Loading...
Loading...

Adhunik Bangla golpo, chobol

Adhunik Bangla golpo, chobol
গল্প, ছোবল

ছোবল

বাপ্পাদিত্য মুখোপাধ্যায়

আপনি যদি Adhunik Bangla golpo পড়তে ভাল বাসেন তাহলে এই Bangla

golpoti আপনার মনে দীর্ঘদিন দাগ কেটে রাখবে। গল্পটি কেমম লাগল অনশ্যই জানাবেন৷

Adhunik Bangla golpo 2019-2020

বাস স্ট্যান্ডে নেমে সিগারেট কেনার সময় মোটেই খেয়াল করি নি  সিগারেটটা ধরিয়ে মুখ তুলতেই, হতবাক! দিনের আলোয় ভূত দেখলেও আমি এতটা অবাক হতাম না। সিগারেটের ধোঁয়াটা বেমালুম গিলে নিয়ে নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করলাম, লুধি হাতিরামপুরে…?

আবার যে কোনদিন লুধির সঙ্গে দেখা হবে সেটা আমি স্বপ্নেও ভাবিনি! চুলোয় যাক বন্ধুর বিয়ে। সিগারেটে দুটো টান দিয়ে লুধিকে বললাম, ‘একটা পান।’
লুধি ফিক করে হেসে চোখ দুটোকে আমার চোখের উপর মেলে দিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কোনসা পান দিবে বাবু ষাট তুলসী না ষাট চৌষট্টি…?’
ও ভাল মতোই জানে আমি কোন জর্দা খেতাম। বিরক্তি নিয়েই বললাম, ‘যেটা খুশি দে।’
লুধি কাঁচের চুড়িতে টুং টাং শব্দ তুলে মুহূর্তে পান বানিয়ে আমার হাতে ধরিয়ে দিল। বিনা খয়ের তুলসী চৌষট্টি চমন এলাচ। জানতাম ওর মনে আছে।
Bangla choti golpo পড়ুন এখান থেকে
আমি আর এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে সামনের লজটায় গিয়ে উঠলাম। ‘বারে বারে ঘুঘু তুমি খেয়ে যাও ধান…’ মনে মনে ঠিক করে নিলাম এবার লুধি রহস্য সমাধান করেই ছাড়ব। আমাকে জানতেই হবে কে এই লুধি! কেনই বা ও এক জনের পর আরেক জনকে দংশন করেই চলেছে ?
বিকেলে লজের ফাস্ট ফ্লোরের বারান্দায় একটা চেয়ার নিয়ে বসে রাস্তার দিকে তাকিয়ে দেখছিলাম লুধির পানসাজা। ওর চেহারার ধার কিংবা হাতের স্পিড কোনটাই কমে নি। বিকেলের পড়ন্ত রোদ লুধিকে আরও বেশি জ্যান্ত করে তুলেছে।
এক
সাত বছর আগের কথা। সেই সময় সময় আমাদের গ্রামে খুব একটা অটো চলত না। তার উপর গ্রীষ্মের দুপুরে কেউ অটো করে আসবে সেটা ছিল কল্পনার অতীত। কিন্তু সেদিন যখন হরি মন্দিরের চাতালে বসে তাস খেলছিলাম দেখলাম কারা অটো করে গ্রামের দিকে এগিয়ে আসছে। ভেবেছিলাম ওই পাড়ার আচার্যদের কেউ হবে হয়ত। কিন্তু অটোটা এসে দাঁড়াল ঠিক হরি মন্দিরের সামনেই। দেখলাম অটো থেকে নামছে পদু। পদু মানে