Loading...
Loading...

প্রেমের গল্প, দুই টুকরো জীবন

বাংলা প্রেমের গল্প
প্রেমের গল্প
দুই টুকরো জীবন
          বাপ্পাদিত্য মুখোপাধ্যায়
এখন
শরতের নীল আকাশে রাজহাঁসের মতো সাদা সাদা মেঘ উড়ে যাচ্ছে। ওদের কোনও ঠিকানা নেই। যেন উড়ে চলাটাই ওদের জীবন। ‘ওদের মনখারাপও হয় না তাই না ?’ নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে পাপড়ি। তারপর নিজের বোকাবোকা প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে হাসি পায় ওর। তবুও ওর কেন যেন ভাবতে ভাল লাগে, দূরের ওই পুচকে মতো মেঘটারও কোনও একদিন কোনও এক প্রেমিক ছিল। সমুদ্রদার মতো সুন্দর দেখতে এক প্রেমিক। কোনও এক ঝড়ো হাওয়ায় সে হারিয়ে গেছে। আর দেখা হয়নি ওদের। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে থাকতে স্কুলজীবনের সেই ডোরাকাটা দিনগুলো মনে পড়ে পাপড়ির।
স্কুল ছুটির টাইমে প্রতিদিন নিয়ম করে আসত ছেলেটা। পাপড়ি তখন ওর নাম জানত না। পরে এক বান্ধবীর মুখে নাম শুনেছিল। প্রথম প্রথম ভয় হত পাপড়ির। ‘প্রেম’- নামক পরিবার বিরুদ্ধ শব্দটার ভয়। ছেলেটার দিকে তাকিয়ে দেখতেও সাহস হত না ওর। তবুও ঘুম না আসা চোখের পাতায় রোজ ঢেউ তুলত সমুদ্র। কেমন যেন অচেনা ভাললাগা ছিল সেই রাতগুলোতে। স্বপ্নের সমুদ্রে ভাসতে থাকা ঘুম-ঘুম ঘুম নেই রাত। তখন চাঁদের সাথে প্রথম বন্ধুত্ব হয়েছিল পাপড়ির। জানালার ওপারে জেগে থাকা চাঁদটাও যেন ফিসফিস করে সমুদ্রের কথা বলত। আজও বলে।
সময়ের হাত ধরেই সাহস পেয়েছিল পাপড়ি। টিউশন থেকে ফেরার পথে এক আলোআঁধারি গলি-মুখে প্রথম কথা বলেছিল ওরা। তারপর কত চিঠি লিখেছে দুজন দুজনকে তার হিসেব নেই। কতবার ঝগড়া হয়েছে, ছাড়াছাড়ি হয়েছে, আবার সব ঠিকও হয়ে গেছে। কিন্তু শেষপর্যন্ত কিছুতেই কিছু হয়নি। নারীনিয়তির নিয়ম মেনে অচেনা অজানা সুদীপ্তর সঙ্গে বিয়ে হয়ে গেল একদিন। তারপর সময়ের স্রোতে কোথায় যে হারিয়ে গেল সমুদ্র পথ তার খোঁজ রাখেনি।
ঠোঁট দুটোকে প্রাণপণ চাপা দিয়ে কোনক্রমে কান্নার শব্দটাকে গলায় আঁটকে নেয় পাপড়ি। বেয়াড়া চোখ দুটোই শুধু বারণ শোনে না। প্রকৃতির বুকে শরত এলেও পাপড়ির চোখদুটো শ্রাবণের ধারার মতো স্মৃতির ভারে ঝরতেই থাকে। সমুদ্রকে ভোলার চেষ্টা করতে গিয়ে পাপড়ি এটুকু জেনেছে, কিছু দুঃখ মনে রাখার চেয়ে সুখ আর কিছুতেই নেই।
‘খুশি দিনের অলস কোনে
অতীত যেদিন পড়বে মনে
সেদিন যদি আমার কথা
নাইবা মনে রয়
স্মৃতিটুকু দেবে আমার
ছোট্ট পরিচয়।’
