Loading...
Loading...

প্রেমের গল্প,স্বপ্ন ডানার ডাক

www.amarsahitya.com

স্বপ্ন ডানার ডাক

বাপ্পাদিত্য মুখোপাধ্যায়

প্রেমের গল্প,স্বপ্ন ডানার ডাক

এক মাসের মতো হল আমি এখানে স্কুল শিক্ষক

হয়ে এসেছি। এখানে বলতে এই রূপনারায়ণপুর গ্রামে। প্রথম যেদিন আসি সেদিন সত্যিই মনটা কেমন যেন হু হু করছিল। নিজের পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব, চেনা পথ-ঘাট এমনকি খাল-বিল, পুকুর, খেলার মাঠ সবই টানছিল নিবিড় টানে। তবুও তো যেতে হয়! সংসার নামক গাড়িটাকে গড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য কত দূরেই না ছুটছে লোকে। আমিও এসেছে।

প্রথম দিন এখানে এসেই মনে হল এই রূপনারায়ণপুর গ্রামটা আমার খুব চেনা। এখানের লাল মরামের রাস্তায় যেন আগেও হেঁটেছি আমি। একটা একটা করে দিন কাটার সঙ্গে সঙ্গে আমার ভেতরের সেই হু হু ভাবটাও উবে গেল একদিন। কচিকাঁচাদের ভিড়ে নিজেকে নতুন করে চিনতে শুরু করলাম আবার। ছোট্ট দুটো ক্লাস ঘর আর গোটা পঁয়ত্রিশ ছাত্রছাত্রী মিলিয়েই চলতে লাগল দিন। আমাকে দুহাত বাড়িয়ে আপন করে নিল এখানের প্রকৃতি।

ছোট্ট গ্রাম রূপনারায়ণপুর সবুজ দিয়ে মোড়া। গ্রামের একপ্রান্তে একটুকরো জঙ্গল। নাম গোত্রহীন একটা নদী, গ্রামের লোকে বলে বালুচরি নদী। আর আছে নানান মাপের ছোটবড় টিলা। স্কুল থেকে অল্প দূরেই আমার দু-কামরার ঘর। দুবেলা রান্না করার একটা লোক আছে। স্কুলের শেষে প্রতিদিন হারিয়ে যাই ওই এক মুঠো জঙ্গলটার ভেতর। নদীটার কাছে গিয়ে বসি। এই সময় গ্রামের কথা মনে পড়ে। চোখের পাতায় চেনা মুখগুলো ভিড় করে আসে। চোখ ঝাপসা হয়। তারপর শেয়ালের ডাকে রূপনারায়ণপুর গ্রামে সন্ধা নামে। পাখিদের মতো আমিও ফিরে আসি। কোনও কোনও দিন গল্প-উপন্যাসের বই নিয়ে বসি। কোনওদিন আবার নিজেই গল্প লিখতে বসি। এভাবেই কেটেছে এতদিন। আজকে সব এলোমেলো হয়ে গেল যেন…

প্রতিদিনের মতো বালুচরির বালির উপর বসে সূর্যটাকে ডুবতে দেখছিলাম। সারা আকাশে লাল মাখিয়ে টিলাগুলোর ওপারে প্রতিদিনের মতো ডুবে যাচ্ছিল আজকের সূর্যটাও। প্রতিদিনের মতো কয়েক ঝাঁক পাখি উড়ে বেড়াচ্ছিল নিজেদের খেয়ালে। তারপর নদীর চরে সন্ধা নেমে এলে আমি উঠে দাঁড়ালাম। উঠে দাঁড়িয়ে পিছন ফিরতেই চমকে উঠলাম আমি।

আমার থেকে হাত চল্লিশ দূরে বসে রয়েছেন এক ভদ্র মহিলা। সম্ভবত বিধবা। দূরের টিলাগুলোর দিকে উনি তাকিয়ে আছেন এক দৃষ্টিতে। নিঃশব্দে কখন এসে বসেছেন আমি জানতেও পারিনি। ভাবলাম কথা বলা উচিৎ, এভাবে পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়াটা ঠিক হবে না হয়তো। উনার সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই উনি বললেন, ‘আমি জানতাম তুমি আসবে।’

