Skip to toolbar
সালেমনের মা, সুভাষ মুখোপাধ্যায়

সালেমনের মা কবিতা আলোচনা

পদাতিক কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় এর লেখা সালেমনের মা কবিতাটির আলোচনা এবং প্রাসঙ্গিকতা। কেন আজকের দিনে দাঁড়িয়েও সালেমনের মা কবিতাটি এতটা প্রাসঙ্গিক তাই আলোচনা করব আজকে।

সালেমনের মা, সুভাষ মুখোপাধ্যায়

“আমাকে তোমাদের কুরুক্ষেত্রে সৈনিক করো ভাই…” – এই দাবি নিয়ে বাংলা সাহিত্যে আবির্ভাব হয়েছিল কমিউনিস্ট কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের। দীর্ঘ ৫০ বৎসর অপ্রতিরোধ্য ছিল ওনার কলম। আজও প্রাসঙ্গিক উনার একাধিক কবিতা। আমাদের আজকের আলোচ্য সালেমনের মা কবিতাটিও ঠিক ততখানিই প্রাসঙ্গিক যতখানি প্রাসঙ্গিক অন্যান্য কবিতাগুলি। সালেমনের মা কবিতাটি নেওয়া হয়েছে ফুল ফুটুক না ফুটুক কাব্যগ্রন্থ থেকে।

১৯৫২ সালে কমিউনিস্ট কর্মে শ্রমিকদের সঙ্ঘবদ্ধ করার জন্য কবি গিয়েছিলেন ব্যঞ্জনহেড়িয়া গ্রামে।পুরো এলাকা জুড়েইছিল চটকল আর তেলকল শ্রমিকদের বসবাস। কাঁচা মাটির অপরিপক্ক ঘর, মাঠ জুড়ে সোঁদা মাটির গন্ধ, কবিকে বিভোর করে রেখেছিল দীর্ঘদিন। ওই গ্রামেরই এক বাড়িতে ভাড়া থাকতেন কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়।

সেই বাড়ি থেকে কয়েকটা বাড়ি পরেই ছিল সালেমনের মামার বাড়ি। সালেমন আর তার লতিমন ওখানে থাকতেন। দীর্ঘ ৭৭ বছরের বৃদ্ধা সালেমন এখনো ওখানে আছেন।

ছোট্ট সালেমন একদিন বান্ধবীর সঙ্গে কবির কাছে এসে জানতে চেয়েছিল, “কী করো তুমি?” উত্তরে যখন কবি বলেছিলেন “লিখি।”  বিশ্বাস হয়নি ছোট্ট সালেমনের। সালেমন বলেছিল, “লিখে কি কেউ কখনও টাকা পায়! লেখাপড়া করতে গেলেই তো টাকা লাগে। ”

এখন সালেমন বৃদ্ধা, শুধু স্মৃতি আঁকড়ে পড়ে আছেন ব্যঞ্জনহেড়িয়া গ্রামে।

আনন্দবাজার পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সালেমন জানিয়েছেন, “আমার আর কি আছে বলুন এই দুঃখ আর অশ্রু ছাড়া, চোখের জলটুকুই রাখি তার পায়ের কাছে।”

কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় আপন কাব্য শক্তির প্রয়োগে এই সালেমনকে করে তুলেছেন বাংলার হাজার হাজার নাগরিক। যারা পিচুটি পড়া চোখে মাকে খুঁজছেন। তাদের পঞ্চইন্দ্রিয় জুড়ে মাকে ফিরে পাবার বাসনা। অথচ তাদের চোখ পাগল বাবরালির মত ঘোলাটে। অর্থাৎ অজ্ঞ-অস্বচ্ছ চোখ নিয়েই চলছে মায়ের খোঁজ, মুক্তির খোঁজ।

সালেমনের মত অজ্ঞ-অশিক্ষিত বাংলার মানুষ মিছিলে মিছিলে মায়ের খোঁজ করছে, মুক্তির খোঁজ করছে। এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত পর্যন্ত যাদের ধূসর দৃষ্টি। মাকে কিছুতেই দেখা যাচ্ছে না, মা যেন লুকিয়ে আছেন চোখের আড়ালে।

