X

লোকসঙ্গীত নিয়ে আলোচনা

লোকসঙ্গীতলোকগান বা সঙ্গীত নিয়ে আলোচনা করলে সবার প্রথমে আসে বাউল তারপর ভাটিয়ালিভাওয়াইয়া তারপর ঝুমুর। লোকসঙ্গীত নিয়ে আলোকপাত করলে বাংলা ভাষার হৃদয়ে কান রাখতে হয়। হৃদয়ের অনেক গভীরতম জায়গা থেকে ভেসে আসে একতারা কিংবা দোতারার সুর।

লোকসঙ্গীত নিয়ে আলোচনা

বাংলার লোকসঙ্গীত,-

“জল জল কর টুসু জলে তুমার কে আছে

মনেতে ভাবিয়া দেখো জলে শ্বশুরঘর আছে…” (লোকসঙ্গীত )

টুসুগান

লোকসঙ্গীত আসলে লোকমানস থেকে উঠে আসা এমন এক সঙ্গীত যা মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত হয়ে শ্রুতি ও স্মৃতি নির্ভর সঙ্গীতে আত্ম পরিচয় পায়। বাউল মরমিয়া এবং দেহতত্ত্বের গানে এই প্রমাণ পাওয়া যায়। একদিন ভাটিয়ালিছিল ব্যক্তি চেতনার গান, কিন্তু এই গানও লোকমুখে প্রচার পেতে পেতে ছড়িয়ে পড়ে বাংলার আঙিনায় আঙিনায়।

বাউল গান

লোকসঙ্গীত আলোচনা

কে কবে কখন কোথায় প্রথম গান গেয়েছিল এই প্রশ্নের যেমন কোনও উত্তর নেই তেমন ভাবে লোকসঙ্গীত কবে থেকে গাওয়া শুরু হয়েছিল এরও কোনও উত্তর নেই। লোকসংগীত মানুষের জীবনের মতোই বহমান এক প্রেমের নদী। বয়ে চলাই এই নদীর জীবন।

নৃত্য-গীত-বাদ্য এই তিনের পূর্ণ মিলনে জন্ম নেয় সঙ্গীত। তেমন ভাবেই লোকনৃত্য-লোকগীত-লোকবাদ্যের মিলনে জন্ম নিয়েছিল লোকসঙ্গীত। বাউল হল এর প্রকৃষ্ট উদাহর।

লোকসঙ্গীতের ইতিহাস

এখানের বাংলার লোকসঙ্গীত নানান ভাবে ছড়িয়ে আছে পল্লীর আনাচে কানাচে। মানুষের চিন্তা ভাবনা থেকে শুরু করে ভাব ভালবাসাতেও আছে লোক সঙ্গীত। গোপন প্রেম থেকে শুরু করে নদীবুকে জেগে থাকা একলা মাঝির গান পর্যন্ত বিস্তার লোকসঙ্গীত এর ।

লোকসঙ্গীত Photo credit Google

শুধু মানুষ নয় বাংলার মাঠঘাট খেতখামার নদীনালা পাহাড়-পর্বত সবেতেই মিশে আছে লোকগান। তবে এ গানের বেশি প্রাধান্য আচার অনুষ্ঠানে। লোকসংস্কারে। নদী আর নৌকা হয়ে উঠেছে জগত ও জীবনের রূপক।

লোকসঙ্গীতের প্রধান প্রধান এলাকা

আমাদের বাংলার প্রায় সর্বত্র লোকগান গাওয়া হলেও কোথাও কোথও এগানের দরদ অনেক বেশি। পূর্ববঙ্গে প্রাধান্য প্রেয়েছে নদীমাতৃক ভাটিয়ালি গান। উত্তরবঙ্গে আছে অরণ্যের প্রেম ভাওয়াইয়া । দক্ষিনে লালমাটির জাদু ভাদু টুসু ঝুমুর। যেহেতু আমাদের দক্ষিণবঙ্গ লালমাটির দেশ। শুশুনিয়া অযোধ্যার মতো পাহাড় দিয়ে ঘেরা। শিলাই/কংশাবতী দারকেশ্বর গন্ধেশ্বরী মতো শীর্ণকায়া নদীর কূল কল শব্দে মুখরিত তাই এই মাটিতে জন্ম নিয়েছে ভাদু টুসু ঝুমুর।

