রহস্য রোমাঞ্চ উপন্যাস, আবার হীরের খোঁজে

শিশুকিশোর উপন্যাস, রহস্য উপন্যাস, বারমুডা, চাঁদের পাহাড় এর মনে করিয়ে দেওয়া রোমাঞ্চ উপন্যাস

রহস্য রোমাঞ্চ উপন্যাস, আবার হীরের খোঁজে
রহস্য উপন্যাস

আবার হীরার খোঁজে     

 বাপ্পাদিত্য মুখোপাধ্যায়

 
প্রিয় শঙ্কর,
আমি বেশ কয়েকটি পত্র-পত্রিকায় তোমার আফ্রিকার অভিজ্ঞতা পড়েছি। আর সেটা পড়েই আমি তোমাকে এই চিঠি লিখছি। তুমি হয়তো আমার নাম শুনে থাকবে। সে যাই হোক যদি রহস্য আর কাঁচা হীরা তোমারও লক্ষ্য হয়ে থাকে তাহলে বারমুডার বুকে তুমি আমার সঙ্গী হতে পারো। বারমুডার বুকে জেগে থাকা কোরক দ্বীপ গুলোতে রহস্য বা হীরা দুটোর কোনটারই অভাব নেই। এখন শুধু তোমার উত্তরের অপেক্ষা।
ইতি
অলিভার আর্নল্ড
পুয়ের্তো রিকো
 চিঠিটা একবার নয় বারবার পড়েছে শঙ্কর। প্রথমে নিজের চোখকেই বিশ্বাস হয়নি। অলিভার আর্নল্ড! সেই বিখ্যাত প্যাট্রিয়ট জাহাজের ক্যাপ্টেন অলিভার আর্নল্ড যিনি বারমুডার বুকে জেগে থাকা মৃত্যুকে হাতছানি দিয়ে ঘরে ফিরেছেন একাধিক বার। সেই তিনি আজ বারমুডার পথে শঙ্করকে সঙ্গে নিতে চান!
আফ্রিকা থেকে দেশে ফেরার পরই শঙ্কর জানতে পেরেছিল বারমুডার বুকে জেগে থাকা কয়েকটা দ্বীপের কথা। সেখানকার হীরার কথা। কিন্তু রহস্যময়তা আর মৃত্যু দিয়ে ঘেরা বারমুডার বুক থেকে অলিভার আর্নল্ড ছাড়া আর কেউই ঘরে ফেরেনি। যেমন আফ্রিকার রিখটারসভেল্ট থেকে ঘরে ফেরেনি জিম কার্টার, আত্তিলিও গাত্তি কিংবা প্রিয় আলভারেজ।
আর্নল্ডের চিঠির উত্তর দিতে বেশ কয়েক মাস সময় লেগেছিল শঙ্করের। কদিন আগেই দু’পায়ে মৃত্যু মাড়িয়ে এসে আবার বারমুডার মতো মৃত্যুপুরীতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত দুম করে নেওয়াটা শঙ্করের পক্ষেও সম্ভব হয়নি। কিন্তু যে জনহীন আফ্রিকার জঙ্গলে নিজের অন্তর আত্মার মুক্তি খুঁজে পেয়েছে সে কি আর কুনো ব্যাঙ হয়ে ঘরের কোনায় বেশিদিন বসে থাকতে পারে ? শেষ পর্যন্ত আর্নল্ডের কাছে একদিন শঙ্করের সম্মতিসূচক উত্তর আসে।
                               
[এক]
২১ সে জুন ১৯১২ পুয়ের্তো রিকো থেকে বারমুডার পথে একটা জাহাজ ভাসতে দেখা গেল। বলার অপেক্ষা রাখে না ওটাতেই শঙ্কর আর আর্নল্ড চলেছে পৃথিবীর সব চেয়ে রহস্যময় এলাকার দিকে। পৃথিবীর সবচাইতে অভিশপ্ত স্থানগুলোর মধ্যে বারমুডা ট্রায়াঙ্গল বা ত্রিভুজকে অন্যতম মনে করা হয়। এ পর্যন্ত এখানে যত রহস্যময় দুর্ঘটনা ঘটার কথা শোনা গেছে, অন্য কোথাও এত দুর্ঘটনা ঘটেনি। তিনটি প্রান্ত দিয়ে এ অঞ্চলটি সীমানা বদ্ধ। আর তাই একে বলা হয় বারমুডা ট্রায়াঙ্গল বা বারমুডা ত্রিভুজ। তিনটি প্রান্তের এক