X

হাসির গল্প- দমফাটা হাসির গল্প পটানি পাথর। হাসতে হাসতে আপনার পেট ফেটে যেতে পারে। দাঁত খুলে যেতে পারে। আপনি লুটিয়ে পড়তে পারেন।

দমফাটা হাসির গল্প

দমফাটা হাসির গল্প, পটানি পাথর

বাপ্পাদিত্য মুখোপাধ্যায়

‘নিমাই-দা তাহলে শেষ পর্যন্ত বৌদির মান ভাঙাতে পারলে তাই তো ?’ বাসের জানালা দিয়ে পানের পিকটা ফেলে মুখটা রুমালে মুছতে মুছতে জিজ্ঞেস করল নলিনী।  নিমাই যেমনটি গম্ভীর ভাবে বসেছিল ঠিক তেমনটি বসে রইল। নলিনীর প্রশ্নের উত্তর দেবার কোনও প্রয়োজন মনে করল না। নিমাই আর নলিনী দুজনে এক অফিসে কাজ করে। দুজনেই বিবেকানন্দ কলেজের ছাত্র ছিল একদিন। নিমাই যখন থার্ড ইয়ার তখন নলিনী কলেজে ভর্তি হয়। সেই তখন থেকেই দুজনের পরিচয়। মাঝে মাঝে অফিস ছুটির পর দুজনে একটু আধটু ঘুরেও আসে। সুখ দুঃখের গল্প করে। কিন্তু আজ এত বছরেও কেউ কারুর বাড়ির দরজা মাড়ায়নি কোনও দিন।

নিমাইকে চুপ করে থাকতে দেখে নলিনী আবার জিজ্ঞেস করে, ‘কি-গো নিমাই-দা কেশ জন্ডিস বলে মনে হচ্ছে। তোমার নীচের ঠোঁটটা একটু লালচে লালচে ঠেকছে। কৈ দেখি দেখি… হুম, একটু ফুলেও আছে। তোমাদেরেই তো কপাল দাদা। বিয়ের এত বছর পরেও প্রেমটা কমতে দাওনি। আর আমার বৌ! রণচণ্ডী। যমের অরুচি…’

‘তোর বৌ ক্রিকেট দেখে ? মানে এবারের আই পি এল দেখেছে ?’- বেশ গম্ভীর ভাবে প্রশ্নটা ছুড়ল নিমাই।

‘না। আমার বৌ বিকেল থেকে শুরু করে রাত দশটা পর্যন্ত ওই প্যানপ্যানানি সিরিয়াল গুলো দেখে। ওই সব খেলা-টেলার ধারেও ঘেঁষে না। আমাকেও ঘেঁষতে দেয় না ।’

‘আমার বৌ শুধু খেলা দেখে তাই নয়। খেলেও ভালো।’

‘মানে ?’

‘আমার ঠোঁটের এই রঙটা আর কপালের এই ফোলা জায়গাটা  ওর দুর্দান্ত ফিল্ডিং করার নিদর্শন। ভয়ে ভয়েই চলি প্রতি মুহূর্তে । যে কোনও সময় রান আউট হয়ে যেতে পারি।’

‘ক্রিকেট বুঝি না দাদা। যদি একটু…’

‘তোর বৌদি মানে আমার বৌ মতিবালা, এখন তো আর বালিকা নেই! কিন্তু কাজ এমন করে যা দেখলে বালিকারাও লজ্জা পাবে। দিনরাত শালা শুধু সন্দেহ আর সন্দেহ। আজকে সকালে আমার জামা কাচতে গিয়ে একটা লম্বা চুল পেয়েছে। সেটা নিয়েই এক সকাল গৃহযুদ্ধ হয়ে গেল। শেষে যখন দেখল ওর পরাজয় নিশ্চিত তখন কাপড় কাচা সাবানটাই ছুড়ে মারল আমার মুখে।’ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল নিমাই। তারপর আবার বলতে শুরু করল, ‘এটা প্রথমবার নয়। তবে আগে টিপ নিখুঁত ছিল না। দীর্ঘ দিনের প্র্যাকটিসে এখন অভ্রান্ত লক্ষ্য হয়েছে।’

নিমাই এর মুখ থেকে মহাভারত শোনার পর টুঁশব্দটুকুও করেনি নলিনী। নিজের মতো অফিসে ঢুকে কাজে মন দিয়েছিল।