লোকসঙ্গীতের প্রকারভেদ

লোকসঙ্গীত এর হৃদয়ে হাত রাখলেই বোঝা যায় কিছুগান একক কণ্ঠের কিছু গান সমবেত। বাউল, ভাটিয়ালি, দেহতত্ত্ব, মুরশদি ও মারফতি গানগুলি একক কণ্ঠের গান।

আবার কবিগান, লেটোগান (বর্ধমানের লোকসঙ্গীত, যাত্রাপালার মতো ) আলকাপ (মুর্শিদাবাদ, বিরভূমের পালা গান) গম্ভীরা (উৎসব) ভাদু-টুসু-ঝুমুর এই গানগুলো সমবেত কণ্ঠের গান।

টুসুগান

সব লোকসঙ্গীতেই সর্বাঞ্চলিয় নয়। কিছু গান কিছু অঞ্চলের ভেতরই সীমাব। কিছু গান আবার সম্প্রদায় গত। কিছুগান নিখাদ মেয়েলী। যেমন, ব্রতগান। এই ব্রতগানগুলি মেয়েরাই রচনা করে মেয়েরাই সুর দেয়।

লোকসঙ্গীতের বৈশিষ্ট, –

১) গানগুলি লোকসমাজেই আজও সীমাবদ্ধ। ২) গানগুলি সম্মিল্লিত বা একক কণ্ঠের গীত। ৩) এই গান চর্চার জন্য নিয়মিত অনুশিলন করতে হয় না। ৪) অত্যন্ত সাধারণ মানুষ এই গানের রচয়িতা ও সুরকার। ৫) লোকগান মূলত প্রকৃতি নির্ভর। ৬) জীবনের পাওয়া না পাওয়াগুলোই এই গানের প্রাণ কেন্দ্রবিন্দু।

লোকসঙ্গীত এর গঠন, –

গঠনগত ভাবে লোকসঙ্গীত চার ভাগে বিভক্ত। ক) সা রা মা পা খ) সা গা মা পা গ) সা রা গা পা ) সা রা গা মা পা

এই গঠনরীতি লোকসংগীতে খুব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করা হয়। লোকসঙ্গীতে সুর ঠিক না থাকলে গান আর গান থাকে। লোকসঙ্গীতে বেশকিছু রাগ ও রাগিণীর দেখা মেলে, আভের, সাবেরী, মালিবী, কানাড়ী, পাহাড়ী, মাঢ, বঙ্গাল।

বাংলা লোকসঙ্গীতে ঝিঁঝিট রাগ

ঝিঁঝিট রাগ এর প্রভাব সব চাইতে বেশি। বাউল, ভাটিয়া, সারি, মারফতি, মরমি এমনকি কীর্তনেও এই রাগ বহুল ব্যবিহৃত হয়। ঝিঁঝিটের রূপ দুটি (১) সা রা মা / পা মা গা রা সা ণা ধা পা/ পা ধা সা রা গা মা গা / ধা সা (২) সা রা মা / পা মা গা সা না ধা/ ধা সা রা গা / রা গা মা

এখানে বলে রাখা ভাল বেশিরভাগ লোকসঙ্গীত একটি স্থায়ী রাগে গাওয়া হয় এবং অন্তরাগুলি প্রায় একরকম। উদা, “আমি কোথায় পাব তারে/ আমার মনের মানুষ যারে…” এখানে ঝিঁঝিট এর দ্বিতীয় রূপটি ব্যবহৃত হহেছে।