প্রান্তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা, একপ্রান্তে পুয়ের্তো রিকো এবং অপর প্রান্তে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বারমুডা দ্বীপ অবস্থিত। ত্রিভুজাকার এই অঞ্চলটির মোট আয়তন ১১৪ লাখ বর্গ কিলোমিটার। এটি ২৫-৪০ ডিগ্রি উত্তরাংশ  এবং ৫৫-৫৮ ডিগ্রি পশ্চিম দ্রাঘিমাংশের মধ্যে অবস্থিত। এ অঞ্চলের রহস্যময়তার একটি দিক হল, কোনও জাহাজ এই ত্রিভুজ এলাকায় প্রবেশ করার কিছুক্ষণের মধ্যেই বেতার তরঙ্গ প্রেরণে অক্ষম হয়ে পড়ে। উপকূলের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনে ব্যর্থ হয়। একসময় দিক নির্ণয় করতে না পেরে রহস্যজনক ভাবে অদৃশ্য হয়ে যায়। মার্কিন সূত্র অনুযায়ী, গত ২০০ বছরে এ এলাকায় কমপক্ষে ৫০-টি বাণিজ্যিক জাহাজ এবং ২০-টি বিমান চিরতরে অদৃশ্য হয়ে গেছে।
শঙ্কর সম্মতি সূচক উত্তর দেওয়ার পরে-পরে আরও বেশ কিছু পত্র বিনিময় হয়েছিল দুজনের মধ্যে। এতে একটা সুবিধা হয়েছে, দুজন দুজনের ব্যাপারে জেনেছে অনেক কিছু। পুয়ের্তো রিকো বন্দরে আর্নল্ডকে দেখে শঙ্করের প্রথমেই আলভারেজের কথাই মনে পড়েছিল। আর্নল্ডের লালচে তামাটে গায়ের রঙ, কাঁচাপাকা দাড়ি, আর মুখে সর্বদা জ্বলন্ত চুরুট। সব মিলিয়ে আলভারেজকে মনে পড়াটাই স্বাভাবিক।
বাড়ি ফেরার পর শঙ্কর যে একবারের জন্যেও পরিবারের কথা ভেবে সংসার গড়ার কথা মাথায় আনেনি, সেটা নয়। কিন্তু আফ্রিকার রিখটারসভেল্ট পর্বতশ্রেণী, আত্তেলিও গাত্তির নরকঙ্কাল আর বিশেষ করে আলভারেজের মৃত্যুর ছবিটা শঙ্কর চোখের পাতা থেকে মুছতে পারেনি কিছুতেই। হয়তো তাই শঙ্করের আর সংসার গড়া হল না। ওর পায়ের পাতায় চিরদিনের জন্য আফ্রিকার মাটি লেগে গেছে।
জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে দূরবীন চোখে দূরের নীল জলরাশির দিকে তাকিয়ে সমুদ্রের রূপ দেখতে দেখতে আনমনা হয়ে পড়েছিল শঙ্কর। হঠাৎ মাথার উপর এক ঝাঁক পাখি উড়ে যেতেই ওর সম্বিৎ ফেরে। আর্নল্ড এখন ইঞ্জিন ঘরে নিজের কাজে ব্যস্ত। জাহাজটা যে কোন পথে চলেছে সেটা বোঝার ক্ষমতা শঙ্করের নেই। বনজঙ্গল পাহাড় পর্বত ও যতটা কাছের থেকে চেনে সমুদ্র ততটা কাছের থেকে চেনা কখনই নয়। একঘেয়ে পাহাড়ে চড়তে বা জঙ্গলে পথ চলতে বিরক্তি আসে ঠিকই কিন্তু অবিরাম সমুদ্রের বুকে ভেসে চলা আরও বেশি বিরক্তিকর। মাঝে মাঝে বড় মাপের ঢেউয়ের ধাক্কায় জাহাজটা দুলে-দুলে উঠে। গা গুলিয়ে যায়। আকাশে ক্রমশ পাখির সংখ্যা কমতে কমতে এখন দু-একটা করে উড়তে দেখা যাচ্ছে। খানিক বাদে সেটাও হয়তো দেখা যাবে না আর।
