিন ওয়াটার” গ্রন্থে বারমুডার যে বর্ণনা দিয়েছিলেন সেখানে উনি পরিষ্কার করেই বলেছিলেন, ম্যাপ কম্পাস আর ঘড়ির উপর ভরসা করলেই বারমুডায় ডুবতে হবে।’
‘কিন্তু আমি তো অন্য কারুর বইয়ে এমন কিছুই পড়িনি।’ সম্রাটের গলায় এখনো বিস্ময় লেগে রয়েছে।


‘তা কেমন করে হয়! ম্যাপ বলছে জাহাজের গতি মতো এখনো ঘণ্টা চারেকের রাস্তা।’ বিস্ময়ের সঙ্গেই কথা গুলো বলে সম্রাট।
‘ম্যাপ অমন অনেক কিছুই বলে। কিন্তু বারমুডা ওসব শুনতে চায় না। আসলে বারমুডার কোনও স্থির এলাকা নেই। ওর আয়তন প্রতিনিয়ত বাড়া কমা করে। মিঃ ইয়াং ম্যান তোমার ঘড়ির সঙ্গে সূর্যের অবস্থানটা একটু মিলিয়ে দেখো তো একবার।’ বেশ শান্ত অথচ গম্ভীর ভাবেই কথা গুলো বললেন লি।
সম্রাটের ঘড়িতে এখন দুটো বেজে পঁয়তাল্লিশ মিনিট। ওদিকে পশ্চিম আকাশে সূর্য ডুববে আর কয়েক মিনিট পরেই। সম্রাটের মুখ দিয়ে আর একটা কথাও বার হয় না। ও শুধু লিয়ের শান্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে থাকে। লি খানিকটা কাছে এসে সম্রাটের দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘এটা কোনও নতুন ঘটনা নয়। আমি আগেও এমন গল্প পড়েছি। ক্যাপ্টেন মার্গারেট কলিং উনার “গ্রিন ওয়াটার” গ্রন্থে বারমুডার যে বর্ণনা দিয়েছিলেন সেখানে উনি পরিষ্কার করেই বলেছিলেন, ম্যাপ কম্পাস আর ঘড়ির উপর ভরসা করলেই বারমুডায় ডুবতে হবে।’
‘কিন্তু আমি তো অন্য কারুর বইয়ে এমন কিছুই পড়িনি।’ সম্রাটের গলায় এখনো বিস্ময় লেগে রয়েছে।


‘আসলে তুমি যাদের লেখা পড়েছ উনারা কেউ বারমুডায় আসেন নি। উনারা লিখেছেন কল্পনার ডানার উপর দাঁড়িয়ে। কিন্তু ক্যাপ্টেন মার্গারেট কলিং ? সেই জীবিত ব্যক্তি যিনি বারমুডায় প্রায় দুই দিন এক রাত্রি কাটিয়ে গিয়েছিলেন। আমি উনার বইটা বেশ কয়েকবার ভালভাবে পড়েছি। আমার মনে হয়েছে বারমুডা থেকে বেঁচে ফেরা সম্ভব তাই তো আজকে…। আচ্ছা আমি তো কোনও বিপরীত পরিস্থিতিতে তোমাকে ঘাবড়াতে দেখিনি। তা হঠাৎ আজকে কী হল মাই ডিয়ার ফ্রেন্ড ?’ কথা গুলো বলার পর লি সম্রাটের কাঁধে হাত রেখে সম্রাটকে অভয় দেবার চেষ্টা করেন। সম্রাট আর কোনও কথা বলে না। দূরের দিকে তাকিয়ে কুয়াশার মেঘ গুলোকে খোঁজার চেষ্টা করে।

bengali detective story Bengali Ghost story Sunday Suspense bomkesh bakshi, feluda
দুই


সূর্য অস্ত যাওয়ার কয়েক মিনিট পরেই শুরু হল তাণ্ডব। ঘনান্ধকার কুয়াশার কবলে পড়ল জাহাজটা। যেন হাজার হাজার বছর ধরে অপেক্ষা করে থাকা কুয়াশার প্রাচীন জটা গুলো একসঙ্গে জাপটে ধরছে জাহাজটাকে। তার সঙ্গে সমান ভাবে তাল মিলিয়েছে ঝড়ো বাতাস। সম্রাটকে সঙ্গে নিয়ে ডেক থেকে কেবিনে নেমে আসার সময় দু’দুবার অন্ধকার সিঁড়িতে হোঁচট খেলেন লি। কেবিনে ঢুকে কোনও রকমে একটা চেয়ারে টেনে বসলেন। জাহাজটা চলছে না দাঁড়িয়ে পড়েছে কেবিনের ভেতর থেকে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না।
কেবিনের খোলা দরজা দিয়ে হুহু করে কুয়াশার দল ভেতরে ঢুকছে দেখে লি সম্রাটকে বললেন, ‘শীঘ্রই কেবিনের দরজাটা বন্ধ করে দাও নতুবা কুয়াশার অত্যাচারে নিশ্বাস নিতেও কষ্ট হবে । আমি একবার ইঞ্জিন ঘরে গিয়ে দেখি জাহাজটা চলছে না দাঁড়িয়ে পড়েছে।’
লিয়ের গলার চাপা উত্তেজনাটা সম্রাটের কানে এসে ভীষণ রকম ধাক্কা খায়। সম্রাট সচরাচর লিকে এমন ভাবে উত্তেজিত হতে দেখেনি এর আগে। যাই হোক প্রাণপণ শক্তিতে সম্রাট কোনক্রমে কেবিনের দরজাটা লক করে দেয়। কেবিনের ভেতর থেকেই শোনা যাচ্ছে বাইরের তাণ্ডবের শব্দ। জাহাজটা ভয়ঙ্কর ভাবে দুলছে এখন।


ইঞ্জিন ঘরে ঢুকেই অবাক হয়ে গেলেন লি। জাহাজের সামনে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। কুয়াশার দল যেন জাহাজটাকে জড়িয়ে ধরে ধীরে ধীরে বরফে পরিণত করতে চাইছে। জাহাজটা চলছে কি না সেটা বোঝা না গেলেও জাহাজটা যে নড়ছে সেটা বুঝতে পারলেন লি।
‘আমাদের জাহাজটা কি দাঁড়িয়ে পড়েছে ?’ হঠাৎ সম্রাটের প্রশ্নে পিছন ফিরে তাকালেন লি। উনি এতক্ষণ খেয়াল করেননি কখন সম্রাট উনার পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে। সম্রাটের প্রশ্নের কোনও উত্তর না দিয়ে লি একটা চুরুট ধরালেন। তারপর শরীরটাকে চেয়ারে এলিয়ে দিয়ে দুচোখ বন্ধ করে কিছু একটা অনুভব করার চেষ্টা করলেন। সম্রাট আবার প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করতেই যাচ্ছিল কিন্তু লি হাতের ইশারায় সম্রাটকে চুপ করতে বললেন। এভাবে বেশ কিছুটা সময় কাটার পর লি এবার ঘাড় সোজা করে চুরুটটায় শেষ কয়েকটা টান দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘না জাহাজটা চলছে না। গোল গোল ঘুরছে।’
‘তাহলে এখন কী হবে ?’ উত্তেজিত ভাবেই দ্বিতীয় প্রশ্নটা করল সম্রাট।
‘দেখা যাক কী হয়।’ কথাটা বলেই চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লেন লি। পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলেন জাহাজের প্রধান সারেং এর কেবিনের দিকে। যাত্রীবাহী জাহাজে সারেংরা এমন সময় বিশেষ দায়িত্ব পালন করে থাকে। কিন্তু আজকে কোনও সারেং নেই। সব কেবিন গুলোই ফাঁকা। আজকে লি আর সম্রাট বারমুডার বুকে সম্পূর্ণ একা। কেবিন ঘরে ঢুকেই জানালার পর্দাটা সরিয়ে বাইরের দিকে তাকালেন লি। বেশ কিছুক্ষণ বাইরের দিকে চেয়ে থেকে বললেন, ‘সমুদ্রের বুকে অন্ধকার নেমে এসেছে তবে আমি যেটা ভয় পাচ্ছিলাম তেমন কিছু নয়।’
‘আপনি কী ভয় পাচ্ছিলেন ?’ ভয়ে ভয়েই জিজ্ঞেস করে সম্রাট।
‘আমি ভাবছিলাম বাইরের কুয়াশাটা ধীরে ধীরে জমাট বেঁধে বরফে পরিণত হচ্ছে। ওটা হলে মৃত্যু ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট রইত না। জাহাজটা এখন লাট্টুর মতো ঘুরছে ঠিকেই কিন্তু ঝড়ো হাওয়াটা কমলেই আবার স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে জাহাজটাকে কনট্রোল করা যাবে।’
‘তাহলে এখন কি অপেক্ষা করা ছাড়া কিছুই করার নেই?’
‘কেন নেই ? গান শোনো। দরকার হলে গান গাও। মোট কথা বাইরের ভয়টাকে মনের ভেতর দানা বাঁধতে দিও না।’ এখন লিয়ের কণ্ঠ এক্কেবারে স্বাভাবিক। কোনও রকম উৎকণ্ঠা নেই এখন আর।


লিয়ের স্বাভাবিক সুর শুনেই সম্রাটের মনে পড়ল সাভানার সেই দিনটার কথা। ওটাই ছিল সম্রাটের প্রথমবার ভারতের বাইরে গিয়ে রহস্যের সন্ধান। সাক্ষাত যমরাজের মুখ থেকেই সেদিন ফিরেছিল সম্রাট। লি না থাকলে হয়তো সাভানার সিংহের পেটেই যেতে হত সম্রাটকে। লিয়ের সঙ্গেই বালিতে সারা শরীর ঢেকে একটা গর্তের ভেতর শুয়েছিল সম্রাট। অপেক্ষা করছিল সাভানার নরখাদকটার জন্য। লি সেদিনও এমন শান্ত ভাবেই বলেছিল, ‘আসতে দাও শয়তানটাকে, ততোক্ষণে নিজেকে শান্ত করো। দরকার হলে শৈশবের কথা গুলোকে মনে মনে ভাবো। তুমি ভয় পেয়েছ বুঝতে পারলেই সিংহটা তোমার উপরই আক্রমণ করে বসবে।’
নিজেকে শান্ত রাখাতে পারেনি সেদিন সম্রাট। ওর চোখমুখ দিয়ে ভয় ঠিকরে পড়ছিল। শেষ পর্যন্ত ও বালির গর্ত থেকে বেরিয়ে ছুটে পালিয়ে যেতে চেয়েছিল ঘাস জঙ্গলের ভেতর। সম্রাটকে বাঁচাবার জন্যই লি সেদিন সিংহের সামনে দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু অদ্ভুত ভাবেই সিংহটা সামনের শিকার ছেড়ে দিয়ে ধাওয়া করেছিল সম্রাটের পিছনেই। যদিও লিয়ের রাইফেলের কাছে হার মানতে হয়েছিল সিংহটাকে। পরে লি সম্রাটকে বলেছিলেন, ‘যে কোনও বন্যপ্রাণীই বুঝতে পারে কে দুর্বল কে ভীতু। আক্রমণ তার উপরেই হয়। তার জন্যই আমাকে কাছে পেয়েও ধাওয়া করছিল তোমাকে।’ পরে পরে সম্রাট নিজে নিজেও শিখেছে এমন অনেক কিছু।


সময়টা যেন থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে। জাহাজের প্রতিটা ঘড়িই অচল। কাজ করছে না কম্পাস। জাহাজটা এখন শুধুই দুলছে আর দুলছে। লি ইঞ্জিন ঘরে অবিচল ভাবে নিজের কাজে ব্যস্ত। আলো অন্ধকার কেবিনের ভেতর সম্রাট সম্পূর্ণ একা। তাহলে কি এখানেই সব শেষ! আর কি কোনদিন সূর্য উঠবে না ? ফেরা হবে না দেশের মাটিতে ? সেই ছোটবেলার খেলার মাঠ, ধানের ক্ষেত, আম বকুলের গন্ধে ভরা দুপুর, সব মিথ্যে হয়ে যাবে বারমুডার বুকে ? নাকি এখানেই শেষ নয় আরও কিছু রহস্য বাকি পড়ে আছে জীবনের আঙিনায় ? বারবার প্রশ্নের বুদ্বুদে তলিয়ে যাচ্ছে সম্রাটের বাঙালী মনটা। সম্রাট আর যাই হোক সেতো আর এডগার লি হতে পারবে না কখনই। লিয়ের জীবনের সম্পূর্ণ ইতিহাসটা রহস্যে মোড়া। সম্রাটের তো তা নয়। আর কিছুই ভাবতে পারে না সম্রাট। ভাবনা গুলো যেন আরও বেশি বেশি করে ভয়ের জন্ম দিচ্ছে। বিছানার থেকে উঠে সম্রাট জানালাটার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরেটা দেখার চেষ্টা করে। থকথকে অন্ধকার ছাড়া সম্রাটের চোখে আর কিছুই ধরা পড়ে না। এভাবে বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর হঠাৎ করেই সম্রাট দেখতে পায় সমুদ্রের বুকে এক অদ্ভুত দৃশ্য। আগুন জ্বলছে সমুদ্রের বুকে। সমুদ্র দেবতা যেন আগুনের মালা পরে অন্ধকারে অট্টহাসি হাসছেন। কেবিন থেকে বেরিয়ে সম্রাট সোজা গিয়ে ঢোকে ইঞ্জিন ঘরে।


লি একটা চুরুট ঠোঁটে ঝুলিয়ে দুচোখ বন্ধ করে কী যেন ভাবছিলেন। সম্রাটের কথা শুনে জানালার সামনে এসে দাঁড়ালেন। কিছুক্ষণ বাইরের দিকে তাকিয়ে থেকে উদাসীন ভাবে লি বললেন, ‘ওটা আগ্নেয় মেখলা। সমুদ্রের ঢেউ একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে আগুন সৃষ্টি করছে। ওতে ভয় পাবার কিছুই নেই।’ কথা গুলো বলেই চুরুট টানতে টানতে লি আবার ইঞ্জিন ঘরেই ফিরে যান।
সম্রাট জানালার সামনে দাঁড়িয়ে বাইরের দিকে আরও কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। ওর বারবার মনে হয় যেন হাজার হাজার জলজ দানব আগুনের মশাল নিয়ে জাহাজটার দিকে ছুটে আসছে। বুকের ভেতরটা কেমন যেন করতে থাকে সম্রাটের। ভয়ে ভয়ে জানালার পর্দাটা টেনে আবার বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ে। সূর্যোদয়ের অপেক্ষা করা ছাড়া এখন আর কিছুই করার নেই।


রাত্রি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই কুয়াশার প্রাদুর্ভাবটাও যেন বাড়ল আবার। জানালাটা যেদিকে ঠিক তার খানিকটা উপরে দেওয়ালের মাথার কাছে বাতাস ঢোকার জন্য যে গোলাকার গর্ত আছে সেটা দিয়েও ধোঁয়ার মতো হুহু করে কেবিন ঘরে কুয়াশা ঢুকছে। আবছা আলোতেও সম্রাট পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে সেটা। এবার বেশ ঠাণ্ডা লাগছে সম্রাটের। বিছানার উপরে রাখা মোটা চাদরটা গায়ে টেনে নেয় সম্রাট। চোখ দুটোকে প্রাণপণে বন্ধ করে একটু ঘুমোবার চেষ্টা করে। কিন্তু জাহাজের দুলুনিতে ঘুম আসে না কিছুতেই। বাইরের ঝড়ো বাতাসের শব্দটাও পরিষ্কার ভাবেই শোনা যাচ্ছে এখন।
ঘণ্টা খানেক নিস্তব্ধ ভাবে কাটার পর একটা অস্পষ্ট শব্দ শুনতে পায় সম্রাট। নিজের অজান্তেই চোখ লেগে গিয়েছিল বলেই হয়তো প্রথমটায় ও কিছুই বুঝতে পারে নি। কিন্তু পরের মুহূর্তে ওর বুঝতে বাকি রইল না আর। বাইরের ঢেউয়ের ধাক্কায় ওই ঘুলঘুলিটা দিয়ে চলাৎ চলাৎ করে জল ঢুকছে ঘরের ভেতর। ধড়ফড় করে উঠে বসে সম্রাট। বিছানার একটা কোন সম্পূর্ণ ভিজে গেছে। যথারীতি জল জমেছে ঘরের ভেতর। কী করবে না করবে কিছুই মাথায় ঢুকল না ওর। এমন সময় আরও খানিকটা জল ঘুলঘুলি দিয়ে ছিটকে এসে ওর গায়ের উপর পড়ে। এখানে থাকাটা ঠিক হবে না ভেবেই বিছানা থেকে নেমে সম্রাটকে আবার ছুটতে হল ইঞ্জিন ঘরে।


ইঞ্জিন ঘরে ঢুকতেই সম্রাটের চোখ পড়ল লিয়ের উপর। লি জাহাজের স্টিয়ারিং শক্ত করে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। সম্রাটকে ইঞ্জিন ঘরে ঢুকতে দেখেই লি বললেন, ‘জাহাজটা চলতে শুরু করেছে। বাইরে কুয়াশাও কমে এসেছে মনে হয়, কিন্তু…’
‘কিন্তু কী ?’ লিকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই প্রশ্ন করে সম্রাট।
উদাসীন ভাবে লি একবার তাকালেন সম্রাটের মুখের দিকে তারপর বললেন, ‘জাহাজটা নিজের ইচ্ছেতে সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে। স্টিয়ারিং ঘুরিয়েও কোনও লাভ হচ্ছে না।’ কথা গুলো বলার সময় লিয়ের চোখে মুখে বেশ কয়েকটা আতঙ্কের রেখা দেখা দিয়েই আবার মিলিয়ে গেল।
‘তাহলে এখন উপায় ?’


‘ভোর হওয়ার অপেক্ষা করা ছাড়া এখন আর কিছুই করার নেই। প্রায় একঘণ্টার উপর চেষ্টা করছি কিন্তু কিছুতেই কিছু করা যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে এক অদৃশ্য শক্তি জাহাজটাকে নিজের কেন্দ্রের দিকে টানছে। তবে ভয়ের কিছু নেই, সকাল হলেই ব্যাপারটা পরিষ্কার হবে হয়তো।’
‘ভয়ের কিছু নেই’- কথাটাতেই সম্রাট কেমন যেন ভয়ের একটা ঝাঁঝালো গন্ধ পায়। লি যে কিছু একটা গোপন করার চেষ্টা করছেন সেটা সম্রাটের বুঝতে বাকি থাকে না। লিকে এমন ভাবে স্টিয়ারিং ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কেবিন ঘরে জল ঢোকার কথাটা বেমালুম ভুলেই গিয়েছিল সম্রাট। মনে পড়তেই বলে, ‘বেশ কিছুক্ষণ ধরে বাতাস চলাচলের পথ দিয়ে কেবিন ঘরের ভেতর জল ঢুকছে ।’
‘হোয়াট! এতক্ষণ বলনি কেন ?’ এবার লিয়ের গলাতেও চাপা উত্তেজনা। জাহাজের স্টিয়ারিং ছেড়ে লি একছুটে কেবিনের ভেতরে গিয়ে ঢোকেন। কেবিনের ভেতর ঢুকতেই লিয়ের চোখে পড়ে ঘরের মেঝেটা জলে ভরে আছে। কিন্তু এখন আর জল ঢুকছে না। লি ঘুলঘুলিটার দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলেন, ‘বড় মাপের ঢেউয়ের ধাক্কায় জল ঢুকেছে। তুমি তো ভয় দেখিয়ে দিয়ে ছিলে। আমি ভেবেছিলাম…। যাই হোক কুয়াশার মেঘ সরে গেছে মনে হয়। ছিদ্রটার দিকে তাকিয়ে দেখো চাঁদের আলো ঢুকছে।’

Bengali detective story Bengali Ghost story Sunday Suspense bomkesh bakshi, feluda বাংলা রহস্য রোমাঞ্চ ভৌতিক


সম্রাট দেখতে পায় হালকা হলুদ রঙের আলোকরশ্মি ছিদ্রটা দিয়ে ঘরের ভেতর এসে ঢুকছে। ঘরের নাইট ল্যাম্পটাকে বন্ধকরে আলোটাকে ভালো ভাবে দেখার চেষ্টা করেন লি। এমন সময় একটা উগ্র গন্ধ লিয়ের নাকে এসে ধাক্কা মারে। লিয়ের বুঝতে পারেন বাইরে কিছু একটা ঘটছে। জানালার সামনে এসে পর্দাটা সরাতেই লিয়ের সারা শরীরে আতঙ্কের ঢেউ খেলে যায়। জানালার ওপারে দাউ-দাউ করে আগুন জ্বলছে সমুদ্রের বুকে। ঠিক জঙ্গলে আগুন লাগলে যেমন ধোঁয়ার কুণ্ডলী উপরের দিকে উঠতে থাকে তেমন ভাবেই ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠছে সমুদ্রের বুক থেকে। আগুনের লেলিহানটা এগিয়ে আসছে জাহাজের দিকেই। সমুদ্রের বুকে এমন ভাবে আগুন জ্বলাটা কোনও স্বাভাবিক ঘটনা হতে পারে না। অন্ততপক্ষে লিয়ের তো এমনেই ধারনা ছিল এতদিন। তাহলে কী বারমুডায় সবেই সম্ভব! কোনও প্রাকৃতিক নিয়মকেই মানে না বারমুডা ট্রায়াঙ্গল ? সম্রাটের মুখে টু শব্দটুকুও নেই এখন। ওর যেন ঘোর কাটতে চাইছে না।


শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে ডেকের উপরে যেতে হল। কেবিনের ভেতর থেকে কিছু বোঝাও সম্ভব নয়। দূরবীন চোখে নিয়ে ডেকের একটা কোনায় এসে দাঁড়ালেন লি। আগুনটা এখনো একেই ভাবে এগিয়ে আসছে জাহাজের দিকে। তার সঙ্গে ভেসে আসছে একটা ঝাঁঝালো গন্ধ সঙ্গে গুড়ি গুড়ি ছাই। তবে লিয়ের মনে হল আগুনের লেলিহান ধীরে ধীরে কমছে। রাত্রির সমুদ্রে তেমন পরিষ্কার ভাবে কিছু দেখা না গেলেও সমুদ্র বক্ষে কিছু যে একটা পুড়ছে সেটা পরিষ্কার ভাবে অনুধাবন করতে পারলেন লি। বেশ কিছুক্ষণ দূরবীন চোখে দাঁড়িয়ে থাকার পর লি ডেকের উপর থেকে সম্রাটের সঙ্গে যখন নিচে নামলেন তখন ডেকের উপর পড়তে থাকা ছাইয়ের বেশ কিছু টুকরো যত্নের সঙ্গে তুলে আনলেন।
ইঞ্জিন ঘরে ঢুকে লি ছাইয়ের টুকরো গুলোকে ভাল ভাবে পর্যবেক্ষণ করে দেখলেন বারবার। ছাইয়ের টুকরো গুলো দেখতে কালো রঙের সুতোর মতো লাগছে। হঠাৎ করেই লিয়ের মনে পড়ে গেল অলিভার আর্নল্ডের ডাইরির কথা। লি কয়েকটা ছাইয়ের টুকরো হাতের তালুতে রেখে সম্রাটকে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘দেখো তো কিছু মনে পড়ে কী না ?’
ছাইয়ের টুকরো কটাকে নিজের হাতে নিয়ে সম্রাট বেশ কিছুক্ষণ দেখার পরেও যখন কিছুই মনে করতে পারল না তখন লি বললেন, ‘এগুলো শ্যাওলার ছাই। অলিভার আর্নল্ড উনার ডাইরিতে বারবার যে শ্যাওলার কথা উল্লেখ করে ছিলেন সেটা তোমার মনে আছে ?’
‘হাঁ মনে আছে কিন্তু…’
‘কোনও কিন্তু নয়। আমি নিশ্চিত সমুদ্রের বুকে ভাসমান শ্যাওলাতেই যেভাবে হোক আগুনটা লেগেছে। এই আগুনে জাহাজের তেমন ক্ষতি হবে বলে আমার তো মনে হয় না।


সম্রাট আর কথা বাড়ায় না। কথা বাড়ানোর মতো তেমন কিছু নেইও সম্রাটের কাছে। অগত্যা চুপচাপ শুয়ে পড়ে কেবিন ঘরে গিয়ে। বেশ কিছুক্ষণ চেষ্টা করার পরেও লি যখন স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে জাহাজের মুখ ঘোরাতে পারলেন না তখন তিনিও বাধ্য হয়েই শুয়ে পড়লেন। শুয়ে শুয়ে লি শুনতে পাচ্ছিলেন সমুদ্রের বুক থেকে ভেসে আসা আগুনের শব্দটা। যেন পুড়-পুড় পুড়-পুড় শব্দ করে প্রাচীন শ্যাওলাগুলো পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে।

Bengali horror


তিন
এই দুয়েকটা দিন যেমন ভাবে কেটেছে তাতে ঘুমিয়ে পড়াটাই ছিল স্বাভাবিক ঘটনা। সম্রাট ঘুমিয়ে পড়েছিল অনেক আগেই। লিয়ের চোখে ঘুম আসতে হয়তো একটু দেরিই হয়ে থাকবে, তাই সকাল বেলার কচি সূর্যের আলোতেও লিয়ের ঘুমটা ভাঙেনি। সম্রাট যখন ঘুম থেকে উঠল তখন ভোরের আলো ছড়িয়ে পড়েছে সমুদ্রের গায়ে। ঘুম থেকে উঠেই সম্রাট খেয়াল করল জাহাজটা দাঁড়িয়ে পড়েছে। প্রথমটায় কিছু বুঝতে না পারলেও খানিক বাদে সম্রাট বুঝতে পারল যে জাহাজটা সমুদ্রের কোনও এক কিনারায় এসে ভিড়েছে। কিন্তু সেটা যে কোথায় তা কেবিন ঘরের ভেতর থেকে বোঝা গেল না বলেই সম্রাট এসে দাঁড়াল জাহাজের ডেকের উপর। জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে সম্রাট যা দেখল সেটা হয়তো এক জন্ম ভোলার মতো নয়।