‘আসলে আপনি একা একা বসে আছেন দেখে ভাবলাম…’

ভদ্রমহিলা আমার দিকে তাকিয়ে হাসলেন। উনার এই বয়সের হাসিতেও যেন যৌবনের সুর ফুটে উঠল। উনার রূপের সঙ্গেই এমন হাসি মানায়। জিজ্ঞেস করলেন আমাকে, ‘এই নদী তোমার ভাল লাগে ?’

‘হ্যাঁ খুব ভাল লাগে। আমি প্রতিদিন এখানে এসে বসি।’

‘আমিও’

‘কিন্তু আপনাকে এর আগে কোনওদিন দেখিনি।’

আবার হাসলেন ভদ্রমহিলা। বললেন, ‘তিন মাসের মতো ছিলাম না। হঠাৎ মাথা ঘুরিয়ে পড়ে জ্ঞান হারিয়েছিলাম। হার্ট-অ্যাটাক বলতে পারেন। কালকে বিকেলে ফিরেছি।’

‘ও আচ্ছা। তাই দেখা হয়নি। এখন ভাল আছেন নিশ্চয় ?’ জিজ্ঞেস করলাম।

ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানিয়ে আবার হাসলেন ভদ্রমহিলা। মুখে কিছুই বললেন না।

‘সন্ধা হয়ে এল। চলুন হাঁটতে হাঁটতে গল্প করা যাবে…’

[দুই]

বাইরে চেয়ার নিয়ে বসে থাকতে থাকতে এক সময় সন্ধার ঘাড়ের উপর রাত্রি এসে হুমড়ি খেয়ে পড়ল। আমি চেয়ারে বসে অপলক ভাবে তাকিয়ে রইলাম দূরের টিলাগুলোর দিকে। ইঁদুরের খোঁজে একটা পেঁচা উড়ে এসে বসল সোনাঝুরি গাছের ডালে। রান্নার টুংটাং শব্দ থামিয়ে পরিমলদাও ফিরে গেল এক সময়। এরপর ঝিঁঝিঁ পোকার মতো রাত্রির বিরামহীন সুর বেজে চলল কানের ভেতর। বারবার চোখের পাতায় জেগে উঠল ওই মহিলার হাসি হাসি মুখটা। উনি জঙ্গলের সীমানা পর্যন্ত এলেন আমার সঙ্গে। হয়তো লোকে কিছু বলতে পারে ভেবেই…

এক সময় ঘুমের পাতলা চাদর নেমে এলো আমার চোখের পাতায়। অদ্ভুত একটা স্বপ্ন দেখতে শুরু করলাম আমি,-

ছুটতে ছুটতে একটা সবুজ টিলা বেয়ে নীচে নামছি যেন। ঝাঁক ঝাঁক পাখি উড়ছে আমাকে ঘিরে। ধোঁয়া ধোঁয়া কুয়াশার আড়াল থেকে ‘সা-হি-ল…’ নাম ধরে এক নারী কণ্ঠ ডাকছে আমায়। ওর মুখ দেখা যায় না। আমি যেন ওকে লক্ষ্য করেই ছুটে নামছি। দু’পা জুড়ে ক্লান্তি জড়িয়ে ধরেছে তবুও পায়ের গতি আরও বাড়ছে যেন। টলমল করছে পা দুটো, মনে হচ্ছে পাথরের উপর আছড়ে পড়ব। কাদের চিৎকার যেন বিভীষিকার মতো কানে এসে ধাক্কা মারছে। তবুও আমি আর পারছি না কিছুতেই, পা দুটো নিজেদের উপর ভরসা হারাচ্ছে এবার…