পাপড়িকে দেওয়া জন্মদিনের গিফটের সঙ্গে একটা কার্ডে এই কটা লাইন লিখে দিয়েছিল সমুদ্র। সেদিন অকারণ কেঁদেছিল পাপড়ি। সমুদ্রকে হারিয়ে ফেলার ভয়ে হয়তো কেঁদেছিল সেদিন। ওই লাইন কটা পাপড়ি যে কতবার ডাইরির পাতায় লিখেছে তার হিসেব ওর নিজেরও জানা নেই। এখন তো মন কাঁদলেই, হয় এই লাইন কটাতে নয় তো মান্নাদের কণ্ঠে, “খুব জানতে ইচ্ছে করে/ তুমি কি সেই আগের মতোই আছ/ নাকি অনেক খানি বদলে গেছ” গানটায় আশ্রয় খোঁজে পাপড়ি।
[এক]
এখন দূরের বট গাছটার ফাঁকে দিনের সূর্য অস্ত যাচ্ছে। দুর্গাপুরে আসার পর সূর্যোদয় দেখার সৌভাগ্য আর হয় না পাপড়ির। বড়বড় বাড়িগুলোর আড়ালেই রোজ সূর্য ওঠে। পশ্চিম দিকটায় বাড়িঘর নেই বলে সূর্যাস্তটুকু দেখা যায়। প্রতিদিন ওই বটগাছটার আড়ালে হারিয়ে যায় সূর্যটা। তারপর পাখির দল বাড়ি ফেরে। একটা একটা করে তারা ফোটে আকাশে। রান্নাবান্নার কাজ সেরে কাজের মেয়ে লতিপাও বাড়ি ফিরে যায়। একলা স্মৃতির নদীতে সাঁতার দিতে থাকে পাপড়ি। রাত নটা নাগাদ সুদীপ্তর ফোন আসে। প্রতিদিন এক কথা,- ‘কি করলে ? কি খেলে ? পরের সপ্তাহে আসার চেষ্টা করছি। বুঝতেই তো পারছ কোম্পানির কাজ…’ কথাগুলো মুখস্থ হয়ে গেছে পাপড়ির। প্রথম প্রথম দুর্গাপুরের বাড়িটায় একলা থাকতে ভয় ভয় করত ওর। এখন আর কিছুই মনে হয় না। বরং সুদীপ্ত এলেই কেমন যেন অস্বস্তি হয়। এক বিছানার শুয়েও শরীর সাড়া দিতে চায় না আর।
এখন অনেক রাত। শরতের শিশিরে ভিজতে ভিজতে ঘুমিয়ে পড়েছে শহরটা। পাপড়ি আর জানালার ওপারে দূরের স্ট্রিট লাইটগুলো শুধু জেগে আছে। আজ কেন যেন ঘুম আসছে না ওর। মোবাইলের ডাটা অন করে ফেসবুকে লগ-ইন করতেই পাপড়ির চোখ পড়ে মেসেজ-বক্সে। দুটো নতুন মেসেজ। দুটো মেসেজেই পাঠিয়েছে মেঘলা মন নামের অচেনা কেউ। মেসেজ-বক্স ওপেন করতেই ভেসে ওঠে একটা স্মাইলি আর একটা কবিতা,-
‘আজকে একা জ্যোৎস্না রাতেও পুড়ি
স্মৃতির পুঁজে বাড়ছে শুধু পোকা
এখনো তবু সঠিক নেই জানা
বোকা আমি ঠিক কতটা বোকা
সেদিন কেন এঁকেছিলাম ঘর
কেনই বা এঁকেছিলাম শিশু
আজ বিদ্ধ প্রেমের ক্রুশে
দাঁড়িয়ে আছি জীবন্ত লাশ যীশু’
-কবিতাটা পড়ার পরই চমকে ওঠে পাপড়ি। মেঘলা মন নামের প্রোফাইলটা খুলতেই কভার ফটোতে বেরিয়ে আসে গাড় নীল রঙের শান্ত সমুদ্রের ছবি। প্রোফাইল পিকচারে বর্ষার আকাশ। প্রোফাইলটা বেশি দিনের বানানো নয়। তারমানে সমুদ্রর নতুন আইডি কিংবা ফেক আইডি। একটা অপঠিত ভয় পাপড়ির বুকের ভেতর বাসা বাঁধে। এতদিন যার স্মৃতির সুগন্ধে বিভোর হয়ে আছে পাপড়ি, আজকে তার দেখা পেতেই বুকটা কেমন যেন তিরতির করে কেঁপে ওঠে। হয়তো আর পাঁচজনের মতোই স্মৃতির দেবতার সম্মুখীন হতে চায় না পাপড়ি। কিছু প্রেম স্মৃতিতে সঞ্চিত রেখেই সুখ।
ফেসবুক প্রোফাইল লগঅফ করে আবার ছাদে এসে দাঁড়ায় পাপড়ি। ছাদের উপর এখন ঠাণ্ডা বাতাস বইছে। অনেক দূরে কোথাও ছুটন্ত ভারী গাড়ির টায়ারের আওয়াজ।