সমুদ্রের কিনারায় এসে জাহাজটা আশ্চর্য রকম ভাবে বালির মধ্যে ফেঁসে গেছে। জাহাজটার বাঁদিকে সমুদ্রের গাড় নীল জলরাশি। ডানদিকে শুধুই সবুজের মেলা। রাত্রিতে দেখা সেই আগুনের লেলিহান এখন আর সমুদ্রের বুকে দেখা যাচ্ছে না। সমুদ্র কিনারায় রঙবেরঙের ঝাঁককে ঝাঁক পাখির দল খেলা করছে নিজের খেয়ালে। ওরা কী পাখি বা কোন প্রজাতির পাখি জানে না সম্রাট। এর আগে এমন ধরণের পাখি দেখেনি ও কোনদিন। কোনটা খুবেই ছোট কোনটা আবার একটু বড় মাপের। ওদের সঙ্গেই সমান ভাবে তাল মিলিয়ে এদিক সেদিক উড়ছে সারসের মতো দেখতে এক ধরণের পাখি। বেশ ছোট মাপের এক ধরণের পাখি ডেকের রেলিং এর উপরে বসে আগন্তুকের দিকে তাকিয়ে আছে। হয়তো ওরাও এমন ধরণের প্রাণী এর আগে দেখেনি। নিজের আনন্দটাকে আটকে রাখতে না পেরে যখন সম্রাট শিস দেয় পাখি গুলো তখন ভয় পেয়ে আবার উড়ে গিয়ে বসে সমুদ্রের কিনারায়। সম্রাটকে দেখেই মনে হচ্ছে ও প্রথমবার পৃথিবীর এমন রূপ এমন সৌন্দর্য দেখছে। একদিকে শুধু নীল নীল আর নীল জলরাশি আর ঠিক তার উল্টোদিকে সবুজের রাজ্য। পাখিদের পৃথিবী।
সম্রাট খেয়াল করেনি কখন লি ওর পিছনে এসে দাঁড়িয়েছেন। হঠাৎ লিয়ের মুখ থেকে ‘মেরিন দ্বীপপুঞ্জ’ শব্দটা শুনে পিছন ফিরে তাকায় সম্রাট। দেখে ঠোঁটের কোনায় একটা চুরুট ঝুলিয়ে লি চোখ দুটোকে মেলে দিয়েছেন সবুজের বুকে। সম্রাট লিকে জিজ্ঞেস করে, ‘আমরা এটা কোথায় এসেছি ?’
‘ওই যে বললাম মেরিন দ্বীপপুঞ্জ।’
‘সেটা কী বারমুডার বাইরের কোনও দ্বীপ ?’
‘মোটেই না। একমাত্র অলিভার আর্নল্ড ছাড়া এই দ্বীপের কথা কেউ কখনই উল্লেখ করেননি। বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের ভেতর কোথাও যে কোনও দ্বীপ থাকতে পারে সেই ধারণাই কারু ছিল না। আজও নেই। হয়তো আমরা বললেও কেও বিশ্বাস করবে না। ঠিক সেদিন যেমন আর্নল্ডের ডাইরিতে পাওয়া দ্বীপের কথা কেউ বিশ্বাস করেনি।’
‘কিন্তু আমরা এখানে এলাম কী ভাবে ?’
‘সেটা সঠিক ভাবে হয়তো বলতে পারব না। তবে এটুকু অবশ্যই বলব আমরা এসেছি বারমুডার ডাকে বারমুডার টানে। আর যাই হোক জাহাজটা কিন্তু আমি চালিয়ে আনি নি। জাহাজটা এসেছে নিজের খেয়ালে।’ চুরুটে শেষ টান দিয়ে ধোঁয়ার কুণ্ডলী আকাশের দিকে ছুড়তে ছুড়তে কথা গুলো বলেন লি।
‘চলুন না আমরা একবার নীচের থেকে ঘুরে আসি।’ সম্রাটের চোখে মুখে একটা খুশির রেখা পরিষ্কার ভাবে দেখা যায়।


‘আমরা তো আর সোনা দানা মনি মুক্তোর খোঁজে আসেনি। আমরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এসেছি কেবল মাত্র…’ কথাটাকে অসম্পূর্ণ রেখেই লি আবার বলেন, ‘এমন একটা দ্বীপের সন্ধান পেয়ে সেখানে যাব না সেটা তো হতেই পারে না। কিন্তু তার আগে আমাদেরকে দ্বীপটার প্রকৃতি একটু হলেও বুঝতে হবে। সম্পূর্ণ অচেনা অজানা একটা দ্বীপে দুম করে যাওয়াটা ঠিক হবে না। কিছুক্ষণ ডেকের উপর থেকেই দ্বীপটাকে ভাল ভাবে দেখতে হবে। তেমন ভয়ের কিছু চোখে না পড়লে তখন নীচে নামবো, তার আগে নয়।’
ডেকের উপর থেকেই লি আর সম্রাট দ্বীপটাকে দেখতে থাকে। পাখি গুলো এখনো নিজের খেয়ালে উড়ে বেড়াচ্ছে। বেলা বাড়ার সাথে সাথে আরও নানান ধরণের নাম না জানা পাখির দল এসে জুটছে কিনারায়। এক সময় লি হাতের ইশারায় সম্রাটকে একটা প্রাণী দেখান। প্রাণীটা দেখতে খানিকটা খরগোশের মতো হলেও খরগোশ নয়। খরগোশের চেয়ে সাইজে বেশ খানিকটা বড় মাপের। প্রাণীটা সমুদ্রের নোনা জল সুন্দর চেটে চেটে খাচ্ছে।
সম্রাট লিকে জিজ্ঞেস করে, ‘ওটা কী পশু ?’
‘অচেনা পশু।’ কথাটা বলে হাসতে থাকেন লি তারপর বলেন, ‘এখানে তোমার মতো আমারও একই দশা। এতক্ষণ পর্যন্ত যে সব পাখি কিংবা গাছপালা গুলোকে দেখছি তাদের একটাকেও আগে দেখেছি বলে মনে হয় না। তবে হাঁ কোনও কোনটার সাথে আমার দেশের পাখি বা গাছের মিল থাকলেও থাকতে পারে। আমার মনে হয় এই অচেনা অজানা দ্বীপের পশু পাখি এমন কি গাছপালা গুলোও আমার পরিচিত হবে না। তাই নীচে নামার সময় সব কটা রাইফেল পিস্তল নিয়েই নীচে নামতে হবে। নতুবা বলা তো যায় না হয়তো আয়ু থাকতে থাকতেও মারা পড়লাম।’ কথা গুলো বলে আবার হাসতে থাকেন লি।
ভুল বলেননি লি। দ্বীপটার সমস্ত কিছুই যেমন সুন্দর ঠিক একই রকম ভাবে সমস্ত কিছুই অচেনা অদেখা। প্রতিটা পাখি প্রতিটা গাছ এমন কি সমুদ্রের কিনারায় যে গুল্মলতা গুলো জন্মেছে সেগুলো পর্যন্ত একটাও লি বা সম্রাট কারুরেই চেনা নয়। এমন অচেনা দ্বীপে নামার সময় অস্ত্র সঙ্গে নিয়ে নামাটাই বুদ্ধিমানের কাজ। হঠাৎ করেই যদি কোনও পশু বা পাখি কিংবা অচেনা অন্য কিছু আক্রমণ করে তখন করার কিছুই থাকবে না।


আরও বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পরেও যখন ভয়ের কিছুই চোখে পড়ল না তখন সম্রাটকে সঙ্গে নিয়ে লি জাহাজ থেকে মাটিতে নামলেন। মাটিতে পা দেওয়ার পর সম্রাটের মনে হল যেন কত শত বৎসর পর ও আবার মাটির ছোঁয়া পেয়েছে। সম্রাটের ইচ্ছে করছিল জুতো গুলোকে খুলে বালির উপর দৌড়ে বেড়াতে। কিন্তু লিয়ের সামনে ওসব ভাবাটাও চাপের। তাই সম্রাট লিয়ের সঙ্গে সঙ্গেই বাধ্য ছেলের মতো হাঁটতে থাকে।


আগন্তুক দুজনকে দেখে পাখি গুলো এদিক সেদিক ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ করছে ঠিকেই কিন্তু ভয় পেয়ে দূরে কোথাও উড়ে যাচ্ছে না। সম্রাট পাখি গুলোকে দেখতে দেখতে লিয়ের পিছনে পিছনে এগিয়ে চলে ঘন ঘাসের জঙ্গলটার দিকে। ঘাস জঙ্গলটা সমুদ্রের গা ঘেঁষে সোজা চলে গেছে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকে প্রাচীন দানবাকৃতির জঙ্গলটার কাছে। জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে বড় বড় গাছ গুলোকে অনেকটা শাল গাছের মতো মনে হচ্ছিল। কিন্তু একটু কাছে আসতেই চোখের ভুলটা ভেঙে যায়। গাছ গুলো যে মোটেই শাল বা ওই প্রকৃতির গাছ নয় সেটা অনভিজ্ঞ সম্রাটের চোখেও ধরা পড়তে সময় লাগে না।


ঘণ্টা খানেক ঘোরার পর দুজনেই ঘর্মাক্ত অবস্থায় একটা গাছের তলায় বসে বিশ্রাম নেবার জন্য। আর কিছুক্ষণ পরেই সূর্য মাথার উপর থেকে কিরণ ঢালবে। গরমটা বাড়বে তখন আবার। তাই আগের থেকেই অল্প বিশ্রাম নিয়ে শরীরটাকে বিপরীত পরিবেশের জন্য প্রস্তুত করতে চাইছে দুজনে। পা দুটোকে সামনের দিকে ছড়িয়ে বসেছেন লি। সম্রাট প্রায় আধশোয়া অবস্থায় বসে তাকিয়ে আছে মাথায় উপর গাছের ডাল বেয়ে ঝুলতে থাকা লতা গুলোর দিকে। গাছের পাতার ফাঁকে ঝিকমিক করছে সূর্যটা। মৃদুমন্দ বাতাসে লতা গুলো দোল খাচ্ছে প্রায় প্রতিটা বড় মাপের গাছের উপর থেকেই। আশ্চর্যের বিষয় কোনও গাছের উপর একটাও পাখি নেই। অথচ দূরের জঙ্গল থেকে পাখির ডাক ভেসে আসছে। মৃদুমন্দ বাতাসে সম্রাটের তন্দ্রা আসছে এবার। মনে পড়ছে ঘরের কথা, মায়ের কথা, বন্ধুদের কথা। সম্রাট জানে না এই ভবঘুরে শরীরটা নিয়ে আবার কবে মায়ের আঁচলে ফিরতে পারবে ও।


বেশ কয়েকদিন ধরের একটা প্রশ্ন সম্রাটের মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল কিন্তু সেটা লিকে জিজ্ঞেস করেনি সম্রাট। পৃথিবীতে তো কতই না রহস্যময় জায়গা ছিল, তা সেসব ছেড়ে দিয়ে লি বারমুডাকেই কেন বেছে নিলেন ? এর আগে লি যেখানেই সম্রাটকে নিয়ে গেছেন সেখানে যাবার কারণটাও ভালভাবে বুঝিয়ে বলেছেন। এই প্রথমবার লি সম্রাটকে তেমন ভাবে কিছু না জানিয়েই বারমুডায় নিয়ে এসেছেন। যদিও সম্রাট আসতে চায় কি না সেটা অবশ্যই তিনি জানতে চেয়েছিলেন। সম্রাটকে ভাবার জন্যে কয়েকটা দিন সময় দিয়েছিলেন লি। রহস্য পিপাসু সম্রাটের পক্ষে না বলাটা আর হয়ে ওঠেনি। তবে সম্রাটের বারবার মনে হয়েছে লিয়ের এই বারমুডায় আসার পিছনে শুধুই রহস্যের সন্ধান নয় আরও কোনও নিখুঁত কারণ অবশ্যই আছে। তবে সেটা যে কী তা যতক্ষণ না লি নিজের মুখে বলছেন ততক্ষণ সম্রাটের পক্ষে জানা সম্ভব নয়।


ঘর্মাক্ত শরীরে ঠাণ্ডা বাতাসের ছোঁয়া লাগছিল বলেই হয়তো খুব দ্রুত ঘুম চলে এসেছিল সম্রাটের। ঘুমটা ভাঙল ভয়ঙ্কর ভাবেই। গাছের উপর ঝুলতে থাকা লতা গুলো কখন যে নীচে নেমে এসে সম্রাটের পা থেকে কোমর পর্যন্ত জড়িয়ে নিয়েছে সেটা সম্রাট বুঝতেই পারে নি। সম্রাট ঘুম থেকে উঠে পড়ায় লতা গুলো যেন আরও দ্রুত গতিতে সম্রাটকে পেঁচিয়ে ফেলতে শুরু করে। কোমর থেকে ছুরিটা বের করে লতা গুলোকে কেটে না ফেললে ওরা হয়তো আর কয়েক মিনিটেই সম্রাটকে শেষ করে ফেলবে। কিন্তু এমন সময় লি গেলেন কোথায়! পাশ ফিরে তাকাতেই সম্রাট আঁতকে উঠে। লিয়ের সারা শরীরটাকে লতা গুলো অজগর সাপের মতো পেঁচিয়ে ধরেছে। লি ঘুমিয়ে আছে না জ্ঞান হারিয়েছে সেটাও বোধগম্য হল না সম্রাটের। সম্রাট দ্রুত কোমর গোঁজা ছুরিটা নিয়ে একটা লতাকে কেটে ফেলতেই দেখে আরেক অদ্ভুত দৃশ্য। লতাটা সাপের মতো ছটফট করে উঠল তীব্র যন্ত্রণায়। শুধু তাই নয় লতাটার কাটা অংশ থেকে রক্তের মতো হালকা গোলাপি বর্ণের তরল পদার্থ বেরিয়ে আসতে লাগল গলগল করে। কিছু বুঝতে না পেরেও অনেক কিছুই বুঝে ফেলল সম্রাট। তাই আর দেরি না করে এক একটা লতাকে কাটতে শুরু করল এবার। কয়েকটা লতাকে কেটে ফেলতেই বাকি লতা গুলো নিজের থেকেই সম্রাটের পা দুটোকে ছেড়ে সড়সড় করে উঠে গেল গাছের উপর। সম্রাটের মনে হল কেউ যেন প্রবল শক্তিতে লতা গুলোকে গাছের উপর থেকে গুটিয়ে নিল।


লিকে কিন্তু এখনো ছাড়েনি রাক্ষুসে লতা গুলো। লিয়ের শরীরটাকে মাটির থেকে প্রায় দেড় ফুট তুলে ফেলেছে উপরের দিকে। আর এক মুহূর্ত দেরি না করে সম্রাট লিয়ের শরীরে পেঁচিয়ে থাকা লতা গুলোকেও কাটতে শুরু করল এবার। কয়েকটাকে কেটে ফেলতেই বাকি গুলো উপরের দিকে পালিয়ে গেল নিজের থেকে। লিয়ের শরীরটা মৃদু একটা শব্দ করে আছড়ে পড়ল ঘাসের বিছানায়। তবুও লিয়ের ঘুম ভাঙল না।


প্রায় আধঘণ্টার মতো চেষ্টা করার পর লিয়ের সম্বিৎ ফিরল। ভীষণ ভাবেই ভয় পেয়ে গিয়েছিল সম্রাট। এমন রহস্যময় বারমুডা ট্রায়ঙ্গেলের এক অচেনা দ্বীপে যদি সম্রাট একা পড়ে যায় তাহলে মৃত্যু ছাড়া আর দ্বিতীয় কোনও পথেই খোলা থাকবে না ওর জন্য।


লিয়ের সম্বিৎ ফিরল ঠিক কথাই কিন্তু শরীরে বল পেলেন না লি। সমস্ত শক্তিই যেন রাক্ষুসে লতা গুলো শোষণ করে নিয়েছে। সম্রাটকে ধরে ধরেই তিনি সমুদ্রের দিকে এগিয়ে চললেন। সম্রাট চলতে চলতেও বার বার তাকিয়ে দেখতে থাকে গাছের উপর থেকে ঝুলতে থাকা লতা গুলোকে। সম্রাটের মনে হয় লতা গুলোও যেন ওদেরকে তাকিয়ে দেখছে। এতক্ষণে সম্রাটের কাছে একটা বিষয়টা পরিষ্কার হয়, কেন এখানকার গাছের উপর একটাও পাখি নেই? আসলে ওরা জানে এই দ্বীপটার প্রকৃতি। তাই ভুল করেও এই জঙ্গলটার দিকে ডানা বাড়ায় না।

Like Sunday suspense
                          চার

সম্রাট খুব সাবধানে পা ফেলে ফেলে এগিয়ে নিয়ে আসতে থাকে লিকে। বলা তো যায় না কখন আবার কোন গাছ থেকে কোন লতা গায়ের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। লিয়ের শরীরটা এখন যথেষ্ট দুর্বল। এখনো ঠিক মতো হাঁটতে পারছেন না। সম্রাটের কাঁধে ভর দিয়ে কোনোক্রমে পা দুটোকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।
বেশ কিছুক্ষণ হাঁটার পর লি জানালেন উনার কিছু সময়ের জন্য হলেও বিশ্রামের প্রয়োজন। উনার পা আর চলছে না। তবে আর গাছের তলায় নয়। একটা ফাঁকা জায়গায় নিয়ে গিয়ে সম্রাট লিকে বিশ্রামের নেবার ব্যবস্থা করে দেয়। তারপর লিয়ের মাথার কাছে বসে দূরের টিলা গুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে। ঠিক এমন সময় পিছন থেকে শিস দেওয়ার মতো কীসের একটা আওয়াজ হতেই আবার চমকে উঠে সম্রাট। পিছন ফিরে দেখার চেষ্টা করে। কিন্তু কিছুই চোখে পড়ে না। কিছুক্ষণ পর আবার একবার আওয়াজটা ভেসে আসে। এবারেও কিছুই চোখে পড়ে না। তবে সম্রাট বুঝতে পারে এটা কোনও পাখির ডাক নয়। এখানে এভাবে বসে থাকাটা যে মোটেই নিরাপদ নয় সেটা বুঝতে পেরেই লি বলেন, ‘চলো এখান থেকে উঠে পড়া যাক।’
সমুদ্রের দিকে হাঁটতে হাঁটতে সম্রাট লিকে বলতে থাকে তখন ঠিক কী ঘটনা ঘটেছিল। লি সম্রাটের প্রতিটা কথা ভাল করে শোনার পর বলেন, ‘আমার মনে হয় ওগুলো মাংসাশী লতা। হয়তো ওই গাছ গুলোতে কিংবা লতা গুলোতে এমন কিছু ছিল যার জন্য আমরা এতোটা সহজেই ঘুমিয়ে পড়ে ছিলাম। তুমি না থাকলে আজকে হয়তো…’ কথাটা শেষ করার আগেই দাঁড়িয়ে পড়েন লি। কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থাকার পর লি ফিসফিস করে বলেন, ‘রাইফেলটা রেডি রাখো। যে কারণেই হোক না কেন আমার মন বলছে কে বা কারা যেন আমাদের পিছু নিয়েছে।’


সম্রাট আরেকবার ভালভাবে চারপাশটা দেখে নেয়। কিন্তু এবারেও কিছুই চোখে পড়ে না। আরও কিছুটা পথ এগিয়ে আসার পর লি সম্রাটকে দাঁড়াতে বলেন। একটা গাছের ডালের দিকে আঙুল বাড়িয়ে সম্রাটকে কিছু একটা দেখাবার চেষ্টা করেন। গাছের ডালটা দুলছে এখনো। লি নিজের কোমর থেকে পিস্তলটা বার করতে করতে বলেন, ‘ওই ডালটায় অদ্ভুত ধরনের একটা প্রাণী বসেছিল। আমার চোখ পড়তেই কোথায় যেন মিলিয়ে গেল এক মুহূর্তে।’
সম্রাট জিজ্ঞেস করে, ‘কেমন দেখতে প্রাণীটা ?’
লি বলেন, ‘যতটুকু দেখলাম তাতে অনেকটা হনুমানের মতোই মনে হল। তবে সাইজে হনুমানের চেয়ে বেশ বড়ই হবে। এই এলাকাটাকে আমার মোটেই সুবিধার বলে মনে হচ্ছে না। তাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব জাহাজটায় ফিরতে পারলেই মঙ্গল।’


কথা বলতে বলতেই দুজনে এক সময় একটা ঘাসের জলা জঙ্গলে এসে উপস্থিত হয়। ঘাস গুলো যেন একটু বেশিই বড় মাপের। লি সম্রাটকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘একটা পচা গন্ধ পাচ্ছ ? মনে হয় কাছাকাছি কোনও প্রাণী মরে পড়ে আছে তাই না ?’
সম্রাট বার দুয়েক জোরে জোরে নিশ্বাস নিয়ে বলে, ‘ঠিক সাপ পচার মতো গন্ধটা।’
ঘাসের জঙ্গল ঠেলে আরও কিছুটা এগিয়ে যেতেই দুজনেই দেখতে পায় একটা আধ খাওয়া প্রাণীকে। প্রাণীটা দেখতে অনেকটা মাছের মতো হলেও মাছ নয় মোটেই। বেশ অদ্ভুত ধরণের প্রাণীটা। মাছের মতো পাখনাও যেমন আছে ঠিক তেমনই আবার চারটা পা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। কোনও বড় মাপের জন্তু হয়তো খুবলে খেয়েছে কদিন আগে। প্রাণীটার শরীরের অধিকাংশ জায়গা ধারালো নখ আর দাঁতের আঁচড়ে ক্ষতবিক্ষত। এক ধরণের হালকা সবুজ আর নীল রঙের বন্য মাছির দল ভনভন করছে প্রাণীটার পচা শরীরটাকে ঘিরে।


লি বললেন, ‘এটা উভচর প্রাণী অবশ্যই নতুবা পাখনা আর পা দুটো একই সঙ্গে থাকতে পারে না। যদিও আমাদের পরিচিত পৃথিবীতে এমন ধরণের উভচর প্রাণীও চোখে পড়ে না।’
লিয়ের সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে সম্রাট বলে, ‘এখানের সবই কেমন অদ্ভুত অদ্ভুত তাই না ?’
‘আমার মনে হয় কপালে থাকলে এসবের চেয়েও অদ্ভুত কিছু চোখে পড়বে আমাদের। তাই যতক্ষণ এই দ্বীপে আছি ততক্ষণ প্রতিটা মুহূর্তে নিজেকে বাঁচানোর জন্য তৈরি থাকতে হবে। কখন যে কোথা থেকে কোন বিপদ ঝাঁপিয়ে পড়বে বলা যায় না।’
সাবধানে পা ফেলে ফেলেই সম্রাটের সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছিলেন লি। সারা দিনের ক্লান্তিতে এখন খিদে-তেষ্টা দুটোই পেয়েছে ভাল রকম ভাবে। সূর্য ডোবার আগে জাহাজে পৌঁছুতে না পারলে যে কী সমস্যা হবে সেটা দুজনের ভাল মতোই জানা। তাই সাবধানতার সঙ্গেই দ্রুত গতিতে হাঁটতে হচ্ছে দুজনকে। এমন সবুজে ঘেরা দ্বীপে বিকেলের সময়টা বেশ মনোরম হওয়ারই কথা। সারা আকাশ জুড়ে শুরু হয়েছে রঙের খেলা। তপ্ত দিনের শেষে মৃদুমন্দ বাতাস বইছে। সেই মৃত প্রাণীটার দুর্গন্ধ এখন আর নাকে আসছে না। তবে দূরের টিলা গুলো যেদিকে দাঁড়িয়ে আছে সেদিক থেকে মাঝে মাঝেই একটা গরম গুমোট পশ্চিমা বাতাস এসে ধাক্কা মারছে সম্রাট আর লিয়ের চোখে মুখে। পড়ন্ত বেলার আলো এসে পড়ছে ঘাস জঙ্গলটার মাথায়। চকচক করছে ঘাস গুলো। চারপাশের পরিবেশটা এত মনোরম তবুও কেমন যেন একটা বিষাদের বাঁশি বেজেই চলেছে অবিরাম। সমস্ত রকম সৌন্দর্য থাকা সত্ত্বেও সমগ্র দ্বীপটা জুড়েই জেগে আছে চরম এক বিষণ্ণতা।
গল্প করতে করতেই হাঁটছিল দুজনে। এমন সময় হঠাৎ করেই কানে এল দানবীয় গর্জনটা, ‘গাং-আ-আ-আ-গ…।’ চমকে গিয়ে লি এবং সম্রাট দুজনেই দাঁড়িয়ে পড়ে। রক্ত জল করে দেওয়ার মতো গর্জনটা। বেশ খানিকটা দূরে যেদিক থেকে গর্জনটা ভেসে এল সেদিকের আকাশে একদল পাখি সঙ্গে সঙ্গে কিচিরমিচির কিচিরমিচির করে চক্রাকারে উড়তে শুরু করল। কয়েক সেকেন্ড পরেই আবার শোনা গেল, ‘গাং-আ-আ-আ-গ…’গর্জনটা। তবে এবার বেশ কাছাকাছি। লি মুহূর্তের ভেতর গর্জনটা যেদিক থেকে আসছে সেদিকটা অনুমান করে রাইফেলটা উঁচিয়ে ধরলেন। লিয়ের দেখা দেখি সম্রাটও বাগিয়ে ধরল রাইফেলটাকে। সমগ্র বিশ্বের ভয়ঙ্কর সব রহস্যময় এলাকায় ঘুরেছেন লি কিন্তু এর আগে এমন রক্ত জল করে দেওয়া গর্জন শোনেননি। গর্জনটা অনায়াসেই আফ্রিকার সিংহকেও হার মানাবে। এবার পরিষ্কার ভাবেই ঘাসের জঙ্গলটাকে দুলে উঠতে দেখা গেল। মুহূর্তের ভেতর আরেকবার শোনা গেল গর্জনটা।


লি আর সম্রাটের এক্কেবারে সামনে এসেই দাঁড়িয়ে পড়েছে কদাকার চেহারার বিকট পশুটা এবার। পশুটা দেখতে প্রায় গণ্ডারের মতোই। পার্থক্য বলতে নিচের চোয়াল বেয়ে দুটো ধারল দাঁত ঝুলছে এই যা। এক জায়গায় স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে মুহুর্মুহু গর্জন করছে এবার পশুটা। লি হাতের ইশারায় সম্রাটকে ফায়ার করতে নিষেধ করে ঘাস জমির উপর দিয়ে কয়েক পা পিছিয়ে এলেন। লিয়ের দেখাদেখি সম্রাটও পিছিয়ে এল কয়েক পা। পশুটার থেকে আপাত নিরাপদ দূরত্বে আসার পর লি ফিসফিস করে সম্রাটকে বললেন, ‘ভয়ের কোনও কারণ নেই পশুটা নিজেই ভয়ে পেয়ে আছে। ফায়ার করলে হিতে বিপরীত হতে পারে। ও আক্রমণ করবে না। ও শুধু নিজের এলাকাটাকে নিরাপদ রাখতে চাইছে।’