নিমাই এর বৌ মতিবালার এই এক দোষ। না না সন্দেহের কথা বলছি না। জিনিশ ছুড়ে মারার কথা বলছি। যখন যেখানে যা পায় সেটাই ছুড়ে মারে নিমাইকে। এই কদিন আগেই এক সামান্য ব্যাপারে নিমাইকে এমন গ্লাস ছুড়ে মেরেছিল যে নিমাইয়ের মাথায় আলু গজিয়ে গিয়েছিল। যদিও নিমাই এখন স্ত্রীর মন পাবার আশায় মাথাটা আলু চাষের জন্যই উৎসর্গ করে দিয়েছে। তবুও কষ্টটা তো কষ্টই।

হাজার নিরাশা নিয়েও নিমাই এখন নানান ভাবে বৌকে ইমপ্রেস করার চেষ্টা করে। আজকেও অফিস থেকে ফেরার পরে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কোকিল কণ্ঠে নিমাই মতিবালাকে ডাকল, ‘বালু। বলি ও বালু। দরজাটা খোলো এবার।’ পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করেও ভেতর থেকে কোনও সাড়া শব্দ না পেয়ে নিমাই আবার ডাক দিল, ‘বালু। ও বালু…’ এবার আর দেরি হল না, দড়াম করে দরজাটা খুলে গেল। মতিবালার মুখটা দেখে প্রথমে ঘাবড়ে গিয়েছিল নিমাই। একটু পরে বুঝতে পারে ভয়ের কিছু নেই, মতিবালা মুখে বেসন মেখেছে। মতিবালার মুখের পানে চেয়ে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল নিমাই। ওকে সুযোগ না দিয়ে মতিবালা ক্যার-ক্যার করে উঠল পাতি কাকের মতো, ‘বুড়ো মিনষে মাথার আলু গুলো বুঝি মিলিয়ে গেছে তাই বালু বলে ডাকার হিম্মত হয়েছে আবার। এবার আলু নয় মাথায় বেলের চাষ করব।’ নিমাই বেগতিক বুঝে গুটি-গুটি ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ে।

মতিবালার মা মতিবালাকে বালু বলে ডাকত। একসময় নিমাইও ডেকেছে। কিন্তু সে তো মান্ধাতা আমলের গল্প। আজকে আর সেই সব সুখের দিন আর কোথায় ?

[দুই]

নিমাই মনে-মনে আজকে প্রতিজ্ঞা করেছিল, ‘মতিবালাকে যেমন করেই হোক আজ খুশি করেই ছাড়ব।’ সেই জন্য আজ অফিস থেকে হাফ-টাইম করে সিনেমার টিকিট নিয়ে এসেছিল। বেচারা নিমাই। এই সিনেমা যাবার দুর্বুদ্ধি না হলে হয়তো ওকে আজকে ঝাঁটার ঝাল খেতে হত না। নিমাই এরেই বা দোষ কী? পোস্টারে তো সিনেমার নাম ছিল, ‘জুরাসিক ওয়ার্ল্ড’ ঝাক্কাস হলিউড মুভি। কিন্তু সেটা যে পালটে যাবে নিমাই জানবেই বা কেমন করে। তাও পালটে কোনও ভাল সিনেমা লাগলেও হয়। লাগলি তো লাগলি এক্কেবারে “এ” মার্কা!

সারা শরীরের অসহ্য জ্বালায় নিমাই এর ঘুম আসছিল না। তাই পাশের ঘরে গিয়ে লাইট অন করে আয়নায় দেখছিল শরীরটা। সারা শরীর জুড়ে চাকা চাকা দাগ। হঠাৎ নিমাই এর মনে পড়ে গেল ছোটবেলার সহজ পাঠের পড়া, ‘বনে থাকে বাঘ গায়ে তার চাকা চাকা দাগ।’ গায়ের চাকা চাকা দাগ দেখে নিমাই এরও মুহূর্তের জন্য নিজেকে বাঘ বলে মনে হল। কিন্তু পরের মুহূর্তে মতিবালার মুখটা মনে পড়তেই বুকের বাঘটা আবার শুকিয়ে… পুনরায় মূষিক ভব। কিন্তু ভয় পেলে তো চলবে না, এবার বীরকে সাহস অবলম্বন করতেই হবে।