নানান ভাবনার ভিড়ে সারারাত আর ঘুম আসেনি পাপড়ির। সকালে ফেসবুক খুলতেই দেখে, ফ্রেন্ড-রিকোয়েস্ট এসেছে মেঘলা মন নামের প্রোফাইল থেকে। খানিকটা ঝোঁকের ভেতর একটা মেসেজ পাঠায় পাপড়ি, ‘আমি জানি আপনি কে। আপনিও জানেন আমার পক্ষে আপনাকে বন্ধু করা সম্ভব নয়।’
কয়েক মিনিটের ভেতর মেসেজের উত্তর আসে, ‘আপনার সঙ্গে বন্ধুত্ব করা বা আপনাকে বিরক্ত করা কোনওটাই আমার উদ্দেশ্য নয়।’
‘তাহলে মেসেজ করছেন কেন ?’
‘শুধু একটা কথা জানার জন্য’
‘আপনাকে জানানোর মতো কোনও কথা নেই আমার কাছে। দয়া করে আর মেসেজ করবেন না।’
‘ওকে, মেসেজ করব না আর ।’
[দুই]
সেদিনের পর আর মেসেজ করেনি সমুদ্র। কিন্তু পাপড়ি ? পাপড়ি অপেক্ষা করেছে নতুন মেসেজের। ইনবক্সে নিউ মেসেজের ছবি দেখে প্রতিবার অচেনা আনন্দে কেঁপে কেঁপে উঠেছে পাপড়ি। বারবার ভিজিট করেছে সমুদ্রের মেঘলা মন নামের প্রোফাইলে। দুদিন আগে নিজের ওয়ালে ‘খুশি দিনের অলস কোনে…’ কবিতাটা পোস্ট করেছিল সমুদ্র। পাপড়ির খুব ইচ্ছে করছিল অন্তত একটা লাইক দিতে। এই কবিটাকে আঁকড়েই তো কতদিন বেঁচেছে পাপড়ি!  কিন্তু শেষপর্যন্ত পারেনি ও। ভেতর ঘরে লুকিয়ে থাকা কিসের যেন একটা ভয় কিংবা সংস্কার ওকে পারতে দেয়নি। পাপড়িও তো তাদেরই একজন যারা মনের ক্ষত স্থানে সুগন্ধি পাউডার লাগিয়ে যন্ত্রণা ঢাকার চেষ্টা করে।
   সকালের খাবার খেয়ে একটা ম্যাগাজিন নিয়ে বসেছিল পাপড়ি। ঠিক সেই সময় বেজে উঠল মোবাইলটা। সুদীপ্তর কল। পাপড়ি কলটা রিসিভ করতে না করতেই মোবাইলের ওপার থেকে কয়েকটা কিস করে সুদীপ্ত বলে, ‘একটা দারুণ খবর আছে জানো। কোম্পানি… না না এটা মোবাইলে বললে ইন্টারেস্ট থাকবে না। এই খবরটা বাড়ি গিয়ে তোমাকে বুকে জড়িয়ে বলব। এই খবরটা আমার তরফ থেকে তোমার পুজোর গিফট। পুজোর বাজার সেরে ফেলোনি তো ?’
‘না, একা একা…’
‘না না একা একা বাজার করার দরকার নেই। আমি পরের সপ্তাহে আসছি তারপর দুজনে মিলে এবার বাজার করব। আর হ্যাঁ এবার তোমার মা বাবা আর ওই বিধবা জেঠিমার জন্যেও একটা শাড়ি কিনব, কেমন ? বেচারির পরার মতো শাড়িই নেই বলো ?’
পাপড়ি হ্যাঁ না কিছুই বলে না। আজকে যেন সুদীপ্তকে আরও বেশি অচেনা মনে হয় ওর।
‘এখন রাখি ? রাতে কল করব। বাই, টা-টা।’
মোবাইলটা বিছানায় রেখে সুদীপ্তর খুশির কারণটা খোঁজার চেষ্টা করে পাপড়ি। এই লোকটা কখন যে খুশি হয় আর কখন যে বিরক্ত আজও পাপড়ি বুঝে উঠতে পারেনি। ওর খুশির ঠিকানা খুঁজতে গিয়ে পাপড়ির নাকমুখ দিয়ে একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস প্রতিবারের মতো এবারেও বেরিয়ে আসে।