লিয়ের কথাটাই সত্য হল শেষ পর্যন্ত। পশুটা নিজের জায়গা ছেড়ে এক পাও এগিয়ে এল না। সম্রাট এবং লি দুজনে পশুটার দিকে লক্ষ্য রেখেই খানিকটা ঘুর পথে সমুদ্রের কিনারায় এসে দাঁড়ালেন। সূর্য অস্ত যেতে আর বিশেষ দেরি নেই। সমুদ্রের নীল জলের উপর সূর্যের লাল আভা ছড়িয়ে পড়ছে। সমুদ্র সৈকতে এখন সকালের চেয়েও অনেক বেশি মাত্রায় পাখি এসে জুটেছে। বালির বুকে দাঁড়িয়ে থাকা জাহাজটার মাস্তুলের উপর বসে আছে বাজ পাখির মতো দেখতে একটা পাখি।
মাঝে মাঝেই সমুদ্রের ঢেউয়ের সাথে বালির চরে ছিটকে উঠে আসছে রঙবেরঙের মাছ। সম্রাট বা লি কারুর পরিচিত প্রজাতির মাছ নয় এগুলো। তবুও মাছ গুলোকে বালিতে ছট-ফট করতে দেখে সম্রাটের মনে হচ্ছে মাছ গুলো যেন কত শত বৎসরের পরিচিত ।
সকাল বেলায় কুয়াশার জন্য দ্বীপের পশ্চিম দিকটা দেখা যাচ্ছিল না। এখন পশ্চিম আকাশে সূর্য ঢলে পড়তেই চারদিকটা পরিষ্কার ভাবে দেখা যাচ্ছে। পশ্চিম দিকের লালচে টিলা আর পিরামিডের মতো দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড় গুলোকে দেখে সম্রাটের খুব ইচ্ছে করছিল একবার ওদিকটা থেকে ঘুরে আসতে। কিন্তু সেটা আজকে আর সম্ভব নয়। আর কিছুক্ষণের ভেতরেই সূর্য অস্ত্র যাবে। তারপরেই অচেনা দ্বীপের বুকে শিকারি চিতার মতো গুড়ি মেরে নামবে রহস্যময় অন্ধকার। কয়েক মুহূর্তের ভেতরেই পাল্টে যাবে দ্বীপটার প্রকৃতি।
সম্রাট স্নিগ্ধ দৃষ্টিতে পশ্চিম দিকের টিলা আর পাহাড় গুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে। ওরা যেন হাজার হাজার বছরের ইতিহাস বুকে নিয়ে সম্রাট আর লিয়ের জন্যই অপেক্ষা করে আছে যুগ যুগান্তর ধরে। সূর্যটাকেও এখন বেশ বড় মনে হচ্ছে। সম্রাট একবার লিয়ের মুখটার দিকে তাকিয়ে দেখে। এডগার লি যিনি বিশ্বের ছোট বড় প্রায় সমস্ত রকম রহস্যময় এলাকায় ঘুরে বেড়িয়েছেন আজকে উনিও বারমুডা ট্রায়ঙ্গেলের এক অচেনা দ্বীপে সূর্যাস্ত দেখে মুগ্ধ। লিয়ের বাদামী রঙের দাড়ি গুলো এখন আবার চকচক করছে সূর্যের নরম আলোয়। এমন সময় লিকে দেখে পঞ্চাশ ঊর্ধ্ব বলাটাই কঠিন হয়ে পড়বে। লি মন্ত্রমুগ্ধের মতোই তাকিয়ে রয়েছেন পশ্চিমের টিলা আর পাহাড় গুলোর দিকে। যেন কিছু একটা খুঁজে চলেছেন পশ্চিমের পাহাড় আর টিলা গুলোর উপর।


শেষ পর্যন্ত থাকতে না পেরে কথাটা বলেই ফেলে সম্রাট, ‘ওদিকটায় একবার গেলে ভালই হত বলুন ?’
লি পশ্চিম দিক থেকে দৃষ্টি না সরিয়ে উদাসীন ভাবে সম্রাটের কাঁধে হাত রেখে বলেন, ‘নতুন ভাবে কিছু হারাতে চাই না ইয়াং ম্যান। কিছুক্ষণের ভেতর অন্ধকার ঝাঁপিয়ে পড়বে দ্বীপটার বুকে। তখন আর ওই সৌন্দর্য থাকবে না। তবে কালকে সকালের দিকে ওদিকটায় অবশ্যই একবার যাব।’ কথা গুলো বলতে বলতে লিয়ের দুই চোখে জল জমা হয়। সূর্যের পড়ন্ত আলোয় সম্রাট সেটা পরিষ্কার দেখতে পায়। এর আগে কখনই লিয়ের চোখে জল দেখেনি সম্রাট। লিয়ের কিছু যে একটা হয়েছে সেটা ভাল মতোই বুঝতে পারে সম্রাট। কিন্তু লিকে জিজ্ঞেস করতে সাহস হয় না। মানুষটা ভেতরে ভেতরে যতটাই নরম হন না কেন বাইরের কঠিন বর্মটাকে পার করাই যে শক্ত। তবে সম্রাট জানে লি সময় হলে সব কথা বলবে। ততদিন অপেক্ষা করে থাকা ছাড়া আর দ্বিতীয় কোনও রাস্তা নেই।
সূর্যটা এবার দুটো পাহাড়ের মাঝে শিশুর হাতে আঁকা ছবির মতো করে ডুবছে। সমুদ্রের নীল জলরাশি এখন লাল আলোয় মাখামাখি। রঙের আবির খেলছে পশ্চিমের আকাশটা। ঠিক এমন সময় একটা লাল রঙের মাছ সমুদ্রের ঢেউয়ে ছিটকে সম্রাটের পায়ের কাছে এসে পড়ে। সম্রাট হাতে তুলে নেয় মাছটাকে। নরম তুলার মতো মাছটা। ওটাকে জলে ছুড়তে না ছুড়তেই আরও বেশ কয়েকটা মাছ ছিটকে এসে পড়ে বালির উপর। সম্রাট সে গুলোকেও জলে ছুড়তে থাকে। পরে আরেক ঝাঁক মাছ বালিতে এসে পড়লে লিও সম্রাটের সঙ্গে খেলায় মেতে উঠেন। দেখতে দেখতে সমুদ্র সৈকতে অন্ধকার গড়িয়ে আসে।

Bengali story


পাঁচ
সূর্যাস্তের এমন মনোরম দৃশ্য দেখে ওরা দুজনেই খিদে বা তেষ্টার কথা প্রায় ভুলেই গিয়েছিল। জাহাজে ফেরার পর দুজনেই সেটা পুনরায় টের পায়। তাই আর দেরি না করে জাহাজের কিচেনে রাখা চিঁড়ে গুড় আর জল দিয়েই রাত্রির আহার সেরে নেয় দুজনে। খাওয়ার পর্ব শেষ হলে লিয়ের সঙ্গে আরেকবার জাহাজের ডেকে এসে দাঁড়ায় সম্রাট। সূর্যাস্তের পরেই বারমুডার অচেনা মেরিন দ্বীপে মিশমিশে অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে। সমুদ্র কিনারায় কোলাহল করে চলা পাখির দল গুলোও ফিরে গেছে যে যার মতো। এখন সমুদ্রের ঢেউয়ের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ ছাড়া কিছুই আর কানে আসছে না।


সময় পেরিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে দ্বীপের উপর গুমোট অন্ধকার যেন আরও বেশি করে জাঁকিয়ে বসছে। দূরের জঙ্গল থেকে ভেসে আসা একটানা ঝিঁঝিঁ পোকার তীব্র ‘ঝিঁ-ই-ই-ই-ঝিঁ-ই-ই’ সুরটা অন্ধকারের তীব্রতা বাড়িয়ে দিচ্ছে বেশি করে। লি বা সম্রাট দুজনেরেই ক্লান্ত শরীর নিয়ে ডেকের উপর দাঁড়িয়ে থাকতে আর ভাল লাগছিল না। অগত্যা দুজনেই কেবিন ঘরে ফিরে এসে পাশাপাশি বিছানায় শুয়ে পড়ে যে যার মতো। কেবিনে নেমে আসার সময় সম্রাট লিয়ের কথা মতো ডেকের দরজাটা লক করে এসেছে ভাল করে।


সারাদিনের ক্লান্তিতে দুচোখের পাতায় ঘুম জড়িয়ে আসতে দুজনের কারুর বেশি সময় লাগল না। দুজনে ঘুমিয়ে পড়ার বেশ কিছুক্ষণ পরেই ঘটল ঘটনাটা। কে বা কারা যেন ডেকের উপর হাঁটছে! প্রথমটায় মনের ভ্রম ভেবেছিল সম্রাট। কিন্তু কিছুক্ষণ কান খাড়া রাখতেই পরিষ্কার শুনতে পেল পায়ের আওয়াজ। যথারীতি ঘামতে শুরু করল সম্রাট এবার। লি পাশের বিছানায় নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে। খুব সাবধানে বিছানার উপর উঠে বসল সম্রাট। পায়ের আওয়াজ গুলো যেন বেড়েই চলেছে। সম্রাট নিজের হৃদকম্পন টুকুও শুনতে পাচ্ছে এখন। নিজের বিছানার থেকে উঠে লিকে জাগানো ছাড়া দ্বিতীয় কোনও উপায় নেই।

অদৃশ্য শত্রুরা মাথার উপর জমায়েত হচ্ছে ধীরে ধীরে। ক্রমশ বেড়েই চলেছে ওদের পায়ের শব্দ সংখ্যা। লিয়ের বিছানার কাছে গিয়ে কয়েকবার নাড়া দিতেই ঘুম থেকে উঠে বসলেন লি। সম্রাট কিছু বলার আগেই উনি নিজেই শুনতে পেলেন ডেকের উপকার পায়ের শব্দ গুলো।
ঘুম থেকে উঠার পরেই লি বিছানার পাশে রাখা রাইফেলটা নিয়ে কেবিন ঘরের বাইরে বেরিয়ে এলেন। লি ঠিক কী করতে চাইছেন সম্রাটের সেটা বোধগম্য হল না। সম্রাট কিছু বুঝে উঠার আগেই লি রাইফেল হাতে সোজা গিয়ে ঢুকলেন ইঞ্জিন ঘরটায়। ইঞ্জিন ঘরে ঢুকেই লি প্রথমেই জাহাজের সার্চ লাইটটা জ্বালিয়ে দিলেন। সার্চ লাইটের তীব্র আলোটা গিয়ে পড়ল দূরের ঘাস জঙ্গলটার উপর। তারপর ইঞ্জিন ঘরের জানালা খুলে রাইফেলর নলটা জানালার বাইরে বার করে আকাশের দিকে উঁচিয়ে শূন্যে কয়েকটা ফায়ার করলেন। এরপর সম্রাট যা দেখল সেটা ভোলার মতো নয়। কমপক্ষে জনা পঞ্চাশ অর্ধ নগ্ন মানুষ ? কিংবা মানুষের মতোই অন্য কোনও প্রাণী! জাহাজের ডেক থেকে ঝাঁপিয়ে বালির উপর দিয়ে ছুটে পালিয়ে গেল ঘাস জঙ্গলটার ভেতর।


কয়েক মিনিট চুপ করে থাকার পর আরও একবার শূন্যে ফায়ার করলেন লি। এবার আর তেমন কিছুই চোখে পড়ল না। জানালাটা বন্ধ করে লি সম্রাটকে বললেন, ‘জঙ্গল থেকে ফেরার সময় আমি গাছের ডালে যা দেখার দেখে নিয়েছিলাম। পিহারা উপজাতির নাম শুনেছ ?’
সম্রাটের বিস্ময় এখনো কাটেনি লিয়ের মুখে ‘উপজাতি’ শব্দটা শুনে ততোধিক বিস্ময়ের সঙ্গেই সম্রাট উত্তর দিল, ‘না। শুনিনি।’
‘জানতাম। পিহারা উপজাতির মানুষ ব্রাজিলের আমাজন উপত্যকায় বয়ে চলা ম্যাইকি নদীর দুই পারের জঙ্গলে বসবাসকারী এক প্রাচীন উপজাতি। এরা ঠিকমতো কথা বলতে পারে না এরা এখনো শিস দিয়ে ভাষার আদান প্রদান করে। বনের ফলমূল পশুপাখি খেয়েই এরা জীবন ধারণ করে আসছে এতকাল ধরে।’
‘তা ব্রাজিলের উপজাতি এখানে এল কেমন করে ?’
‘আমি কিন্তু বলিনি এরা ব্রাজিলের পিহারা উপজাতি।’
‘তাহলে ?’ সম্রাটের চোখেমুখে প্রশ্নের ছাপ ফুটে ওঠে।
‘এরা যে মানুষ সেটা তো পরিষ্কার ভাবেই দেখলাম। পিহারা উপজাতির মতো এদের শিস দিয়ে কথা বলার অভ্যাসটাও জঙ্গল থেকে ফেরার পথেই শুনেছি। কিন্তু এদের চেহারা পিহারা উপজাতির মতো মোটেই নয়। এরা দেখতে খানিকটা হলেও কোরোয়াই উপজাতির মতো। তবে এদেরকে উপজাতি না বলে বারমুডার মেরিন দ্বীপের মৃত মানব বলাটাই মনে হয় যুক্তি সঙ্গত হবে।’
‘মেরিন দ্বীপের মৃত মানব! কিন্তু এরা তো…’
সম্রাটকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই লি বলেন, ‘মৃত না জীবিত সেটা না হয় পরে জানতেই পারবে। প্রাণ থাকলেই তো আর জীবিত হয় না।’
‘তাহলে কী এরা জম্বি ?’ আবার প্রশ্ন করে সম্রাট।
‘না জম্বিরা গাছে চড়তে কিংবা দ্রুত ছুটতে বা শিস দিতে পারে না। তবে এদেরকে তুমি যদি জম্বি ভাবো তাহলেও খুব একটা ভুল ভাববে না। আজকে অনেক রাত হয়েছে আজকে আর নয় এই নিয়ে কালকে আলোচনা হবে, এখন চলো।’ কথাটা শেষ করেই জাহাজের সার্চ লাইটটা বন্ধ করেন লি। মুহূর্তের ভেতর বাইরের পরিবেশটা আবার ঘনান্ধকারে তলিয়ে যায়।


রাত্রিতে শোয়ার পরেও আর কিছুতেই ঘুম আসছিল না সম্রাটের। ওই মানুষ গুলোর চেহারাটাই চোখের সামনে ভেসে উঠছিল বার বার। কান দুটো নিজের অজান্তেই চলে যাচ্ছিল ডেকের দিকে। লিয়ের মুখ থেকে শোনা ‘মৃত মানব’ শব্দটাই যেন সম্রাটের সারা রাতের ঘুমটা কাড়িয়ে নিলো। চোখের পাতা এক করলেই ওর মনে হচ্ছে এই বুঝি জানালার কাঁচ ভেঙে ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ল মৃত মানব গুলো। শেষ পর্যন্ত না জেগে না ঘুমিয়েই সম্রাটকে সারা রাত কাটাতে হল।
সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর ফ্রেস হয়ে লি সম্রাটকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন পশ্চিমের টিলা আর পাহাড় গুলোর দিকে। তবে আজকে খাবার আর জলের বোতলটা সঙ্গে নিতে ভুললেন না। আজকে সকালে তুলনা মূলক কুয়াশা কম থাকার জন্য অস্পষ্ট ভাবে হলেও টিলা গুলোকে দেখা যাচ্ছে। গত কালকের তুলনায় সমুদ্র সৈকতে আজকে পাখির সংখ্যাটাও একটু বেশি। ডানহাতে রাইফেলটা নিয়ে বাঁহাতের জ্বলন্ত চুরুট টানতে টানতে সম্রাটের আগে আগে চলেছেন লি। সম্রাটের মতোই লিয়ের কাছেও এই দ্বীপটা সম্পূর্ণ অচেনা তবুও লিকে দেখে সম্রাটের বার বার মনে হচ্ছে এই দ্বীপ সম্পর্কে অনেক কিছুই জানেন লি।
পথ চলতে চলতে সম্রাট মাঝে মাঝেই পিছন ফিরে দেখছে সন্দেহ জনক কেও পিছু নিচ্ছে কি না। গত রাত্রির ঘটনাটা ওর চোখে এখনো পরিষ্কার ভাবে গেঁথে আছে। এর আগে সম্রাটকে সঙ্গে নিয়ে কোথাও যাবার আগে লি সেখানে যাবার কারণ এবং গন্তব্য স্থলের ভৌগলিক বিবরণ দুটোই আগাম জানিয়ে দিতেন। এই প্রথমবার লি সম্রাটকে বারমুডায় আসার সঠিক কারণ সম্পর্কে কিছুই বলেননি। ভৌগলিক পরিবেশ জানার কথা অবশ্য লিয়ের পক্ষেও সম্ভব নয়।


ঘণ্টা খানেকের মতো চলার পর সম্রাট খেয়াল করল মাটি আর পাথরের রঙ পাল্টে যাচ্ছে। সমুদ্র সৈকতের মতো এদিকের মাটিটা ধূসর নয়। এদিকের মাটি-পাথর দুটোই রক্তিম বর্ণের। এমন কি গাছপালা গুলোও মাত্রাতিরিক্ত লাল। এখান থেকে টিলা আর পাহাড় গুলোকে দেখা যাচ্ছে পরিষ্কার ভাবে। তবুও চলার যেন শেষ নেই। জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে পাহাড় বা টিলা গুলোকে ঠিক যতটা কাছে মনে হচ্ছিল ততটা কাছে নয় মোটেই। সম্রাট আর লি যতই এগিয়ে চলেছে পাহাড় আর টিলা গুলো যেন ঠিক ততই পিছিয়ে যাচ্ছে। এই সব খোলামেলা দ্বীপে অনেক দূরের জিনিশকেও কাছের বলেই ভুল হয়। সম্রাট আর লি যে দিক দিয়ে চলেছে সেদিকটায় গাছপালা তেমন নেই বললেই চলে। মাঝে মাঝে এক আধটা বাওবাব গাছের মতো দেখতে প্রাচীন গাছ দাঁড়িয়ে আছে ঠিকেই তবে সে গুলোও অনেকটাই দূরে। দূর থেকে গাছ গুলোকে দেখে বট কিংবা অশ্বত্থ গাছ ভেবে ভুল হওয়াটাই স্বাভাবিক।


লি চলতে চলতেই এবার বললেন, ‘জাহাজে ফেরার সময় পথ চিনতে না পারলে এই প্রাচীন গাছ গুলোই আমাদেরকে পথ দেখিয়ে নিয়ে আসবে।’
সম্রাট কিছুই বলল না শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে গেল। সত্যি বলতে কালকে রাতে ওই মানুষ গুলোকে দেখার পর থেকে সম্রাটের এখানে আর একটুও ভাল লাগছে না। প্রতিটা মুহূর্তেই ওর মনে হচ্ছে মৃত্যু যেন পিছনে ধাওয়া করে বেড়াচ্ছে। আসলে বারমুডায় আসার উদ্দেশ্যটা সম্রাটের কাছে ঘনান্ধকারে মোড়া বলেই হয়তো ওর আরও বেশি খারাপ লাগছে।
লি সম্ভবত সম্রাটের মনের কথাটা পড়ে ফেলেছেন তাই উনি পিছনের দিকে না তাকিয়েই সম্রাটকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কি ইয়াং ম্যান কী ভাবছ ? আমার মনে হয় তোমাকে এবারের সফরে সঙ্গে আনাটা আমার উচিৎ হয়নি।’
সম্রাট নিজের গলার স্বর যথাসম্ভব স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে বলে, ‘কেন আমি কি কিছু ভুল করেছি ? আপনি সঙ্গে না নিলে আমার মতো সাধারণ ছাপোষা ঘরের বাঙালী কি কখনো বারমুডায় আসার স্বপ্ন দেখতে পারত ? আপনার সঙ্গে না এলে হয়তো কোনোদিন জানতেই পারতাম না বারমুডা ট্রায়েঙ্গেলের মতো রসম্যময় এলাকায় এমন একটা জলজ্যান্ত দ্বীপ আছে বলে।’


‘এই দ্বীপের কথা আমিও তেমন ভাবে জানতাম না। তবে আমার ধারনা ছিল বারমুডার মতো বিশাল এলাকায় প্রাণের অসতীত্ব থাকলেও থাকতে পারে। এরপর যখন অলিভার আর্নল্ডের ডাইরিতে মেরিন দ্বীপের কথা শুনলাম তখন আমার ধারনাটা আরও মজবুত হয়।’ বেশ কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর লি আবার বলতে শুরু করেন, ‘মিঃ ইয়াং ম্যান প্রায় চার বছর আমি আমার ছেলের সঙ্গে বারমুডা ট্রায়ঙ্গেল নিয়ে কাল্পনিক গবেষণা করেছি। তবে কাল্পনিক বলছি এই কারণেই কারণ বারমুডায় না এসে কেবল মাত্র বই-ম্যাপ-ধারনা আর কল্পনার উপরেই দাঁড়িয়েছিল আমাদের গবেষণাটা। তবে আমাদের গবেষণা যে ভুল প্রমাণিত হয়নি সেটা এখানে এসেই বুঝতে পারছি। আমি ঠিক করেছিলাম আমার ছেলে এমিলকে সঙ্গে নিয়েই একদিন বারমুডায় আসব। কিন্তু সেটা আর হল না।’
‘ওকেও তো সঙ্গে নিয়ে আসতে পারতেন। ওকে কেন আনলেন না আমাদের সঙ্গে ?’ সরাসরিই প্রশ্নটা করে বসে সম্রাট।
লি আবার খানিকক্ষণ চুপ করে থাকার পর বলেন, ‘আসলে বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলকে মৃত্যুরই আরেক নাম বলতে পারো। কিন্তু আমার বিশ্বাস এখান থেকে ফেরা কষ্টের হলেও অসম্ভব নয়। এখানের প্রকৃতি একটু বেশি মাত্রায় রুষ্ট এই যা। কিন্তু আমার ছেলে মনে হয় নিজের পিতার উপর রিস্কটা নিতে চায়নি।’
‘আপনার কোনও কথাই কিন্তু আমার ছোট মাথায় ঢুকল না।’
‘গত মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে এমিল নিখোঁজ। আমি লাইবেরিয়ায় গিয়েছিলাম একটা কাজে আর এমিল এই সুযোগে…’ গলাটা ভারী হয়ে আসে লিয়ের। আর একটাও কথা বলতে পারেন না তিনি।


লিয়ের বারমুডায় ছুটে আসার কারণটা সম্রাটের কাছে এখন ভোরের আলোর মতোই পরিষ্কার হয়ে ওঠে। লি এতদিন সম্রাটকে কিছুই বলেননি বলে সম্রাটের একটু খারাপ লাগছে ঠিকেই তবে বারমুডায় আসার উপযুক্ত কারণটা খুঁজে পেয়ে সম্রাটের বুকের ভেতর থেকে প্রশ্নের বিশাল বোঝাটা নিচে নেমে গেল। সম্রাট লিকে সান্ত্বনা দেবার জন্য কিছুই বলল না শুধু কয়েক পা এগিয়ে এসে লিয়ের বাঁহাতটা শক্ত করে ধরল মাত্র।
এতক্ষণ পর্যন্ত দুজনে গল্প করতে করতে অন্যমনস্ক ভাবেই এগিয়ে চলেছিল। টিলা গুলোর কাছাকাছি এসে পড়তেই সম্রাট সাথে সাথে লিও চমকে গেলেন। টিলা গুলোর উপর বিক্ষিপ্ত ভাবে চরে বেড়াচ্ছে কয়েক দল হরিণ প্রজাতির প্রাণী। ছোটবড় কাঁটা গাছ গুলোকে ওরা মনের আনন্দে চিবিয়ে যাচ্ছে। লি আর সম্রাটের চমকে যাওয়ার কারণটা কিন্তু এই হরিণ প্রজাতির প্রাণী গুলো নয়। ওদের চমক লাগার কারণ টিলার গায়ে ছড়িয়ে থাকা প্রাচীন সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ। কিন্তু এটা কেমন করে সম্ভব! লি বা সম্রাট কারুরেই বোধগম্য হল না বিষয়টা। পৃথিবীর যে কোনও প্রান্তেই মানুষ থাকাটা অস্বাভাবিক নয় কিন্তু তাই বলে বারমুডা ট্রায়ঙ্গেলের রহস্যময় মেরিন দ্বীপে প্রাচীন সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ থাকাটা যথেষ্টই আশ্চর্যের। সাবধানে পা ফেলে ফেলে টিলার উপর এসে দাঁড়ায় দুজনে। তারপর ভাল ভাবে খতিয়ে দেখে প্রাচীন দেওয়াল গুলোকে। পোড়ামাটি আর পাথর দিয়ে খুবেই যত্নের সঙ্গে দেওয়াল গুলো বানানো হয়েছিল। দেওয়ালের গায়ে পরিচিত পৃথিবীর ছাপ। খানিকক্ষণ খোঁজা খুঁজি করার পর সম্রাটের চোখ পড়ল দেওয়ালের গায়ে খোদাই করা একটা অস্পষ্ট মূর্তির উপর। কাছে যেতেই সম্রাট চিনতে পারল মূর্তিটা ধ্যানমগ্ন বৌদ্ধ মূর্তি।


এরপর সম্রাটের সঙ্গে আরও বেশ কয়েকটা টিলায় ঘুরলেন লি। খুঁজে বার করলেন আরও কিছু প্রাচীন স্থাপত্য ভাস্কর্য। কিন্তু সবেই ভগ্নপ্রায়। সব মিলিয়ে মানেটা দাঁড়াল, কোনও না কোনও এক সময় সভ্য জগতের মানুষ এখানে বসবাস করেছে। তবে তারা কবে কখন কীভাবে এখানে এসে পড়েছিল সেটা সম্রাট বা লি কেও ঠিক ভাবে বুঝে উঠতে পারল না। আর তারা এত এত জায়গা থাকতে কেনই বা দ্বীপের এই টিলা গুলোকেই বসবাসের জন্য বেছে নিয়েছিল সেটাও পরিষ্কার হল না দুজনের কারু কাছেই।
টিলার উপর থেকে দূরের সমুদ্রটাকে জমাট বাঁধা নীলচে সবুজ বরফের মতো মনে হচ্ছে। সমুদ্রের একটা দিক দখল করে নিয়েছে জলজ শ্যাওলায়। অলিভার আর্নল্ড উনার ডাইরিতে হয়তো এই শ্যাওলা গুলোর কথাই বারবার উল্লেখ করে ছিলেন। লি শ্যাওলা গুলোর দিকে আঙুল বাড়িয়ে বললেন, ‘এই শ্যাওলা গুলোই শুকিয়ে গিয়ে বারমুডার সমুদ্র বক্ষে ঘুরে বেড়ায়। তারপর যখন বজ্রপাত কিংবা ঢেউয়ে ঢেউয়ে ধাক্কায় সমুদ্র বক্ষে অগ্নুৎপাত ঘটে তখন এই শ্যাওলা গুলোতে আগুন লাগে। গাড় নীল জলের বুকেও দেখা দেয় দাবানল। সেদিন রাত্রিতে দেখা আগুনটাও ছিল বারমুডার বুকে নিয়ত ঘটে চলা এমনই একটা সাধারণ ঘটনা মাত্র।’


