Hasir Golpo

Hasir golpo হাসির গল্প, সীতাহরন

Hasir golpo:- সীতাহরন

বাপ্পাদিত্য মুখোপাধ্যায়
Hasir golpo :-  আপনি যদি হাসির গল্প পড়তে ভালবাসেন তাহলে এই হাসির গল্পটা অবশ্যই পড়ুন। হাসতে হাসতে লুটিয়ে পড়বেন।
Hasir golpo
Hasir golpo
অনেক বছর আগেকার কথা তখন পাড়ায় পাড়ায় যাত্রাপালা, নাটক, ঝুমুরগান, পুতুল নাচ এসব হয়েই থাকত। তখন তো আর ঘরে ঘরে টিভি ছিল না। দর্শকও আসত গ্রামকে গ্রাম। তখন আমরা ওই নয় দশ বছরের কচিকাঁচা। যাত্রাপালা কিংবা পুতুল নাচ দেখতে দেখতে কখন যে মায়ের কোলে ঘুমিয়ে পড়তাম নিজেরই খেয়াল থাকত না। সকালে ঘুম থেকে উঠে বেজার মুখে আপসোস করে বলতাম, ‘ধুর এবছরও ঘুমিয়েই পড়লাম। পরের বছর কিন্তু পুরোটা দেখব।’
তা সে বছর কিন্তু আমি একটুও ঘুমাইনি। সারারাত জেগে ছিলাম। সেই রাতটা ভোলার মতো নয়। সেই বছর লক্ষ্মীপূজা উপলক্ষে আমাদের গ্রামে ‘সীতাহরন’ পালা হয়েছিল। যাত্রাপালার মাস খানেক আগে থেকে আমাদের ঘুম নেই। সন্ধা হলেই রিয়ারসেল দেখতে যেতাম নিয়ম করে। রিয়ারসেল দেখতে দেখতেই যাত্রাপালার রাতটা কল্পনা করতাম মনে মনে। ভেতরে ভেতরে একটা দুশ্চিন্তা হত, যাত্রার দিন বৃষ্টি হবে না তো। সে বছর কিন্তু বৃষ্টি হয়নি। সন্ধার আকাশ জুড়ে কোজাগরী পূর্ণিমার চাঁদ উঠেছিল। সবার ঘরেই সেদিন কমবেশি আত্মিয় এসেছিল। এখনো পরিষ্কার মনে আছে, সেদিন সকাল থেকেই মাইকে ঘোষণা হচ্ছিল, ‘আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর আপনারা দেখতে পাবেন এ বছরের শ্রেষ্ঠ সাড়াজাগানো পৌরাণিক যাত্রাপালা সী-তা-হ-র-ন।’
আমাদের গ্রামের নিয়ম ছিল, যে যেমন টাকা দেবে সে তেমন রোল পাবে। সবচেয়ে বেশি টাকা যে দিত সেই নায়ক। তারচেয়ে অল্পকম দিলে সে সাইড নায়ক। কিন্তু সে বছর ফল্গু মণ্ডল সবচেয়ে বেশি টাকা দিয়েও রাবণের অভিনয় করেছিল। যেমন ছিল তার চেহারা তেমন ছিল গলার আওয়াজ। রাবণের সাজে ফল্গু মণ্ডলকে আরও বেশি ভয়ঙ্কর দেখাচ্ছিল সেদিন। লক্ষ্মীমেলার মাঠে ত্রিপল টাঙিয়ে দর্শকদের বসার ব্যবস্থা করা হয়েছিল প্রতিবছরের মতোই।