হঠাৎ কিসের যেন একটা শব্দে ঘুমটা ভেঙে গেল আমার। চোখ পড়ল রান্না ঘরের চালাটার নীচে। পেঁচাটা একটা ইঁদুর ধরেছে। তারই ঝটপট আওয়াজ। এদিকে ঘামে শরীরটা ন্যাতপ্যাত করছে আমার। চেয়ার থেকে উঠে গিয়ে চোখে মুখে জল নিলাম। রুটি তরকারিগুলো আমার অপেক্ষায় থাকতে থাকতে ঠাণ্ডা হয়ে শীত ঘুমে গেছে। পেটের ভেতর খিদেটা অনুভব করলাম এবার।

খাবার খেয়ে একটা পত্রিকার পাতা উল্টোতে উল্টোতে স্বপ্নটার কথাই ভাবছিলাম। কেমন যেন এলোমেলো বীভৎস একটা স্বপ্ন। যেটার কোনও মানে নেই। ‘আচ্ছা সত্যিই যদি স্বপ্নটার কোনও মানে থাকত ?’ নিজের প্রশ্নে নিজেই হেসে ফেললাম। ছোটবেলায় দেখা কোনও সিনেমার ছবি হয়তো এই প্রকৃতির ছোঁয়া পেয়ে নিজের কল্পিত রূপ নিয়েছে। অন্ততপক্ষে ফ্রয়েডের স্বপ্নের ব্যাখ্যা তো তাই বলে।

ভোরের দিকে ফ্রয়েডের ব্যাখ্যাকে কয়েক হাত পেরিয়ে আরও একটা স্বপ্ন দেখলাম আমি। ওই বিধবা মহিলাটির সঙ্গে সঙ্গমের স্বপ্ন। বালুচরি নদীর চরে সোনাঝুরি গাছের আড়ালে আমরা বিবস্ত্র। আমরা উন্মাদ। আমাদের দুটো শরীর জুড়ে আগুন ঝরছে। ঘুম ভাঙার পর এটাকে আর স্বপ্ন বলতে পারলাম না। এটা স্বপ্ন নয়, স্বপ্নদোষ।

মনের ব্যাপারীরা হয়তো বলবেন, আপনার অন্তরমন সঙ্গম চেয়েছিল তাই এই স্বপ্নদোষ। আমি মনের ঠিকানা জানি না। শুধু এটুকু জানি, মাতৃসমা ওই মহিলার সঙ্গে আমি সঙ্গমের কল্পনা করতে পারি না। আমি নিজেকে চিনি। তবুও কেন যেন ধিক্কার দিতে ইচ্ছে করল নিজেকে। বারবার ঘিনঘিন করে এলো শরীরটা।

[তিন]

আজকে সকাল থেকেই আকাশের মুখ ভার। যখন তখন ঝমঝম করে শুরু হতে পারে। এমন মেঘলা দিনে মন কেমনের কোনও কারণ দরকার হয় না। এক জীবনের স্মৃতি ভিড় করে চোখের পাতায় এসে বসে। এমন দিনে চেনা অচেনা কত মানুষের কথাই না মনে পড়ে যায়। একটা বিষণ্ণ ভায়োলিন বুকের ভেতর অবিরাম বাজতে থাকে।

স্নান-টান করে চারটি ভাত মুখে দিয়ে স্কুলের দিকে পা বাড়াতে যাব না হোঁচট খেলাম পরিমলদার কথায়, ‘আজকে তো রবিবার। তাও স্কুলে যাচ্ছেন!’