সুদীপ্তকে বিয়ে করতে চায়নি বলেই হয়তো পাপড়ি ওকে আজও মেনে নিতে পারেনি। সব পাওয়ার ভিড়েও কিছু না পাওয়াই বারবার ভিড় করে আসে ওর মনে। তবে ছেলে হিসেবে মন্দ নয় সুদীপ্ত। ভাল চাকরি করে। মোটা মাইনে। টাকা-গাড়ি-বাড়ি সব আছে। পাপড়ির স্বাধীনতাতেও কোনওদিন হাত দেয়নি ও। তবুও পাপড়ির মন সেই সুদূরের সন্ধানে আজও ফেরে। আজও চোখের পাতা ঝাপসা করে শ্রাবণের ধারার মতো স্মৃতির কণা ঝরতে থাকে। প্রতিটা একলা রাতেই ওর মনে হয়, সেদিন মা বাবার কথা না ভেবে যদি সমুদ্রের হতে পারতাম…
পাপড়ির মুখ থেকে ওর বিয়ের কথা শোনার পরেও বিচলিত হয়নি সমুদ্র। উদাসীন ভাবে আকাশের দিকে তাকিয়ে শুধু বলেছিল, ‘কোনওদিন ভুলে যেও না যেন।’ সেই দিনটার কথা পাপড়ির খুব মনে পড়ে। সবুজ ঘাসের উপর বসেছিল ওরা দুজনে। পাপড়ির পছন্দের নীল জিন্স আর মেরুন রঙের হাফ-হাতা পাঞ্জাবীটা পরে এসেছিল সমুদ্র। হাওয়ায় এলোমেলো হচ্ছিল ওর চুলগুলো। সেদিনের পর পাপড়ি অনেকবার সমুদ্রের সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিল। সমুদ্রই আর দেখা করেনি। হঠাৎ কাউকে কিছু না বলে পাপড়ি একদিন সমুদ্রের বাড়িও গিয়ে ছিল। গিয়ে দেখে, ঘরে তালা ঝুলছে। বাড়িতে কেউ নেই। গ্রামের কেউই বলতে পারেনি ওরা কোথায় গেছে। কবে ফিরবে। বিয়ের রাত পর্যন্ত সমুদ্রের ফেরার অপেক্ষা করেছিল পাপড়ি। সমুদ্র আর ফিরে আসেনি।
[তিন]
আজকে সকালে ফেসবুক খুলতে গিয়েই সমুদ্রের মেসেজটা চোখে পড়েছে পাপড়ির। ‘বুকে হাত দিয়ে শুধু একবার বলো ভাল আছো তুমি। আমি আর কোনওদিন বিরক্ত করব না।’ মেসেজটা পড়ার পর বুকে হাত দিয়ে ‘ভাল আছি’ বলার চেষ্টা করেছে পাপড়ি, কিন্তু পারেনি। যতবার বলতে গেছে ভাল আছি, ততবার ভাল না থাকার ছবিগুলোই ধরা পড়েছে চোখে। ভালবাসার মানুষ হারিয়ে ভাল থাকার অভিনয় করে যাওয়া যতটা সহজ ভাল থাকা ততটাই কঠিন হয়তো। বিয়ের পর-পর পাপড়িও আর পাঁচটা মেয়ের মতোই সব ভুলে নতুন করে শুরু করতে চেয়েছিল। পারেনি, এমনকি অন্তরঙ্গ সময়েও সুদীপ্তের শরীরে সমুদ্রের ছায়া খুঁজেছে ও।
সমুদ্রের এই মেসেজটা আসার পর থেকেই ভেতর ভেতর ছটফট করছে পাপড়ি। স্মৃতির সুতোগুলো যেন এক হয়ে ওকে অতীতে টানছে। বারবার শিশির জমছে চোখের পাতায়। কিন্তু ‘ভাল নেই’ লিখলে সমুদ্রের ঢেউ তো দ্বিতীয়বার ওকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে অচেনা সাগরে পাড়ি দিতে। আবার কিছু একটা না লিখলেও তো নয়। কি লিখব ভাবতে ভাবতেই জানালা দিয়ে সন্ধা এসে ঢুকল ঘরের ভেতর। কয়েকটা কচি কচি তারার মুখ ভেসে উঠল আকাশে। এমন সময় আবার মেসেজ এলো মেঘলা মনের, ‘ভাল আছো। ভাল থেকো।’