সন্ধা হতে না হতেই পাশাপাশি গ্রামের থেকেও পালকে পাল মানুষ আসতে শুরু করল। মাইকে বারবার ঘোষণা হচ্ছিল যাত্রাপালার নাম। ষ্টেজের উপর লাইট ঝোলানো। মাইক্রোফোন টাঙানো। ‘হ্যালো চেক, হ্যালো চেক’ চিৎকার করে করে মাইক্রোফোন টেস্ট। সে কী ব্যস্ততা। সেদিন আমিও এমন ভাবেই ছোটাছুটি করছিলাম; যে দেখছিল সেই বলছিল, ‘বেশ কাজের ছেলে কিন্তু পাপ্পু।’
আমি কিন্তু কাজ করছিলাম গ্রিনরুমের ভেতরে ঢুকতে পাব বলেই। কাকে কেমন সাজাচ্ছে। তাতে তাকে কেমন লাগছে। এই সব ইন্টারেস্টিং খবরগুলো আমিই তো বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা নেপালা, পটলা, পরানদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছিলাম। আমি যখন তখন গ্রিনরুমে ঢুকছি বার-হচ্চি সেটা দেখে পটলারা জ্বলছিল আর লুচির মতো ফুলছিল। সেদিন আমার দামেই ছিল আলাদা। ‘সীতাহরন’ পালার মুলচরিত্র রাবণকে চা এনে দেওয়া মুখের কথা ? না কম বীরত্বের কাজ ? অমন গর্বের কাজ পেতে নেপাল পটলারা মনে হয় পাঁচবার ইন্টার্ভিউ দিতেও রাজি হয়ে যেত। আমাকে অবশ্য ওসব নিয়ে ভাবতে হয়নি। ফল্গুদা নিজেই আমাকে বলেছিল, ‘তুই ভাই আমার কাছাকাছি গ্রিনরুমেই থাকিস। কখন কী দরকার পড়ে।’ আমি অভয় দিয়ে বলেছিলাম, ‘ওসব নিয়ে তুমি ভেব না দাদা আমি সব সামলে দেবো।’  বাবার বয়সি ফল্গু মণ্ডলকে দাদা বলার সুযোগ! কল্পনা করাই যায় না। পরিষ্কার মনে আছে যখন ফল্গুদাকে বলেছিলাম, ‘ফল্গুদা এবার একটু চা খেয়ে নাও নতুবা গলা ফেঁসে গেলে কেচাল হয়ে যাবে।’ ব্যাটা রাম, মানে ওই নামো পাড়ার নিতাই রক্ষিত। আমার দিকে এমন কটমট করে চাইছিল যে কী বলব! একবার তো আমাকে উদ্দেশ্য করেই বলেছিল, ‘এই টিকটিকিটা ভেতরে কী করছে?’ আমার যা রাগ হয়েছিল না। তবু আমি কিছু বলিনি, চেপে গিয়ে ছিলাম। আমার হয়ে ফল্গুদাই বলেছিল, ‘এই নিতা ও আমার চেলা।’  ‘আমার চেলা’ কথাটা শুনে গর্বে আমার বুকটা চার সেন্টিমিটার বেড়ে গিয়ে থাকলেও থকাতে পারে। সেদিনেই প্রথম বুঝেছিলাম কেন মধুসূদন দত্ত ‘মেঘনাদ বধ কাব্য’-তে রামকে হিরো করেননি।