আমাদের পাড়ার প্রদ্যুত মণ্ডল। কিন্তু চিনতে পারছিলাম না ওর সঙ্গের মেয়েটিকে। তাই অবাক ভাবেই তাকিয়ে ছিলাম মেয়েটির দিকে। পদু রাঁচিতে কাজ করে জানতাম কিন্তু কী কাজ করে সেটা জানতাম না। মেয়েটি অটো থেকে নেমে আমাদের দিকে কেমন ভাবে যেন তাকিয়ে ছিল। দেখতে বিশেষ কিছুই নয়। কিন্তু একবার তাকিয়ে দেখলে আরেকবার তাকাতেই হবে এমন একটা আকর্ষণ ছিল ওর চোখে মুখে। উজ্জ্বল শ্যামল বর্ণ গায়ের রঙ। নিটোল শরীরের বাঁধন। দু’হাত ভর্তি কাঁচের চুড়ি। কোমরে শক্ত করে শাড়িটা এমন ভাবে পরেছিল যেন অনিচ্ছাতেই পেটের কিছুটা অংশ বাইরে বেরিয়ে এসেছে। তবুও বলব শরীর বা পেট নয় ওর চোখ দুটোতেই ছিল জাদু। সেটা প্রথম বার দেখেই বুঝতে পেরেছিলাম। যেন শত জন্মের করুণা কুড়িয়ে রেখেছে দু’চোখে।
সেদিন বিকেল বেলাতে পদুর কাছে শুনলাম মেয়েটার নাম লুধি। রাঁচিতে পদুর সাথেই এক চাল মিলে কাজ করে মেয়েটা। ইলেকট্রিক চুরির দায়ে মিলের মালিক ধরা পড়ায় মিলে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছে পুলিশ। তাই নিরাশ্রয় লুধিকে পদু সঙ্গে করেই নিয়ে এসেছে গ্রামে। আরও কত কিছুই না সেদিন পদু বলেছিল আমাদের…
কয়েকদিন পদুর বাড়িতেই ছিল লুধি। কিন্তু পদুর বৌয়ের গালাগালির চোটে শেষ পর্যন্ত ওর জায়গা হয়েছিল আমাদের গ্রামের মাটির ক্লাব ঘরটায়। কয়েক মাসেই মনসামাতা ক্লাব হয়ে গেল ‘লুধির দোকান’। ছেলে বুড়ো চ্যাংড়া যে যখন পারত আড্ডা দিতে যেত লুধির দোকানে। চা চপ দিয়ে চলতে শুরু করে একদিন দোকানটায় পান বিড়ি সিগারেট গুটকা সবেই ঢুকল লাইন দিয়ে। কয়েক মাসেই লুধির দোকানটা ফেঁপে ফুলে উঠেছিল। রাত ন’টার পর দোকান বন্ধ হয়ে যেত। তবে মাঝে মাঝে দোকান বন্ধ হওয়ার পরেও দেখতাম জানালার ধারে ছায়া মূর্তির মতো একটা দুটো লোক কী যেন লুকিয়ে নিয়ে যাচ্ছে চুপিচুপি। পরে জেনেছিলাম লুধি রাতের বেলায় চোলাই মদ বিক্রি করে। মনসা পূজার বিসর্জন কিংবা লক্ষ্মী পূজার রাতে আমারও গিয়ে যখন জানালায় টোকা দিতাম ভেতর থেকে লুধি ঘুম জড়ান গলায় একটা কথাই জিজ্ঞেস করত, ‘সিক্সটি… ?’ তারপর বোতল ধরা একটা হাত জানালার ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে বোতলটা ধরিয়ে দিত। আবার টাকা নিয়ে হাতটা ঢুকে পড়ত ঘরের ভেতর। সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ হয়ে যেত জানালাটা।
দুই