সম্রাট আর লি লালচে রঙের একটা পাথরের উপর বসে বারমুডার প্রকৃতি নিয়ে গল্প করছিলেন। ঠিক এমন সময় টিলার নিচের থেকে ভেসে এল লোমহর্ষক একটা চিৎকার। টিলার উপরে বসে থাকার জন্য সম্রাট বা লি কিছুই দেখতে পেলেন না। একবারের জন্যই শোনা গেল চিৎকারটা। এরপর সব কেমন যেন থমথমে হয়ে পড়ল মুহূর্তের ভেতর। হরিণ প্রজাতির প্রাণী গুলো যে যার মতো ছুটে পালিয়ে গেল দূরের পাহাড় গুলোর দিকে। টিলার নীচে যে কিছু একটা ঘটেছে সেটা দুজনের কারুরই বুঝতে আর বাকি রইল না। লি নিঃশব্দে খানিকটা সরে এসে টিলার নীচে ঠিক হচ্ছে সেটা দেখার চেষ্টা করলেন। কিন্তু প্রাচীন সভ্যতার ভগ্ন দেওয়াল গুলোর জন্যই কিছুই দেখা গেল না। এবার বাধ্য হয়েই লি খানিকটা নীচে নামলেন। সম্রাট উপরে বসেই লিয়ের ফেরার অপেক্ষা করতে লাগল।


বেশ কয়েক মিনিট পর হাঁপাতে হাঁপাতে ফিরে এসে লি সম্রাটকে বললেন, ‘পালিয়ে চল শীঘ্র পালিয়ে চল এখান থেকে।’ সম্রাট দেখল লিয়ের চোখমুখ দিয়ে একটা আতঙ্ক ঠিকরে বেরিয়ে আসছে। লিয়ের এমন আতঙ্কিত চেহারা প্রথমবার দেখে আরও বেশি করেই আতঙ্কিত হয়ে পড়ল সম্রাট। কিংকর্তব্য জ্ঞান হারিয়ে দুজনেই এবার ছুটে নামতে লাগল টিলাটার উল্টো দিকে। পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখার মতো সাহস টুকুও এখন সম্রাটের নেই। ছুটতে ছুটতে দুজনেই এসে দাঁড়াল একটা অন্ধকার গুহা মুখের সামনে। কয়েক সেকেন্ডের জন্য হলেও গুহাটাকে প্রথমবার দেখে অতিবড় সাহসী পুরুষেরও ভয়ে বুক কেঁপে উঠবে। গুহা মুখটা খোদাই করে কারা যেন দৈত্যের রূপ দিয়েছিল এককালে। এখন সেটার উপর জংলি লতা গুলো এমন ভাবেই ঝুলে আছে যাতে করে গুহটাকে আরও বেশি জ্যান্ত বলে মনে হচ্ছে।
গুহাটার সামনে দাঁড়িয়ে লি একবারের জন্য পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখলেন তারপর বললেন, ‘এই গুহায় ঢুকে লোকানো ছাড়া আর দ্বিতীয় কোনও রাস্তা নেই আমাদের কাছে।’


শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়েই গুহার ভেতর ঢুকতে হল দুজনকে। গুহার ভেতর দিয়ে ক্রমশ সংকীর্ণ হতে হতে আঁকাবাঁকা ভাবে চলে গেছে একটা অন্ধকার সুড়ঙ্গ। গুহাটার বেশি ভেতরের দিকে যেতে লি বা সম্রাট কারুরেই বিশেষ সাহসে কুলাল না। গুহায় ঢুকেই বড় মাপের একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে লি বললেন, ‘অতি রঞ্জিত আরব্য উপন্যাসেও এমন অদ্ভুত দানব আকৃতির মানুষের বর্ণনা পড়িনি।’
সম্রাট ভয়ে ভয়েই লিকে জিজ্ঞেস করে, ‘ঠিক কী দেখলেন আপনি ?’
আরেকটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে লি বললেন, ‘এতদিন অশ্ব-মানব; হিম-মানব; সিংহ-মানব আরও কত কিছুই না শুনেছিলাম কিন্তু চোখের সামনে এমন ডানা ওয়ালা দৈত্য-মানব দেখব স্বপ্নেও ভাবিনি। কী নৃশংস ভাবেই না দৈত্যটা ওই হরিণের মতো প্রাণীটাকে কামড়ে খাচ্ছিল।’


লিয়ের মুখ থেকে বেরিয়ে আসা প্রতিটা শব্দের ভেতর আতঙ্কের আঁশটে গন্ধটা পরিষ্কার ভাবে অনুভব করতে পারছিল সম্রাট। লিয়ের মতো অভিজ্ঞ সাহসী পুরুষকে আজ ভয়ে নেতিয়ে পড়তে দেখে কিছুই আর জিজ্ঞেস করতে পারল না সে। চোখ দুটোকে বড় বড় করে গুহা মুখটার দিকে শুধু তাকিয়ে রইল মৃত্যুরূপ দৈত্য-মানবটার অপেক্ষায়। অন্ধকার গুহার ভেতর বসে সম্রাটের প্রতি মুহূর্তেই মনে হতে লাগল কে যেন ওর কানের কাছে ফিসফিস করে বলছে, এখানে কেন এসেছিস ? কেন এসেছিস এখানে ?

bengali detective story Bengali Ghost story Sunday Suspense bomkesh bakshi, feluda

Bengali story


ছয়
দেখতে দেখতেই কেটে গেল আরও তিনটা দিন। সেদিন ওদের দুজনকে গুহার ভেতরেই সারা রাত কাটাতে হয়েছিল। গুহার বাইরে মাঝে মাঝেই হানা দিয়েছিল দৈত্য-মানবটা। লিয়ের কথা জানি না তবে সম্রাট যত দিন বাঁচবে ততদিন ওই গুহার রাতটা ওর মনে থাকবে। গুহার গুমোট অন্ধকার, মশার কামড়, সাপের ভয় তার সঙ্গে ডানা ওয়ালা দৈত্য-মানবের হাড় হিম করা ক্রুদ্ধ গর্জন সব মিলিয়ে সেদিনের রাতটা সম্রাটের কাছে সত্যিই বিভীষিকাময় হয়ে উঠেছিল।

পরেরদিন সকালে ওরা যখন জাহাজে ফিরল তখন সকাল গড়িয়ে দুপুর। ডেকের কপাট হাঁ করে খোলা। খাবার জলের ড্রাম কিচেনে গড়াগড়ি খাচ্ছে। সারা কেবিন জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বিস্কুট আর কেকের টুকরো। সব মিলিয়ে এক বিতিকিচ্ছি অবস্থা। পড়ে থাকা জলের ড্রামটার ভেতর সামান্য যেটুকু জল অবশিষ্ট ছিল সেটা দিয়েই এই কটা দিন কেটেছে। আজকে সকাল থেকে খাবার জলও নেই। কালকে বিকেলে সমস্ত ভয়কে পায়ে মাড়িয়ে লিয়ের সঙ্গে জলের সন্ধানে বেরিয়েছিল সম্রাট কিন্তু নিরাশা ছাড়া কিছুই জোটেনি কপালে। আজকে দুপুরের ভেতর পানিয় জলের কিছু একটা ব্যবস্থা না হলে মারাত্মক সমস্যায় পড়বে দুজনেই।


আজকে সকালের দিকে এক পশলা বৃষ্টি হওয়ার পর এখন ঝকঝকে আকাশ। জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে লি সম্রাটের সঙ্গে আলোচনা করছিলেন কোনদিকে গেলে পানিয় জলের সন্ধান পাওয়া যেতে পারে। পশ্চিম দিকটায় যেহেতু মানব সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে তখন ওদিকটায় পানিয় জল থাকারই কথা কিন্তু ওই দিকে পুনরায় যাবার ইচ্ছে সম্রাট বা লি কারুরই নেই এখন। উত্তর পশ্চিম দিকে রহস্যময় প্রাচীন অরণ্য তার সঙ্গে মাংসাশী লতার উপদ্রব। এখন একমাত্র দক্ষিণ পূর্ব দিকটা ছাড়া আর কোথাও যাবার নেই। লি দ্বীপের দক্ষিণ পূর্ব দিকের জঙ্গলটা দূরবীন দিয়ে ভাল করে দেখে নিলেন কয়েক বার কিন্তু তেমন কিছু চোখে পড়ল না। এই দ্বীপটার এই এক সমস্যা, প্রতি পদক্ষেপেই মৃত্যুর হাতছানি তবুও শান্ত সবুজ নিরীহ প্রকৃতিকে দেখে কিছুই বোঝার উপায় নেই।


শেষ পর্যন্ত দ্বীপের দক্ষিণ পূর্ব দিকের জঙ্গলে যাওয়াটাই ঠিক হল। আজকে বাইরে বার হওয়ার সময় লি কয়েক মুঠো বিস্কুট, খানিকটা ময়দা, ফুট খানেক দড়ি আর কয়েকটা বড় জলের বোতল সঙ্গে নিলেন। দড়ি, বিস্কুট আর ময়দা দিয়ে লি ঠিক কী করবেন সেটা সম্রাটের বোধগম্য হল না। রাইফেলটার সঙ্গে আজকে দুনলা বন্দুকটা নিতেও ভুললেন না লি। এখানকার প্রায় প্রতিটা প্রাণীই সাইজে অল্প বিস্তর বড় মাপের। তাই শুধুমাত্র রাইফেল দিয়ে শেষ রক্ষা নাও হতে পারে।


ঘন জঙ্গলের ভেতর দিয়ে এগিয়ে চলল দুজনে। চোখের সামনে বিশাল মাপের গাছের গুড়ি গুলো ধাপে-ধাপে উঠে গেছে আকাশের দিকে। পায়ের নীচে নানা রঙের ছোটবড় মাঝারি মাপের পাথর ছড়িয়ে আছে। দুজনে যতই সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে জঙ্গল ততই নিবিড় হচ্ছে বারেক্কে। সূর্যের আলো তো দূরের কথা মাথার উপরকার আকাশটাও ঠিক মতো দেখা যাচ্ছে না এখন। গাছের উপর থেকে ভেসে আসছে পাখিদের কিচিরমিচির। এই এবড়ো খেবড়ো পাথুরে রাস্তা দিয়ে সম্রাটের চলতে খুবেই সমস্যা হচ্ছে ঠিকেই তবুও লিকে বলার মতো সাহস নেই ওর। লিকে বলেও কোনও লাভ হবে না কারণ আজকে বিকেলের ভেতর পানিয় জলের ব্যবস্থা করতে না পারলে সমুদ্রের নোনা জল খেয়ে অসুস্থ হওয়া ছাড়া দ্বিতীয় কোনও রাস্তা থাকবে না ওদের কাছে।


পথ চলতে চলতেই সম্রাটের চোখ পড়ল, গাছের ডালে গুটি মেরে বসে থাকা বেড়াল মাপের এক ধরণের অদ্ভুত প্রাণীর উপর। লি সম্রাটকে জানালেন, ওগুলো প্রাচীন প্রজাতির বাঁদর। আমাজনের জঙ্গলে এদের সংখ্যা নেহাত কম নয়। প্রাণী গুলো গাছের ডালে চুপটি করে বসে আছে। মাঝে মাঝে অলস ভাবে তাকিয়ে দেখছে সম্রাট আর লিকে। ওরা দুজনে এগিয়ে চলল গভীর থেকে গভীরতর জঙ্গলের দিকে।
পায়ের তলায় এখন মাটি বা পাথর কিছুই নেই, তার বদলে আছে পচা পাতার স্তূপ। এই সব জনমানব শূন্য জঙ্গলে বছরের পর বছর ধরে পাতার রাশি জমা হচ্ছে গাছের গোঁড়ায়। সাবধানে পা ফেলে চলতে হচ্ছে দুজনকে এখন। এই সব প্রাচীন আলোআঁধারি জঙ্গলে পাতার ধসে ভুস করে তলিয়ে যাওয়াটা আশ্চর্যের কিছু নয়।


ঘনান্ধকার জঙ্গলটা পেরিয়ে যেতেই শুরু হল যেন স্বর্গরাজ্য। বড় বড় গাছ গুলোর ডাল বেয়ে এমনকি গুঁড়ি বেয়েও ঝুলে আছে জংলি ফুল। পরম যত্নে কারা যেন গাছের গায়ে লতা আর ফুল গুলোকে সাজিয়ে দিয়ে গেছে। এখানে দাঁড়িয়ে কে বলবে এটা বারমুডা ট্রায়ঙ্গেলের এক অচেনা অজানা দ্বীপ! ফুলের মিষ্টি একটা গন্ধে ভরে আছে এলাকার আকাশ বাতাস। লি সম্রাটকে সাবধান করে দিয়ে বললেন, ‘নাকে মুখে রুমাল চাপা দিয়ে এগিয়ে চলো। এই ফুলের গন্ধতেও জ্ঞান হারাতে পারো।’ লিয়ের কথায় সেদিনের ঘটনাটা মনে পড়ে যেতে তাড়াতাড়ি পকেট থেকে রুমালটা বার করে নাকে মুখে চাপা দেয় সম্রাট।


শেষ পর্যন্ত এক টুকরো ফাঁকা সমতল জমির উপরে এসে বসল দুজন। আজকে আর গাছের নীচে বসতে সাহস হল না। সেই সকাল থেকে ঘুরে ঘুরে কোথাও জলের কোনও চিহ্ন পাওয়া গেল না শেষ পর্যন্ত। এবার খানিকটা হতাশার সঙ্গেই সম্রাট লিকে জিজ্ঞেস করে, ‘এখন কী তাহলে সমুদ্রের নোনা জল খাওয়া ছাড়া আর কোনও উপায় নেই ?’
কয়েক মুহূর্ত চিন্তা করে লি বলেন, ‘উপায় তো একটা দেখেই এসেছি কিন্তু কতটা সফল হব বলতে পারছি না।’
‘কী উপায় ?’ জিজ্ঞেস করে সম্রাট।
লি হেঁয়ালির সুরে বলেন, ‘চলো গেলেই দেখতে পাবে।’


শেষ পর্যন্ত আবার ফিরে আসা। আবার সেই আলোআঁধারি জঙ্গল, পচা পাতার স্তূপ পেরিয়ে সম্রাটরা এসে দাঁড়ায় সেই বাঁদর গুলোর কাছেই। লি ভাল মতোই জানেন ওই বাঁদর গুলো জলের সন্ধান ঠিক রাখে। কিন্তু জলের কাছে রক্ত-মাংস লোভী জন্তুর উপদ্রব বেশি মাত্রায় থাকে বলে ওরা সব সময় জলের কাছে যায় না। আর গেলেও দল বেঁধে যায়। লি সম্রাটকে বললেন, ‘গাছের ডালে বসে থাকা বাঁদর গুলোর ভেতর একটাকে ধরতে পারলেই জলের ঠিকানা ঠিক জোগাড় করা যাবে। দেখি কতদূর কী হয়।’


সম্রাটকে একটা ঝোপের আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকতে বলে লি এবার বাঁদর ধরার জন্য পকেটে রাখা দড়িটা দিয়ে একটা ফাঁদের ব্যবস্থা করলেন। তারপর কিছুক্ষণ এদিক সেদিক খোঁজা-খুঁজি করে একটা গাছের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। গাছটার সারা গায়ে ছোটবড় গর্তের মতো কোটর। সম্রাট লক্ষ্য করল লি গাছটার একটা কোটরে ফাঁদ সমেত ডান হাতটা ঢুকিয়ে কিছু একটা করছে। কয়েক মিনিট পর লি গাছের কোটর থেকে হাতটা বার করে বাঁদর গুলোকে দেখিয়ে দেখিয়ে কয়েকটা বিস্কুট ভরে দিলেন কোটরটায়। তারপর ফিরে এলেন সম্রাটের কাছে। সম্রাট জানতে চাইলে লি বললেন, ‘যে কোনও বাঁদরই ভীষণ কৌতূহলী কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে দেখো কেউ না কেউ ঠিক হাত ঢোকাবে কোটরটায়। আর হাত ঢোকালেই জলের জন্য ভাবতে হবে না আমাদের।’


লি ঠিক যেমনটা ভেবেছিলেন ঘটলও ঠিক তেমনটাই। শেষ পর্যন্ত একটা বাঁদর গাছের কোটরে হাত ঢুকিয়ে আটকা পড়ল লিয়ের ফাঁদে। বাঁদরটা আটকা পড়তেই লি ছুটে গিয়ে যথেষ্ট দক্ষতার সঙ্গে বাঁদরটাকে ধরে ওর গলাটা দড়িতে বাঁধলেন। সম্রাট এতক্ষণ ধরে ম্যাজিক দেখার মতো দেখছিল পুরো ব্যাপারটা। কিন্তু এখনো পর্যন্ত সম্রাটের কাছে পরিষ্কার হল না লি ঠিক কী করাতে চাইছেন বাঁদরটাকে দিয়ে!


দড়িতে বাঁধার পরেও বাঁদরটা বেশ ছট-ফট করছিল। কিন্তু ওর হাতে কয়েকটা বিস্কুট ধরিয়ে দিতেই বাচ্চা ছেলের মতো শান্ত হয়ে গেল বাঁদরটা এক মুহূর্তে। লি বাঁদরটাকে বেশ কিছুটা দূরে নিয়ে এলেন বাকি বাঁদর গুলোর দৃষ্টি এড়াবার জন্য। তারপর ওর গলার দড়িটা একটা গাছের ডালে বেঁধে দিয়ে ওকে আরও কয়েকটা বিস্কুট খেতে দিলেন লি। ওগুলো শেষ হতেই একটা বিস্কুট রেখে অবশিষ্ট বিস্কুটগুলোও বাঁদরটার হাতে ধরিয়ে দিয়ে লি সম্রাটকে একটা বড় মাপের পাতা তুলে আনতে বললেন। সম্রাট পাতাটা আনার পর লি পাতার উপর পুরো ময়দাটা ঢেলে নিয়ে তাতে শেষ বিস্কুটটাকে গুঁড়ো করে মিশিয়ে দিলেন। তারপর বিস্কুট গুঁড়ো মেশানো ময়দাটা বাঁদরটার মুখের সামনে ধরলেন। বাঁদরটা কোনও রকম ভাবনা চিন্তা না করেই লিয়ের হাত থেকে পাতাটা নিয়েই বিস্কুট মেশানো ময়দাটা খেতে শুরু করল।


লি এরপর অপেক্ষা করতে লাগলেন। এতক্ষণে সম্রাটের কাছেও পুরো বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে গেছে। ঘণ্টা খানেক অপেক্ষা করার পর একটা সময় বাঁদরটা লাফানি ঝাঁপানি শুরু করে। লি আরও আধঘণ্টার মতো অপেক্ষা করে বাঁদরটাকে মুক্ত করে দিলেন। বাঁদরটাকে মুক্ত করতেই সে ছুটতে শুরু করল ঘাস জঙ্গলের দিকে। লি আর সম্রাট দুজনে বাঁদরটার পিছু নিলেন।
বাঁদরটা ঘাস জঙ্গল পেরিয়ে বিস্তীর্ণ ভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা একটা পাথুরে জায়গায় এসে কিছুক্ষণের জন্য দাঁড়িয়ে পড়ল। চারদিকটা ভাল করে একবার দেখে নিয়ে আবার ছুটতে লাগল সামনের দিকে। লি আর সম্রাট এবার বাঁদরটার পিছনে ছোটা বন্ধ করে। এবার কানে আসছে পাহাড়ি ঝর্ণার কুল-কুল শব্দ। সামনের দিকে চলতে চলতেই সম্রাট একবার তাকিয়ে দেখল লিয়ের মুখটা। নির্মল, শিশু মুখের মতো পবিত্র। এবড়ো খেবড়ো পাথরের দল পেরিয়ে দুজনে এসে দাঁড়াল পাহাড়ি একটা ঝর্ণার সামনে। অনেক অনেক দূরের থেকে সাদা সুতোর মতো নেমে এসেছে ঝর্ণাটা। সম্রাট দেখল চতুর্দিক ভাল ভাবে দেখতে দেখতে জল খাচ্ছে বাঁদরটা। সম্রাটের হাসি পেয়ে গেল বাঁদরটাকে দেখে। সত্যিই লিয়ের বুদ্ধির কাছে মাথা না ঝুঁকিয়ে উপায় নেই।


ঝর্ণা নদীটা পাথরের উপর দিয়ে ঝাঁপাতে ঝাঁপাতে নেমে গেছে গভীর খাদের দিকে। নীচের থেকে হালকা ভাবে ভেসে আসছে জলপ্রপাতের মতো একটা মৃদু গর্জন। সম্রাট দুচোখ ভরে প্রকৃতির রূপ দেখছে। পাহাড়ি সাদা ফুলে ভরে আছে চার দিকটা। এখানেও কত রকমের পাখি উড়ে বেড়াচ্ছে নিজের মতো করে। সম্রাট আর লি প্যান্টের পা দুটোকে গুটিয়ে পাথরের উপর পা ফেলে ফেলে সাবধানে এগিয়ে গিয়ে বসে পাহাড়ি ঝর্ণা নদীটার মাঝে। আঁজলা ভরে দুজনেই জল খায় পেট ভর্তি করে। তারপর দুজনে মিলে জলের খালি বোতল গুলোয় জল ভরতে থাকে। জাহাজটা যেখানে রয়েছে সেখান থেকে এই জায়গাটার দূরত্ব বিশেষ নয় তবুও ওই বাঁদরটাকে না ধরলে হয়তো এখানে এসে পৌঁছানো বেশ কঠিন হয়ে উঠত। দুদিকে সবুজ জঙ্গলের রাজত্ব আর তার মাঝে পাহাড়ি পথ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে ঝর্ণা নদীটা। রহস্যের সঙ্গে প্রাকৃতিক রূপ মিশে বারমুডার এই মেরিন দ্বীপে এক ভয়ঙ্কর সৌন্দর্যের সৃষ্টি করেছে।


ঠাণ্ডা জলে পা ডুবিয়ে আনমনা হয়ে পড়েছিল সম্রাট। হঠাৎ আধা জেব্রা আধা ঘোড়ার মতো দেখতে কয়েকটা প্রাণীকে ঝর্ণার দিকে এগিয়ে আসতে দেখে চমকে ওঠে। প্রাণী গুলো লিয়ের চোখে পড়লে উনি সম্রাটকে বলেন, ‘এই প্রাণী গুলোর নাম কুয়াগা। একটা সময় দক্ষিণ আফ্রিকার জঙ্গলে প্রচুর দেখা যেত, ১৮৮৩ সালে এদের অবলুপ্তি ঘটে। আমার কী মনে হয় জানো এই দ্বীপের প্রতিটা প্রজাতির প্রাণীই কোনও না কোনও সময় সভ্য পৃথিবীতেও ছিল। কিন্তু দিনের পর মানুষ প্রকৃতির উপর অত্যাচার করে করে এদের বিলোপ ঘটিয়েছে।’
সম্রাট সহমত জানিয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘আচ্ছা সেদিন টিলার উপরে আমরা যে বৌদ্ধ মূর্তি সমেত একটা সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ দেখলাম সেটা এমন একটা দ্বীপে তৈরি হল কেমন করে। এখানে তো সভ্য মানুষ থাকার কথা নয়।’
লি একটা চুরুট ধরিয়ে ধোঁয়াটা আকাশের দিকে ছুড়তে ছুড়তে গম্ভীর ভাবে বলেন, ‘হতেই পারে বহুকাল আগে এক বা একাধিক যাত্রীবাহী জাহাজ পথ ভুলে কিংবা বারমুডার রহস্যময় আকর্ষণে এখানে এসে পড়েছিল। হয়তো ওদের আর ফিরে যাওয়ার কোনও রাস্তা ছিল না। তাই ওরা গোষ্ঠীবদ্ধ ভাবে এই দ্বীপেই বসবাস শুরু করে।’
‘সেটা হতেই পারে কিন্তু এত জায়গা থাকতে ওরা ওই টিলা গুলোকেই বা বেছে নিলো কেন সেটা তো বুঝতে পারছি না।’
‘আজকের পরিবেশ পরিস্থিতির সঙ্গে সেই সময়কার পরিবেশ পরিস্থিতি মেলানোর চেষ্টা করলে কিন্তু ভুল করবে। তাছাড়া আমার মনে হয় ওই ধ্বংসাবশেষ গুলো যত প্রাচীন বলে মনে হচ্ছে ততটা প্রাচীন নয়। জলপথে নৌকার ব্যবহার প্রাচীন হলেও জাহাজের ব্যবহার কিন্তু বহু প্রাচীন ঘটনা নয়। আর এতগুলো মানুষ নিশ্চয় নৌকাতে করে আসেনি। মনে হয় বেশ কিছু বছর আগে বড়সড় মাপের কোনও প্রাকৃতিক দুর্ঘটনায় ওই জনপদ ধ্বংস হয়েছে। আর এমন ভাবেই ধ্বংস হয়েছে যে বর্তমানে সেটা প্রাচীন সভ্যতার আকার নিয়েছে।’
‘আচ্ছা একটা কথা জিজ্ঞেস করতাম যদি কিছু মনে না করেন।’
‘আরে মিঃ ইয়াং ম্যান তুমিও না! কী জানতে চাও বল।’ হাসি মুখেই কথাটা বলেন লি।
‘আপনি কী নিশ্চিত আপনার ছেলে এমিল এখানেই আছে ?’