আজকে নলিনী অফিসে আসেনি দেখে নিমাই একটা সুযোগ পেল ওর বাড়ি যাবার। নলিনী বৌকে ভয় পায় না। হয়তো নলিনী কিছু একটা বুদ্ধি অবশ্যই দিতে পারবে। অনেক খোঁজা খুঁজির পর শেষ পর্যন্ত নিমাই খুঁজে পেল বিদ্যাসাগর পল্লিতে নলিনীর বাড়িটা। কিন্তু নিমাই নলিনীর বাড়ি এসে দেখল, নলিনী রান্না করছে আর ওর বৌ সিরিয়াল দেখায় মগ্ন। নলিনীও ভাবেনি এই ভাবে নিমাই-দা চলে আসতে পারে কোনদিন। নিমাইকে দরজায় দেখেই নলিনীর মুখটা কেমন যেন ফ্যাকাসে হয়ে গিয়েছিল।

তারমানে নলিনীও নামের বাঘ, আসলে নলিনীও একটি গৃহপালিত মার্জার । নলিনীকে দেখার পর তার কাছে পরামর্শ নেবে না তাকেই সান্ত্বনা দেবে সেটাই ঠিক করতে পারল না নিমাই। কিন্তু এর তো একটা বিহিত হওয়া চাই।

নলিনীর রান্না শেষ হলে দুজনেই বেরিয়ে আসে রাস্তায়। নলিনীর মুখে এখনো লজ্জার ছাপ পরিষ্কার। একটা গাছের নীচে বেঞ্চের উপর বসে দুজনে। নিমাই এর গায়ের জ্বালা এখনো মেটেনি। তাই নীরব প্রতীবাদ বন্ধ করে ওই প্রথম মুখ খোলে, ‘দেখ নলিনী এই ভাবে চলতে পারে না। কিছু একটা করতে না পারলে একদিন স্বামী সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।’

‘কিন্তু নিমাই-দা করবেটাই বা কী ? আমার বৌ কথায় কথায় বাপের বাড়ি চলে যাবার ধমকি দেয়। এবার তুমিই ভেবে দেখো এই বয়েসে বৌ বাপের বাড়ি চলে গেলে কী কী কথা উঠবে।’

‘তাই বলে এই ভাবে তো আর পড়ে পড়ে সারা জীবন মার খাওয়া যায় না। তোর বৌ তো তাও পথে আছে গায়ে হাত দেয় না। যদিও আমার মতিবালাও এখন আর গায়ে হাত দেয় না। হাত দিলে সাবান দিয়ে হাত ধুতে হয় বারবার। তাই ঝাঁটা, জুতা থেকে এমন কিছুই বাকি নেই যার ব্যাবহার আমার শরীরে হয়নি।’

‘তুমি আর কী জানবে দাদা…’ কথাটা শেষ না করেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নলিনী।   

‘দেখ নলিনী আমি বলি কী চল জ্যোতিষী সম্রাট মিলনাচার্যের কাছে যাই। বিজ্ঞাপনে পড়েছি বশীকরণে ওঁর জুড়ি মেলা ভার। যদি কবচ-টবচ পরে বা পরিয়ে কিছু একটা হয়।’

নলিনী এসবে বিন্দু মাত্র বিশ্বাস করে না। কিন্তু এখন যখন কোনও রাস্তা খোলা নেই তখন বিশ্বাস না থাকলেও…। নলিনীকে চুপ থাকতে দেখে নিমাই আবার বলে, ‘একবার গিয়ে দেখতেই বা দোষ কী ? আর তো হারাবার কিছু নেই। তাছাড়া চুরি ডাকাতি করতেও তো যাচ্ছি না। যাচ্ছি নিজের বৌকে হাতের মুঠোয় রাখার উপায় জানতে। হতেও তো পারে মিলনাচার্য এক বাণে বাঘিনীকে আবার বৌ বানিয়ে দিল। তখন তো আবার সুখের সংসার। আবার সেই সুড়সুড়ি দেওয়া রাত…’

[তিন]