Notun Bangla golpo

সেদিন ছিল চৈত্র সংক্রান্তি। গ্রামের শিব মেলার মাঠে মেলা বসেছিল প্রতি বছরের মতো। বন্ধু-বান্ধব মিলে চাঁদা করে যা টাকা জোগাড় হয়েছিল তাতে রামের একটা ফাইল অনায়াসে কেনাই যেত। কিন্তু দোকানে রাম কেন ভদকা অফিসার চয়েস কিছুই পাওয়া যায় নি সেদিন। অগত্যা বাধ্য হয়েই কয়েক জনে মিলে গিয়েছিলাম লুধির দোকানের জানালার সামনে। জানালায় টোকা দিতে যাব ঠিক এমন সময় শুনেছিলাম পদু গম্ভীর গলায় ফিস ফিস করে বলছে, ‘কী কইর‍্যা সম্ভব…? আমি পত্ত্যেক বার তো পইর‍্যা ছিলম। দ্যাক লুধি অন্যের পাপ আমার ঘাড়ে দিবার চেষ্টাটা করিস না, ধম্মে সইব্যেক নাই।’
সাপের মতো ফোঁস করে উঠেছিল লুধি, ‘তুর লজ্জা সরম নাহি আছে পদু ? বল থাইকল্যে কী কুঞ্জকে গলায় দড়ি দিতে হুতুক। আর লাই হাম দুনুকো রাঁচি ছোড় না হুতুক।’ লুধি বলত ওর ভাষা খোট্টা। আমরা বলতাম হিংলা না হিন্দি না বাংলা। আর একটা কথাও সেদিন রাতে বলেনি পদু। আমরাও অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ফিরে গিয়েছিলাম। তবে সেদিন রাতেই বুঝতে পেরেছিলাম কিছু একটা রহস্য অবশ্যই আছে ওদের রাঁচি থেকে চলে আসার পিছনে।
অবাক হয়ে ছিলাম সেদিন, যেদিন সকাল বেলায় পুলিশ এসে ধরে নিয়ে গেল পদুকে। আর সেদিনেই লুধি নিরুদ্দেশ হয়েছিল বংশীর সাথে। বংশী মাঝে মাঝে মদ কিনত। লুধিকে টাকা ধার দিত। এগুলো জানতাম। কিন্তু বউ বাচ্চা ফেলে বংশী কোনদিন লুধির সাথে পালিয়ে যাবে সেটা কল্পনার অতীত ছিল। লুধি আসার আগে ক্লাবটা যেমন ফাঁকা পড়েছিল যেদিন লুধি উধাও হল সেদিন ও ঠিক তেমনেই ফাঁকা পড়েছিল। তবে লুধির দোকান আর কোনদিনেই ক্লাব হয় নি।
এক একটা দিন কাটতে কাটতে পেরিয়ে গেল সাতটা বছর। কালবৈশাখী ঝড়ে লুধির দোকান গুড়িয়ে যাবার পর লুধির কথা আর কারুর তেমন ভাবে মনেও ছিল না। আমারও না। গেল তিন মাস আগে আমার ভোটরে ডিউটি পড়েছিল বর্ধমান জেলার গুস্করা গ্রামের একটা বুথে। ভোটের আগের দিনেই সকাল সকাল আমাদের পৌঁছাতে হয়েছিল গুস্করা। আমি ভেবেছিলাম নতুন গ্রাম একটু ঘুরে-টুরে দেখা যাক। পাইলেও পাইতে পারি লেখার সম্বল। তা আমি যে গ্রামে ঘুরতে গিয়েছিলাম সেটার নাম ছিল রামচন্দ্রপুর। বিকেলের হালকা হাওয়াটা গায়ে মাখতে বেশ ভালই লাগছিল। রামচন্দ্রপুরের চৌরাস্তার মোড়ে পৌঁছে যখন দেখলাম একটা দোকানে গরম গরম শিঙাড়া ছাঁকছে ? আমার জিবেও জল এসে গেল। একটা ফাঁকা চেয়ার পেয়ে টুক করে বসে পড়েছিলাম রাস্তার ধারেই। পাশে বসে থাকা এক ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘তা বাবু কি গ্রামে নতুন নাকি? আগে দেখেছি বলে মনে পড়ছে না তো।’ আমি ঠোঁটের কোনে একটা মিথ্যে হাসি এঁকে ঘাড় ঘুরিয়ে বলতে যাচ্ছিলাম, ‘আজ্ঞে হাঁ’ কিন্তু সেটি আমার আর বলা হল না। ঘাড় ঘোরাতেই চোখ পড়ল একটা পানের দোকানে। আর সেই দোকানে আপন মনে খদ্দেরকে পান সেজে দিচ্ছে লুধি। আমি হাঁ করে চেয়েছিলাম লুধির দিকে। ‘তা বাবুর বলতে যদি একান্তই আপত্তি থাকে তাহলে না হয় থাক।’ ভদ্রলোকের কথায় আমি লজ্জা পেয়ে গিয়েছিলাম। কী জানি লুধির দিকে তাকিয়ে থাকাটা উনি কোন নজরে দেখে ছিলেন। যাই হোক ভদ্রলোককে নিজের পরিচয় বিস্তারিত ভাবেই দিতে হয়েছিল। চা শিঙাড়া খেতে খেতে আলাপ জমেও উঠেছিল বেশ। উনার মুখেই শুনে ছিলাম মেয়েটি মানে লুধি এক দুই মাস আগে একদিন ধীমান মজুমদার বলে এক জনের সাথে এখানে এসেছে। তার পর এক রকম ভাবে ধীমান মজুমদারের স্ত্রীর জায়গা দখল করে বসেছে। চা শিঙাড়া খাওয়ার পর ইচ্ছে করেই সিগারেট কিনতে গিয়েছিলাম লুধির দোকানে। ভেবেছিলাম বংশীর কথা জিজ্ঞেস করব। কিন্তু যখন দেখলাম লুধি আমাকে দেখে বিন্দুমাত্র আশ্চর্য হল না তখন আর কিছু জিজ্ঞেস করতে পারি নি। ভেবেছিলাম ভোট ভালভাবে চুকে যাক তারপর হাটে এসে হাঁড়ি ভাঙব।
তিন
সেদিন ভোট শেষ হতে পাঁচটা বেজেছিল। বাকি কাজ সারতে সারতে ছটা পেরিয়ে গিয়েছিল বলে আর বেরোবার সময় পাই নি। সি-আর-পি-এফ টিমের সঙ্গে বাকিরা বেরিয়ে গিয়েছিলেন ভোটের দিন সন্ধ্যা বেলাতেই। আমি বিরেন বাবুকে সব কিছু বুঝিয়ে দিয়ে ওখানেই থেকে গিয়েছিলাম। পরেরদিন সকালে যখন রামচন্দ্রপুর গেলাম তখন দেখি চৌরাস্তার মোড়ে বেশ ভিড় জমেছে। গিয়েই শুনলাম ভোররাতের ট্রেনে পালিয়ে গেছে লুধি। সাথে দোকানের সমস্ত জিনিশ পত্র নিয়ে ভেগেছে। সেদিন আমার মাথার ভেতর হাজারটা প্রশ্ন কিলবিল করছিল। কিন্তু সেদিন কাউকে কিছু বলতে পারি নি।
‘বাবু আপনার চা’- লজের পুচকে ছেলেটার ডাকে যখন আমার সম্বিৎ ফিরল তখন আকাশ আলো করে তারা বেরিয়ে এসেছে। লুধির দোকানে দেখলাম বেশ কিছু খদ্দেরের ভিড়। বুঝতে পারলাম এখানেও লুধি বেশ জমিয়ে নিয়েছে ব্যবসাটা। কী জানি এখানে কাকে কামড়ে ও আবার পাড়ি দেবে অচেনা এলাকার সন্ধানে। বাচ্চাটা চায়ের কাপ নিয়ে ফিরে গেলে আমিও ওর পিছু পিছু রুমে ঢুকি। পূব দিকের জানালাটা দিয়েও পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে লুধির দোকানটা। কিন্তু এখান থেকে লুধিকে ঠিক দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না। হঠাৎ খেয়াল হল মোবাইল ভাইব্রেসেন হচ্ছে। মোবাইলটা যে এতক্ষণ বিছানায় রাখা ছিল সেটা আমার খেয়াল ছিল না। ফোনটা ধরতেই ওপার থেকে নীলয় চিৎকার করে বলে উঠলো, ‘শালা হারামি জানতাম তুই আসবি না। তো না আসিস নাই কমসেকম ফোনটা তো ধরতে পারিস। চেনা হয়ে গেল ভাই তোকে। তোর বিয়েও হবে একদিন।’ কোনও উত্তর দেবার সুযোগ না দিয়েই নীলয় লাইনটা কেটে দিল। আমি আর কল-ব্যাক করলাম না। নীলয়ের বিয়েতে যেতে না পারার জন্য খারাপ লাগাটা আমার আজীবন থাকবে।