এবার আর উত্তর না দিয়ে উপায় নেই। কাঁপা কাঁপা আঙুলে চাপ দিয়েই পাপড়ি লিখল, ‘আমি ভাল নেই। তুমি ভাল থেকো।’ মেসেজটা সেন্ড হওয়ার পর কেন যেন ভয় হল ওর। নিষ্পাপ সুদীপ্তর মুখটা ভেসে উঠল চোখের পাতায়।
হাজার ভাবনার ভিড়ে পথ হারিয়ে আজকে রাতেও আর ঘুম এলো না পাপড়ির। খোলা জানালার পাশে শুয়ে তারাদের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই বাড়তে চলল রাত। শেষ রাতের দিকে আর থাকতে না পেরে আবার ফেসবুক এই মুখ গুঁজল পাপড়ি। বন্ধু লিস্টে এড করল মেঘলা মনের মানুষটিকে।
[চার]
পাপড়ি যেমনটা ভেবেছিল ঘটলও ঠিক তাই। পরপর দুদিন মেসেজে কথা বলার পরই আবার ছিঁড়ে যাওয়া সম্পর্কটা পাতা মেলতে শুরু করল নতুন করে। এতদিনের জমানো গল্পগুলো ফেসবুকের ইনবক্সে ভিড় করে এলো একে-একে। আরও নতুন করে প্রাণ পেয়ে অর্ধমৃত স্বপ্নগুলো ফিরে এলো চোখের পাতায়। আবার পাপড়ির মনে হল, এখনো একটা জীবন নিজের মতো বাঁচাতে পারে ও। এখনো জীবনের সব সুর শেষ হয়ে যায়নি।
কাল সারারাত ফেসবুকে কথা বলার পর সকালে যখন পাপড়ির ঘুম ভাঙল তখন ঘড়ির কাঁটা দশটার ঘর ছুঁই-ছুঁই করছে। সকালের এক পশলা বৃষ্টির পর ঝলমল করছে শরতের আকাশ। বাতাসে উৎসবের গন্ধ। পাপড়ির মনে হল, গ্রামের নদী পাড় দুটো হয়তো এতদিনে কাশ ফুলে সাদা হয়ে গেছে। এলোমেলো ভাবনায় মনের ভেতর ভেসে উঠল মেয়েবেলার ছবিগুলো। তখন ওদের গ্রামে দুর্গাপূজা হত না। এখন হয়।
বিয়ের আগের বছর সমুদ্রের সাইকেলের সামনে চড়ে ঘুরেছিল পাপড়ি। মফঃস্বলের কয়েকটা ঠাকুর দেখতে গিয়েছিল দুজনে। ফেরার পথে জলে পা ডুবিয়ে বসেছিল একটা কালভাটের কিনারায়। কাশফুলগুলো তখন দোল খাচ্ছিল বাতাসে। দু’একটা বালিহাঁস জলে চরছিল নিজেদের খেয়ালে। সেদিন প্রথমবার সমুদ্রের ঠোঁটে গলা পর্যন্ত ডুবেছিল পাপড়ি। ওই দিনটার কথা মনে পড়তে আজও শরীরে শিহরণ জাগে। বুক দুটো টনটন করে।
আজকে দুপুরের দিকে কল করেছিল সুদীপ্ত। কাল-পরশু বাদ দিয়েই আসছে ও। সঙ্গে দারুণ সারপ্রাইজ গিফট নিয়ে আসছে। সেই গিফট যে কি সেটা এখনো বুঝতে পারেনি পাপড়ি। বুঝতে পারার কথাও নয়। সুদীপ্ত ধরা না দিলে ওকে ধরা যায় না। ওর ভাবনা আর ভালবাসাটাও অনেকটা সেরকম। হয়তো তাই বিয়ের এতদিন পরেও পাপড়ির চোখে অচেনাই রয়ে গেছে মানুষটা।
সুদীপ্তর ফোনটা কাটার পর স্নানে ঢুকে সাওয়ারের নীচে দাঁড়িয়ে নিজেই নিজের নগ্ন শরীরটার দিকে অপলক ভাবে তাকিয়ে থাকে পাপড়ি। কেমন যেন নেশা লাগে ওর। সুদীপ্তর সঙ্গে শুয়ে এই নেশা নেই। এই নেশা কেবলই সমুদ্রের ছোঁয়ায়। এই নেশা শুধু সঙ্গমের নেশা নয়। এই নেশা শরীরকে মাতৃত্বের স্বপ্ন দেখায়।
‘দিদি ফোন এসেছে…’ লতিপার ডাকে চমক ভাঙে পাপড়ির।
সাওয়ারটা বন্ধ করে জিজ্ঞেস করে, ‘কার ফোন দেখ…’
‘কাকলি টু লেখা আছে।’