সম্রাটের প্রশ্নে লিয়ের মুখটা থমথমে হয়ে আসে। তবুও যতটা সম্ভব নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে লি বলেন, ‘ও বেঁচে আছে কি নেই সেটা হয়তো বলতে পারব না। তবে যদি বেঁচে থাকে তাহলে এখানে থাকার সম্ভাবনা বেশি। আসলে কয়েক মাস ধরেই ও বারমুডায় আসার জন্য ব্যকুল হয়ে উঠেছিল। সেদিন তোমাকে ঠিক কী বলেছিলাম আমার মনে নেই, তবে সত্যি বলতে একজন পিতা হিসেবে আমি কোনও দিনেই চাইনি এমিল বারমুডা অভিযানে আসুক। সেদিক দিয়ে দেখলে আমি অবশ্যই তোমার সঙ্গে অন্যায় করেছি। তবে এটুকু জেনে রাখো এই এডগার লি বেঁচে থাকতে তোমার কোনও ক্ষতি হতে দেবে না।’ কথা গুলো বলতে বলতেই লিয়ের চোখ বেয়ে কয়েক ফোটা জল গড়িয়ে পড়ে ঝর্ণা নদীটার বুকে।


লিকে আঘাত দেওয়ার মতো কোনও ইচ্ছেই ছিল না সম্রাটের তবুও সম্রাট লিকে সান্ত্বনা দেবার মতো কোনও ভাষা খুঁজে পায় না। কিছুক্ষণ পর লি নিজেকে সামলে নিয়ে বলেন, ‘চলো ইয়াং ম্যান এবার ওঠা যাক। বন্য প্রাণীদের জল পান করতে আসার সময় হয়ে আসছে।’ কথাটা বলেই লি উঠে দাঁড়ান। সম্রাট উঠে পড়ার আগে আরও খানিকটা জল খেয়ে নেয়।
সম্রাট আর লি গল্প করতে করতে ঝর্ণা নদীটা পেরিয়ে হাঁটতে থাকে জঙ্গলটার দিকে। কুয়াগা নামক প্রাণী গুলো এখনো নদীটার ধারেই চরে বেড়াচ্ছে। বন্য ফুলের গন্ধ ভেসে আসছে বাতাসে। ভেসে আসছে ঝর্ণা নদীটার গড়িয়ে চলার শব্দ। জঙ্গলের ভেতর দিয়ে চলতে চলতে সম্রাটের চোখে পড়ল প্রকাণ্ড একটা পাইথন। গাছের গুড়িতে পেঁচিয়ে আছে পাইথনটা। সদ্য কিছু একটা খেয়েছে মনে হয়, সেটাকে হজম করার জন্যই গাছের গুড়িতে শরীর মোচড় দিচ্ছে পাইথনটা। সম্রাট আর লি একটু ঘুর পথ ধরে চলতে থাকে। পাইথনটাকে দেখার পর স্বাভাবিক ভাবেই পথ চলতে ভয় ভয় করছে সম্রাটের। হতেই পারে আবার কোনও গাছের গুড়িতে কিংবা গাছের ডালে কোন পাইথন অপেক্ষা করে আছে। সাবধানে পা ফেলে ফেলেই এগিয়ে আসতে হচ্ছিল সম্রাট আর লিকে।

Bengali story


সাত
জাহাজের কাছে ফিরে সম্রাট এবং লি দুজনের হতভম্ব হয়ে পড়ে। নিজেদের চোখকেও যেন ওদের বিশ্বাস হচ্ছে না। জাহাজটাকে ঘিরে বসে আছে প্রায় একশোর বেশি আদিম মানুষ। লিয়ের ভাষায় মেরিন দ্বীপের মৃত মানব। সম্রাটের চোখে জম্বি। সম্রাট আর লিকে আসতে দেখেও ওরা ভয় পেল না। লি খেয়াল করলেন, শিস দিয়ে ওরা একে অপরকে কিছু একটা বলছে। যদিও কী বলছে সেটা বোঝার ক্ষমতা লি বা সম্রাট কারুর নেই। আদিম মানুষ গুলোকে দেখে যথেষ্ট নার্ভাস বোধ করছে সম্রাট। ওদের হাতে ধারালো বর্শা আর তির ধনুক। ওদের গলায় ঝুলছে টুকরো টুকরো হাড়ের মালা। ওদের ঘোলাটে চোখ, হলদেটে দাঁত আর লিকলিকে লম্বা আঙুল গুলো যেন সম্রাটকে ভয় দেখানোর জন্যই ওদের ঈশ্বর বহু যুগ আগেই ওদেরকে দিয়ে ছিলেন। লি সম্রাটের বাঁহাতটা শক্ত করে ধরে বললেন, ‘ওদেরকে ভয় পাবার কিছুই নেই। নিজেকে সামলাও নতুবা ওরা আক্রমণ করে বসতে পারে।’


রুদ্ধশ্বাস ভাবেই প্রায় পনের মিনিট কেটে গেল কিন্তু ওদের কেউ আক্রমণ করল না। আবার নড়লও না নিজের জায়গা ছেড়ে কেউ। আরও কয়েক মিনিট পর লি এবং সম্রাট দুজনেই দেখতে পেল ওদের ভেতর থেকে একজন উঠে দাঁড়িয়েছে। খুব সম্ভবত ওদের দলপতি। লি আর সম্রাটের দিকেই ভয়ে ভয়ে এগিয়ে আসছে এবার। লি একহাতে সম্রাটের হাতটা ধরে আছেন অন্য হাতে বাগিয়ে ধরেছেন দুনলা বন্দুকটা। থরথর করে কাঁপছে সম্রাটের পা দুটো। আদিম মানুষটা কিছুটা এগিয়ে আসতেই লি বুঝতে পারলেন উনি মহিলা। তবে কি উনি দল নেত্রী ? হবেন হয়তো।


এর পর যে ঘটনাটা ঘটল সেটা সম্রাট কেন লিয়েরও কল্পনার অতীত। মহিলাটি সম্রাট এবং লিয়ের কাছে এসে হাতজোড় করে লুটিয়ে পড়লেন বালির উপর। কাঁদছেন উনি। অবিকল মানুষের মতো কাঁদছেন। উনার দুচোখ দিয়ে অঝোরে ঝরছে জলের ধারা। সম্রাট বা লি কিছুই বুঝতে না পেরে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকে। আরও কয়েক মিনিট পর ভিড়ের ভেতর থেকে আরেকজন উঠে এল। এবার মহিলা নয়, পুরুষ। সারা শরীর জুড়ে নানা ধরণের হাড়ের মালা, দুকানের ভাঁজে রঙিন পালক গোঁজা। বন্য প্রাণীর চামড়া দিয়ে বানানো কৌপীন লজ্জাটুকু রক্ষা করছে। উচ্চতা কম হলেও সাড়ে ছফুট। দেখেই মনে হচ্ছে ইনিই হয়তো দলের সর্দার।


হাঁ ইনিই সর্দার তা না হলে ইনি লিয়ের হাতে কখনই ফল উপহার দিতেন না। সর্দার লিয়ের হাতে উপহার তুলে দিয়ে লিকে ইশারায় জাহাজের কাছে যাবার জন্য বললেন। লিয়ের সঙ্গে সঙ্গে সম্রাটও জাহাজের কাছে পৌঁছুল। সেই মেয়েটি এখনো ওখানে পড়ে পড়ে কেঁদেই চলেছে। জাহাজের কাছে গিয়েই লি দেখলেন, জাহাজটাকে ঘিরে বসে থাকা আদিম মানুষ গুলোর ভিড়ের মাঝে আড়াআড়ি ভাবে তিনজনকে শোয়ানো আছে। তিন জনের শরীরেই ক্ষতবিক্ষত। টাটকা রক্তের উপর মাছি ভন ভন করছে। লি বুঝতে পারলেন এই আদিম মানুষ গুলো ওদের দুজনের কাছে সাহায্য চাইছে। লি ইশারা করে বোঝালেন যে উনি সাহায্য করবেন। লিয়ের কাছে সাহায্যের আশ্বাস পেতেই একটা কোলাহল পড়ে গেল ওদের ভেতর।


লি সাহায্যের আশ্বাস দিয়ে চিকিৎসা করলেন তো ঠিকই কিন্তু এক জনকে মাত্র বাঁচাতেই সক্ষম হলেন। বাকি দুজনের আঘাত এতটাই মারাত্মক ছিল যে লিয়ের পক্ষে ওদেরকে বাঁচানো সম্ভব হল না কিছুতেই।
এরপর শুরু হল ইশারার মাধ্যমে কথোপকথন। আদিম বন্য মানুষ গুলোর অনেক ইশারাই বুঝতে পারলেন না লি বা সম্রাট। আবার লিয়ের অনেক কথাই বুঝল না ওরা। তবে লি যতটুকু বুঝতে পারলেন ততটুকুই লিয়েই জন্য যথেষ্ট। মোটের উপর এরা ঐ ডানা ওয়ালা দৈত্য-মানবের হাত থেকে মুক্তি পাবার জন্য লি আর সম্রাটের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করছে। কিন্তু আদৌ কি লি আর সম্রাটের পক্ষে সম্ভব হবে এক দৈত্য মানবের হাত থেকে এদের কে রক্ষা করা ?


পরেরদিন সকাল বেলায় আদিম কয়েকজন মানুষের সঙ্গে ওদের দলপতিও এলেন লি আর সম্রাটকে ওদের ডেরায় নিমন্ত্রন করে নিয়ে যাবার জন্য। কিন্তু লিয়ের পক্ষে আজকে ওদের সঙ্গে যাওয়া কিছুতেই সম্ভব না। কালকে রাত থেকেই লিয়ের প্রচণ্ড জ্বর। গতকালকে ঝর্ণা নদীর ঠাণ্ডা জলে পা ডুবিয়ে বসে থাকার জন্যই হয়তো লিয়ের জ্বরটা এসেছে। লিয়ের ইচ্ছে ছিল না সম্রাট একলা ওদের সঙ্গে যাক। কারণ ওরা আর যাই হোক ওরা সভ্য জগতের মানুষ নয়। আজকেই প্রথমবার সম্রাট লিয়ের কথার অবাধ্য হয়ে একাই বেরিয়ে পড়ল আদিম মানুষ গুলোর সঙ্গে। এখানের প্রকৃতি পেয়ে বসেছে সম্রাটকে। সম্রাট ওদের সঙ্গে যাবার আগে লি নিজের দুনলা বন্দুকটা সম্রাটের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘সন্দেহ জনক তেমন কিছু ঘটলে শূন্যে পর পর দুটো ফায়ার করো। আমি ঠিক এসে পড়ব।’


ওদের ডেরায় গিয়ে সম্রাট যা দেখল তাতে করে আর যাই হোক এদেরকে মৃত মানব বা জম্বি কিছুতেই বলা যাবে না। এদেরকে উপজাতি বললেও ভুল বলা হবে। তবে এরা যথেষ্ট প্রাণবন্ত এবং স্নেহপরায়ণ। এদের আচরণ বন্ধু সুলভ। জঙ্গলের ভেতর লুকিয়ে থাকা ছোট ছোট টিলার গুহা এদের বাসস্থান। আবার এরা বাঁদর বা হনুমানের মতোই গাছের ডালেও রাত কাটাতে পারে। শিস ধ্বনিই এদের প্রধান ভাষা হলেও এরা প্রয়োজনে ছবি বা বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে বার্তালাপ করে থাকে। গাছের ফলমূল আর পশু-পাখির কাঁচা মাংস এদের খাবার। আগুনের ব্যবহার এখনো এদের হাতের বাইরে। আর পাঁচটা বন্য প্রাণীর মতো আগুনকে এরা যথেষ্ট ভয় পায় ।


এদের সঙ্গে ভাষার আদান প্রদানে ভয়ঙ্কর রকম সমস্যায় পড়ল সম্রাট। প্রায় ৯০% কথাবার্তা সম্রাটের বোধগম্য হচ্ছে না। সম্রাট আসার পর থেকেই এই আদিম মানুষ গুলোর দলপতি কিছু একটা বোঝাবার চেষ্টা করছেন। কিন্তু তিনি বোঝাতে পারছেন না কিছুতেই। শেষ পর্যন্ত অনেক চেষ্টা করেও যখন দলপতি কিছুই বোঝাতে পারলেন না তখন তিনি খানিকটা বিরক্ত হয়েই সম্রাটের কাছ থেকে এক ঝটকায় দূরে সরে গেলেন। তারপর তরতর করে উঠে গিয়ে দাঁড়ালেন একটা টিলার উপর। সম্রাটের মনে হল আকাশের দিকে মুখ করে উনি কিছু একটা খুঁজছেন। ঠিক এর পরেই সম্রাট দেখল আরেক অদ্ভুত দৃশ্য, দলপতি মুখের ভেতর একটা আঙুল ঢুকিয়ে, ‘কুল কুল কুল কুল’ ‘কুল কুল কুল কুল’ শব্দ করে কাউকে যেন কিছু একটা বললেন। বেশ কয়েকবার ওরকম শব্দ করার পর দলপতি ছুটে নীচে নেমে এলেন।

দলপতি টিলাটার থেকে নীচে নেমে আসার কয়েক সেকেন্ডের ভেতরেই সম্রাট দেখল বিরাট শরীরের একটা রাক্ষুসে পাখি জঙ্গলের বুকে পাক খেতে খেতে ওদের দিকেই উড়ে আসছে। পাখিটার চেহারা আর ডানার টকটকে লাল রঙ দেখেই সম্রাটের রক্ত শুকিয়ে যাবার জোগাড়।
দলপতি হাতের ইশারায় সম্রাটকে শান্ত হতে বললেন। পাখিটা উড়ে এসে টিলাটার উপরেই বসল। ভয়ঙ্কর তার চেহারা। পালক বিহীন চামড়ার ডানা দুটো রক্ত বর্ণের। সোনালি রঙের চোখ। ডাইনোসরের মতো লেজ আর মুখের অবয়বটা অনেকটাই বড় মাপের কচ্ছপের মতো।

এর চেয়েও বেশি আশ্চর্যের হল পাখিটার চারটা পা। এমন ধরণের একটা পাখিকে দেখে সম্রাট কেন হারকিউলিস হলেও হয়তো ঘাবড়ে যেতেন। দলপতি এবার সম্রাটকে সঙ্গে নিয়েই টিলাটার উপরে উঠে পাখিটার কাছে এসে দাঁড়ালেন। হাতের ইশারায় বুঝিয়ে দিলেন উনি সম্রাটকে সঙ্গে নিয়ে কোথাও একটা উড়ে যেতে চাইছেন। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে এবার সত্যি সত্যিই ঘাবড়ে গেল সম্রাট। ওর বার বার মনে হতে লাগল একা একা আসাটা মোটেই ঠিক হয়নি। কিন্তু এখন আর কিছুই করার নেই।
প্রায় আধ ঘণ্টার মতো চেষ্টা করার পর সম্রাট সক্ষম হয় পাখিটার পিঠে চড়তে। সম্রাট পাখিটার পিঠে চড়ে বসলে আদিম মানুষ গুলো মুখের ভেতর আঙুল ঢুকিয়ে উচ্চস্বরে, ‘কুল কুল কুল কুল’ ‘কুল কুল কুল কুল’ধ্বনিতে জঙ্গলটাকে মাতিয়ে তোলে। ওদের ‘কুল কুল কুল কুল’ শব্দের প্রতিধ্বনিটা সারা জঙ্গলে ছুটে বেড়ায়। এরপর সম্রাটের সামনে ড্রাইভারের ভঙ্গিতে চড়ে বসেন দলপতি। আর কোনও রকম সময় নষ্ট না করে পাখিটার উদ্দেশ্যে দলপতি আরেকটা অদ্ভুত শব্দ বার করেন মুখ থেকে, ‘উচিয়াআআ… চিয়াকুউউউউউ।’ পাখিটা এবার এক পা এক পা করে চলতে শুরুকরে টিলাটার শেষ প্রান্তের দিকে। তারপর ঝপাৎ করেই ঝাঁপিয়ে পড়ে টিলাটা থেকে। মুহূর্তের জন্য ভয়ে কেঁপে উঠে সম্রাটের বুকটা। এবার ধীরে ধীরে ডানা মেলে পাখিটা উঠতে থাকে আকাশের দিকে। সম্রাটরা রওনা হয় কোনও এক অজানা রহস্যের সন্ধানে।


কখনো মেঘের রাজ্য দিয়ে কখনো আবার বেশ নীচ দিয়েই দ্বীপটার পশ্চিম দিকে উড়ে চলল পাখিটা। প্রথমটায় সম্রাটের যতটা ভয় ভয় করছিল এখন আর ততটা ভয় করছে না ওর। এখন বরং ভেতরে ভেতরে একটা উত্তেজনা কাজ করছে। পায়ের নীচে দিক চিহ্নহীন নীলাভ সবুজ সমুদ্র। কোথাও কোথাও আবার সমুদ্রের বুকে সবুজ শ্যাওলার রাজত্ব। উপর থেকে শ্যাওলা গুলোকে দেখে চিরসবুজ খেলার মাঠের মতো মনে হচ্ছে। দলপতি হাত বাড়িয়ে দেখিয়ে দিলেন তিনি ঠিক কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন সম্রাটকে। সম্রাট দূরের দিকে তাকিয়ে দেখল ও চলেছে আবার সেই পশ্চিমের টিলা গুলোর দিকেই। কিন্তু পাখিটা এমন ঘুর পথে সমুদ্রের উপর দিয়ে কেন চলেছে সেটা সম্রাটের মাথায় ঢুকল না। আকাশ থেকে কখনো পায়ের নীচের রূপ দেখতে দেখতে কখনো বা দূরের টিলা আর পাহাড় গুলোকে দেখতে দেখতে চলল ওরা। মাঝে মাঝেই পাখিটার শরীর থরথর করে কেঁপে উঠছে। তখনই একটু যা ভয় ভয় করছে সম্রাটের।


কয়েক মিনিটের ভেতর সম্রাটদের পায়ের তলায় দেখা যেতে লাগল প্রাচীন সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ। দলপতি শিস দিয়ে কিছু একটা বলতেই পাখিটা চক্রাকারে পাক খেতে লাগল টিলা গুলোর উপর। সম্রাটের মনে হল দলপতি কিছু একটা খুঁজছেন টিলা গুলোর ভেতর। কত ছোট বড় টিলা, ভাঙা পাথরের দেওয়াল আকাশের দিকে মুখ করে তাকিয়ে আছে। আকাশের বুকে ভাসতে ভাসতেই সম্রাটের চোখে পড়ল সেদিনের সেই ভয়ঙ্কর গুহা মুখটা। কিন্তু একটা কথা সম্রাটের মাথায় কিছুতেই ঢুকল না, দলপতি সম্রাটকে এখানে কেন নিয়ে এলেন ?
দলপতির নির্দেশ মতো পাখিটা এবার আকাশের বুকে কয়েকটা পাক খেয়ে বিদ্যুৎ গতিতে নীচের দিকে নামতে শুরু করল। গুহা মুখটার থেকে খানিকটা দূরে একটা বড় মাপের পাথরের উপর এসে নামল পাখিটা। দলপতি সম্রাটকে নামিয়ে দিয়ে নিজেও নামলেন। পাখিটা কেমন ভাবে যেন সম্রাটকে চেয়ে চেয়ে দেখছে।


পাথরটার থেকে নেমে দলপতির সঙ্গে চলতে লাগল সম্রাট। দলপতি হাসি হাসি মুখে ডান হাতটাকে চক্রাকারে ঘুরিয়ে সম্রাটের দিকে আঙুল বাড়ালেন। সম্রাট বুঝতে পারল দলপতি বলতে চাইছেন,- তোমাদের মতো সভ্য মানুষরাই এই সব বানিয়েছিল একদিন। বেশ কিছুক্ষণ এদিক সেদিক ঘুরে বেড়ানোর পর একটা পাথরের গায়ে খোদায় করা করমর্দনের চিহ্ন দেখতে পেয়ে দাঁড়ালেন দলপতি। খুশিতে জড়িয়ে ধরলেন সম্রাটকে। দলপতির শরীরের উগ্র বন্য গন্ধটা সম্রাটের নাকে ধাক্কা মারল ভীষণ রকম ভাবে। সম্রাট কিছুই বুঝতে না পেরেও সব বোঝার ভান করে একটা বিজ্ঞের হাসি হাসে। হাসলেন দলপতিও।


দলপতি সম্রাটকে সঙ্গে নিয়ে এবার এগিয়ে গেলেন করমর্দন চিহ্ন আঁকা পাথরটার কাছে। পাথরটার কাছে গিয়ে দলপতি সম্রাটকে একটা অদ্ভুত জিনিশ দেখালেন। দলপতি প্রথমে নিজের ডান হাতটা রাখলেন করমর্দন চিহ্নটার উপর, তাতে কিছুই হল না। এরপর দলপতি নিজের দুটো হাতেই রাখলেন চিহ্নটার উপর, তাতেও কিছুই হল না। একই রকম ভাবে সম্রাটও নিজের ডান হাত এবং পরে দুটো হাতই রাখল চিহ্নটার উপর, তাতেও কিছুই হল না। এরপর দলপতি সম্রাটকে ইশারায় বললেন ওর ডান হাতটা করমর্দন চিহ্নের একটা হাতের উপর রাখতে। সম্রাট নিজের ডান হাতটা রাখলে দলপতি নিজেও নিজের হাতটা রাখলেন করমর্দন চিহ্নের আরেকটা হাতের উপর। সঙ্গে সঙ্গে হুড়মুড় শব্দে সরে গেল পাথরের হাত দুটো। আর হাত দুটো সরে যেতেই সম্রাটের চোখে পড়ল একটা সুড়ঙ্গ। উপরে দাঁড়িয়ে সম্রাটের মনে হল যেন হাজার হাজার সিঁড়ি বেয়ে সুড়ঙ্গটা পাতালের দিকে চলে গেছে।


দলপতির সঙ্গে সম্রাট এবার নামতে শুরু করল সুড়ঙ্গের আলো অন্ধকার সিঁড়ি বেয়ে। যে বা যারাই এই সুড়ঙ্গ পথ বানাক তাদের পরিশ্রমকে সম্মান জানাল সম্রাট। সুড়ঙ্গ পথের মাঝে মাঝেই সূক্ষ্ম ছিদ্র আছে যা দিয়ে ক্ষীণ ভাবে আলো এসে ঢুকছে অন্ধকার রাজ্যে। আর সেই জন্যই সুড়ঙ্গ পথটাকে আবছা হলেও দেখা যাচ্ছে। আরেকটা জিনিশ অবাক করল সম্রাটকে, এমন একটা সুড়ঙ্গের ভেতরে কোনও রকম উৎকট গন্ধ নেই। সম্রাটের আগে আগে দলপতি চলেছেন আর উনার শরীর বেয়েই একটা বন্য গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে সুড়ঙ্গের ভেতর।
সুড়ঙ্গের সিঁড়ি যেন আর শেষ হতে চায় না। সম্রাটের কেবল মনে হতে থাকে সিঁড়ি বেয়ে এই নামা যেন কোনও দিনেই শেষ হবে না ওদের। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ছোট্ট একটা ঘরের কাছে এসে সিঁড়ি গুলো মিলিয়ে গেল। সম্রাট ভাল করে চেয়ে দেখল আর কোনও সিঁড়ি নেই। আলো অন্ধকার ঘরটার ভেতর শুধু একটা বৌদ্ধ মূর্তি রাখা আছে। তাহলে দলপতি সম্রাটকে এখানে নিয়ে এলেন কেন ? প্রশ্নটার উত্তর পেতে সম্রাটের বেশি সময় লাগল না। দলপতি মূর্তিটার নীচে রাখা পাথরের একটা চাকাকে কয়েক পাক ঘোরাতেই মূর্তিটা নিজের জায়গা থেকে সরে গেল। মূর্তিটা সরে যাওয়ার কয়েক মুহূর্ত পরেই যেখানটায় মূর্তিটা রাখা ছিল ঠিক সেখান থেকে বেরিয়ে এল প্রায় এক ফুটের একটা শিবলিঙ্গ। আবছা আলোতেও সম্রাট দেখতে পায় শিবলিঙ্গটা জ্বলজ্বল করছে। দলপতি শিবলিঙ্গটাকে তুলে এনে সম্রাটের হাতে ধরিয়ে দিলেন। তারপর আবার ওই চাকাটাকে ঘুরিয়ে বৌদ্ধ মূর্তিটাকে বসিয়ে দিলেন নিজের জায়গায়।


এরপর দলপতি সম্রাটকে সঙ্গে নিয়ে সুড়ঙ্গের ভেতর থেকে বাইরে বেরিয়ে এলেন। করমর্দন চিহ্ন যুক্ত দরজাটা এবার নিজে নিজেই বন্ধ হয়ে গেল। সুড়ঙ্গের ভেতর থেকে বাইরে বেরিয়ে দলপতি সম্রাটকে নিয়ে এলেন সেদিনের সেই গুহা মুখটার সামনে। যদিও আজকে আর সম্রাটকে গুহার ভেতরে ঢুকতে হল না। দলপতি নিজেই গুহার ভেতরে ঢুকলেন। ফিরে এলেন মিনিট চল্লিশ পর হাতে একটা ডাইরি নিয়ে। ডাইরিটাও দলপতি সম্রাটের হাতেই তুলে দিলেন।


ডাইরি আর শিবলিঙ্গটা নিয়ে সম্রাট যখন জাহাজে ফিরল তখন দুপুর গড়িয়ে এসেছে। লি দিবানিদ্রায় মগ্ন। সম্রাটের ইচ্ছে করল না অসুস্থ লিয়ের ঘুম ভাঙাতে। পরে যখন লিয়ের ঘুম ভাঙল তখন উনি নিজেই সম্রাটের কাছ থেকে শিবলিঙ্গটা নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ পরীক্ষা করে দেখে বললেন, ‘প্লাটিনামের মূর্তি এটা। মূর্তিটা কখনো নষ্ট করো না এটা তোমার বাড়িতেই রাখবে। এটা নিছক একটা মূর্তি নয় এটা একটা বিশ্বাস।’


সম্রাট লিকে কথা দিল সে শত দারিদ্র অবস্থাতেও মূর্তিটা নষ্ট করবে না। মূর্তিটা কেবিন ঘরে রেখে এসে ডাইরিটা লিয়ের হাতে তুলে দিয়ে সম্রাট এবার বলল, ‘সমগ্র ডাইরির পাতা জুড়ে শুধু সাংকেতিক চিহ্ন আর বিভিন্ন রকম ছবি। এই ডাইরিটা আমার বোঝার বাইরে আপনি দেখুন যদি কিছু সমাধান করতে পারেন।’
লি ডাইরিটাকে উল্টে পাল্টে বেশ কয়েকবার ভাল করে দেখার পর বললেন, ‘এগুলো কোনও সাংকেতিক চিহ্ন নয় এগুলো চাইনিজ অক্ষর। আমার পক্ষেও এর পাঠোদ্ধার সম্ভব নয়। তবে ডাইরিটা লেখা হয়েছে ১৮৯২ সাল নাগাদ। ডাইরিটা যিনি লিখেছেন তিনি কেবল মাত্র এক বারের জন্যই সাল সমেত নিজের নাম ইংরেজিতে সই করেছেন। ভদ্রলোকের নাম ক্যাপ্টেন চুয়ান ম্যেইনলেন্ড। এবার এই ছবিটা দেখো।’ কথাটা বলেই লি সম্রাটের দিকে ডাইরিটা বাড়িয়ে দিলেন।


সম্রাট দেখে একজন চাইনিজ মানুষের পাশে হাসি মুখে দাঁড়িয়ে আছেন বারমুডার একজন বয়স্ক আদিম মানুষ। খুব সম্ভবত সেই সময়কার দলপতি। লি সম্রাটকে এবার জিজ্ঞেস করেন, ‘ছবিটা দেখে কিছু বুঝতে পারলে ?’
সম্রাট বেশ কিছুক্ষণ ছবিটাকে ভালভাবে পর্যবেক্ষণ করে বলে, ‘ছবিটা দেখে মনে হচ্ছে সেই সময় এখানকার আদিম মানুষদের সঙ্গে সভ্য মানুষদের একটা বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল।’
‘আমি সেটা বলছি না ছবিটা খুঁটিয়ে দেখো।’
‘হাঁ আদিম মানুষটার পিছনে একটা বিশাল মাপের শিবলিঙ্গ এবং শিবলিঙ্গটার মাঝে একটা ছোট মাপের শিবলিঙ্গ আঁকা।’

bengali detective story Bengali Ghost story Bengali story


লি এবার একটু গম্ভীর ভাবে বললেন, ‘ইয়েস এবার ঠিক ধরেছ। তবে বড় মাপের শিবলিঙ্গটার গায়ে ওটা ছোট মাপের শিবলিঙ্গ আঁকা নয়। ওটা একটা শূন্যস্থান। তোমার আনা শিবলিঙ্গটা দিয়েই মনে হয় ওটা পূরণ করা যাবে। এবার পরের ছবিটা দেখো।’


সম্রাট পরের ছবিতে লক্ষ্য করে একজন চাইনিজ মানুষ একটা ছোট মাপের শিবলিঙ্গ বড় শিবলিঙ্গটার কাছে নিয়ে যাচ্ছেন। তার পরের ছবিতে শুধুমাত্র একটা ত্রিশূল আঁকা আছে। তার পরের ছবিতে একটা ভীষণাকৃতির পাখির পিঠে ত্রিশূল হাতে একজন মানুষ। পাখিটাকে দেখেই চিনতে পারে সম্রাট। এই ছবির পাখিটাই যে আজকের সকালের পাখিটা সে ব্যাপারে সম্রাট নিশ্চিত। এই ছবিটা দেখেই সম্রাটের মনে পড়ে যে আজকের সেই ভীষণাকৃতির পাখিটার কথা লিকে বলা হয়নি।


পাখিটার ছবি লিকে দেখিয়ে আজকের যাবতীয় ঘটনা গুলো একটা একটা করে সম্রাট লিকে শোনায়। লি কয়েক মিনিট ধরে কিছু একটা চিন্তা করেন। তারপর একটা চুরুট ধরিয়ে সম্রাটের কাঁধে হাত রেখে বলেন, ‘মিঃ ইয়াং ম্যান আমি গর্বিত যে আমি তোমার বন্ধু। তুমি কী জানো এটা কোনও পাখি নয় ?’