কিছুক্ষণ পর একটা সিগারেট ধরিয়ে জানালার কাছে গিয়ে দেখি লুধি দোকান বন্ধ করে চলে গেছে। খানিক আগেও দোকানে ভিড় ছিল, এরেই ভেতর লুধির দোকান বন্ধ করার কোনও উপযুক্ত কারণ খুঁজে পেলাম না।
রাতে আমার আর ঘুম এলো না। শুয়ে শুয়ে তারাশঙ্করের ‘কবি’ উপন্যাসটা পড়ছিলাম। রাত্রি তিনটা নাগাদ লুধির দোকানের ভেতর থেকে হালকা আলো বেরিয়ে আসতে দেখে ছুটে বেলকনিতে গিয়ে দাঁড়ালাম। আলো অন্ধকারে পরিষ্কার দেখা না গেলেও একটা ছায়া মূর্তি যে বড় বস্তার মতো কিছু একটা নিয়ে…। আর কিছুই বুঝতে আমার বাকি রইল না। দৌড়ে নিজের রুমে এসে ব্যাগ গুছুয়ে আমিও বেরিয়ে পড়লাম। রুমের চাবিটা নীচের হল ঘরে ম্যানেজারের টেবিলে নামিয়ে দিলাম বার হওয়ার সময়।
মেঠো পথ ধরে এগিয়ে যাচ্ছে লুধি। আমি বেশ কিছুটা দূরত্ব বজাই রেখে ওর পিছনে পিছনে চলছি। ভোরের আলো ফুটতে এখনো অনেক সময় বাকি। লুধির পিছু পিছু কিছুদূর চলার পর এক সময় দেখলাম আরও একটা ছায়া মূর্তি দাঁড়িয়ে আছে মেঠো পথের ধারে। কেন জানি না আমার বুকটা একটা অজানা আতঙ্কে কেঁপে উঠল এবার। লুধি তাহলে একা নয়…!
মনে মনে ভাবলাম যা হবার হবে, শেষ দেখেই ছাড়ব। ওদের পিছনে পিছনে আমি আবার চলতে শুরু করলাম। বেশ কিছুক্ষণ পিছু হাঁটার পর ঝাপসা ভোরের আলোয় দেখতে পেলাম লুধির সঙ্গে যে আছে সে পুরুষ। চাদরে মাথা অবধি ঢেকে রেখেছে লোকটা। শেষ পর্যন্ত ওরা দুজনে এসে দাঁড়াল একটা ফাঁকা মাঠে। কাঁচা রাস্তার ওই পারে। আমি এই পারে একটা শেয়াকুল ঝোপের আড়ালে। এই দিকটা নানান লতা-পাতা ঝোপ-ঝাড়ে ভর্তি। সঙ্গে মশার আপ্যায়ন। সাপ থাকটাও আশ্চর্যের নয়।
কিছুক্ষণ পরেই একটা মানুষ বোঝাই ট্রাক এসে দাঁড়াল মাঠটায়। আমি হামাগুড়ি দিয়ে আরও কিছুটা এগিয়ে এলাম। ট্রাক থেকে একে একে নামল প্রায় জনা তিরিশ পুরুষ, মহিলা। সঙ্গে প্রায় পনের কুড়িটা বাচ্চা ছেলে মেয়ে। এমন পুরুষ মহিলা অনেকবার হাওড়া কিংবা খড়্গপুর ষ্টেশনে দেখেছি। দেখেছি নানান বাস স্ট্যান্ডেও। সাধারণত এদের মুখে একটাই বুলি শোনা যায়, ‘এ বাবু দয়া করে এক টাকা আট আনা দিয়ে যা।’ বাচ্চা গুলো মায়ের গর্ভ থেকেই এই বুলিটা শিখে আসে। কিছুক্ষণ পর শুরু হল বাচ্চা গুলোর ভাগ বাটোয়ারা। বুঝতে পারলাম এরা নিজেদের পছন্দ মতো বাচ্চা নিয়ে ভিক্ষা করে।
ভোরের আলো একটু উজ্জ্বল ভাবে ফুটে উঠতেই লোক গুলো একে একে বেরিয় পড়ল যে যার পথে। ভিড়টা একটু কমতেই দেখতে পেলাম, লুধি একটা লোকের কলার ধরে কী সব বলে যাচ্ছে। বাচ্চা গুলোর মুখে হাসি কান্না কিছুই নেই। পিতৃ পরিচয়হীন পৃথিবীতে জন্ম নেবার পাপে তারা যেন কবেই বোবা হয়ে গেছে।
চার