সত্যি কথা বলতে আমার একবারের জন্যেও মনে পড়েনি আজ রবিবার। তবুও পরিমলদাকে ধরা না দিয়ে বললাম, ‘স্কুলে নয় একটু বেড়িয়ে আসব বলে বেরচ্ছি। তোমার হয়ে গেলে বাইরের লকটা দিয়ে যেও।’

পরিমলদা আর কিছু বলল না ঠিকই কিন্তু আমার দিকে কেমন ভাবে যেন তাকিয়ে রইল কয়েক সেকেন্ড। হয়তো আমার পোশাকটাই

সন্দেহের কারণ। কোথাও ঘুরতে গেলে আমি সাধারণত স্কুলে পরে যাওয়ার পোশাক পরে যাই না। যাই হোক পরিমলদার চোখের আড়ালে এসে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম আমি।

এখানে দোকানবাজার তেমন নেই।ঘুরতে যাওয়া মানে সেই নদী-টিলা-জঙ্গল এগুলোই। বেরিয়ে যখন পড়েছি তখন কোথাও না গেলেও তো নয়। তাই আজকে সকালের ভ্রমণটা পায়ের উপরই ছেড়ে দিলাম। যদিও জানি আমার পা দুটোর দৌড় বলতে তো সেই নদীর চর পর্যন্তই। পায়ে পায়ে চলতে চলতে এসে দাঁড়ালাম আবার সেই বালুচরি নদীর চরেই।

হাঁটতে হাঁটতে কেন যেন মনে হচ্ছিল সেই ভদ্রমহিলার সঙ্গে দেখা হলেও হতে পারে। এতক্ষণ পর্যন্ত এটা নিছক ভাবনাই ছিল মাত্র। এসে যখন দেখলাম উনি সেই কালকের জায়গাতেই বসে রয়েছেন তখন আর অবাক না হয়ে পারলাম না। আজকেও উনার দৃষ্টি আবদ্ধ সেই টিলাগুলোর দিকেই।

‘আজকে সকাল সকাল ?’ জিজ্ঞেস করলাম।

উনি আমার উপস্থিতিতে বিন্দুমাত্র অবাক না হয়ে দূরের দিকে তাকিয়েই বললেন, ‘এখানে আসার জন্য সকাল বা বিকালের প্রয়োজন হয় না আমার। মন টানলেই চলে আসি। কিন্তু আপনি ?’

উনার পাশেই বসে পড়লাম আজ। ভোর রাতের স্বপ্নটা মাথায় এসে কয়েক পাক ঘুরে আবার বেরিয়ে গেল। বললাম, ‘আমি সকালে আজকেই প্রথম। আসলে খেয়াল ছিল না যে আজ রবিবার। স্কুলের জন্য বেরিয়ে… আচ্ছা আপনি কি রূপনারায়ণপুর গ্রামেই থাকেন?’

‘হ্যাঁ। ওই শিব দালানের ওদিকে।’

‘শিব দালান ? নামটা শুনেছি হয়তো কিন্তু যাওয়া হয়নি।’

‘হয়তো গেছেন। মনে পড়ছে না। হতেও তো পারে।’ আমার চোখে চোখ ভাসিয়ে হাসলেন ভদ্রমহিলা।

‘না সত্যিই যাওয়া হয়নি। তবে এবার নিশ্চয় যাব। যে গ্রামে শিক্ষকতা করছি সেই গ্রামটা ঘুরে দেখা উচিৎ। এখানের ঘর বাড়ি, সমাজ, পরিবেশ পরিস্থিতি এগুলো জানি না বলেই শিশুদের মন বুঝতে সমস্যা হয়।’

‘হয়তো হয়। আমার মানুষের মন বুঝতে ভাল লাগে না। এই নদী; এই এক টুকরো জঙ্গল আর ওই টিলাগুলো ছাড়া কোনও কিছুই বুঝতে ভাল লাগে না আমার। হয়তো বুঝতে পারি না বলেই। এদের আমি চিনি তাই বুঝতেও পারি। ওই টিলাগুলোর উপরে উঠেছেন কখনো ?’

‘না নদী পেরিয়ে ওদিকে যাওয়াই তো হয়নি। ওদিকটা খুব সুন্দর তাই না ?’

‘আজকে তো মেঘলা আকাশ, তেমন কষ্ট হবে না। যাবেন টিলাগুলোর কাছে ?’