‘ফোনটা ধরে বলেদে, শরীর ভাল নেই আজকেও সন্ধায় যাওয়া হবে না।’
কাকলি, মঞ্জীরা, তৃষ্ণা আর পাপড়ি মিলে রোজ বিকেলে একটা পার্কে গিয়ে বসে। গল্পগুজব করে। সমুদ্রের সঙ্গে কথা বলার লোভে এই কদিন যাওয়া হয়নি পাপড়ির। পাপড়ি নিজের মোবাইল নম্বর সমুদ্রকে দিতে চেয়েছিল। ও নেয়নি। পাপড়ির সামনে দাঁড়িয়ে অন্তত একবার কথা না বলে ফোনে কথা বলতে চায় না ও।
পাঁচটা বাজতে না বাজতেই অনলাইনে এলো সমুদ্র। তার কয়েক সেকেন্ডের ভেতর ভেসে উঠল ওর মেসেজ, ‘একবার দেখা করতে পারবে ? কেন জানি না একবার দেখতে খুব ইচ্ছে করছে।’
‘কবে ?’
‘এই ধরো সামনের রবিবার। তোমাকে আসতে হবে না, আমিই আসব দুর্গাপুর।’
‘না না আসা যাওয়াটা ব্যাপার না। তোমাকে চোখের দেখা দেখতে আমারও খুব ইচ্ছে করে। কিন্তু তখন তো সুদীপ্ত… আই মিন ও বাড়িতেই থাকবে সম্ভবত।’
‘কবে আসছেন তোমার উনি ?’
‘দুদিন পরই। তবে যদি না থাকে তাহলে নিশ্চয় দেখা করব।’
‘আচ্ছা তাহলে তাই হবে।’
ফেসবুকের ভেতর দিয়ে দুটো মনের ভেতর কথা গড়িয়ে চলে। এই কটা দিন যে কীভাবে কেটে গেছে পাপড়ি বুঝতেও পারেনি। স্বপ্নের মতো পেরিয়েছে সময়। কয়েক বছর আগে সমুদ্রের চিঠিগুলো পড়তে পড়তে এভাবেই সময় কাটত পাপড়ির। সময় যেন হারানো সময়ে ঘুরে এসে দাঁড়িয়েছে আবার। হারিয়ে যাওয়া স্বপ্নগুলো মনের দরজায় ফিরে এসে টোকা দিচ্ছে যেন। নিজেকে ভেতরকার সেই আগের আমিটাকে খুঁজে পাওয়ার আনন্দই আলাদা। এই আমির ভেতর সুখের দিনের সেই আমি ফিরে এলে কে না ভাল থাকে ! 
[পাঁচ]
আজকে সকালেই এসেছে সুদীপ্ত। কেমন যেন বিষণ্ণ দেখাচ্ছে ওকে। অন্যান্য বার সকালে বাড়ি পৌঁছলেও, এসেই শুয়ে পড়ে না। আজকে দু’একটা কথা বলেই সেই যে শুয়েছিল ? ঘুম ভাঙতে পৌনে একটা। ঘুম থেকে উঠে খাবার খেয়ে আবার শুয়ে পড়েছিল। স্নান পর্যন্ত করেনি। সুদীপ্তর থমথমে মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করতেও সাহস হয়নি পাপড়ির। তবে পাপড়ি এটুকু জানে সুদীপ্তর যাই হোক না কেন, ও ঠিক বলবে। না বলে থাকতে পারে না ও।
সন্ধার গড়ায় গড়ায় ঘুম থেকে উঠল সুদীপ্ত। তারও আধঘণ্টা পর ডাক পড়ল পাপড়ির। অন্যান্য বার বাড়ি এলে সন্ধার দিকে ক্লাবে বেরিয়ে যেত সুদীপ্ত। ফিরত হালকা ড্রিঙ্ক করে। আজকে বাইরে যাওয়ার কোনও লক্ষণ নেই। ওদিকে ফেসবুকে বসে সমুদ্র হয়তো…
‘মাঝে মাঝে আনন্দের দিনেও মনটা কেমন যেন বাদলা হয়ে থাকে তাই না ?’ পাপড়িকে লক্ষ্য করেই কথাগুলো বলল সুদীপ্ত। পাপড়ি কিছু একটা বলতে গিয়েও গুটিয়ে নিলো নিজেকে। সুদীপ্তর হাতে এখন রঙিন গ্লাস। টেবিলে কয়েক টুকরো কাটা আপেল, নুনের ছোট বাটি। কখন শুরু করেছে কে জানে! সুদীপ্তকে কেমন যেন এলোমেলো লাগছিল সকাল থেকেই। তাই বলে এই কালসন্ধায় ও মদ নিয়ে বসবে এটা হয়তো ভাবেনি পাপড়ি।   