Modern Bangla golpo

সকাল হয়ে এসেছে। আমি এক মনে লুধির দিকে তাকিয়ে দেখছিলাম ও কেমন ভাবে এক একটা বাচ্চাকে তুলে দিচ্ছে অবৈধ সব মায়ের কোলে। ঠিক এমন সময় পিছন থেকে কে একজন আমার কাঁধে হাত রাখল। আমি চমকে গিয়ে পিছন ফিরতেই দেখলাম, পদু। নিজের চোখকেই যেন বিশ্বাস হচ্ছে না। আমি কিছু বলে ওঠার আগেই পদু নিজেই বলল, ‘কাইল র‍্যাইতে লুধি আমাকে ফোন কইর‍্যা বইল্যেছে তোর কতা। তাই আমি নিজেই টুকু গিহে উহাকে আইনলম। কিন্তু আমাদের পিছু পিছু তুই এতদূর…?’
আমি পদুর কথায় কান না দিয়ে সরাসরি জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুই জেল থেকে ছাড়া কবে পেলি ?’
পদু লুধির দিকে একবার আড়চোখে তাকিয়ে নিয়ে ফিস ফিস করে বলল, ‘জ্যেল আমার তো হয় নাই। জ্যেল তো বংশীর হইছে।’
আমি হতভম্ব হয়ে আবার জিজ্ঞেস করতেই যাচ্ছিলাম, সেটা কী করে সম্ভব! কিন্তু তার আগেই পদু উত্তরটা নিজেই দিল, ‘আমি কাইজ ছাইড়্যা দিলে আমাকেই জ্যেল খ্যাইটতে হত। কী জানি লুধি আর করুণা মল্লিক কেমন কইর‍্যা বংশীকে ফ্যাঁসাইছে। তবে অনেক টাকা লাইগ্যাছে বটে।’
পদুর কথার মাথা মুণ্ডু কিছুই বুঝতে না পেরে বাধ্য হয়েই জিজ্ঞেস করতে হল, ‘কে এই করুণা মল্লিক ? তোর কথার মাথা মুণ্ডু আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।’
পদু আমার পাশে ধপাস করে বসে পড়ল। তার পর বলল, ‘করুণা মল্লিকেই তো রাঁচির চাল মিলের মালিক ছিলেক। যেখানে আমি আর লুধি কাইজ কইত্তম। লুধির সাতেই মালিকের আসল পিরিতি বুজলি। কুঞ্জ নামের একটা সাঁওতাল বিটিছাও কাজ কইত্ত। ওই কুঞ্জিরটাকে খাবার ল্যাইগে শালা…।’ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পদু। তারপর আবার বলে, ‘একদিন র‍্যাইতে মদ খ্যাইয়ে শালা কুঞ্জর ইজ্জত লিল। বাঁশটা গেল আমার। পিসিটিবি না কী একটা ক্যামেরাতে আমার ভিডিও উইঠ্যাছিল। তো হ্যাঁরে র‍্যাইতে আমার ডিবটি থাইকল্যে কার ভিডিও উইঠব্যাক ?’ আবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পদু। আড়চোখে আবার একবার লুধির দিকে তাকায়। লুধি এখন আপন মনে বসে পান সাজছে নিজের জন্যে। আমি পদুকে শুকনো গলায় জিজ্ঞেস করলাম, ‘তারপর ?’
পদু আবার বলতে শুরু করে, ‘তারপর আর কী! সেই র‍্যাইতেই কুঞ্জ মিলের ভিতরিতে গলায় দড়ি লিলেক…’ গল্পটার মাঝ পথে পদু একটা বিড়ি ধরিয়ে নেয়, ‘আমি যখন লুধিকে সব খুইল্যে বল্ল্যম লুধিও আমার সাতেই পলাই আইল। শালা আমি ভাইব্যা ছিলম লুধি মনে হয় আমাকে ভালবাসে। সব ওই শালা করুণার বাবুর চালাকি। আমি পুলিশের হাতে পইড়ল্যে উহারো তো বাঁশ ছিল। বিটি ছ্যেইলা পাচার, ভিকারি ব্যবসা, গাঁজার ব্যবসা সবেই তো আমি জানি। পিছনটায় ভয় ছিল বল্যেই না লুধিকে সাতে পাঠ্যাই ছিল।’
সবেই বিশ্বাস করলাম কিন্তু জায়গা বদল করে পুরুষ বদল করে লুধির দোকান করার ব্যাপারটা মাথায় ঢুকছিল না কিছুতেই। জানতে চাইলে পদু বলে, ‘ওই মাগীটাই তো সবের মূল। দোকান কইর‍্যা শুরু করে তারপর মদ গাঁজা ভিকারি সব ঢুকায় শালি। পুরা এলাকাটাকে বিষাক্ত করে। কত ম্যেয়াকে পাচার কইর‍্যে দিল কে কী ছিঁড়্যেছে উয়ার। তোর জন্যে বদ্ধমানের গুস্করাতে অনেক লস হইছ্যে। করুণা বাবু তোকে পাইল্যে ছ্যাইড়ব্যেক নাই…’