‘বলছেন ?… চলুন তবে যাওয়া যাক।’

বালুচরির পাতলা জল পেরিয়ে আমরা টিলাগুলোর দিকে পা বাড়ালাম। মাঝে মাঝে দুবার দেখা দুটো স্বপ্নই ঘুরপাক খেলো মাথায়। এদিকটা যেন আরও বেশি নির্জন। মেঘলা সকালেও ঝিমঝিম করছে এলাকাটা। অথচ চারদিক জুড়ে সবুজের মেলা। নাম না জানা কত পাহাড়ি ফুল, অর্কিড ঝুলছে গাছে গাছে। যেন কোনও আশ্রমের দিকে চলেছি।

‘জানেন আজ বহু বছর পর এদিকে এলাম। একা একা আসতে ইচ্ছে করে না।’ আমার পাশাপাশি এসে কথাগুলো বললেন উনি।

‘এদিকটা বেশ নির্জন। একা একা না আসাই ভাল।’

‘না না নির্জন বলে নয়। নির্জনতা মনকে অতীতে টানে বলেই আসি না। আমার নতুন করে হারানোর কিছু নেই। শরীরেরও বেলা বেড়ে বিকেলের মুখে দাঁড়িয়ে।’

‘আমি সেটা বলছি না। শুধু তো নারীত্ব হারানোর ভয় নয়…’

‘নারীত্ব বলে কি আদৌ কিছু হয়! আসলে মেয়েরা যেটা হারানোর ভয় পায় সেটা তো মেয়েদেরকে সমাজ দেয়নি কোনওদিন। নতুবা সেটা হারানোর ভয় থাকত না। আর যদি বলেন শেয়াল কুকুরের ভয় ? তাহলে বলব ওদের আমি মানুষের চেয়ে বেশি ভরসা করি।।’

‘আপনি খুব গুছিয়ে কথা বলতে পারেন। তবে কোনও কোনও কথার গভীরতা এতটাই যে আমার ছোট মাথায় ঢোকে না।’

উনি আমার দিকে তাকিয়ে আবার হাসলেন। হাসি মুখেই বললেন, ‘সব মাথায় ঢোকানোর চেষ্টা করেন কেন ? কিছু জিনিস মনে ধরে রাখতে হয়। মাথায় বেশি কিছু রাখার মতো যায়গা কোথায় ?’

আমি কিছু বললাম না। উনার মুখের দিকে তাকিয়ে উনার গভীরতা মাপার চেষ্টা করলাম শুধু।

হাঁটতে হাঁটতে কখন যে টিলায় চড়তে শুরু করেছি আমার খেয়াল নেই। যখন খেয়াল হল তখন টিলার উপরে আমরা।

[চার]

টিলার উপরে দাঁড়িয়ে মাথাটা ঘুরপাক খেয়ে গেল আমার। মনে হল, আমার শরীরটা হালকা হয়ে গেছে। আমি যেন ঠিক ভাবে নিজেকে অনুভব করতে পারছি না। পা দুটোও যেন শূন্যে ভাসছে।

‘এই যে শুনছেন ?’ ডাকলাম উনাকে। উনি শুনেও শুনলেন না। আমাকে একা ফেলে উনি প্রায় একছুটে টিলাটার চূড়ায় গিয়ে দাঁড়ালেন। তারপর ডানার মতো দুহাত বাড়িয়ে দিয়ে পাখির সুরে শিস দিলেন উনি।

আমার চোখের সামনে বদলে যেতে লাগল প্রকৃতি। হাজার হাজার পাখি কোত্থেকে উড়ে এসে ঘিরে ধরল আমায়। আমার গায়ে মাথায় কাঁধে আদরে বসল কেউ কেউ। আবার উড়ল আকাশে। আবার ঘুরপাক খেলো। উনি টিলার উপর থেকে যেন ময়ূরীর মতো উড়ে এসে আমার সামনে দাঁড়ালেন। উনার বয়স এখন কুড়ির নীচে। যেন কতদিন থেকে চিনি এই মেয়েকে। আমি চোখ বন্ধ করে ওর নাম মনে করার চেষ্টা করলাম। মনে পড়ল না কিছুতেই। চোখ খুলতেই দেখি টিলার উপর রূপের আলো ঝরিয়ে মেয়েটা নেমে যাচ্ছে আরেক দিকে। আমি চাইলেও দাঁড়িয়ে থাকতে পারি না আর।

হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে আমিও নামতে লাগলাম ওর পিছনে পিছনে। ও একবারের জন্য দাঁড়িয়ে দেখল আমাকে।বুকের ভেতর আগুন লাগিয়ে দেওয়া হাসি হেসে দুহাত বাড়িয়ে ডাকল আমায়, ‘সা-হি-ল…’ তারপর আরও নীচে নামতে লাগল ও। নিজেকে নিজের ভেতর ধরে রাখার ক্ষমতা আমার নেই আমার। উড়ন্ত পাখির ডানা ছিঁড়ে বেরিয়ে পড়া পালকের মতো করে নীচে নামছি আমি। এমন সময় মনে হল পিছন থেকে কারা যেন ডাকছে আমায়। চিৎকার করে মানা করছে নীচে নামতে। ওরাও দ্রুত নেমে আসছে । আমি ওদের পায়ের শব্দ শুনতে পাচ্ছি।

জানি না কে আমার পায়ে সজোরে আঘাত করল। আমি ছিটকে পড়লাম একটা পাথরের কোলে। তারপর আর কিছু মনে নেই। যখন চোখ খুললাম তখন আমার সামনে গ্রামের অনেকেই দাঁড়িয়ে। বুঝতে পারলাম কিছু একটা হয়েছে আমার। মিনিট কয়েক পরই সব মনে পড়ল একে একে।

আমার হাতে হাত রেখে পরিমলদা বলল, ‘আর একটু হলেই পাহাড়ি খাদে গিয়ে পড়তেন। ছুটছিলেন কেন ? ভাগ্যিস আপনাকে ওই টিলার দিকে একা একা যেতে এই ছেলেটা দেখেছিল।’

‘কে এই ছেলেটা ?’

‘ওই রবিদাস বাউরীর ছেলে। গরু চরায়।’

‘কিন্তু আমি তো একা ছিলাম না। আমার সঙ্গে তো এক ভদ্রমহিলাও…’

‘জানি। ওর নাম পরি। শিব দালানের পুরোহিতের মেয়ে ছিল ও। বছর পঁচিশ আগে সাহিল নামের এক মুসলিম ছেলের প্রেমে পড়েছিল… এই বাচ্চা যারা আছিস সব যা এখান থেকে। যা যা খেলবি যা।’ পরিমলদা বাচ্চাগুলোকে বের করে দিয়ে আবার শুরু করল, ‘গ্রামেও কেউ মেনে নেয়নি। ওরা রাতের অন্ধকারে একদিন পালিয়ে যাওয়ার সময় ওই টিলাগুলোর উপরেই ধরা পড়ে। তারপর…’ কথাটা অসম্পূর্ণ রেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পরিমলদা।

‘তারপর ?’
‘সেই রাতেই গ্রামের লোকের হাতে খুন হয়েছিল সাহিল। যদিও ওকে খুন করতে চায়নি কেউ। ধাক্কা-ধাক্কিতে কীভাবে যেন ওই খাদটাতেই পড়ে গিয়েছিল ছেলেটা। ওর লাশ খুঁজে পায়নি গ্রামের লোকে। এক মাসের ভেতরই পরির বিয়ে দেওয়া হল গ্রামের নিতাই নামের একটা ছেলের সঙ্গে।’

‘তারপর ?’