আজকের যাত্রা পথে শঙ্করের বারবার আফ্রিকার দিনগুলোই মনে পড়ে যাচ্ছিল। হয়তো আর কোনও দিন আফ্রিকায় যাওয়া হবে না ওর। আফ্রিকায় গেলে শেষ বারের মতো একবার আলভারেজের সমাধিটা অবশ্যই ও দেখে আসবে। ঘুরে আসবে কিসুমু থেকে ত্রিশ মাইল দূরের সেই ষ্টেশনটায়। কি ভয়ানক ছিল ওখানকার সিংহের গর্জন। তবু একটা নেশা ছিল সেই গর্জনে। এবারের যাত্রাপথটা কেমন যেন ম্যাড়ম্যাড়ে। আকাশ কুসুম ভাবনার ভেতর দিয়ে আফ্রিকা আর বারমুডার পার্থক্য নির্ণয় করতে থাকে শঙ্কর।
একটা সময় বিরক্তি আর ক্লান্তিতে নিজের কেবিন ঘরের মেঝের উপরেই ঘুমিয়ে পড়েছিল শঙ্কর। বুকের উপর উপুড় করা একটা গল্পের বই। হয়তো গল্পের বইটা পড়তে পড়তেই চোখ লেগে গিয়ে থাকবে। হঠাৎ ডেকের উপর হুড়মুড় করে একটা শব্দ হতেই ঘুমটা ভেঙে গেল শঙ্করের। ঘুম থেকে উঠে শঙ্কর ডেকের সিঁড়ির দিকে পা বাড়ালে আর্নল্ড বাধা দিয়ে বললে- এখন উপরে যেও না শঙ্কর, বৃষ্টি হচ্ছে। মনে হয় ঝড় উঠবে, আকাশের অবস্থা মোটেই ভাল নয়। বরং আমার সঙ্গে ইঞ্জিন ঘরে চলো কফি খেতে খেতে গল্প করা যাবে।
আর ডেকের উপরে যাওয়া হল না শঙ্করের। তবে ইঞ্জিন ঘরে এসে ও যা দেখল তাতে ওর হাড় হিম হবার জোগাড়। জাহাজের বাইরেটা ঘনান্ধকার কালো মেঘে ঢাকা। কিছুই চোখে পড়ছে না। মনে হচ্ছে হাজার হাজার বছরের প্রাচীন মেঘের দল জাহাজটাকে গিলে ফেলতে চাইছে। অন্তত শঙ্করের তো তেমনটাই মনে হল। আর্নল্ড শঙ্করের দিকে একটা চেয়ার বাড়িয়ে দিয়ে বললে- সমুদ্রের বুকে এসব নতুন কিছুই নয়। তুমিও দেখে থাকবে নিশ্চয়। তবে পার্থক্য এটুকু যে, এখানের মেঘগুলো সমুদ্রের শরীরে নেমে এসেছে। শঙ্কর কী বলবে কিছুই বুঝে উঠতে পারল না, শুধু মনে মনে বললে- লোকটা কি পাগল ?
 
মিনিট কুড়ি পরে শঙ্করের মনে হল, আর্নল্ড স্টিয়ারিং হাতে ঘুমিয়ে পড়েছে। বেশ কিছুক্ষণ অবশ্য কোনও সাড়াশব্দ পাওয়া যায়নি আর্নল্ডের। চোখ দুটোও বন্ধ। যাচাই করার জন্য শঙ্কর জিজ্ঞেস করে-  আচ্ছা আমরা বারমুডা রেঞ্জে কখন পৌঁছব ?
আর্নল্ড চোখ বন্ধ করেই বললে- এক মিনিট পরেও পৌঁছতে পারি আবার একমাসেরও বেশি সময় লাগতে পারে। বারমুডার কোনও নির্দিষ্ট এলাকা নেই। ওটা কমা বাড়া করতেই থাকে। তবে যখন বারমুডার রহস্যময় এলাকায় ঢুকব তখন নিজেই বুঝতে পারবে পরিবর্তনটা।
কেমন পরিবর্তন ?- জিজ্ঞেস করে শঙ্কর।
আর্নল্ড বললে- সেটাও ঠিকঠাক বলা সম্ভব নয়। বারমুডা আমাকে এক একবার এক একরকম রহস্যময় ওয়েলকাম জানিয়েছে। কখনো রাক্ষুসে শ্যাওলার মুখে ফেলে তো কখনো কুয়াশার ঝড়ে জাহাজ আটকে দিয়ে। কখনো আবার ভয়ংকর জলজ দাবানলে জাহাজটাকে ঘিরে ধরে। আমিও ছাড়ার পাত্র নই, প্রতিবার বারমুডার বাধা কাটিয়ে গেছি। কথাগুলো বলতে বলতেই একটা চুরুট ধরিয়ে নেয় আর্নল্ড।
শঙ্কর আবার আশ্চর্য হয়ে জানতে চায়- জলজ দাবানল! কিন্তু সেটা কেমন করে সম্ভব ?