সালেমনের মা কবিতার প্রাসঙ্গিকতা

শ্রমিকদেরকে সঙ্ঘবদ্ধ করতে এসে কবি যে অন্ধকার দেখেছেন সেই অন্ধকার প্রকাশ করেছেন কাব্যের আকারে। কবি বোঝাতে চেয়েছেন অস্বচ্ছ চোখে “মা” বা “মুক্তি” কিছুই খুঁজে পাওয়া যায় না। “মা” বা “মুক্তি” কে খোঁজার জন্য চাই শিক্ষা, চাই আলোকিত দৃষ্টি।

সেদিন মানুষ মুক্তি পাবে যেদিন তারা জানবে তাদের মিছিলে হাঁটার প্রকৃত কারণ। অস্বচ্ছ আর অশিক্ষিত চোখে যেমন মাকে খুঁজে পাওয়া যায় না, তেমনি মিছিলে হাঁটার কারণ না জেনে মিছিলে হেঁটেও মুক্তির সন্ধান পাওয়া যায় না।

সালেমনের মা কবিতার শেষ তিন লাইন এজন্য বড় সোজা নয়,

এক আকালের মেয়ে তোমার

আরেক আকালের মুখে দাঁড়িয়ে

তোমাকেই সে খুঁজছে

আসলে স্বাধীনতার পর মানুষ ভেবেছিল স্বর্গরাজ্য হাতে পাবে তারা। কিন্তু কয়েক বছর কাটতে না কাটতেই মানুষ দেখল স্বর্গরাজ্য তো দূর নরকটাও সুন্দর হয় নি তাদের। তাদের মাথার উপর জমাট মেঘ গুমোট অন্ধকার ছড়িয়ে রেখেছে। মেঘের ফাঁক-ফোঁক দিয়ে যতটুকু আলো বের হয় তা তাদের কাছ পর্যন্ত এসে পৌঁছায় না।

মানুষ বুঝতে পারল ক্ষমতার পরিবর্তন হয়েছে, আগেছিল বিদেশী সাদা চামড়ার হাতে শাসন। এখন শাসন করছে দেশের মানুষ। চাবুক চালানো হাতগুলো পাল্টে গেছে চাবুকের কোন পরিবর্তন হয় নি।

অজ্ঞ অশিক্ষিত মানুষেরা এই চাবুকের হাত থেকে নিজেদের কে বাঁচানোর জন্য মিছিলে হাঁটতে শুরু করল, কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় দেখিয়েছেন এই অজ্ঞতা, অশিক্ষা আর অস্বচ্ছ চোখ দিয়ে কখনোই মুক্তির সন্ধান পাওয়া যাবে না। মুক্তির জন্য চাই আলো, চাই শিক্ষা।

ছোট্ট সালেমন যেমন নিষ্পাপ মন দিয়ে নিষ্পাপ ঘোলাটে চোখ দিয়ে মায়ের সন্ধানে বেরিয়ে পড়েছিল, বাংলার শ্রমিকরা ঠিক তেমনভাবেই মুক্তির খোঁজ করছিল মিছিলে মিছিলে। কবি দেখিয়েছেন এভাবে যেমন মাকে খুঁজে পাওয়া যাবেনা ঠিক তেমনভাবেই মুক্তিও পাওয়া যাবে না।

এই অশিক্ষিত অজ্ঞ শ্রমিকদেরকে সঠিক পথ দেখানোর জন্যই কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় ব্যঞ্জনহেড়িয়া গ্রামে দীর্ঘদিন বসবাস করেছেন। মানুষদেরকে দেখিয়েছেন মুক্তির সঠিক পথ।

কবি বলেছেন অজ্ঞতা দিয়ে অন্ধকারকে দূর করা যায় না অন্ধকারকে দূর করতে হলে চাই আলো চাই শিক্ষা। তাই মায়ের খোঁজ করতে হবে স্বচ্ছ চোখ দিয়ে। ঘোলাটে চোখ মায়ের সন্ধান দিতে পারে না।

সালেমনের মা কবিতার সালেমন রূপক মাত্র, আসলে সালেমনের মুখের আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে হাজার হাজার বাংলার শ্রমিক। যারা আজও প্রতিনিয়ত মুক্তির খোঁজ করছে মায়ের খোঁজ করছে।

আরও পড়ুন,☛  একুশ শতকের কবিতা

 

Spread the love

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

COVID-19

করোনা ভাইরাস সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দেখুন