‘বিয়ের অষ্টমঙ্গলার দিন সাপের কামড়ে মরল নিতাই। সেই থেকে পরি বিধবা। কারুর সঙ্গেই কথা বলত না ও। বালুচরির ঘাটে গিয়ে একলাই বসে থাকত। অপেক্ষা করত সাহিলের। যেহেতু সাহিলের লাশ পাওয়া যায়নি তাই ওর বিশ্বাস ছিল সাহিল ফিরে আসবে। তারপর পঁচিশ বছরেও যখন সাহিল ফিরে এলো না তখন নিজেও একদিন ঝাঁপ দিল ওই খাদেই।’

‘হোয়াট ? কতদিন আগে ?’

‘মাস তিনেক আগে।’

‘কিন্তু আমি তো…’

‘একমাস হল আমি আপনার বাড়িতে কাজ করছি। ছোট ভাই এর মতো দেখি আপনাকে। তাই দাদা হিসেবে বলছি, এখান থেকে চলে যান আপনি। আপনি এখানে থাকলে হয়তো আপনিও ওই খাদেই…’

‘কিন্তু কেন ?’

‘আপনি বিশ্বাস করুন আর নাই করুন যাদের সাহিলকে মনে আছে তারা সবাই বলবে আপনিই সাহিলের দ্বিতীয় জন্ম। ওই পরি আপনাকে নিজের করতে চাইছে।’

ভিড়ের ভেতর থেকে এক বয়স্ক বললেন, ‘হ্যাঁ মাস্টার-বাবু আপনার এখানে থাকাটা ঠিক হবে না। আপনি বাড়ি ফিরে যান।’

ঠিক এমন সময় কয়েকটা পাখি আমার ঘরের জানালার ওপারের গাছটায় এসে বসল। কেন যেন মনে হল ওরা আমার পরিচিত পাখি। আমার ডাক নিয়ে এসেছে। আমাকে অনেক দূরে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার ডাক। আমার হয়তো আর ঘরে ফেরা হবে না। আবার শরীরটা হালকা হয়ে আসছে আমার।

[সমাপ্ত]

www.amarsahitya.com

প্রেমের গল্প,স্বপ্ন ডানার ডাক
প্রেমের গল্প
Share

Recent Posts

Top 100 good morning flower images free download
  • good morning images

Top 100 good morning flower images free download

Top 100 good morning flower images free download. Good morning HD image with quotes, 100 good morning quotes. Good morning… Read More

1 day ago
Ishwar Chandra Vidyasagar Rachana for madhyamik and HS
  • সাহিত্য আলোচনা

Ishwar Chandra Vidyasagar Rachana for madhyamik and HS

Ishwar Chandra Vidyasagar Rachana is very important for all classes এবছর Madhyamik 2020 এবং Uchch Madhyamik 2020 এর জন্য Ishwar… Read More

4 days ago
bangla choties app download android
  • Bangla choti

bangla choties app download android

[smartslider3 slider=2] If you want to bangla choties app download android then please visit here. Bangla choties app available here.… Read More

4 weeks ago
bangla serial and bangla serial video
  • Bangla serial

bangla serial and bangla serial video

Bangla serial :- আপনি কি Bangla serial দেখতে বা Bangla serial video দেখতে খুব ভালবাসেন? তাহলে এই লেখাটা আপনার জন্য।… Read More

4 weeks ago
Bangla Kobita 1970-2020
  • Bangla kobita
  • Bangla Kobita abritti
  • Bangla love kobita

Bangla Kobita 1970-2020

Bangla kobita আশির দশক থেকে বর্তমান পর্যন্ত বিভিন্ন ধারায় প্রবাহিত। বাংলা কবিতার দিক বদল হয়েওছে একাধিক শক্তিশালী কবির হাত ধরে।… Read More

4 weeks ago
Bangla choti part2 Mami choti
  • Bangla choti

Bangla choti part2 Mami choti

Bangla mami choti:- বাংলা চটি সাহিত্যেরই আরেক 'সম্পদ'। হীরে নয় কিন্তু কয়লার মতো যার কদর। ছেলে বুড়ো প্রায় প্রত্যেকেই Bangla… Read More

4 weeks ago