ঠিক এমন সময় মোবাইলে কার সাথে কথা বলতে বলতেই লুধি ডাক দেয় পদুকে, ‘আরে ওই পদুয়া। শালা কামচোর কহিঁকা। গাঁজা টানতে এত সময় লাগতাহে তোর। সুমুকপাহাড়ির হাটে দুকান বসাতে তুর বাপ যাবেক ?’ লুধির ডাক শুনেই পদুর মুখটা পাংশু হয়ে যায়। পদু তাড়াতাড়ি বুক পকেট থেকে কয়েকটা একশ টাকার নোট বের করে আমার হাতে দিয়ে বলে,  ‘আমার বৌটারে দিস। তবে বলিস না মাইরি আমি দিছি। আমি জ্যেলে আছি শুইন্যাই উহারা ভাল থাক।’ কথাটা বলেই পদু ছুটে পালিয়ে যায়। আমি আর বলার সুযোগ পেলাম না যে ওর বৌ এক বছর হল ক্যানসারে মারা গেছে। পদু যাওয়ার পর কেন জানি না আমার চোখ দুটোতে অকারণে জল ভরে আসে।
পদু আমার কাছ থেকে ফিরে গেলে নির্জন রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে লুধি নাগিনীর মত পেঁচিয়ে ধরে পদুর ছিপছিপে শরীরটাকে। তারপর পদুর ঠোঁট দুটো কামড়ে পাগলের মতো চুষতে থাকে। লুধির ডাগর বুকের থেকে শাড়ির আঁচলটা লাল ধূলার উপর খুলে পড়ে।
নির্লজ্জ দেহের পিপাসা দেখতে না পেরে আমি মুখটা পিছন দিকে ঘুরিয়ে নিয়েছিলাম। কিচ্ছুক্ষণ পর একটা গাড়ির শব্দ পেয়ে আবার পিছন ফিরে তাকাই। দেখি লুধি একটা লাল মারুতিতে চড়ছে। কালো কাঁচের ভেতরকার ড্রাইভারকে দেখা যাচ্ছে না। মারুতিটার সিটে বসে জানালা দিয়ে হাত বের করে আমাকে দেখিয়েই যেন কিছু একটা বলছে লুধি। ওর ডান হাতের দুটো আঙুলকে সাপের জিবের মত নাড়াচ্ছে বারবার। তাহলে কী লুধি আগেই জানতে পেরেছিল আমার উপস্থিতি…? গাড়িটা ঝড়ের বেগে লাল ধুলো উড়িয়ে হারিয়ে গেল পশ্চিমের দিকে।
আমি উঠে দাঁড়াতে গিয়ে দেখি পদু মাটিতে উবুড় হয়ে পড়ে ছটফট করছে। সঙ্গে সঙ্গে আমি ঝোপ ঝাড় গুলো সরিয়ে ছুটে যাই পদুর কাছে। গিয়ে দেখি লাল মাটিটা রক্তে ভিজে আরও বেশি লাল হয়ে উঠেছে। ধূলায় মুখ গুঁজে কাতরাচ্ছে পদু। আমি পদুকে কোনও রকমে চিৎ করে শোয়াতেই দেখি, ওর বুকে একটা ইঞ্চি ছয়েকের ছুরি গাঁথা আছে। শুধু তাই নয় পদুর ঠোঁটেরো কিছুটা অংশ কেটে গড়িয়ে পড়ছে রক্তের ধারা। পদু কিছু একটা বলার চেষ্টা করছে। পারছে না কিছুতেই। বারবার চেষ্টা করেও যখন পদু কিছুতেই কিছু বলতে পারল না তখন আমি কিংকর্তব্য জ্ঞান হারিয়ে ওর বুকের থেকে ছুরিটা টেনে বার করি। সঙ্গে সঙ্গে বেশ কিছুটা রক্ত উপচে পড়ে পদুর বুক থেকে। তারপরেই ধীরে ধীরে নিথর হয়ে যায় ওর শরীরটা।
ভেবেছিলাম এখানেই সব শেষ! কিন্তু বিধাতা আমার ভাগ্যে অন্য কিছুই লিখে রেখেছিলেন হয়তো। চোখের সামনে ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে পুলিশ ভ্যানটা। আমার আর কিছু বুঝতে বাকি নেই।পালিয়ে যাওয়ার মতো কোনও রাস্তাও খোলা নেই। লুধির বিছিয়ে দেওয়া জালে এখন সম্পূর্ণ ভাবে জড়িয়ে পড়েছি আমি।
[সমাপ্ত]
Share