সম্রাট হাঁ-না কিছুই বলতে পারে না। লি সম্রাটের কাঁধে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে বলেন, ‘মাই ডিয়ার ফ্রেন্ড এটা কোনও পাখি নয়। এটা হিম যুগের গোল্ডেন আই ড্রাগন। অদ্ভুত ক্ষমতা এই ড্রাগনের। এ ইচ্ছে করলে মুখ দিয়ে আগুন যেমন বের করতে পারে ঠিক তেমন ভাবেই এই ড্রাগন মুখ দিয়ে বরফ বের করতেও সক্ষম। তবে যতদিন না এরা নিজের রাইডার খুঁজে পায় ততদিন এরা আগুন বা বরফ কিছুই বের করতে পারে না। নিজের উপযুক্ত রাইডার খোঁজার জন্য এরা হাজার বছরেরও বেশি সময় অপেক্ষা করে জন্ম নিতে। এই গোল্ডেন আই ড্রাগন ওর রাইডার হিসেবে তোমাকে বেছে নিয়েছে। তুমি মনে মনে ডাকলেও এ ঠিক তোমার কাছে আসবে।’
‘ধুর আপনার না যত আজগুবি গল্প। এত আদিম মানুষ থাকতে এই ড্রাগন আমাকে কেন ওর রাইডার বানাতে যাবে! তাছাড়া আজকে ও এসেছিল দলপতির ডাকে। উড়ছিল দলপতির কথায়।’
‘ওটা নিছকই বন্ধুত্ব মাত্র। তুমি যখন ওকে ডাকবে তখন কোনও রকম চিৎকার করতে হবে না। মনে মনে ডাকলেই ও এসে ঠিক হাজির হবে। এরা এক সঙ্গে দুজনকে তখনই পিঠে নেয় যখন ওই দুজনের ভেতর একজন ওর রাইডার থাকে।’
‘কিন্তু…’
‘কোনও কিন্তু নয় বন্ধু এটাই সত্য এটাই বাস্তব। তুমি পরীক্ষা করতে চাইলে চলো ডেকের উপর।’
লিয়ের কথা শুনে সম্রাটের ভেতর একটা উত্তেজনা আর আনন্দের স্রোত যেমন বয়ে যাচ্ছে ঠিক তেমন ভাবেই একটা দুশ্চিন্তা কাজ করছে ভেতর ভেতর। ড্রাগন রাইডার হওয়া যতটা সম্মানের ঠিক ততটাই দায়িত্বের। শেষ পর্যন্ত লিয়ের সঙ্গে জাহাজের ডেকে এসে দাঁড়ায় সম্রাট। আর একটু পরেই পশ্চিম দিগন্তে টিলা দুটোর মাঝে সূর্যটা ডুবে যাবে। এখন রক্তবর্ণ ধারণ করেছে সমগ্র পশ্চিম আকাশটা। সমুদ্র সৈকতে প্রতিদিনের মতো আজকেও রঙবেরঙের পাখির দল কিচিরমিচির করছে। লি সম্রাটকে বললেন, ‘প্রথমে মনটাকে শান্ত করো তারপর দুচোখ বন্ধ করে ডাক দাও তোমার ড্রাগনকে। কিন্তু ওকে ডাকার আগে মনে রেখো এই প্রথমবারের ডাকটার গভীরতার উপর তোমাদের সম্পর্কের বুনিয়াদ অনেকটাই নির্ভর করবে।’


সম্রাট যথা সম্ভব নিজের মনটাকে শান্ত করার চেষ্টা করে। তারপর দুচোখ বন্ধ করে ড্রাগনটাকে নিজের ভেতর খুঁজতে থাকে। ড্রাগনের প্রতিমূর্তিটা সম্রাটের মনে পরিষ্কার ভাবে যখন ভেসে উঠে তখন ওকে ডাক দেয় সম্রাট। বেশ কিছুক্ষণ এভাবে কেটে যাবার পর সম্রাট চোখ খুলে তাকিয়ে দেখে পশ্চিম দিগন্তে সূর্য ডুবতে চলেছে। এছাড়া তেমন কিছুই আর চোখে পড়ে না। ড্রাগন শূন্য আকাশটা দেখে সম্রাট লিকে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল কিন্তু লি উত্তর পশ্চিম আকাশের দিকে আঙুল বাড়িয়ে সম্রাটকে চমকে দেন। আকাশের বুকে পাক খেতে খেতে বিদ্যুতের গতিতে ড্রাগনটা এগিয়ে আসছে জাহাজটার দিকেই। লি সম্রাটের পিঠ চাপড়ে বলেন, ‘একজন ড্রাগন রাইডার হিসেবে তোমার কর্তব্য ড্রাগনটার পাশে থাকা এবং ওকে রক্ষা করাও।’


ড্রাগনটা এসে জাহাজের উপর চক্কর কাটতে শুরু করল এবার। লি সম্রাটকে বললেন, ‘ওকে মনে মনে ধন্যবাদ জানিয়ে আজকে ফিরে যাবার জন্য বোলো। ওর আজকের কাজ শেষ।’ লিয়ের কথা মতো সম্রাট ড্রাগনটাকে ফেরত পাঠিয়ে দিলে লি আবার বলেন, ‘তোমার দায়িত্ব এখন অনেক বেড়ে গেল সম্রাট। আমি আজকে শুধু একজন বন্ধু হিসেবেই নয় একজন দাদার মতো করে বলছি, এই দ্বীপের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে তোমার হাতে। সেই জন্য এখন থেকে তোমার প্রতিটা পদক্ষেপ হবে এই দ্বীপের মঙ্গলের জন্যই। তোমার জায়গায় এমিল থাকলেও আমি বলতাম প্রাণের বিনিময়ে হলেও এই দ্বীপটাকে রক্ষা করতে।’


আবেগ আর উত্তেজনায় সম্রাটের চোখ দুটো ছলছল করে আসে, কোনও কথা বলতে পারে না। সমুদ্রের বুক ছুঁয়ে যে ঠাণ্ডা বাতাসটা ডেকের উপর ছুটে আসছে সেটা শুধু সম্রাটের চুল গুলোকেই নয় সম্রাটের ভাবনা গুলোকেও এলোমেলো করে দিয়ে যাচ্ছে বার বার। বারমুডার রহস্যময় মেরিন দ্বীপের আকাশে এবার একটা একটা তারার কচি মুখ বেরিয়ে আসে। সম্রাটের চোখে ভাসতে থাকে দূরের কালপুরুষটা। সমগ্র শৈশব জুড়ে খেলে আসা যুদ্ধ যুদ্ধ খেলাটা যে একদিন কোনও এক অচেনা অজানা দ্বীপে এসে এক দৈত্য-মানবের সঙ্গে সত্যি সত্যিই খেলতে হবে সেটা হয়তো দিবাস্বপ্নেও কল্পনা করেনি সম্রাট।

Bengali story


আট
রাত্রিতে খাবার খেয়েই শুয়ে পড়েছিল দুজনে। হাজার অলিক কল্পনার ভেতর হাঁটতে হাঁটতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিল সম্রাট সেটা ও নিজেও টের পায়নি। মাঝরাতে লিয়ের ধাক্কায় ঘুমটা ভেঙে গেল ওর। লি ফিসফিস করে সম্রাটকে বললেন, ‘কিছু শুনতে পাচ্ছ ?’ ঠিক এমন সময় জাহাজের বাইরে থেকে ভেসে এল শব্দটা। না ঠিক শব্দ নয়, বিশালাকৃতির কোনও পশু যেন জাহাজটার বাইরে দাঁড়িয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলছে। সম্রাট লিকে জিজ্ঞেস করে, ‘ড্রাগনটা নয় তো ?’


লি ঠোঁটে আঙুল চাপা দিয়ে ফিসফিস করে বললেন, ‘আস্তে আস্তে, এত জোরে কথা বোলো না শুনতে পাবে। ওটা আর যাইহোক ড্রাগনটা নয়। তুমি না ডাকলে ড্রাগনটা আসবে না। এখন জানালার পর্দা সরিয়ে দেখাটাও যথেষ্ট বিপদজনক।’
‘তাহলে এখন কী হবে ?’ এবার ফিসফিস করেই জিজ্ঞেস করল সম্রাট।
‘দাঁড়াও আগে রুম-স্প্রেটা দিয়ে ঘরটা ভরিয়ে দি। নতুবা পশুটা আমাদের শরীরের গন্ধ পেয়ে জানালা ভেঙে ঢুকে পড়তে পারে।’ কথাটা বলেই লি আলমারির কপাটটা সাবধানে খুলে রুম-স্প্রেটা বের করে কেবিন ঘরের চারদিকটায় ভাল করে স্প্রে করে দেন।


আরও কয়েক মিনিট এভাবেই কেটে গেল। পশুটার দীর্ঘশ্বাস এখনো দুজনেরেই কানে আসছে। সম্রাটের মনে হল পশুটা জানালার খুব কাছাকাছি ঘুরছে। সম্রাট নিজের শ্বাস প্রশ্বাস টুকুও পরিষ্কার শুনতে পাচ্ছে এখন। ঠিক এমন সময় নড়ে উঠল জাহাজটা। পশুটা প্রবল শক্তিতে ধাক্কা মেরে বালির ভেতর এঁটে থাকা জাহাজটাকেও কাঁপিয়ে দিল। এরপর বেশ কিছুক্ষণ সব শান্ত। বাইরের দীর্ঘশ্বাসের শব্দটুকুও শোনা যাচ্ছে না আর। প্রায় আধঘণ্টা চুপ করে থাকার পরেও যখন বাইরে থেকে কোনও রকম শব্দ এল না তখন খানিকটা সাহস অবলম্বন করেই লি জানালার পর্দাটা অল্প সরিয়ে বাইরেটা দেখার চেষ্টা করলেন। তেমন কিছুই চোখে পড়ল না। পালিয়ে গেছে পশুটা। তবে পশুটা পালিয়ে যাবার পরেও লি আর সম্রাট বাকি রাতটুকু গল্প করেই কাটালেন।


পরের দিন সূর্যোদয়ের পর লি আর সম্রাট জাহাজ থেকে বেরিয়ে এসে বালির চরের উপর প্রায় দেড় ফুট মাপের পায়ের চিহ্ন দেখেই যা বোঝার বুঝে যায়। লি একটা চুরুট ধরাতে ধরাতে বললেন, ‘দৈত্য-মানবটা যে ভাবেই হোক ড্রাগন যে তার রাইডারের খোঁজ পেয়েছে সেই খবর জেনে গেছে। এখানে ড্রাগনটাকে ডেকে আনতে বলা আমার উচিৎ হয়নি। শয়তানটা একবার যখন এসেছে তখন গন্ধ শুঁকে শুঁকে আবার ঠিক আসবে।’
সম্রাট কিছু একটা বলতেই যাচ্ছিল কিন্তু পশ্চিম দিক থেকে হঠাৎ রাইফেলের আওয়াজ ভেসে আসতেই চুপ করে গেল। সম্রাট আর লি দুজনেই কান খাড়া করে রইলেন পরবর্তী আওয়াজটা শোনার জন্য। দ্বিতীয়বার রাইফেলের আওয়াজটা হল আরও কয়েক মিনিট পর।


লি সম্রাটের উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বললেন, ‘আমি সিওর ওটা এমিল ছাড়া আর কেও নয়। এখানে আমাদের তিনজন ছাড়া আর কেও থাকতে পারে না। মনে হয় ও কোনও বিপদে পড়েছে। সম্রাট তুমি তোমার ড্রাগনকে এবার ডাকো। আমাদেরকে দ্রুত ঐ টিলা গুলোর কাছে পৌঁছুতে হবে।’


সম্রাটের ডাকে ড্রাগনটা এল তো ঠিক কথাই কিন্তু ড্রাগনটাকে পরিচালনা করতে গিয়ে প্রথমবার যথেষ্ট সমস্যায় পড়তে হল সম্রাটকে। প্রায় এক ঘণ্টার মতো চেষ্টা করার পর যখন ড্রাগনটা ডানা মেলল আকাশের বুকে তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। ড্রাগনের পিঠ থেকে নীচে নেমেই লি শূন্যে কয়েক রাউন্ড ফায়ার করলেন। কিন্তু প্রত্যুত্তরে আর কোনও ফায়ারের শব্দ শোনা গেল না। জনমানব শূন্য টিলা গুলোতে লিয়ের রাইফেলের শব্দটাই প্রতিধ্বনিত হল বার বার। প্রায় প্রত্যেক কটা টিলাতে গিয়েই লি, ‘এমিল, এমি-ই-ই-ল’ চিৎকার করে ডাকলেন কিন্তু কোনও উত্তর এল না।


সারাদিন খোঁজা খুঁজির পরেও যখন এমিলের কোনও সন্ধান পাওয়া গেল না তখন লি নিজেই সম্রাটকে জাহাজে ফেরার কথা বললেন। ক্লান্ত শরীরে দুজন যখন হাঁটতে হাঁটতে ড্রাগনটার দিকে এগিয়ে আসছিল ঠিক এমন সময় সম্রাট দেখতে পেল, লাল রঙের একটা পাথরের খাঁজে একটা রক্তমাখা জামা পড়ে আছে। পাথরটার গায়েও ফোটা ফোটা তাজা রক্তের চিহ্ন। জামাটা যে এমিলেরেই সেটা আর বলে দেবার অপেক্ষা রাখে না। পাথরের খাঁজ থেকে জামাটা বের করলেন লি তারপর সেটাকে বুকে জড়িয়ে দুচোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইলেন কয়েক মিনিট। লিয়ের দুচোখ বেয়ে নোনা জলের ধারা গড়িয়ে পড়তে দেখেও সম্রাট লিকে সান্ত্বনা দেবার মতো কোনও শব্দ খুঁজে পেল না। ঠিক এর পরেই সম্রাট দেখল লিয়ের মধ্যে এক অদ্ভুত পরিবর্তন। লি এমিলের জামাটাকে ডান হাতে জড়িয়ে আকাশের দিকে মুখ উঁচু করে ভয়ঙ্কর একটা গর্জন করে উঠলেন। চোট পাওয়া সিংহের গর্জনের মতো ক্রুদ্ধ শোনাল সেই গর্জন। লিয়ের গর্জন শুনে ড্রাগনটা পর্যন্ত কয়েক পা পিছিয়ে দাঁড়াল। লিয়ের চোখে এখন আর কোনও জল নেই। শিকারি চিতার মতো জ্বলজ্বল করছে চোখ দুটো।


লি আর সম্রাটকে পিঠে নিয়ে সমুদ্রের উপর দিয়ে উড়ে চলল ড্রাগনটা। সম্রাট ড্রাগনটাকে জাহাজের দিকে নিয়ে যেতে চাইছিল কিন্তু লি নিষেধ করে বললেন, ‘আমাকে একবার আদিম মানুষ গুলোর ডেরায় নিয়ে চলো।’
লিয়ের কথা মতো সম্রাট গভীর জঙ্গলের উপর দিয়ে উড়িয়ে নিয়ে চলল ড্রাগনটাকে। এত অল্প সময়ের ভেতর সম্রাট এমন ভাবে ড্রাগনটাকে পরিচালনা করতে পারবে সেটা মনে হয় লি নিজেও ভাবেননি। আকাশ পথে যেতে যেতেই সম্রাটের চোখ পড়ল সেই রাক্ষুসে লতা গুলোর উপর। ওরা সেদিনের মতো আজকেও ঝুলে আছে দানব আকৃতির গাছ গুলোর ডালে। সেদিন ওই রাক্ষুসে লতা গুলোর জন্যই মরতে বসেছিলেন লি। সম্রাটের মনে হল এই লতা গুলোকে পুড়িয়ে শেষ করে দেওয়া দরকার নতুবা এই রাক্ষুসে লতা গুলো একদিন পুরো দ্বীপটাকেই গ্রাস করবে। এমন একটা ভাবনা সম্রাটের মনের ভেতর আসতেই ঘটে গেল আরেকটা অদ্ভুত ঘটনা। মুহূর্তের ভেতর ড্রাগনটার মুখ থেকে আগুনের একটা লেলিহান বেরিয়ে গিয়ে লতা সমেত একটা বিশাল মাপের গাছকে ঝলসে দিল এক নিমেষে। লি পিছনে বসে চিৎকার করে বললেন, ‘নিজেকে সামলাও সম্রাট, এখন মাথা ঠাণ্ডা রাখার সময়। তোমার ভেতরের রাগটা ড্রাগনের মুখে আগুনের মন্ত্র এনে দিয়েছে। তবে এখনো সময় হয়নি দাবানলের। এতে অনেক নিরীহ জীবের প্রাণ যেতে পারে।’


ড্রাগনটার মুখ থেকে আগুন বেরুতে দেখে বেশ উত্তেজিত হয়ে পড়েছিল সম্রাট। এখন আকাশের বুক চিরে উড়তে উড়তে ওর শুধুই মনে হচ্ছে ও যেন এক রূপকথার রাজকুমার। পক্ষীরাজের পিঠে চড়ে চলেছে ব্যাঙ্গমা ব্যাঙ্গমীর দেশে।


আকাশ পথে যেতে যেতে হঠাৎ করে লিয়ের চোখ পড়ল একদল আদিম মানুষের উপর। পাহাড়ি ঝর্ণা নদীর কিনারায় ওরা গর্ত খুঁড়ছে। লি সম্রাটকে বললেন ড্রাগনটাকে নদীর কিনারায় নামাতে। ড্রাগনের পিঠে চড়ে লি আর সম্রাটকে এক সঙ্গে নামতে দেখে আদিম মানুষ গুলোর খুশি হওয়ার কথা কিন্তু ওদেরকে দেখে বিন্দু মাত্র খুশি বলে মনে হল না। লি ওদের দিকে এগিয়ে এসে দেখলেন ওদের প্রায় প্রত্যেকের চোখেই জল। ওরা কাঁদছে। বিষয়টা কিছুক্ষণের ভেতরেই পরিষ্কার হয়ে গেল লি আর সম্রাটের কাছে। গতকাল রাত্রিতে দৈত্য মানবটা আদিম মানুষ গুলোর ডেরায় এসে বেশ কয়েক জনকে হত্যা করেছে। তবে যত জনকে হত্যা করেছে সকলকে নিয়ে যায়নি। বেছে বেছে কয়েক জনকেই নিয়ে গেছে মাত্র। অবশিষ্টদের লাশ নিয়ে এরা এসেছে নদীর কিনারায় কবর দিতে।
কিন্তু একটা বিষয় লি বা সম্রাট কারুর কাছে পরিষ্কার হচ্ছিল না, দৈত্য-মানবটা এই নিরীহ মানুষ গুলোকে মেরে মেরে নিয়ে যাচ্ছে কেন ? ওর যদি খাবার ইচ্ছেই হয়ে থাকে তাহলে তো যেখানে খুশি খেতে পারে। তার জন্য বয়ে নিয়ে যাবার দরকার কী ?


ড্রাগনটাকে এক জায়গায় দাঁড় করিয়ে রেখে সম্রাট আর লি দুজনেই আদিম মানুষ গুলোর ডেরায় এলেন। বাইরের পাতলা জঙ্গল ছেড়ে দিয়ে ঘনান্ধকার জঙ্গলে এসে আশ্রয় নিয়েছে এরা। এদের কাছে এর বেশি কিছু করারও নেই। সবার চোখেই ভয় আর বিষাদের ছাপ। এই আদিম মানুষ গুলোর অসহায় মুখের দিকে তাকিয়ে লিয়ের চোখ দুটোও এবার ছল ছল করে এল। চোখের তারায় বার বার ভেসে উঠল এমিলের নিষ্পাপ মুখটা। এমিলের রক্তাক্ত জামাটা দিয়েই চোখের জল মুছলেন লি। হয়তো মনে মনে কিছু একটা প্রতিজ্ঞাও করলেন ছেলের মৃত্যুর প্রতিশোধ নেবার জন্য।
লি যে জন্য আদিম মানুষ গুলোর ডেরায় এলেন সেই কাজটা আর হল না। কারণ গতকাল রাত্রি থেকে দলপতিও নিখোঁজ। হয়তো দলপতিকেও…। খানিকটা হতাশ হয়েই দুজনকে জাহাজে ফিরতে হল। জাহাজে ফিরে লি ক্যাপ্টেন চুয়ান ম্যেইনলেন্ডের ডাইরিটা নিয়ে বসলেন। হাতে আর বিশেষ সময় নেই এর ভেতরেই কিছু একটা করতে হবে। এমিলের মুখটা মনে পড়লেই লিয়ের ভেতর একটা হিংসার দাবানল ছড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু কী ভাবে লি প্রতিশোধ নেবেন! উনার ওই রাইফেল বা দুনলা বন্দুক কোনটাই যে কাজে লাগবে না সেটা উনি নিজেও ভালমতোই জানেন। তাই যা করার সম্রাটকে করতে হবে। লিয়ের দায়িত্ব শুধু সম্রাটকে পরিচালনা করে যাওয়া।


ডাইরিটা ঘাঁটতে ঘাঁটতে হঠাৎ করেই লিয়ের কৌতূহল জাগে ডাইরির মলাটটার উপর। খুব সাবধান ভাবে লি ডাইরির মলাটটা খুলে ফেলেন। যা ভেবেছিলেন ঠিক তাই। পুরো মলাটের ভেতর জুড়েই একটা ছবি আঁকা আছে। ছবিতে দেখা যাচ্ছে উজ্জ্বল রক্ত বর্ণ চাঁদের একটা ভয়ঙ্কর ছবি সেই সঙ্গে সমগ্র আকাশ জুড়ে আঁকা আছে মুশল ধারায় রক্ত বৃষ্টি। বেশ কিছুক্ষণ চিন্তা ভাবনা করার পরেও লি ছবিটার মানে বুঝতে পারলেন না। শেষ পর্যন্ত লি মলাটটা নিয়ে এসে সম্রাটকে দেখান। কিন্তু ছবির মানেটা সম্রাটের কাছেও অধরা হয়েই ধরা দেয়। ছবিটা হাতে নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ এদিক সেদিক হাঁটার পর লি ভয়ার্ত কণ্ঠে সম্রাটকে বললেন, ‘কেন জানি না আমার মন বলছে আজকে ভয়ঙ্কর কিছু একটা ঘটতে চলেছে। নতুবা হঠাৎ করেই ডাইরির মলাট খুলতে ইচ্ছে হবে কেন আর ডাইরির মলাটের ভেতর এমন রক্ত বর্ণের চাঁদ সঙ্গে রক্ত বৃষ্টির ছবিই বা থাকবে কেন।’
সম্রাট লিয়ের চোখ মুখের দিকে তাকিয়ে কিছুই বলতে পারে না। শুধুমাত্র লিয়ের হাত থেকে ছবিটা নিয়ে নিখুঁত ভাবে দেখতে থাকে।
বিকেলের দিকে শুরু হয় ফোটা ফোটা বৃষ্টির সঙ্গে ঝড়ো বাতাস। লি সম্রাটকে কাছে ডেকে বলেন, ‘আজকে রাতে আমাদের জাহাজে থাকাটা উচিৎ হবে না। শয়তানটা আজকে রাতেও ঠিক হানা দেবে।’
বিস্ময়ের সঙ্গে সম্রাট জিজ্ঞেস করে, ‘তাহলে আজকে রাতে থাকব কোথায় ?’
‘সে যেখানে খুশি থাকব তবে এই জাহাজটা এখন আমাদের কাছে মোটেই নিরাপদ নয়।’
কথাটা ঠিকেই বলেছেন লি। সত্যই বদ্ধ জাহাজের ভেতর রাত কাটানোর চেয়ে খোলা আকাশের নীচে রাত কাটানোটা যথেষ্ট নিরাপদ। প্রয়োজন হলে ড্রাগনটাকে পাহারায় রাখা যাবে। সন্ধ্যার দিকে বৃষ্টি থামলে দুজনেই জাহাজের বাইরে বেরিয়ে এসে আদিম মানুষ গুলোর বর্তমান ডেরার দিকে চলতে থাকে। এখন ড্রাগনটাকে ডাকা মানেও নিজেদের অবস্থানটা দৈত্যটাকে জানিয়ে দেওয়া। তাই দুজনকে পায়ে হেঁটেই যেতে হবে গভীর জঙ্গলের ভেতর তারপর না হয় ড্রাগনটাকে ডাকা যেতেই পারে। কিছুদূর যাওয়ার পর লি সম্রাটকে বললেন, ‘সম্রাট দাঁড়াও। কিছু শুনতে পাচ্ছ ?’
সম্রাট কান খাড়া করে কিছু একটা শোনার চেষ্টা করে। দূরের আকাশে মেঘ ডাকার মতো গুড় গুড়, গুড় গুড় একটা শব্দ একটানা অনেক দূরের জঙ্গল থেকে ভেসে আসছে। সম্রাট জিজ্ঞেস করে, ‘কীসের শব্দ এটা ?’
সম্রাটের প্রশ্নের কোনও উত্তর না দিয়েই লি বলেন, ‘ড্রাগনটাকে জলদি ডেকে নাও।’
‘কেন কীসের শব্দ হচ্ছে এটা ?’ সম্রাটের গলা থেকে বেরিয়ে আসা প্রতিটা শব্দেই ভয়টা পরিষ্কার ভাবে ধরা পড়ে। মেঘ ডাকার মতো শব্দটা যেন বাড়ছে ধীরে ধীরে।
লি এবার প্রায় চিৎকার করেই বলেন, ‘দ্বীপটার একটা দিক মনে হয় সমুদ্র গ্রাস করছে…’ লিয়ের কথাটা শেষ হওয়ার আগেই দুজনের পায়ের নিচের মাটিতে যেন ঢেও খেলে যায়। সঙ্গে সঙ্গে গাছ গুলোও কেঁপে উঠে অজানা আতঙ্কে। গাছের উপর বসে থাকা পাখি গুলো চিৎকার শুরু করে দেয়।