লোকসঙ্গীত বাউল

বাংলা লোকসঙ্গীতের সুরগত বৈশিষ্ট্য অন্যান্য দেশের থেকে অনেক আলাদা। শুধুমাত্র সুরের বৈশিষ্ট্য বাংলা বাংলা লোকসঙ্গীতকে সমগ্রবিশ্বের দরবারে এক উচ্চতর স্থান দিয়েছে। বাংলা লোকসঙ্গীতের সুর মনকে এত নিবিড় ভাবে টানতে পারে যা অন্যকোনও ভাষা পারে না। একতারা হাতে বাউলের সুর তো জাদুর মতো।

ভাটিয়ালি নিয়ে কিছু কথা

অন্যদিকে ‘বাংলাদেশের লোকসঙ্গীত পরিচিতি’ গ্রন্থে সিরাজুদ্দিন কাশিমপুরী বলেন- ‘ভাটিয়ালী একটি সুর; কথার বাঁধনে কোন বিশেষ গান নহে বলিয়াই আমার ধারণা’। প্রসঙ্গত, ‘ভাটিয়ালী’ সঙ্গীত শাস্ত্রের একটি রাগীনিরও নাম। শ্রী কৃষ্ণকীর্ত্তন, মঙ্গলকাব্য এবং বৈষ্ণব ও সুফী পদেও ‘ভাটিয়ালী’ রাগের ব্যবহার আছে। অনেকের মতে ভাটিয়ালী গান হলো প্রকৃতিতত্ত্ব ভাগের গান। ভাটিয়ালী গানের মূল বৈশিষ্টা হলো এ গানগুলো রচিত হয় মূলত মাঝি, নৌকা, দাঁড়, গুন ইত্যাদি বিষয় অবলম্বনে। সাথে থাকে গ্রামীণ জীবন, গ্রামীণ নারীর প্রেমপ্রীতি, ভালবাসা, বিরহ, হারানোর আকুলতা ইত্যাদির সম্মিলন। অনেক বিতর্কের মধ্যেও এটি স্বীকৃত যে নদীতে ভাটির স্রোতের সঙ্গে নৌকা ভাসিয়ে মাঝি-মাল্লারা যে গান করেন সর্ব সাধারণের মতে সেগুলোই ভাটিয়ালী গান।

বিখ্যাত ভাটিয়ালি গান, আমায় ডুবায়লিরে

ভাটিয়ালি গান

উথালি পাথালি আমার বুক…আমার, মনেতে নাই
সুখরে…
আমায় ডুবাইলিরে আমায় ভাসাইলিরে
অকুল দরীয়ায় বুঝি কুল নাইরে…
আমায় ডুবাইলিরে আমায় ভাসাইলিরে
অকুল দরীয়ায় বুঝি কুল নাইরে…
আমায় ডুবাইলিরে আমায় ভাসাইলিরে
অকুল দরীয়ায় বুঝি কুল নাইরে…
কুলনাই সীমা নাই অথই দরীয়ায় পানি
দিবসে নীশিথে ডাকে দিয়া হাত ছানিরে
অকুল দরীয়ায় বুঝি কুল নাইরে…
আমায় ডুবাইলিরে আমায় ভাসাইলিরে
অকুল দরীয়ায় বুঝি কুল নাইরে…
পানসা জলে সাই ভাসায়ে, সাগরেরও বানে
আমি জীবনের ভেলা ভাসাইলাম..
জীবনের ভেলা ভাসাইলাম কেউনাতাজানেরে
অকুল দরীয়ায় বুঝি কুল নাইরে…
আমায় ডুবাইলিরে আমায় ভাসাইলিরে
অকুল দরীয়ায় বুঝি কুল নাইরে…
আসমান চাহে দরিয়া পানে, দরিয়া আসমান পানে
আসমান চাহে দরিয়া পানে, দরিয়া আসমান পানে
আরে লক্ষ বছর পার হইলো
লক্ষ বছর পার হইলো কেউনাতাজানেরে
অকুল দরীয়ায় বুঝি কুল নাইরে…
আমায় ডুবাইলিরে আমায় ভাসাইলিরে
অকুল দরীয়ায় বুঝি কুল নাইরে…
কুলনাই সীমা নাই অথই দরীয়ায় পানি
দিবসে নীশিথে ডাকে দিয়া হাত ছানিরে
অকুল দরীয়ায় বুঝি কুল নাইরে…
আমায় ডুবাইলিরে আমায় ভাসাইলিরে
অকুল দরীয়ায় বুঝি কুল নাইরে…
কুল নাই…সীমা নাই…নাইরে..কুল নাই…
সীমা নাই…