সমস্ত কিছু শোনার পর জ্যোতিষ সম্রাট মিলনাচার্য নিমাই আর নলিনীর মাথায় হাত রেখে বললেন, ‘তোরা এতটা ভেঙে পড়িস না এই পটানি পাথর রবিবার সন্ধ্যায় ধারণ করিস সোমবার থেকেই ফল হাতে নাতে পাবি। নিমাই এক পিসতুতো দাদার মুখেও শুনেছিল দ্রোণাচার্যের পটানি পাথর দিয়ে সবাইকে পটিয়ে নেওয়া যায়। নিমাই নলিনী দুজনেই পাঁচশ করে টাকা দক্ষিণা দিয়ে বাবাকে খুশি করে হাসি মুখে বাড়ি ফিরে আসে।

জ্যোতিষীর কাছ থেকে পটানি পাথর নিয়ে বাড়ি ফেরার পর নিমাই মনে মনে একটু বল পেল। এখন শুধু অপেক্ষা একটা দিনের। শনিবারটুকু শান্তিতে পার করলেই মতিবালা আবার আগের মতোই গলা জড়িয়ে বলবে, ‘চলো না কদিনের জন্য কোথাও হারিয়ে আসি।’ নতুন নতুন বিয়ের পরের রাতগুলোর কথা মনে পড়ায় বুকের ভেতরকার মরা নদীটা আবার যেন কুলকুল করে বইতে শুরু করল। মনে পড়ল মতিবালাকে দেখতে যাওয়ার প্রথম দিনটা। লজ্জাবতী লতার মতো লাজুক মেয়েটা সেই যে প্রথম দেখাতেই নিমাইয়ের বুকে সুর তুলেছিল সেই সুর নিমাই এখনো শুনতে পায়। বিয়ের পর দুজনে পাশাপাশি বসে সংসার সাজানোর জন্য কত স্বপ্ন কুড়িয়ে আনত চোখের ভেতর থেকে। জ্যোৎস্না রাতে বাগানের দোলনায় বসে নিমায়ের বুকে মাথা দিয়ে মতিবালা গাইত, ‘এই সুন্দর স্বর্ণালি সন্ধ্যায় একি বন্ধনে জড়ালে গো বন্ধু…।’ এখন সেই সব দিন গুলো শুধুই গল্প হয়ে গেছে। সত্যিই যদি ওদের একটা ছেলে কিংবা মেয়ে থাকত…

রবিবার দিন সকাল সকাল স্নান সেরেই নিমাই ডান হাতের বাহুতে পটানি পাথরটা পরে নিলো। রক্তের স্রোতে অনুভব করল শান্তি প্রবাহ। ছাদের উপর দাঁড়িয়ে চোখ বন্ধ করে দেখতে পেল মতিবালার মানসিক পরিবর্তন ঘটছে। আর কোনও ভয় নেই। মতিবালা এবার পিছন থেকে এসে জড়িয়ে ধরে বলবে, ‘চলো না কদিনের জন্য কোথাও হারিয়ে আসি।’

পিছন থেকে সত্যি সত্যিই এবার দুটো পায়ের শব্দ দ্রুত গতিতে এগিয়ে আসছে। আরও কাছে আরও আরও কাছে এগিয়ে আসছে পদধ্বনি। চোখদুটোকে প্রাণপণ শক্তিতে বন্ধ করল নিমাই। এই মুহূর্তটাকে নিঃশ্বাস ভরে পান করবে আজ। মনের ফ্রেমে যেন দীর্ঘদিন ছবিটা গেঁথে থাকে।

‘বাঁচাও নিমাই-দা বাঁচাও আমাকে…’

‘আরে নলিনী তুই ?’

‘এক্কেবারে মেরেই ফেলত।’

‘আঃ কোমরটা ছাড়বি তো।’ সাত সকালে নলিনীকে দেখে প্রথমটায় নিমাই ঘাবড়ে গিয়েছিল পরে নিজেকে সামলে নিয়ে বলে, ‘তা হয়েছেটা কী সেটা বল ? আর অমন মেয়েদের মতো কাঁদছিস কেন ?’