সম্রাট ডাকার কয়েক মিনিটের ভেতরেই ড্রাগনটা এসে দাঁড়ায় একটা উঁচু পাথরে। লি আর সম্রাট আর দেরি না করে দ্রুত চড়ে বসে ড্রাগনটার পিঠের উপর। দুজনকে পিঠে নিয়ে শূন্যে উড়তে থাকে ড্রাগনটা। লি যা ভেবেছিলেন ঠিক তাই, সমুদ্র গ্রাস করছে দ্বীপের উত্তর দিকটা। ওদিক থেকে পশু পাখি গুলো মৃত্যুর ভয়ে দক্ষিণ দিকে ছুটে আসছে রুদ্ধশ্বাসে। বড় বড় পাহাড় গুলো পর্যন্ত হুড়মুড় করে তলিয়ে যাচ্ছে সমুদ্রের জঠরে। মাঝে মাঝেই পায়ের তলার জঙ্গলটায় তরঙ্গ খেলে যাচ্ছে, সঙ্গে গুড় গুড় শব্দ।


আকাশের বুকে চক্কর দিতে দিতেই লি সম্রাটকে আদিম মানুষ গুলোর ডেরায় নামার কথা বলেন। যদিও অন্ধকারে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না তবুও সম্রাট আন্দাজ মতোই ড্রাগনটাকে নিচে নামিয়ে নিয়ে আসে। কিন্তু অনেকক্ষণ খোঁজা খুঁজি করার পরেও একটা আদিম মানুষও দুজনের কারুরেই চোখে পড়ে না। ওরা হয়তো বিপর্যয়ের পূর্বাভাষ পেয়েই নিরাপদ কোথাও কেটে পড়েছে। সমগ্র দ্বীপটা জুড়েই এবার শুরু হয়েছে ভয়ঙ্কর তাণ্ডব। সারা আকাশ জুড়ে চলছে পাখিদের চিৎকার। মনে হচ্ছে পায়ের তলা থেকে দ্বীপটা কয়েক মিনিটের ভেতরেই তলিয়ে যাবে। কেও কোনোদিন জানতেও পারবে না বারমুডার এই দ্বীপের ইতিহাস।

বাংলা আদি রসের গল্প পড়ুন


সর্বগ্রাসী সমুদ্র দেবতার প্রলয় তাণ্ডব কিছুটা শান্ত হলে সম্রাটের চোখ পড়ল পশ্চিম দিকের টিলা গুলোর উপর। পশ্চিম দিকের একটা পুরো টিলা জুড়ে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। আর সেই আগুনটা ছড়িয়ে পড়ছে সমুদ্র বক্ষে ভাসমান শ্যাওলা গুলোয়। সম্রাট বা লি কারুরেই কিছু বোধগম্য হল না ব্যাপারটা। হঠাৎ করেই সব কেমন যেন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। সম্রাট লিকে কিছু একটা জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিল কিন্তু সেটা আর হল না আরেকটা অদ্ভুত দৃশ্য চোখে পড়ায়। বৃহৎ আকারের কোনও ড্রাগন কিংবা ওই ধরনেরেই কোনও একটা প্রাণী আকাশের বুকে উড়তে উড়তে আগুন ঢালছে এক একটা টিলার উপর।


লি প্রচণ্ড উত্তেজনার সঙ্গে সম্রাটকে বললেন, ‘শীঘ্র জাহাজে চলো নতুবা সব শেষ হয়ে যাবে।’
কী শেষ হবে কেনই বা শেষ হবে সে সব জিজ্ঞেস করার মতো সময় এখন সম্রাটের হাতে নেই। লিয়ের কণ্ঠে আদেশের সুরটা পরিষ্কার। তাই যতটা দ্রুত সম্ভব জাহাজে ফিরতে না পারলে বড় রকমের সমস্যায় পড়তে হতে পারে।
নয়
উড়ন্ত ড্রাগনের পিঠ থেকে লাফিয়ে সম্রাট আর লিকে জাহাজের ডেকে নামতে হল। হাজার হাজার বছরের রহস্যময় ইতিহাস বয়ে চলা প্রাচীন দ্বীপটার মাথায় আজকে রূপার থালার মতো চাঁদ উঠেছে। তার আলো এসে পড়ছে জাহাজটার উপরে। ডেকে নেমেই লি সম্রাটকে বললেন, ‘আমি তখন বলছিলাম না আজকে ভয়ঙ্কর কিছু একটা ঘটতে চলেছে। এবার চাঁদটার দিকে তাকাও।’


চাঁদটার দিকে তাকিয়ে প্রথমটায় সম্রাটের চোখে কিছু ধরা না পড়লেও খানিক বাদেই সম্রাট দেখল চাঁদের গা থেকে বেরিয়ে এসে যে আলোটা সমুদ্রের জলের উপর পড়ছে সেটা লাল!
লি সম্রাটের কাঁধে হাত রেখে বললেন, ‘কেন জানি না আজকে হঠাৎ করেই ডাইরির মলাটটা খুলতে প্রবল ইচ্ছে হয়েছিল…। চলো আর দেরি না করে ওই ডাইরি আর শিবলিঙ্গটা নিয়ে আসি এবার। নতুবা শয়তানটা সব টিলা গুলোকে পুড়িয়ে শেষ করে দেবে তখন আর কিছুই করার থাকবে না।’


সম্রাট বা লি কেউই বেশি কথা না বাড়িয়ে ডেকের দরজা খুলে ভেতরে ঢোকে। দরজাটা খুলতে বিশেষ সমস্যা হল না লিয়ের কয়েকটা জোরালো লাথির আঘাতে খুলে গেল দরজাটা। ম্যেইনলেন্ডের ডাইরি আর প্রাচীন শিবলিঙ্গটা নিয়ে টর্চ হাতে যখন দুজনে ডেকের উপর এসে দাঁড়াল তখন চাঁদের গায়ে একটা লালচে আভা পরিষ্কার মতো ফুটে উঠেছে। সম্রাট চাঁদটার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে, ‘হে চন্দ্র দেবতা যেন সাফল্যের মন্ত্রটুকু ভুলে না যাই।’


কয়েক মিনিটের মধ্যেই ঘনান্ধকার কালো মেঘের আড়ালে চাঁদটা অদৃশ্য হতেই সমগ্র দ্বীপ জুড়ে একটা ঘুটঘুটে অন্ধকার জেগে উঠল। পশ্চিম দিকের জ্বলন্ত কয়েকটা টিলা আর সমুদ্র বক্ষে ভাসমান শ্যাওলা গুলোর উপর ছড়িয়ে পড়া আগুনটুকু ছাড়া তেমন কিছুই চোখে পড়ছে না এখন। এমন কি মাথার উপর চক্রাকারে ঘুরতে থাকা ড্রাগনটাকেও আর দেখা যাচ্ছে না। লি ভাবছিলেন আরও কিছুক্ষণ ডেকের উপর দাঁড়িয়েই চন্দ্রালোকের জন্য অপেক্ষা করবেন কিন্তু সেটা আর সম্ভব হল না। অন্ধকার আকাশের বুক থেকে একটা আগুনের ডেলা ছুটে এল এবার জাহাজটাকে লক্ষ্য করে। আর সেটার আঘাতে জাহাজের ডেকের কিছুটা অংশ এমন ভাবেই ভেঙে পড়ল যে লি আর সম্রাট দুজনেই হুমড়ি খেয়ে পড়ল বালির উপর। হঠাৎ করে এমন কিছু একটা যে ঘটতে পারে সেই ধারনা মনে হয় সম্রাট বা লি কারুরেই ছিল না। যদিও ডেকের উপর থেকে বালিতে পড়ার জন্য কারুরেই তেমন চোট লাগল না কিন্তু শিবলিঙ্গটাকে বাঁচাতে গিয়ে সম্রাটের হাত থেকে ম্যেইনলেন্ডের ডাইরি আর টর্চটা ছিটকে গেল। কিছুক্ষণ এদিক সেদিক হাতড়ে দেখার পর টর্চটা পাওয়া গেলেও টর্চের আলো ফেলে ডাইরিটা খোঁজার মতো সময় হল না।


এবার শুরু হল প্রাণপণ ছুট। ছুটে ছুটে জীবন রক্ষা করা ছাড়া দুজনের কাছে এখন আর কোনও রাস্তা খোলা নেই। ড্রাগনটাকে ডেকে ওর পিঠে চড়ার আগেই হয়তো কয়েকটা আগুনের গোলা ছুটে এসে ড্রাগন সমেত লি আর সম্রাটকে ভস্মীভূত করে দেবে। লি আর সম্রাট যেদিন লক্ষ্য করে ছুটছে সেদিক লক্ষ্য করেই এবার ছুটে আসছে আগুনের গোলা গুলো। এক একটার সাইজ এতটাই বড় মাপের যে কেঁপে কেঁপে উঠছে পায়ের তলার বালি-মাটিটা সেই সঙ্গে আগুনের হলকা ছড়িয়ে পড়ছে ঘাস জমির উপর। তবে এখনো পর্যন্ত সম্রাট বা লি কেউই দেখতে পায়নি ঠিক কোথা থেকে বা কোন প্রাণীর জঠর থেকে ভেসে আসছে আগুনের গোলা গুলো।


শেষ পর্যন্ত দুজনে যখন একটা বৃহদাকার গাছের আড়ালে আশ্রয় নিলো তখন সম্রাটের চোখে পড়ল প্রাণীটা। না প্রাণী বললে হয়তো ভুল বলা হবে। আবছা অন্ধকারেও সম্রাট দেখতে পায় কালো ধোঁয়া দিয়ে তৈরি ড্রাগন আকৃতির একটা মেঘ বা মেঘের মতোই কিছু একটা অদ্ভুত জিনিসের মুখ থেকে ছুটে আসছে আগুনের গোলা গুলো। গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে লি সম্রাটকে বলেন, ‘ওটা কোনও প্রাণী নয় ওটা মায়া। দৈত্য মানবটার শক্তি বাড়ছে এবার…’ কথা গুলো বলতে বলতে খক খক করে কাশতে থাকেন লি। একটু পরে নিজেকে সামলে নিয়ে তিনি আবার বলেন, ‘সেদিন রাত্রিতে শয়তানটা যখন জাহাজের কাছে আমাদের খোঁজে এসেছিল সেদিন ওর এমন শক্তি ছিল না নতুবা সেদিনেই ও জাহাজ সমেত আমাদেরকে পুড়িয়ে মারত। মাই ডিয়ার ইয়াং ম্যান তোমার হাতে বিশেষ সময় নেই আর তাই যা করার তোমাকে আজকে রাতেই করতে হবে।’
সম্রাট এতক্ষণ খেয়াল করেনি যে লিয়ের ডান হাতের কিছুটা অংশ আর পুরো পিঠটা আগুনে ঝলসে গেছে। লিয়ের এখন নিশ্বাস নিতেও যথেষ্ট কষ্ট হচ্ছে। ডান হাতের দগ্ধ কনুই বেয়ে গড়িয়ে নামছে রক্তের ধারা। পিঠের অবস্থাটা আরও খারাপ। লিকে এমন ভাবে দেখে যথেষ্ট ঘাবড়ে যায় সম্রাট। এই অচেনা অজানা ভয়ঙ্কর রাক্ষুসে দ্বীপে সম্রাট একা পড়ে যাবে না তো ?
লি এমন অসহ্য যন্ত্রণার ভেতরেও হাসার চেষ্টা করে বলেন, ‘সময় নষ্ট করো না মাই ডিয়ার…’ আবার কাশতে থাকেন লি, ‘আমার কিচ্ছু হবে না। আমাকে যে আমার পুত্রের হত্যাকারীর মৃত্যু দেখে যেতে হবে। গো মাই ডিয়ার গো…’ এবার লিয়ের মুখ দিয়ে খানিকটা রক্ত উঠে আসে। আর কোনও কথা বলতে পারেন না লি হাতের ইশারায় শুধু বুঝিয়ে দেন ওই বড় শিবলিঙ্গটার অসম্পূর্ণ অংশে ছোট শিবলিঙ্গটাকে লাগিয়ে দিয়ে হবে।


লিকে এমন অবস্থায় ছেড়ে যাওয়াটা সম্রাটের পক্ষে যথেষ্ট কষ্টের কিন্তু সম্রাটের এখন করার কিছুই নেই। লিকে নিয়ে এখন জাহাজে ফেরার চেষ্টা করা মানেও দুজনের মৃত্যুকেই ডেকে আনা। আবার এই গাছের আড়ালে পড়ে থেকে লি কতক্ষণ মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়াই করতে পারবে সেটাও বুঝে উঠতে পারছে না সম্রাট। ঠিক এমন সময় শুরু হল আবার ফোটা ফোটা বৃষ্টি। আর বৃষ্টি শুরু হতে না হতেই মুহূর্তের ভেতর বন্ধ হয়ে গেল আগুনের গোলা বর্ষণ। দ্বীপটা যেন কেঁপে কেঁপে উঠছে এবার। আবার শুরু হয়েছে সেই গুড় গুড় শব্দটা। লিয়ের চোখে মুখে কয়েক ফোটা বৃষ্টি পড়তে উনি খানিকটা সুস্থ বোধ করেন। ক্রমশ আগুন বর্ষণে জঙ্গলের যে যে জায়গায় দাবানল শুরু হয়েছিল সেটাও বৃষ্টি শুরু হতেই নিভতে শুরু করল। এভাবে কয়েক মিনিট নিস্তরঙ্গ ভাবে কাটার পর সম্রাট শুনতে পেল অদ্ভুত এক নারী কণ্ঠ। সে যেন ফিস ফিস করে বলছে, ‘রাইডার, রাইডার, তুমি আমাকে শুনতে পাচ্ছ রাইডার ?’
সম্রাট চারদিকটা ভাল করে দেখার চেষ্টা করে কিন্তু অন্ধকারে কিছুই চোখে পড়ে না। আবার সম্রাটের পরিষ্কার শুনতে পায়, ‘রাইডার, রাইডার, তুমি আমাকে শুনতে পাচ্ছ না রাইডার? পাচ্ছ না শুনতে? আমি বলছি রাইডার আমি। নিজেকে শান্ত করো।’


সম্রাট এবার বেশ উত্তেজিত হয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করে, ‘কে…কে তুমি সামনে আসছ না কেন ?’
উত্তর আসে, ‘আমি ম্যেলিয়া। আমি তো সব সময় তোমার সঙ্গেই আছি।’
‘ম্যেলিয়া ? আমি তো এই নামের কাউকেই চিনি না। প্লিজ সামনে এসো।’
সম্রাট ডাকার সঙ্গে সঙ্গেই সম্রাটের সামনে এসে দাঁড়ায় ড্রাগনটা। সম্রাটের যেন নিজের কান দুটোকে কিছুতেই বিশ্বাস হয় না। সম্রাট কল্পনাতেও ভাবেনি ও সত্যিই কোনোদিন ড্রাগনটার মনের ভাষা শুনতে পাবে। প্রবল উত্তেজনার সঙ্গে সম্রাট ম্যেলিয়াকে কিছু একটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিল কিন্তু ম্যেলিয়া বাঁধা দিয়ে বলে, ‘তোমার হাতে বেশি সময় নেই রাইডার। প্রলয় আসার আগেই পশ্চিমে যেতে হবে। রক্ত বৃষ্টি শুরু হয়েছে।’
‘রক্ত বৃষ্টি ?’
সম্রাটের প্রশ্নটা শোনার পরেই ড্রাগনটা আকাশের দিকে মুখ করে খানিকটা আগুন ছুড়ে দেয়। আগুনের আলোতে সম্রাট পরিষ্কার দেখতে পায় সমগ্র আকাশ জুড়ে রক্ত বৃষ্টি হচ্ছে। এখন আর দেরি করার সময় নেই। সম্রাট গাছটার গোঁড়ায়-ডালে টর্চের আলো ফেলে ভাল করে একবার দেখে নেয় কোথাও সন্দেহ জনক কিছু আছে কি না। এই দ্বীপের কোনও কিছুই বিশ্বাস যোগ্য নয় এই মুহূর্তে। গাছের তলা থেকে মগডাল গুলো পর্যন্ত ভালভাবে দেখার পর সম্রাট লিকে টেনে এক্কেবারে গাছের গোঁড়াটার উপরে বসিয়ে দেয় যাতে করে ওই দৈত্য মানবটা বা ওর পাঠানো ধোঁয়াশা ড্রাগনটা লিকে খুঁজে বের করতে না পারে।

Blood rain


এবার শিবলিঙ্গটাকে শক্ত করে পিঠের সঙ্গে বেঁধে রক্ত বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতেই সম্রাটকে বেরিয়ে পড়তে হয় ম্যেলিয়ার সাথে। এখন সমগ্র দ্বীপের আকাশ জুড়ে ঝরঝর করে ঝরছে রক্তের ধারা। ম্যেলিয়ার সঙ্গে কথা বলতে বলতেই সম্রাট এসে পৌঁছায় পশ্চিমের টিলা গুলোর উপর। কিন্তু কোথায় সেই প্লাটিনামের শিবলিঙ্গ আছে সেটা সম্রাট বা ম্যেলিয়া কারুরেই জানা নেই। ম্যেলিয়ার কথা মতো এই রক্ত বৃষ্টি থামার আগেই দৈত্য-মানবটাকে মেরে ফেলতে হবে নতুবা আবার হাজার বছরের অপেক্ষা এই দিনটার জন্য। তখন হয়তো দৈত্য-মানবটার অত্যাচারে এই দ্বীপে আর কোনও প্রাণীর অস্তিত্ব থাকবে না। এমনকি দিনকে দিন দৈত্য-মানবটা এতটাই শক্তিশালী হয়ে উঠবে যে সভ্য মানব সভ্যতার উপরেও তার প্রভাব অনিবার্য হবে।


একে ঘনান্ধকার রাত্রি তার উপর আবার মুশল ধারায় চলছে রক্ত বৃষ্টি। এমন অবস্থায় কেবল মাত্র একটা টর্চের ভরসায় এত এত টিলার ভিড় থেকে শিবলিঙ্গ আকৃতির কোনও গম্বুজকে খোঁজা মুখের কথা নয়। প্রায় এক ঘণ্টার উপর খোঁজ করার পরেও না কোনও শিবলিঙ্গ না কোনও দৈত্য-মানবের দেখা পাওয়া গেল। সম্রাটের সঙ্গে সঙ্গে ম্যেলিয়াও ক্লান্ত হয়ে পড়েছে এবার। রক্ত বৃষ্টিও কমে আসছে ধীরে ধীরে। ক্লান্ত শরীরেই আরও কয়েকটা টিলায় ঘুরে দেখল সম্রাট কিন্তু এবারেও কোথাও কিছুই পেলো না।


এক বুক নিরাশা নিয়েই রক্তে ভেজা মাটির উপরেই বসে পড়েছিল সম্রাট ঠিক এমন সময় শুনতে পেল কুল-কুল; কুল-কুল শব্দ করে টিলা বেয়ে গড়িয়ে পড়া রক্তের ধারাটা কোথায় যেন ঢুকছে। প্রবল বৃষ্টিতে বড় মাপের গর্তের ভেতর জল ঢুকলে যেমন শব্দ হয় ঠিক তেমন শব্দটাই আসছে একটা টিলার নীচ থেকে। আর বিন্দু মাত্র কালাতিপাত না করে শব্দটার অনুস্মরণ করতে করতে সম্রাট ছুটে নামে টিলাটার উপর থেকে। নীচে নেমে দেখে যা ভেবেছিল ঠিক তাই, রক্তের একটা ধারা হুড়-হুড় করে গিয়ে ঢুকছে একটা গুহামুখ গর্তে। আর গুহামুখটার ভেতর থেকে ভেসে আসছে পচা মাংসের তীব্র গন্ধ। মুহূর্তের ভেতর সম্রাট মনে মনে ঠিক করে নেয় ও এই বিশালাকার গর্তটার ভেতর ঢুকে দেখবে।


অন্ধকার গুহামুখটার ভেতরে ঢুকে সম্রাট টর্চের আলো ফেলে দেখে রক্তের স্রোতটা গড়িয়ে যাচ্ছে গুহাটার ভেতরের দিকে। পায়ে পায়ে এগিয়ে আসে সম্রাট। পচা মাংসের গন্ধটা বার বার নাকে ঝাপটা মারতে থাকে। আরও কিছুটা এগিয়ে আসার পরেই সম্রাট লক্ষ্য করে রক্তের স্রোতটাকে গুহার ভেতরকার দেওয়াল দুটো আশ্চর্য রকম ভাবে শোষণ করে নিচ্ছে। ঠিক যেখানটায় রক্তের স্রোত অদৃশ্য হয়েছে সেখানেই গুহাটা সুড়ঙ্গের মতো একটা বাঁক নিয়ে নেমে গেছে আরও ভেতরের দিকে। আরও কয়েক পা এগিয়ে যেতেই এবার সম্রাটের চোখ পড়ে গুহাটার একটা কোনে। প্রায় স্তূপাকারে পড়ে আছে গলিত শবদেহ আর নরকঙ্কাল। টর্চের আলোয় সম্রাট পরিষ্কার দেখতে পায় শবদেহ গুলোর মাংস খুবলে খুবলে খাওয়া। এক হাতে রাইফেল আরেক হাতে টর্চটা নিয়ে আরও কিছুটা এগিয়ে যেতেই সম্রাট দেখতে পায় গুহাটার এক্কেবারে শেষ প্রান্তে ভয়ে জড়সড় হয়ে বসে আছে মানুষের মতোই দেখতে অদ্ভুত ধরণের ডানা ওয়ালা তিনটে ছোট্ট প্রাণী। হয়তো ওরাই এতক্ষণ ধরে খুবলে খাচ্ছিল শবদেহ গুলোকে। হঠাৎ করে সম্রাটের এখানে এসে পড়ায় ওরা ভয় পেয়ে গেছে। দৈত্যটা কেন এত পরিমাণ হত্যা করছিল এবার সেটা পরিষ্কার হয়ে আসে সম্রাটের কাছে। তবুও ছোট্ট দৈত্য-শিশু গুলোকে হত্যা করতে সম্রাটের বিবেক বাধা দেয়।


গুহার দেওয়াল গুলো স্যাঁতস্যাঁতে, দেওয়ালের গা বেয়ে কোথাও কোথাও রক্ত ঝরছে। পায়ের তলায় কখনো ভেজা মাটি কখনো আবার শক্ত পাথর। বাইরে এখনো রক্ত বৃষ্টি হচ্ছে না থেমে গেছে সেটা গুহার ভেতর থেকে বুঝতে পারল না সম্রাট। না আর বেশিক্ষণ এখানে থাকলে ওর চলবে না। এবার এক পা এক পা পিছন ফিরে চলতে লাগল সম্রাট। গুহা মুখটার ঠিক কাছা কাছি আসার পরেই সম্রাটের মনে হল কে যেন মৃদুসুরে, ‘হেল্প…হেল্প’ করছে। ম্যেলিয়া নয় তো ? কান খাড়া করে শব্দটাকে শোনার চেষ্টা করে সম্রাট। না ম্যেলিয়া নয়, পুরুষ কণ্ঠ। এটা যদি আবার দৈত্যটার কোনও মায়াজাল হয়! হতেও তো পারে মানুষের মতো সুর করে দৈত্যটা ওকে বড়সড় কোনও বিপদে ফেলার চেষ্টা করছে। কিছুক্ষণ চিন্তা করার পর সম্রাট ঠিক করে যা হবার হবে ও শেষ না দেখে যাবে না।


ক্ষীণ কণ্ঠটা অনুস্মরণ করে আবার এগিয়ে যায় সম্রাট। শবদেহ আর নরকঙ্কাল গুলোর দিক থেকেই ভেসে আসছে শব্দটা। কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে গুহার ভেতরকার সুড়ঙ্গটায় ঢুকে টর্চের আলো ফেলতেই সম্রাট পরিষ্কার দেখতে পায় এক যুবককে। ভেজা মাটির উপর মুখ গুঁজে পড়ে আছে। সম্রাট দ্রুত এগিয়ে যায় ওর কাছে। রাইফেলটাকে নীচে নামিয়ে এক হাতে ধরে কোনোক্রমে সোজা করে বসায় ওকে। সোজা করে বসিয়ে ওর মুখের উপর টর্চের আলো ফেলতেই সম্রাটের চোখে ভেসে উঠে লিয়ের মুখটা। সম্রাটের চিনতে পারে ছেলেটাকে, এমিল। এমিল ছাড়া আর কেও হতেও আরে না। কিন্তু এমিল এখানে জীবিত অবস্থায়…! না আর দেরি করার সময় নেই এই সব ব্যাপারে এমিলের কাছ থেকে পরেও জানা যাবে। বেঁচে ফিরলে পুরো জীবনটাই পড়ে থাকবে গল্প শোনা আর বলার জন্য।