বিখ্যাত ভাটিয়ালি গান, আমায় ডুবায়লিরে
বিখ্যাত ভাটিয়ালি গান, লোকসঙ্গীত

বিখ্যাত টুসু গান

আমার টুসু ধনে 
বিদায় দিব কেমনে
মাসাবধি টুসুধন কে
পুজেছি যতনে। 
শাঁখা সাড়ি সিঁদুর দিলাম
আলতা দিলাম চরণে। 
মনে দুঃখু হয় বড়
ফিরে যাতে ভবনে 
দয়া কইরে আসবে আবার 
থাকে যেন মনে
ভুইলনা ভুইলনা টুসু
আসবে আমার সনে

আবদুল আলমগীরকে লোকগানের যুবরাজ বলা হয়।

লোকগান

ভাওয়াইয়া

ভাওয়াইয়া উত্তরবঙ্গের সবচেয়ে জনপ্রিয় লোকসঙ্গীত

ভাওয়াইয়া

রংপুর কোচবিহার জলপাইগুড়ি এই সব এলাকাতেই ভাওয়াইয়ার প্রাধান্য সব চেয়ে বেশি। এই গানের কেন্দ্রবিন্দু মানবিক প্রেম। প্রেম-বিরহের দোলনায় বাঁধা (মইশাল) বন্ধুর জীবন। এই গানে রাধাকৃষ্ণ নেই এ এক আশ্চর্য ব্যাতিক্রম। জীবনকে সুরের পারে সীমাহীন স্থান দেওয়ার জন্যই হয়তো রাধাকৃষ্ণ প্রসঙ্গের পরিবর্তে মানবপ্রেম প্রাধান্য পেয়েছে অনেক বেশি।

বাউল

Credit, Google বাউল

বাউল হল শরীরের মাধুর্য সঙ্গে নিয়ে ঈশ্বরকে ছুঁয়ে দেখার প্রয়াস। বাউল গান সাধনার গান। শরীরকে পথ করে সঙ্গমের মাধ্যমে শৃঙ্গাররসের সুখে ঈশ্বর লাভ এই গানের উদেশ্য। শরীরকে আর কোনও আঞ্চলিক গানে এত প্রাধান্য দেওয়া হয়নি। বর্তামানে যে গানগুলিকে পুরুলিয়ার বাউল গান বলা হচ্ছে সেগুলি কিন্তু মোটেও বাউল নয়। ওগুলি বিকৃত রুচির গান।

বাউলের সুরেই হল, খাঁচার ভেতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়… বাউলের একতারা কিংবা বাউলের আখড়া থেকে ভেসে আসা সুর এখনো মনকে মেদুর করে দেয়। মনে হয় স্বর্গের সুধা আছে বাউলে যা আর কোনও লোকসঙ্গীতে নেই।

আমাদের অন্যান্য লেখা পড়ুন প্রেমেরগল্প.কম

প্রেমের গল্প পড়ুন

প্রেমের গল্প পড়ার জন্য আমাদের ওয়েবসাইট ফলো করুন।

যৌনমিলনে ভয় পান? আর ভয় নয় শিখেনিন কিভাবে মিলিত হবেন।

চটি গল্প পড়েন? জানেন চটি গল্প কেন পড়বেন বা পড়বেন না।

admin:

This website uses cookies.

Read More