‘একটা কথা বলব বলব করেও…’ এক চুমুক নিয়ে ‘…বলা হয়নি। দাঁড়িয়ে রইলে কেন ? বসে পড়ো। লম্বা গল্প।’ বিছানার একটা কোনায় জড়সড় হয়ে বসে পাপড়ি।
‘কলেজে ঢুকেই দুম করে প্রেমে পড়েছিলাম জানো ? বনলতা, বনলতা সেন নয়। বনলতা বসু। সাদামাটা ঘরের মেয়েছিল ও। বড়লোক বাপের বেয়াড়া এই ছেলেটাকে ওই তো টাকার বাইরের দুনিয়াটা চিনিয়েছিল। শিশির পড়ার শব্দ শুনেছ কখনো ? আমি শুনেছি। রাতের পর রাত একলা ছাদে দাঁড়িয়ে শিশিরের শব্দ শুনেছি। পিউকাঁহার ডাক শুনেছি। শকুনের কান্না শুনেছি, আরও…’ মদের গ্লাসটা হাতে নিয়েই পশ্চিমের জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ায় সুদীপ্ত। টলমল করছে ওর পা দুটো। চোখের কোনায় অতীতের শান্ত ছায়া নিবিড় হয়ে আছে। ‘বি-সি-এ এম-সি-এ করে যখন চেন্নাই থেকে ফিরলাম তখন আর কিছুই নেই। হ্যাঁ শকুনগুলো ছিল তখনো…’ হাসার চেষ্টা করেও হাসতে পারে না সুদীপ্ত। গলাটা ভারী হয়ে এসেছে ওর। ‘আমার বাবা আমাকে এত ভালবাসতেন এত ভালবাসতেন যে বুকে জড়িয়েই মেরে ফেললেন। একদিন নিজেও সব ছেড়ে চলে গেলেন ওপারে। আমি তখন একা। অন্ধকারের মতো একা। ভাল করা তো দূরের কথা মন্দ করার মতোও কেউ নেই তখন।’
মদের গ্লাসটা খালি করে পাপড়ির সামনে এসে দাঁড়ায় সুদীপ্ত। পাপড়ির একটা হাত কয়েকবার ঝাঁকিয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘আচ্ছা বনলতা বিষ খেয়েছিল কেন জানো ? জানো না। কিছুই জানো না তুমি। বনলতা বিষ খেয়েছিল বাঁচবে বলে। ও বেঁচে গেছে। আমি মরছি। প্রতিদিন নতুন নতুন ভাবে মরছি। কেউ কারু নয়। যাও… যাও… এখান থেকে। গেট আউট।’ পাপড়িকে একরকম ভাবে ধাক্কা দিয়েই বের করে দেয় সুদীপ্ত।
আর সারারাত দরজা খোলেনি ও। একাই যেন কিসব বিড়বিড় করেছে অনেক রাত পর্যন্ত। কয়েক বার কান্নার শব্দও পেয়েছে পাপড়ি। এই প্রথমবার কেন যেন সুদীপ্তর জন্য কষ্ট হচ্ছে ওর। সমস্ত অচেনার বাইরেও ওকে খুব চেনা মনে হচ্ছে প্রথমবার।
[ছয়]
সোফায় বসে থাকতে থাকতেই কখন যে ঘুম এসেছিল পাপড়ির খেয়াল নেই। যখন ঘুম ভাঙল তখন নটা পেরিয়ে গেছে। সুদীপ্ত স্নান সেরে জামাপ্যান্ট পরছে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে। কোথাও বেরোবে মনে হয়। ধড়ফড় করে উঠেই চোখেমুখে জল নেয় পাপড়ি। শরীরটা ম্যাজম্যাজ করছে এখনো।
‘কোথাও বেরোবে ?’ জিজ্ঞেস করে।
‘হ্যাঁ।’ ছোট্ট করেই উত্তর দেয় সুদীপ্ত। চোখেমুখে কালকে রাতের কোনও চিহ্নই নেই এখন।
‘দাঁড়াও খাবার বানিয়ে দিচ্ছি।’
‘কালকে রাতের জন্য বানানো খাবারগুলোই আমি গরম করে খেয়েছি।’