‘শাঁকচুন্নি বলে কি না তোমাকে ছাড়া বাঁচবো না। কোনক্রমে প্রাণ বাঁচিয়ে তোমার কাছে এসেছি।’

‘তা এতে এতো কাঁদার কী আছে সেটাই তো বুঝলাম না। যখন বলছে তোকে ছাড়া বাঁচবে না তারমানে ওষুধ তো কাজ করছে।’

‘কাজ করছে মানে করছে! এক্কেবারে রকেট ক্যাপস্যুলের মতো কাজ করছে। কাজ না করলে কি তোমার কাছে আসি ? সকাল হতে না হতেই ববিতা হাজির। তার এক ঘণ্টা পর মল্লিকা।’

নলিনীর মুখের দিকে খানিকটা অবাক চোখে তাকিয়ে নিমাই জিজ্ঞেস করে, ‘এরা আবার কারা ?’

‘প্রেমিকা। একজন স্কুলের আরেকজন ইউনিভার্সিটির। দুজনেই দুটো করে বাচ্চার মা অথচ সকাল থেকে বাড়িতে এসে বসে আছে, বলছে আমাকে ছাড়া বাঁচবে না। এখন কী করব তুমিই বল।’

নিমাই নলিনীর প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে নিজের হাতের থেকে কবচটা এক ঝটকায় খুলে নিয়ে বলে, ‘বলিস কীরে ভাই এমন হলে তো বৌ থাকতেও অনাথ হয়ে যাব। দাঁড়া আমি উপর থেকেই একবার উঁকি মেরে দেখি টগর এসেছে কি না ?’ ছাদের কোনায় গিয়ে রাস্তাটা ভাল করে দেখে নিমাই। না, ফাঁকা রাস্তা। কেউ কোথায় নেই।

নলিনী জিজ্ঞেস করে, ‘এই টগরটা কে নিমাই-দা ?’

‘আমার বাড়ির কাজের বৌ।’

‘হ্যাঁ ?’

‘হুম।’

‘এখন কী হবে নিমাই-দা ? এবার তো চালচুলো সব যাবে।’

‘যাবে না যাবে না।’

‘কেমন করে যাবে না ?’

‘চল বাইরে চল বলছি।’ কথাটা বলতে বলতে পটানি পাথরটা আবার বাহুতে বেঁধে নেয় নিমাই।

দুজনেই খোলা রাস্তায় এসে দাঁড়ায়। পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে নিমাই বলে, ‘আর কিছুক্ষণ পরেই টগর রান্না করার জন্য এসে পড়বে।’

‘তারপর ?’

‘তারপরেই তো আসল খেল শুরু।’

‘আজকে মনে হয় তুমি…’

‘তোর কালো জিবটা একটু বন্ধ রাখ। ভাল ভাল কথা ভাব এখন। সন্ধায় বাড়ি ফিরে দেখবি…’

‘নারকেল ঝাঁটা হাতে দরজায় বৌ দাঁড়িয়ে আছে।’

‘চুপ কর। মেয়েদের মতো অত ভয় থাকলে হয় ? বিবেকানন্দ কী বলেছিল মনে নেই ?’

‘জীবে প্রেম করে যেই জন…’

‘ওটা তোর দাদু বলেছিল। আমাদের বিবেক বীরকে সাহস অবলম্বন করতে বলেছিল।’

‘শহীদ হওয়ার আগে বড় বড় বীররাও বিড়াল হয়ে পড়ে। সব তোমার জন্য হয়েছে। এবার ঠেলা সামলাও।’

‘মুখটা বন্ধ কর নতুবা এবার আমার হাতেই তুই শহীদ হয়ে যাবি।’

নলিনী আর কিছু না বলে ঘরের ফেরার মুহূর্তটুকু কল্পনা করে। গায়ে কাঁটা দেয়। মনে মনে বলে, ‘কী সর্বনাশা পাথররে বাপ! হাতে পরতে না পরতেই দুজন হাজির। ঈশ্বর জানের এতক্ষণে আরও কজন এসে জুটেছে। সব শালা নিমাই…’

‘কিছু বললি ?’