Bangla hasir golpo

দশটা বাজতে না বাজতেই শুরু হল যাত্রাপালা। রাম লক্ষ্মণ সীতা বনে বনে ঘুরে বেড়াচ্ছেন দেখে পাড়ার কাকিমা ঠাকুমাদের চোখে সেকি জল! কেউ কেউ আবার হাত জোড় করে রামকে প্রণাম করছে। আমি শুধু মনে মনে ভাবছিলাম, জঙ্গল তো দূরের কথা একটাও গাছ নেই তবুও এরা এমন করে চোখের জল ফেলছে! যদি সত্যি সত্যি ষ্টেজটা জঙ্গল হত ভগবান জানে এরা কী কী করত। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর তৃতীয় দৃশ্য যখন এল তখন আমার একটু চাপচাপ লাগছিল। বারবার মনে হচ্ছিল ফল্গুদা পারবে তো সীতাকে তুলে আনতে ? কোনও বিপদ হবে না তো ?
…পেরেছিল ফল্গুদা। জটায়ুর চাদর কেটে না ঠিক চাদর নয়, চাদর দিয়ে তৈরি ডানা কেটে নিয়ে এসেছিল সীতাকে। তাতে কেউ খুশি হয়নি। আমিই কেবল হাত তালি দিয়ে বলেছিলাম, ‘শাবাশ ফল্গুদা শাবাশ এই না হলে অপহরণ।’
সীতাকে তুলে আনার পর ফল্গুদা আমাকে কানেকানে বলেছিল, ‘তোর বন্ধুদেরকে গিয়ে বল পরের সিনে আমি ডাইলগ বলার পর যেন হাত তালি দিয়ে ফাটিয়ে দেয়। কালকে সকালে তোদের সবাইকে গরম গরম শিঙাড়া…।’ আমি সঙ্গে সঙ্গে নেপালা পটলাদেরকে গিকে বলেছিলাম। ওরাও তৎক্ষণাৎ রাজি হয়ে গিয়েছিল। পরের সিনে ফল্গুদা ডাইলগ বলার আগেই আমরা হাততালি দিতে শুরু করে দিলাম। ষ্টেজের উপর থেকেই ফল্গুদা মাইক্রোফোনে চিৎকার করে বলল, ‘ডাইলগটা আগে বলি তারপর তালি দিবি হতচ্ছাড়ারা।’ আমরাও আর ভুল করিনি। যদিও ফল্গুদা প্রতিবার ডাইলগ শেষ হবার পরেই হাত নেড়ে আমাদেরকে তালি দিতে বলে দিচ্ছিল ঠিক সময়ে। একবার তো উত্তেজনায় ফল্গুদা নিজেও তালি বাজাতে শুরু করে দিয়েছিল। পরে অবশ্য নিজেকে সামলেও নিয়েছিল।
ফল্গুদা কিন্তু হুবুহু মুখস্ত করেছিল মানতেই হবে। এমন কী ব্র্যাকেটের ভেতরকার লেখা গুলোকেও ছাড়েনি। বিভীষণকে তাড়িয়ে দেবার সময় ফল্গুদা বলেছিল, ‘আমার সামনে থেকে দূর হয়ে যা রাক্ষস-কুল-কলঙ্ক তোকে আমি ব্র্যাকেটে ব্র্যাকেটে পদাঘাত করি।’ সমস্ত দর্শক হতবাক হয়ে গিয়েছিল ফল্গুদার ডাইলগ বলার ধরণ দেখে। এতদূর পর্যন্ত তেমন সমস্যা হয়নি। এরপর যা হল সেটা কল্পনার অতীত। বেশ কয়েক সিনে ফল্গুদার কোনও রোল ছিল না। ফল্গুদা ভেবেছিল এই ফাঁকা সময়ে ঘর থেকে একবার গরু-মোষগুলোকে দেখে আসা দরকার। যেমন ভাবা তেমন কাজ। ফিল্গুদার বাড়িটাও লক্ষ্মীমেলা থেকে বেশি দূরে নয়। ফল্গুদা সাজঘরের পিছন দিক দিয়ে বেরিয়ে পড়ল গরু-মোষগুলোকে দেখে আসার জন্য। আমিও সঙ্গেই গিয়েছিলাম। যতই হোক চেলা বলে কথা।
সেই যে ফল্গুদার সঙ্গে আমি বেরিয়ে ছিলাম সারা রাতেও আর ফিরতে পারিনি। ফল্গুদার গরু-মহিষগুলো ফল্গুদাকে চিনত ঠিকেই কিন্তু তারা তো আর দশ মাথা রাবণকে চিনত না। সমস্যাটা হল সেখানেই। ফল্গুদা অন্ধকার গোয়াল ঘরে ঢুকতে না ঢুকতেই গরু-মহিষগুলো বিকট চিৎকার শুরু করেদিল। ফল্গুদা নরম গলায় নিজের পরিচয় দিল কিন্তু অবলা প্রাণীগুলো তাতেও মালিককে চিনতে পারল না। ফল্গুদা নানান ভাবে বোঝানোর চেষ্টা করল। ওরা কিছুতেই বুঝতে রাজি হল না। এরপর ফল্গুদা রাগের মাথায় একটা মহিষের লেজটা দিল মুচড়ে। মহিষটাও সঙ্গে সঙ্গে গলার দড়ি ছিঁড়ে দিল ছুট। তার দেখাদেখি বাকিগুলোও হাম্বা হাম্বা করে দড়ি ছিঁড়ে যে যেদিকে পারল ছুটতে শুরু করল। গরু-মহিষ-গুলোকে এদিক সেদিক ছুটতে দেখে আমি মনে মনে ভাবলাম, চুলোয় যাক ফল্গুদা। নিজে বাঁচলে বাপের নাম।