শঙ্করের প্রশ্নে আর্নল্ডের ঠোঁটে এক টুকরো হাসির রেখা দেখা দেয়। হাসি মুখেই আর্নল্ড বলে- বারমুডায় অসম্ভব বলে কিছুই হয় না। যেটা অন্যান্য কোথাও সম্ভব নয় সেটাই প্রতিনিয়ত ঘটতে থাকে বারমুডায়। তবে সেবার আগুনটা লেগেছিল সমুদ্রের বুকে ভাসমান শুকনো শ্যাওলার জন্য।
জাহাজটা এখন নিজের খেয়ালে চলেছে। এখন আর আকাশে মেঘ নেই। যতদূর দেখা যায় শুধু নীল আর নীল। সুদূর নীল জলরাশির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মাথা ঝিমঝিম করে শঙ্করের। এই নীলের যেন শেষ নেই। জাহাজটা দুলতে দুলতে এগিয়ে যাচ্ছে বারমুডা ট্রাঙ্গেলের দিকে।
 
[দুই]
পরের দিন বিকেলের দিকে জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে শঙ্কর নিজের আফ্রিকা জীবনের গল্প শোনাচ্ছিল আর্নল্ডকে। পড়ন্ত বিকেলের পাতলা আলোয় কত স্মৃতি কত কথাই না আজ ওর মনে পড়ে যাচ্ছে। আগ্নেয়গিরিটার কথা বলার পর শঙ্কর হয়তো আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু হঠাৎ আর্নল্ডের মুখের দিকে তাকিয়ে চুপ করে গেল। আর্নল্ডের মুখটা ভয়ঙ্কর রকম থমথমে হয়ে আছে। শঙ্কর দূরের নীল জলরাশির দিকে তাকিয়ে রহস্যময় কিছু একটা খোঁজার চেষ্টা করল ঠিকেই কিন্তু তেমন কিছুই চোখে পড়ল না ওর।
বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে আর্নল্ড বললে- আফ্রিকায় তুমি তোমার খুব কাছের যে বন্ধুকে হারিয়েছিলে তাঁকে আজও তুমি মনে মনে পথপ্রদর্শক করে রেখেছ তাই তো ?
-ঠিক তাই। আমি দিয়াগোকে ভুলতে পারিনি।
  কিছুক্ষণ উদাসীন ভাবে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকার পর আর্নল্ড বলতে শুরু করে ফেলে আসা দিনের কথা- একটা সময় সমুদ্রের নেশা আমাকে পেয়ে বসেছিল। নেশাটা যে এখন নেই সেটা নয় তবে সেই সময়ের সঙ্গে আজকের তুলনা চলে না। তখন বয়সটাও ছিল কম, তাই সব স্বপ্ন গুলোকেই জ্যান্ত বলে মনে হত। নিজেকে জাহাজের ক্যাপ্টেন ছাড়া দ্বিতীয় কিছু ভাবতেই পারতাম না। সেদিন পাড়ি দিয়েছিলাম পুনটা কানার পথে। মেরিন, আমার স্ত্রী কিছুতেই আমাকে যেতে দিতে চায়নি। কিন্তু ওই যে বললাম, নেশা। সেদিন মেরিনের কথা অগ্রাহ্য করেই বেরিয়ে পড়েছিলাম পুনটা কানার সুদীর্ঘ পথে। মাস তিনেক পরে যখন ফিরে এলাম তখন সব শেষ হয়ে গেছে। আমি পুনটা কানা যাবার পরেই পুয়ের্তো রিকোতে বন্যা দেখা দিয়েছিল। আমার ঘর ভেঙে গুড়িয়ে গিয়েছিল। জলে তলিয়ে গিয়েছিল মেরিন। জানতো শঙ্কর নিজেকেই অপরাধী বলে মনে হয়। মেরিন মারা যাবার পর যখন বাঁচার আর কোনও উদ্দেশ্যই রইল না তখন বেরিয়ে পড়লাম নানান রহস্যময় এলাকায়। নিজেকে মৃত্যুর মাঝে বারবার দাঁড় করিয়ে দিয়ে তামাশা দেখেছি। কিন্তু কই মৃত্যু তো আমাকে নিলো না !