‘কই না তো।’

‘হুম। চল কোনও একটা পার্কে গিয়ে বসি।’

‘পার্কে ? অসম্ভব। তুমি যাবে যাও আমি কিছুতেই যাব না।’

‘আরে পাগলা বিবেক বলেছিল…’

কথাটা শেষ করতে না দিয়ে নলিনী বলে, ‘রাখতো তোমার বিবেককে। বিয়ে করলে তোমার বিবেকের মুখে বাণী নয় গালিই ঝরত বুঝলে ? জীবনে বিয়ে করল না আর বড় বড় বাত। বিয়ে করতে যাওয়ার সময় মাকে বলে গিয়েছিলাম, মা তোমার জন্য দাসী আনতে যাচ্ছি। এখন হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারছি গৃহিণী হলেন গুরুজন তারে প্রণাম করেই বাঁচতে হয়। এই ঝিলের ধারে দাঁড়িয়ে মশার কামড় খওয়ার চেয়ে বৌয়ের সঙ্গে দ্বিতীয় দফা ঝিলিকের মাকে খুঁজতে যাওয়াটাই সুখের ছিল। তোমার কথা শুনেই…’

‘দিনরাত বৌয়ের সঙ্গে বসে সিরিয়াল দেখতে দেখতে তোর মনটা প্রতিবাদ করতে ভুলে গেছে। কলেজে তো এমনটা ছিলি না।’

‘না ছিলাম না। তুমিও কী এমনটা ছিলে ? এখন রোজ ঘটি-বাটির চিহ্ন কপালে তিলকের মতো এঁকে নিয়ে ঘুরে বেড়াও। আবার বলে প্রতিবাদ…’

[চার]

সারাদিন রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে সন্ধার সময় ভয়ে-ভয়ে দুজনেই বাড়ির পথে রওনা দেয়। নলিনী অটোয় চড়ে বেরিয়ে যাওয়ার পর নিমাই এর বুকের ভেতরটা কেমন কেমন যেন করতে থাকে। একলা ফুটপাতে হঠাৎ যদি কোনও মেয়ে এসে বলে, ‘চিনতে পারছ আমাকে ? আমি সেই যে…। আমি তোমাকে ছাড়া কিছুতেই বাঁচব না।’ একটা ঢোক গিলে চারপাশটা ভাল করে তাকিয়ে দেখে নিমাই। না, সন্দেহ করার মতো কোনও মুখ চোখে পড়ছে না। আর কিছু দূর গিয়ে গলিটার মুখে ঢুকলেই নিমাই এর বাড়ি।

দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ চিন্তা করে নিমাই। বুকের ভেতরকার সাহসটাকে বাইরে আনার চেষ্টা করে। সাহসের পরিবর্তে একটা ঢেকুর ছাড়া আর কিছুই বার হয় না। উত্তেজনা বাড়ছে বুকের ভেতর। দরজায় টোকা দেয় নিমাই। কয়েক সেকেন্ডের ভেতর দরজা খুলে যায়। তারপর কিছু মনে নেই নিমাই এর।

যখন চোখের পাতা খোলে তখন মতিবালা পাখা হাতে নিমাই এর মাথার কাছে বসে বাতাস করছে। প্রথমটায় নিমাই ভেবেছিল ও স্বপ্ন দেখছে হয়তো। পরে কপালের আলুটায় হাত দিয়ে বুঝতে পারে, বাস্তবের বিছানায় শুয়ে আছে ও। মতিবালার চোখের জলটাও যে বাস্তব সেটা মানতে হয়তো নিমাই এর একটু বেশি কষ্ট হচ্ছে ।

শাড়ির আঁচলে চোখের জল মুছে মতিবালা বলে, ‘আমি ঠিক জানতাম ওই ডাইনিটার নজর আছে তোমার উপর। ঝাঁটা পিটিয়ে তাড়িয়েছি। আমিও মুখুজ্জে বাড়ির মেয়ে, আমিও দেখব কে কাড়ায় তোমাকে আমার কাছ থেকে।’

‘তুমি কার কথা বলছ ? এই বয়সে তোমার কাছ থেকে কে কাড়িয়ে নেবে আমাকে ?’

‘কে আবার ? ওই হারামজাদী টগরি। মাগী বলে, তোমাকে ছাড়া বাঁচবে না। ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়েছি।’ মতিবালার চোখের জল বাড়তে থাকে।

‘তা আমাকে মারলে কেন তাহলে ?’

‘ওটা তো অভ্যাসে মেরেছি। ওটা কিছু না এমনি।’

নিমাই কপালের আলুটায় হাত বোলাতে বোলাতে মনে মনে বলে, ‘ভাগ্যিস এমনি মেরেছে। সিরিয়াস হলে…’

‘এই শোনো না…’

‘শুনছি তো বলো।’

‘আজকে না বাবার কাছে গিয়েছিলাম।’

‘বাবার কাছে ? তিনি তো বহুকাল আগেই উপরে গেছেন। তা ফিরলে কেন আবার ?’