Hasir Bangla Golpo

আমি ফল্গুদাদের খড় গাদার উপর চড়ে চুপটি করে বসেছিলাম। ভয়ে বুকটা টিপটিপ করছিল আমার। গরু-মোষগুলো প্রথমে ঘরের উঠোনেই চক্কর কাটছিল। হয়তো অন্ধকারে দরজা দিয়ে বেরিয়ে যেতে সাহস পাচ্ছিল না। দেখছিলাম, কখনো ফল্গুদা গরু-মহিষগুলোকে তাড়িয়ে গোয়াল ঘরের দিকে নিয়ে যাচ্ছে কখনো আবার গরু-মহিষ-গুলো ফল্গুদাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। আমি ভয় পাচ্ছিলাম দ্বিপদ চতুষ্পদের যুদ্ধে আমার না বিপদ হয়ে যায়।
সুযোগ বুঝে পিছনের দরজা দিয়ে পালাতে যাব এমন সময় চোখ পড়ল একটা মহিষের উপর। মহিষটা প্রাণপণ ছুটছে আর ফল্গুদা ডান পায়ে করে মহিষের দড়িটা ধরে প্রায় উড়তে উড়তে পিছনে যাচ্ছে। আমি আবার হাত তালি দিয়ে বললাম, ‘শাবাশ ফল্গুদা শাবাশ।’
জ্যোৎস্নার আলোয় ধানের ক্ষেত মাড়িয়ে ফল্গুদা মহিষটার পিছনে যাচ্ছে। আমিও ছুটছি পিছনে পিছনে। লক্ষ্মীমেলার থেকে তখনো ভেসে আসছে সীতার করুণ কান্না। ছুটতে ছুটতে কিছুদূর যাবার পরেই একটা মুণ্ডু কুড়িয়ে পেলাম। ভাগ্যভাল মুণ্ডুটা রাবণের ছিল ফল্গুদার নয়। আরও কিছুটা আসার পরেই পেলাম ফল্গুদার ধুতিটা। তারপরে পেলাম, একটা জুতা আরও তিনটা মুণ্ডু। শেষ পর্যন্ত একটা গাছের তলায় পেলাম ফল্গুদাকে। মহিষটাকে দেখতে পেলাম না। ফল্গুদার কাছে গিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে জিজ্ঞেস করলাম, ‘মহিষটাকে ছেড়ে ফেললে ফল্গুদা ?’
আমার কথায় বিরক্ত হয়ে ফল্গুদা বলল, ‘ আমি ছাড়িনি ওই আমাকে এই যাত্রায় ছেড়ে দিল।’
এতক্ষণ যাত্রার কথা খেয়ালেই ছিল না। ফল্গুদার মুখে যাত্রা কথাটা শুনতেই খেয়াল হল, পূবের আকাশ লাল হয়ে আসছে। আমি চিৎকার করে বললাম, ‘ফল্গুদা তোমার রোল।’
‘হাঁ এই জন্মে আমার আরও কিছু রোল আছে তাই বেঁচে গেলাম।’
ফল্গুদার কথা আমার মাথায় ঢুকল না ঠিকই কিন্তু এটুকু বুঝতে পারলাম, ফল্গুদা মহিষটাকে ধরেনি মহিষটাই ফল্গুদাকে ধরে এনেছে। পরে শুনেছিলাম মহিষের গলার দড়িতে কেমন করে ফল্গুদার পা পেঁচিয়ে গিয়েছিল। সেদিন সকালে বাড়ি ফেরার সময় পিছনের ব্যথায় ফল্গুদা ঠিক ভাবে হাঁটতেও পারছিল না। আমি জীবনে অনেক গরু-মহিষকেই জমিতে মই দিতে দেখেছি, কিন্তু ফল্গুদার মতো পিছন রগড়ে পাকা ধানে মই দিতে দেখিনি। বাড়ি ফেরার সময় ফল্গুদার আরেকটা জুতা আর বাকি মাথা গুলোও খুঁজে পেয়ে ছিলাম সেদিন।
বাড়ি ফেরার পর গ্রামের মানুষ যখন সব শুনেছিল আর ফল্গুদার অবস্থা দেখেছিল তখন আর রাগ করেনি। আমি শুয়ে শুয়ে ঠাকুমাকে পুরো গল্পটাই বলেছিলাম। ঠাকুমা বলেছিল, ‘রাবণ যখন সীতাকে হরণ করে নিয়ে গিয়েছিল সীতা মা তখন শরীরের গয়নাগুলো ফেলতে ফেলতে গিয়েছিলেন।’ আমি মনে মনে ভেবেছিলাম, রাবণ মনে হয় ফল্গুদার মহিষটার চেয়ে বেশি নির্দয় ছিল না। সীতা তো নিজের গয়না ফেলতে ফেলতে গিয়েছিল কিন্তু ফল্গুদা ফেলতে ফেলতে যায়নি। ফল্গুদার খুলতে খুলতে গিয়েছিল। এখনো ফল্গুদাকে দেখলেই সীতাহরনের সেই রাতটা মনে পড়ে যায়।
Hasir Golpo
                                                                                  [সমাপ্ত]
Spread the love

Leave a Reply