কথাগুলো বলতে বলতে আর্নল্ডের দুচোখ জলে ভরে আসে। সেটা শঙ্করের দৃষ্টি এড়ায় না। কিন্তু এমন সময় মানুষকে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো কিছুই থাকে না। কিছু কষ্টের কোনও সান্ত্বনা হয় না কখনো।
ডুবন্ত সূর্যের আলো এবার সমুদ্রের নীলের উপর লাল মাখিয়ে দিচ্ছে আলতো করে। সমুদ্রের জল এখন শান্ত। আর্নল্ড হয়তো দূরের দিকে তাকিয়ে সুদূর অতীতে রেখে আসা পরিবারের কথা মনে করার চেষ্টা করছে। শঙ্কর বারবার হারিয়ে যাচ্ছে আফ্রিকার সবুজ স্মৃতিতে।
আজকে আর বেশিক্ষণ রাত জাগেনি শঙ্কর। সামান্য কিছু চিঁড়ে ভাজা আর জল খেয়ে শুয়ে পড়েছিল। আলভারেজের সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলো মনে করতে করতে জাহাজের মৃদু দুলুনিতে একটা সময় ঘুম এসে গিয়েছিল ওর। ঘুমটা ভাঙল ভয়ানক একটা শব্দে। ধড়ফড় করে বিছানা থেকে উঠে জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরেটা দেখার চেষ্টা করল শঙ্কর। কিন্তু মিশমিশে অন্ধকারে কিছুই দেখা গেল না। ব্যাপারটা বোঝার জন্য শঙ্করকে কেবিন ঘর থেকে বেরিয়ে ছুটতে হল ইঞ্জিন ঘরের দিকে।
ইঞ্জিন ঘরের ভেতরে ঢুকে শঙ্কর যা দেখল তাতে করে ওর মূর্ছা যাবার জোগাড়। সমুদ্রের যে দিকটায় দৈত্যাকার কয়েকটা পর্বত দাঁড়িয়ে রয়েছে সেদিকেই ছুটে চলেছে জাহাজটা। জাহাজের ঘোলাটে আলোয় পর্বতগুলোর উচ্চতা ঠিক মতো বোঝা যাচ্ছে না। স্টিয়ারিং হাতে দাঁড়িয়ে আর্নল্ড জাহাজের মুখটা প্রাণপণ শক্তিতে ঘোরাবার চেষ্টা করছে। চুল্লির আগুনের মতো গনগনে লাল হয়ে আছে আর্নল্ডের চোখ দুটো। চিতি সাপের মতো বেরিয়ে পড়েছে হাতের প্রতিটা শিরা। সামনের দিকে তাকিয়েই আর্নল্ড চিৎকার করে বললে- লাইফ বেল্ট পরে নাও শঙ্কর, ফাস্ট…ফাস্ট…ফাস্ট…
শ্বাস-রুদ্ধ বাক্-রুদ্ধ হয়ে কাটল আরও কয়েক মিনিট। এবার যেকোনও মুহূর্তে জাহাজটা ধাক্কা খাবে পর্বতের সঙ্গে। গুড়িয়ে যাবে জাহাজটা। তারপর ? …জানে না শঙ্কর। কিছুই জানে না ও। মৃত্যুর অনেক রূপ দেখার পরেও মৃত্যুর প্রতিটা রূপকেই অন্যটার থেকে ভয়ঙ্কর বলে মনে হয়েছে শঙ্করের। তবুও আর্নল্ড বলার পরেও লাইফ বেল্ট বাঁধেনি শঙ্কর। অ্যাটল্যান্টিকার মাঝে দাঁড়িয়ে আর যাই হোক লাইফ বেল্ট পরে লাইফ রক্ষা হবে না এটা শঙ্করের অজানা নয়। আর মাত্র কয়েকশো মিটার। তারপরই প্রচণ্ড ধাক্কায় গুড়িয়ে যাবে জাহাজটা। আর্নল্ড এখনো চেষ্টা করেই যাচ্ছে জাহাজটার মুখ ফেরানোর। কিন্