Recent Posts

Top 100 good morning flower images free download
  • good morning images

Top 100 good morning flower images free download

Top 100 good morning flower images free download. Good morning HD image with quotes, 100 good morning quotes. Good morning… Read More

1 day ago
Ishwar Chandra Vidyasagar Rachana for madhyamik and HS
  • সাহিত্য আলোচনা

Ishwar Chandra Vidyasagar Rachana for madhyamik and HS

Ishwar Chandra Vidyasagar Rachana is very important for all classes এবছর Madhyamik 2020 এবং Uchch Madhyamik 2020 এর জন্য Ishwar… Read More

4 days ago
bangla choties app download android
  • Bangla choti

bangla choties app download android

[smartslider3 slider=2] If you want to bangla choties app download android then please visit here. Bangla choties app available here.… Read More

4 weeks ago
bangla serial and bangla serial video
  • Bangla serial

bangla serial and bangla serial video

Bangla serial :- আপনি কি Bangla serial দেখতে বা Bangla serial video দেখতে খুব ভালবাসেন? তাহলে এই লেখাটা আপনার জন্য।… Read More

4 weeks ago
Bangla Kobita 1970-2020
  • Bangla kobita
  • Bangla Kobita abritti
  • Bangla love kobita

Bangla Kobita 1970-2020

Bangla kobita আশির দশক থেকে বর্তমান পর্যন্ত বিভিন্ন ধারায় প্রবাহিত। বাংলা কবিতার দিক বদল হয়েওছে একাধিক শক্তিশালী কবির হাত ধরে।… Read More

4 weeks ago
Bangla choti part2 Mami choti
  • Bangla choti

Bangla choti part2 Mami choti

Bangla mami choti:- বাংলা চটি সাহিত্যেরই আরেক 'সম্পদ'। হীরে নয় কিন্তু কয়লার মতো যার কদর। ছেলে বুড়ো প্রায় প্রত্যেকেই Bangla… Read More

4 weeks ago