স্যাঁতস্যাঁতে গুহার ভেতর থেকে এমিলকে টেনে বের করে আনতে বেশ কষ্ট হয় সম্রাটের। তবুও এমিলকে খুঁজে পাওয়ার আনন্দের কাছে এই কষ্ট টুকু কিছুই নয়। সম্রাট এমিলের সঙ্গে যখন গুহার বাইরে এসে দাঁড়ায় তখনো রক্ত বৃষ্টি হচ্ছে তবে তার পরিমাণ অনেকটাই কম।
এমিলকে ম্যেলিয়ার পিঠের উপর শুয়ায়ে দিয়ে সম্রাট আবার খুঁজতে থাকে শিবলিঙ্গটা। কিন্তু এবারেও নিরাশা ছাড়া ওর কপালে আর কিছুই জোটে না। বেশ খানিকক্ষণ এদিক সেদিক খোঁজ করার পর সম্রাট হতাশ হয়েই ম্যেলিয়ার কাছে ফিরে আসে। ফিরে এসে দেখে এমিল রক্ত বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে ঝিমচ্ছে। সম্রাটকে দেখতে পেয়ে উঠে বসার চেষ্টা করে এমিল। পারে না, দুর্বল শরীরটা কিছুতেই সাথ দেয় না ওর। বাধ্য হয়েই এমিল সম্রাটকে হাতের ইশারায় কাছে ডেকে ম্যেলিয়ার পিঠের উপর চড়তে বলে। সম্রাট শিবলিঙ্গটার ব্যাপারেই কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল কিন্তু এমিল বাধা দিতে আর বলা হয় না। এমিলের কথা মতো ম্যেলিয়ার পিঠের উপর চড়ে বসে সম্রাট।


সম্রাটকে আঙুলের ইশারায় পথ দেখিয়ে নিয়ে চলে এমিল। ম্যেলিয়া পশ্চিমের টিলা গুলো পেরিয়ে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড় গুলোর দিকে উড়তে থাকে। পায়ের তলার ঘনান্ধকার জঙ্গলটা যেন মাঝে মাঝে নড়ে উঠছে। যতদূর দৃষ্টি যাচ্ছে করালবদনা অন্ধকার ছাড়া কিছুই চোখে পড়ছে না। মাথার উপরকার চাঁদটা সম্পূর্ণ রক্ত বর্ণ ধারণ করেছে এবার। ম্যেলিয়ার ডানার সাঁই সাঁই শব্দটা ছাড়া কিছুই কানে আসছে না সম্রাটের। জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে পাহাড় গুলোকে যতটা কাছে মনে হচ্ছিল পাহাড় গুলো ততটা কাছে মোটেই নয়। আরও কয়েক মিনিট উড়ে চলার পর এমিল একটা পাহাড়ের দিকে আঙুল বাড়িয়ে কিছু একটা বলার চেষ্টা করে। কিন্তু এমিলের অস্পষ্ট শব্দ গুলো বুঝতে পারে না সম্রাট। তবে এমিল যে পাহাড়টার উপর নামার কথা বলছে সেটুকু সম্রাটের বুঝতে পারে।

Bengali story


দশ
অন্ধকারের বুক চিরে নীচে নেমে আসে ম্যেলিয়া। সম্রাটের মনে হয় সমগ্র দ্বীপ জুড়ে যেন নটরাজের তাণ্ডব নৃত্য চলছে। সব শেষ হয়েই মনে হয় এই তাণ্ডব নৃত্য থামবে নতুবা এ তাণ্ডব থামবে না কোনোদিন। ম্যেলিয়ার পিঠ থেকে নীচে নামতেই সম্রাটের চোখে পড়ে গম্বুজাকার শিবলিঙ্গটা। এমন ঘনান্ধকার রাত্রিতেও শিবলিঙ্গটা থেকে আবছা আলো বেরিয়ে আসছে। সম্রাট কয়েক মুহূর্ত চিন্তা করে নিয়ে ম্যেলিয়াকে এক জায়গায় দাঁড়াতে বলে কয়েক পা এগিয়ে যায়। সম্রাটের হাতে এখন বিশেষ সময় নেই তাই ভয়ে ভয়ে পথ চলাটাও এখন ওর কাছে বিলাসিতা।


পিঠের সঙ্গে বেঁধে রাখা শিবলিঙ্গটাকে খুলে দুহাতে নিয়ে টর্চের আলো ফেলে এগিয়ে যেতে থাকে সম্রাট। চাপা উত্তেজনার সঙ্গে ভয়টাও কাজ করছে সমান ভাবে। সম্রাট যখন গম্বুজাকার শিবলিঙ্গটার থেকে মিটার দশেক দূরে দাঁড়িয়ে ঠিক তখনই ভয়ঙ্কর এক গর্জনে কেঁপে উঠল এলাকাটা। বাতাসের উপর সপাৎ সপাৎ করে ডানার শব্দ তুলে সম্রাটের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়ে পড়ল বিশালাকৃতির এক দৈত্য-মানব। সম্পূর্ণ নিরাবরণ তার দেহ। তবে লজ্জা নিবারণ করার জন্যই হোক বা অন্য কোনও কারণেই হোক দৈত্যটার কোমর থেকে উরু পর্যন্ত লোমশ জানোয়ারের চামড়া বেড়ানো আছে।


সম্রাট খেয়াল করল দৈত্য-মানবটার পুরু বাদামী রঙের পালকে ঢাকা ডানা দুটোর সাইজ সাত আট ফুটের কম কিছুতেই হবে না। ডানা দুটোর সঙ্গেই অদ্ভুত রকম ভাবে দুটো হাত যেন জোড়া লাগানো আছে। পায়ের আকৃতির চেয়েও ভয়ঙ্কর পায়ের আঙুলের আগায় বেরিয়ে থাকা বাঁকানো ছুরির মতো ধারালো নখ গুলো। সম্রাটের টর্চের আলো পড়ে সেগুলো যেন একটু বেশিই চক চক করছে। টর্চের আভায় সম্রাট পরিষ্কার দেখতে পায় দৈত্যটার শ্বাপদ চোখে-মুখে-দাঁতে রক্তলোলুপ জিঘাংসা ফুটে উঠেছে। জ্বলন্ত অঙ্গারের মতো ডিম্বাকৃতি চোখ দুটো তাকিয়ে আছে সম্রাটের দিকেই। রক্ত বৃষ্টিতে ভিজে দৈত্যটার চেহারা আরও ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেছে এখন। চোখের সামনে সাক্ষাত মৃত্যুকে দেখার পরেই দাঁড়িয়ে পড়েছে সম্রাট। ওর হাত পা গুলো কাঁপছে থরথর করে।
ডানায় সপাৎ সপাৎ শব্দ তুলে সম্রাটের দিকে এগিয়ে আসতে লাগল দৈত্য-মানব। সম্রাট এতটাই হতভম্ব যে কোমরে ঝুলতে থাকা রাইফেলটা পর্যন্ত বের করতে ভুলে গেছে। পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে সে। এক পা এক পা করে এগিয়ে আসছে দৈত্য-মানব। গ-র-র-র – গ-র-র-র করে একটা ক্রুদ্ধ গর্জন বেরিয়ে আসছে দৈত্যটার নাক-মুখ দিয়ে।


আর বিন্দুমাত্র দেরি করাটাও ঠিক হবে না ভেবেই ম্যেলিয়া এমিলকে একটা পাথরের উপর নামিয়ে দিয়ে ডানায় সাঁই সাঁই শব্দ তুলে এগিয়ে আসে দৈত্য-মানবটার দিকে। ঠিক এমন সময় দৈত্যটা সম্রাটকে ডানার এক ঝাপটা মেরে দূরে ছুড়ে দিয়ে ম্যেলিয়ার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পড়ে। ডানার প্রচণ্ড আঘাতে সম্রাট ফুট দশেক দূরে আছড়ে পড়তেই ওর হাত থেকে শিবলিঙ্গ আর টর্চটাও ছিটকে পড়ে যায়।


এর পরেই শুরু হয় ড্রাগনের সঙ্গে দৈত্যের প্রবল যুদ্ধ। মুহুর্মুহু আগুনের গোলা বর্ষণে কেঁপে কেঁপে উঠতে থাকে পাহাড়টা। প্রায় পনের মিনিট একে অপরকে আগুন ছুড়েও যখন কেউ কাউকে বিন্দুমাত্র জখম করতে অসমর্থ তখন শুরু হয় ডানায়-ডানায় আর পায়ে-পায়ে ঝাপটা ঝাপটি। এতেও দৈত্য মানবটা কিছুতেই কাবু করতে পারে না ম্যেলিয়াকে। ইতি মধ্যেই নিজের জখম ভুলে প্রবল জেদের সঙ্গে রাইফেল হাতে উঠে দাঁড়িয়েছে সম্রাট। কিন্তু কিছুতেই গুলি ছুড়তে পারছে না। সে গুলিটা গিয়ে ম্যেলিয়ার শরীরেও লাগাতে পারে।


শেষ পর্যন্ত শক্তি দিয়ে দৈত্যটা যখন কিছুতেই ম্যেলিয়ার সঙ্গে পেরে উঠল না তখন আশ্রয় নিলো মায়ার। কয়েক সেকেন্ডের ভেতর ম্যেলিয়ার সামনে এসে দাঁড়িয়ে গেল চার চারটা ধোঁয়ার তৈরি কালো ড্রাগন। আবার শুরু হল আগুনের গোলা বর্ষণ। ম্যেলিয়া আর পেরে উঠছে না। চারটা ড্রাগনের সামনে ওর শক্তি কম পড়ছে। এবার সম্রাট কিছু করে উঠতে না পারলে ম্যেলিয়ার মৃত্যু নিশ্চিত। অন্ধকার হাতড়েই সম্রাট এবার শিবলিঙ্গটা খুঁজতে থাকে। মাঝে মাঝেই যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠছে ম্যেলিয়া। অন্ধকারে সম্রাট কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছে না শিবলিঙ্গটাকে। এদিকে রক্ত বৃষ্টি কমতে কমতে ফোটা ফোটায় এসে দাঁড়িয়েছে।
আর মাত্র কয়েকটা মুহূর্ত। তারপরেই দৈত্য মানবের নখ-দাঁতে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবে ম্যেলিয়ার শরীরটা। রেহায় পাবে না সম্রাট কিংবা এমিল। মায়ায় সৃষ্টি ড্রাগন গুলোর আগ্নেয় আঘাতে ম্যেলিয়ার সারা শরীরে ক্ষত স্থানের সৃষ্টি হয়েছে। তবুও জীবনের শেষ শক্তিটুকু দিয়ে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে ম্যেলিয়া। অন্ধকার হাতড়ে শিবলিঙ্গটা খুঁজতে খুঁজতে একটা সময় ভাগ্য দেবতা সম্রাটের সহায় হন। ঘন এলিফেন্ট ঘাসের ভেতর সম্রাট খুঁজে পায় শিবলিঙ্গটা। এটাই মোক্ষম সময়, দৈত্য-মানব এখন ম্যেলিয়াকে নিয়ে ব্যস্ত। সম্রাট রাইফেলটাকে আবার কোমরে ঝুলিয়ে শিবলিঙ্গটা আঁকড়ে ধরে ছুটে যায় গম্বুজাকার বৃহৎ শিবলিঙ্গটার কাছে। ফসফরাসের মতো যে হালকা আলো গম্বুজ থেকে বেরিয়ে আসছে তাতে ছোট শিবলিঙ্গটার শূন্যস্থান দেখতে পায় সম্রাট।


আর বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে সম্রাট হাতে ধরে থাকা শিবলিঙ্গটাকে গম্বুজাকার বড় শিবলিঙ্গটার খাপে বসিয়ে দেয়। মুহূর্তের ভেতর চোখ ধাঁদিয়ে যাওয়া আলোয় ভরে উঠে পাহাড়টা। মায়ায় সৃষ্টি ড্রাগন গুলো হুশ হুশ করে শূন্যে মিলিয়ে যায়। ভয়ঙ্কর গর্জন করে সম্রাটের দিকে এবার এগিয়ে আসতে থাকে দৈত্য-মানব। কিন্তু ম্যেলিয়া পুনরায় বাধার সৃষ্টি করে ওর পথে। ম্যেলিয়ার মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত দৈত্য-মানবটার ক্ষমতা নেই যে সম্রাটের কাছে পৌঁছায়। সম্রাট জানে ম্যেলিয়া নিজের জীবন দিয়ে হলেও নিজের রাইডারের প্রাণ রক্ষা করার চেষ্টা করবে। এবার গম্বুজাকার শিবলিঙ্গটা দুটো ভাগে ভাগ হয়ে যায়। ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে ইস্পাতের মতো ঝকঝকে এক ত্রিশূল। সম্রাটের মনে পড়ে ম্যেইনলেন্ডের ডাইরির পাতায় ঠিক এমনই একটা ত্রিশূলের ছবি আঁকা ছিল।
সম্রাট ত্রিশূলটা ডান হাতের তালুতে মুষ্টিবদ্ধ করতেই মৃদু একটা কম্পনে নড়ে উঠে সমগ্র দ্বীপটা। প্রবল আক্রোশে ম্যেলিয়াকে দূরে ছুড়ে দিয়ে সম্রাটের দিকে এগিয়ে আসে দৈত্য-মানব। এবার সম্রাটের জয় নিশ্চিত। আর কোনও ভয় নেই ওর। দৈত্য মানব নিধন করার ত্রিশূল এখন ওর হাতে।


সম্রাট যেমনটা ভেবেছিল তেমনটা হল না মোটেই। দৈত্য মানবটার বুক লক্ষ্য করে ত্রিশূলটা ছুড়ে মারল সম্রাট। প্রচণ্ড গতিতে দৈত্য-মানবটার ছাতি ভেদ করে ত্রিশূলটা আবার সম্রাটের হাতে ফিরে এল। কিন্তু দৈত্য-মানবটার কিছুই হল না। এবার ডানা দুটোকে আকাশের দিকে তুকে বিজয়ীর ভঙ্গিতে চিৎকার করে উঠল দৈত্য-মানবটা। তাহলে কি সবই মিথ্যে নাকি দৈত্য-মানবটাকে হত্যা করার সময় পেরিয়ে গেছে। আবার একবার ত্রিশূলটা ছুড়ল সম্রাট কিন্তু এবারেও কিছুই হল না ওর। গর্জন করতে করতে সম্রাটের দিকে এগিয়ে আসতে থাকে দৈত্য-মানব। এখন মৃত্যুর অপেক্ষা করা ছাড়া কিছুই করার নেই।


দৈত্য-মানবটা যখন সম্রাটের খুব কাছা কাছি চলে এসেছে ঠিক এমন সময় সম্রাট শুনতে পায় এমিল চিৎকার করে বলছে, ‘ওকে বরফ দিয়ে অচল মূর্তি না বানালে ওর কিছুই হবে না।’ কিন্তু সম্রাটের পক্ষে এখন দৈত্য-মানবটাকে বরফ দিয়ে মোড়ার মতো কোনও উপায় নেই। হঠাৎ করেই সম্রাটের মনে পড়ে যায় লিয়ের কথাটা, ‘…এটা হিম যুগের গোল্ডেন আই ড্রাগন। অদ্ভুত ক্ষমতা এই ড্রাগনের। এ ইচ্ছে করলে মুখ দিয়ে আগুন যেমন বের করতে পারে ঠিক তেমন ভাবেই এই ড্রাগন মুখ দিয়ে বরফ বের করতেও সক্ষম।’


সম্রাট এবার দৈত্য-মানবটাকে পাশ কাটিয়ে ছুটে যায় ম্যেলিয়ার কাছে। ম্যেলিয়াকে কিছু বলতে হয় না, ও এখন সম্রাটের মনের ভাষা পড়তে সক্ষম। ক্ষতবিক্ষত শরীরটা নিয়েই উঠে দাঁড়ায় ম্যেলিয়া। আবার সম্রাটকে পিঠে নিয়ে ডানায় শব্দ তুলে উড়তে থাকে আকাশে। দৈত্য-মানবটাও এবার ডানা দুটোকে দুদিকে ছড়িয়ে আকাশে উড়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। এটাই উত্তম সময়। সম্রাট সমস্ত শক্তি দিয়ে ত্রিশূলটা উঁচিয়ে ধরে দাঁড়িয়ে পড়ে ম্যেলিয়ার পিঠের উপর। সঙ্গে সঙ্গে ম্যেলিয়ার মুখ থেকেও বরফ বেরিয়ে আসতে শুরু করে। কয়েক সেকেন্ডের ভেতরেই দৈত্য-মানবটা বরফের মূর্তিতে পরিণত হয়। এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে সম্রাট ত্রিশূলটা ছুড়ে দেয় দৈত্য-মানবটার বুকের দিকে। নিমেষেই ত্রিশূলটা বিদ্যুতের গতিতে গিয়ে গেঁথে যায় দৈত্য-মানবটার ছাতিতে। ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরিয়ে আসে এবার। ভূমিকম্পের মতো কেঁপে উঠে দ্বীপটা।


আবার শুরু হয় মুশল ধারায় বৃষ্টি। না এবার আর রক্ত বৃষ্টি নয় বরং এবার দ্বীপের গায়ে জমা হয়ে থাকা সমস্ত রক্ত বিন্দু গুলো ধুয়ে যাচ্ছে জলের ধারায়। সম্রাটকে পিঠে নিয়েই নীচে নেমে আসে ম্যেলিয়া। ওর পক্ষে ক্ষতবিক্ষত শরীরে সম্রাট আর এমিলকে পিঠে নিয়ে এই মুহূর্তে লিয়ের কাছে উড়ে যাওয়া সম্ভব নয়। বিশ্রামের প্রয়োজন এখন ম্যেলিয়ার। এদিকে সম্রাট আর এমিল দুজনের ভীষণ চিন্তা হচ্ছে লিয়ের জন্য। লিয়ের কিছু হলে সম্রাট বা এমিল কারুরেই নিজের কাছে জবাবদিহি করার মতোও কিছু থাকবে না। বিশেষ করে এমিলের দায়বদ্ধতা আরও বেশি কারণ ওর জন্যই লিকে আসতে হয়েছে এমন মৃত্যুরূপ মেরিন দ্বীপে। আকাশের দিকে মুখ উঁচু করে খালি গায়ে বসে বসে ভিজছে থাকে এমিল। হয়তো ভেতর ভেতর পিতার সম্মুখীন হওয়া মুহূর্তের নাট্য সংলাপ গুলো সাজিয়ে নিচ্ছে ও এখন।


ঘণ্টাখানের বিশ্রাম নেবার পর ম্যেলিয়া খানিকটা সুস্থ বোধ করলে তিনজনে রওনা দেয় লিয়ের খোঁজে। লিকে এখন আর ওই গাছটার নীচে পাওয়া যাবে বলে তো মনে হয় না। তবুও সম্রাটকে প্রথমে ওই গাছটার কাছেই যেতে হবে। পূবের আকাশে সূর্যোদয় হতে আর বিশেষ দেরি নেই। দিগন্ত রেখার ওপারে লাল আভা ফুটে উঠছে ধীরে ধীরে। আর কিছুক্ষণ পরেই এই রহস্যময় দ্বীপটার আকাশে নতুন দিনের সূর্য উঠবে। সম্রাটের কাছে এই সূর্যোদয়টা আর পাঁচটা সূর্যোদয়ের চেয়ে আলাদা। ওর এখানে আসা সার্থক। পৃথিবীর বুকে জলজ্যান্ত এমন রহস্যময় একটা দ্বীপ যে জেগে আছে সেটা মনে হয় সভ্য সভ্যতার মানুষ কোনদিনেই বিশ্বাস করবে না। সম্রাটের কাছে কোনও ক্যামেরাও নেই যে ছবি তুলে নিয়ে গিয়ে সবার চোখের সামনে তুলে ধরবে। এই দ্বীপটার গল্প সম্রাটের মুখে শোনার পরেও কেও হয়তো তেমন আমল দেবে না। কিন্তু সম্রাট ? ও কি কোনোদিন এই দ্বীপটার কথা, দৈত্য মানবটার কথা, ম্যেলিয়ার কথা ভুলতে পারবে ? নাকি সম্রাটও একদিন সব কিছুকে নিছক স্বপ্ন মনে করে মেরিন দ্বীপটাকে ভুলতে শুরু করবে ধীরে ধীরে!
সমুদ্রের নীল জলরাশির উপর লাল রঙ ছড়িয়ে প্রতিদিনের মতো আজকেও সূর্যোদয় হচ্ছে। সম্রাট আর এমিল দুজনেই তাকিয়ে দেখতে থাকে আজকের সূর্যোদয়টা। এমিলের কাছে সম্রাটের অনেক কিছু শোনার আছে জানার আছে। সম্রাট মনে মনে ঠিক করেছে জাহাজের যাত্রাপথে এমিলের কাছে সব শুনবে সব জানবে একে একে। হয়তো কোনোদিন এমিলকে সঙ্গে নিয়েই সম্রাটকে বেরিয়ে পড়তে হতে পারে নতুন কোনও রহস্যের সন্ধানে। সেদিন এই দ্বীপের থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা গুলো ভীষণ ভাবে কাজে লাগবে ওর।


কালকের সেই বিশালাকৃতির গাছটার নীচে এসে সম্রাট দেখে লি নেই। এমিলের রক্তাক্ত জামাটা গাছের একটা কোনায় পড়ে আছে। জামাটা কুড়িয়ে সম্রাট এমিলের হাতে তুলে দেয়। জামাটা হাতে নিয়ে এমিলের চোখ দুটো ছলছল করে আসে। সম্রাট বেশ কয়েকবার লিয়ের নাম ধরে চিৎকার করে ডাকে কিন্তু জঙ্গলের প্রতিধ্বনি ছাড়া আর কোনও সাড়াশব্দ পাওয়া যায় না। এই গভীর জঙ্গলটার উপর থেকে লিকে খুঁজে বেরকরা সম্ভব নয়। তাই সম্রাট আর এমিল দুজনকে পায়ে হেঁটেই লিয়ের সন্ধানে বেরোতে হয়। ম্যেলিয়া আকাশ পথে লিয়ের খোঁজ করতে থাকে।


এভাবে ঘণ্টা খানেক খোঁজ করার পর পাহাড়ি ঝর্ণা নদীটার ধারে লিয়ের সন্ধান মেলে। আদিম মানুষ গুলো ঘিরে রেখেছে ওকে। কাছে গিয়ে সম্রাট আর এমিল দেখে লিয়ের পিঠে আর পুরো ডান হাতটায় আদিম মানুষ গুলো কোন এক গাছের পাতা বেটে লাগিয়ে রেখেছে। লিয়ের অবস্থা গুরুতর না হলেও কথা বলতে বেশ সমস্যা হচ্ছে এখনো। এমিলকে জীবিত অবস্থায় দেখে লি চোখের জল আটকে রাখতে পারেন না। উনি হয়তো কল্পনাতেও ভাবেননি আর কোনোদিন এমিলকে জীবিত অবস্থায় দেখবেন। এমিল লিয়ের কাছে গিয়ে বসলে লি এমিলের হাত দুটোকে শক্ত করে চেপে ধরে নীরবে কাঁদতে থাকেন। এমিল যে জীবিত এটাই লিয়ের কাছে বড় প্রাপ্তি। তাই এমিলের কাছেও লিয়ের আর কোনও অভিযোগ নেই, কোনও জিজ্ঞাসা নেই। পিতা পুত্রের এমন মিলন মুহূর্তের সময় সম্রাটের চোখেও জল এসে যায়। ওর বার বার মনে পড়তে থাকে বাবা মায়ের মুখটা। ইতি মধ্যে ম্যেলিয়াও এসে পৌঁছায় ঝর্ণা নদীটার ধারে।
আদিম মানুষ গুলোর সাহায্য নিয়েই বিকেলের দিকে লিকে নিয়ে আসা হয় জাহাজে।

জাহাজটার কাছে পৌঁছেই সম্রাট খুঁজে পায় চুয়ান ম্যেইনলেন্ডের ডাইরিটা। সন্ধ্যার দিকে লি নিজেও অনেকটা সুস্থ বোধ করেন। টুকটাক কথাবার্তাও বলেন এমিলের সঙ্গে। গত রাত্রির পুরো বর্ণনা শোনেন সম্রাটের মুখ থেকে। এরপর লি আদিম মানুষ গুলোর হবু দলপতির হাতে তুলে দেন ম্যেইনলেন্ডের ডাইরিটা। ওটা লি বা সম্রাট আর কারুরেই তেমন কাজে লাগবে না। যে জন্য ডাইরিটা বানানো হয়েছিল সেই কাজটা সম্পন্ন হয়ে গেছে। এই দ্বীপের নিরীহ প্রাণী গুলোকে আর দৈত্য-মানবটার খাবার হতে হবে না। আর যে তিনটা দৈত্য-শিশু গুহার ভেতরে বসে আছে ওরা হয়তো শীঘ্রই খাবারের অভাবেই মারা পড়বে।


পরের দিন সকাল বেলায় প্রায় সত্তর আশি জন আদিম মানুষের সাহায্যে জাহাজটাকে আবার জলে নামানো হয়। আজকে ক্যাপ্টেনের সিটে লিয়ের পরিবর্তে এমিল বসেছে। ইঞ্জিনে স্টার্ট দেওয়ার কিছুক্ষণ পরেই ধীর গতিতে এগিয়ে চলতে শুরু করে জাহাজটা। লি আজকে অনেকদিন পর আবার অলিভার আর্নল্ডের ডাইরিটা নিয়ে বসেছেন। হয়তো নতুন কোনও রহস্যের সন্ধান করছেন। সম্রাট একলা ডেকে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকে উড়ন্ত ম্যেলিয়ার দিকে। হয়তো এই জন্মে আর কোনও দিনেই মেরিন দ্বীপে ওর আসা হবে না ম্যেলিয়ার সঙ্গেও দেখা হবে না আর। অকারণেই চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে আসে সম্রাটের।


নীল জলের বুক চিরে এগিয়ে চলতে থাকে জাহাজটা। এখন আর মেরিন দ্বীপটাকেও ঘন কুয়াশায় দেখা যাচ্ছে না। বিদায় ম্যেলিয়া, বিদায় মেরিন দ্বীপ। এবার সম্রাটকেও ইঞ্জিন ঘরে ফিরে এমিলকে সাহায্য করতে হবে। তাছাড়া এমিলের কাছে ওর অনেক গল্পও শোনার আছে। দূরের আকাশটার দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর ধীরে ধীরে ডেকের থেকে নেমে আসে সম্রাট। জাহাজটা এখন গতি নিয়েছে। সমস্ত কিছু ঠিকঠাক থাকলে বারমুডা রেঞ্জ পার হতে বেশি সময় লাগবে না।
[সমাপ্ত]

Bengali story
admin:

This website uses cookies.

Read More