‘তোমার না সবেতেই হেঁয়ালি। বাবা মিলনাচার্যের কাছে গিয়েছিলাম।’

মিলনাচার্য নামটা শুনেই উঠে বসে নিমাই। একটা ঢোক গিলে বলে ‘কেন উনার কাছে আবার কেন ?’

‘ওই টগরির নজর থেকে তোমাকে মুক্ত করতেই তো গিয়েছিলাম। এই দেখো এই পটানি পাথরটা দিয়েছেন বাবা।’ মতিবালা নিজের বাহুতে বাঁধা পাথরটা দেখায়।

নিমাই কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল কিন্তু হঠাৎ কলিং বেলটা বেজে উঠতেই মতিবালাকে উঠতে হয়। মতিবালা বাইরের দরজার দিকে গেলে নিমাই ওপারের খবর নেওয়ার জন্য নলিনীকে একটা ফোন করে, ‘কীরে সব খবর ভাল তো ?’

‘ভাল ? হ্যাঁ ভালই তো। বউ এর চারজন বয়-ফ্রেন্ড এসেছে। ওদের জন্য চা করছি।’

‘মানে?’

‘সেটা তুমিও বুঝবে। সারাদিন তোমার খোঁজ না পেয়ে বৌদি আমার বাড়িতে ফোন করেছিল।’

‘তারপর ?’

‘তারপর দুজনে মিলে ওই শালা মিলনাচার্যের কাছে গিয়েছিল। হারামজাদা হাজার টাকা করে নিয়ে দুজনকেই ওই একই পিণ্ডি পাথর দিয়েছে।’

‘ওরা উনার সন্ধান পেল কী করে ?’

‘পেপারে পেয়েছে। তোমার বউটা না মাইরি শালা তমারই মতো…’

‘কার জিন দেখতে হবে তো…’

‘শালা তোমার মাথাতে ষাঁড়ের বিচি আছে মনে হয়।’ বিরক্ত হয়ে ফোনটা কেটে দেয় নলিনী।

‘ওগো শুনছো…’ ওঘর থেকে মতিবালার কাঁদো কাঁদো গলা ভেসে আসে। মতিবালার গলা শুনে হন্তদন্ত হয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে। বাইরে বেরিয়ে নিমাই দেখে মতিবালার সামনে হাসি হাসি মুখে একজন ছেলে-ছাঁট চুলের মহিলা দাঁড়িয়ে। তবে সৌভাগ্যের কথা এই যে, উনাকে নিমাই চেনে না। খানিকটা সাহস নিয়ে নিমাই জিজ্ঞেস করে, ‘তোমার বান্ধবী ?’

মতিবালা কয়েক সেকেন্ড সময় নিয়ে বলে, ‘হ্যাঁ। মানে আসলে আমরা…’

‘আমরা দুজন দুজনকে প্রচণ্ড ভালবাসতাম। কিন্তু সমাজ আমাদের…। আজ আমি আর সমাজের ভয় পাই না।’ আগন্তুক মহিলা উত্তর দেয়।

‘কিন্তু আপনি তো মশায় মহিলা।’ মুখ ফসকে বলেই ফেলে নিমাই।

‘তাতে কী হয়েছে। আমি এই আইন মানি না।’

মাথায় হাত দিয়ে চুপচাপ বসে পড়ে নিমাই। মতিবালা নিমাইকে বোঝানোর চেষ্টা করে। মতিবালার কোনও কথাই নিমাই এর কানে ঢোকে না। ও শুধু ফ্যালফ্যাল করে মতিবালার মুখের দিকে তাকিয়ে নীরবে কিছু একটা খুঁজতে থাকে। ঠিক এমন সময় আবার বিরক্তিকর কলিং বেলের শব্দ ঘরের নীরবতা ভঙ্গ করে দিয়ে যায়।

এই হাসির গল্প কেমন লাগল কমেন্টে জানান। ভাললাগলে লাইক সেয়ার করবেন।

ইংরেজি হাসির গল্প

প্রেমের ছোট গল্প পড়ুন

সম্পূর্ণ প্রেমের উপন্যাস, কেন প্রেম

[সমাপ্ত]

This website uses cookies.