‘কোথায় যাবে এখন ?’
‘কয়েক মাসের কাজে দেশের বাইরে যেতে হচ্ছে। সেই একটা গিফটের কথা বলছিলাম না…’
‘আর আমি ?’ ঠোঁট ফসকেই কথাটা বেরিয়ে আসে পাপড়ির মুখ দিয়ে।
‘তুমি ?’ হাসি হাসি মুখে পাপড়ির দিকে তাকায় সুদীপ্ত। তারপর বলে, ‘তুমি ফেসবুকের পাসওয়ার্ডটা বদলে নিও।’
সেকেন্ডের ভেতর পাপড়ির মুখটা বাসি ফুলের মতো ফ্যাকাসে হয়ে যায়। ঠোঁট দিয়ে কোনও কথাই বার হয় না আর।
‘ডানা অনেকের থাকে কিন্তু সবার জন্য আকাশ থাকে না। তোমার আকাশ আছে। চিন্তা নেই এই বাড়িটা রইল। আলমারির ভেতর চেক রাখা আছে। একজীবন বাঁচার মতো বাঁচতে সমস্যা হবে না…’ কোথায় যেন একটা কষ্ট হচ্ছে সুদীপ্তর। গলার ভেতর কান্নাগুলো যেন কিলবিল করে বেরিয়ে আসতে চাইছে। ‘একটা সময় আমিও কবিতা লিখতাম জানো? আজও কবিতা লিখতে খুব ইচ্ছে করছে…’
পাপড়ির সামনে এসে দাঁড়ায় সুদীপ্ত। দুহাতে করে পাপড়ির মুখটা তুলে কপালে চুমু খেয়ে বলে, ‘কারণে অকারণে কোনওদিন কষ্ট দিয়ে থাকলে ক্ষমা করে দিও। অনুমতি না নিয়ে তোমাদের মেসেজগুলো পড়েছি বলে খারাপ পেও না।’
পাপড়ি দুচোখ জল নিয়ে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থাকে। সুদীপ্ত সোফায় বসে জুতোর ফিতেগুলো বাঁধতে বাঁধতে বিড়বিড় করে,-
“সব পাখী ঘরে আসে- সব নদী- ফুরায় এ জীবনের সব লেনদেন;
থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।”
                                                                             -সুদীপ্ত বেরিয়ে যাওয়ার পর কান্না ভেজা চোখে অপলক ভাবে শূন্য রাস্তার দিকে চেয়ে থাকে পাপড়ি। কানের ভেতর ‘বনলতা সেন’ কবিতার শেষ দুটো লাইন বেজে চলে বিরামহীন ভাবে।
                                                                        [সমাপ্ত]

Active Search Results

প্রেমের গল্প

সেরার সেরা প্রেমের গল্প

সেরার সেরা প্রেমের গল্প পড়তে চাইলে আমাদের ওয়েবসাইট সাবস্ক্রাইব করে রাখুন।

Share

Recent Posts

Notun bangla chudi golpo 2020
  • Bangla choti
  • Choti golpo
  • Golpo
  • চটি গল্প
  • প্রেমের গল্প

Notun bangla chudi golpo 2020

Bangla chudi golpo:- ভাল গল্পের খোঁজে পাঠক দিনরাত ঘুরে বেড়ায় কিন্তু তেমন মনের মতো গল্প পায় না। আমাদের আজকের নিবেদন… Read More

4 days ago
Top 100 good morning flower images free download
  • good morning images

Top 100 good morning flower images free download

Top 100 good morning flower images free download. Good morning HD image with quotes, 100 good morning quotes. Good morning… Read More

1 week ago
Ishwar Chandra Vidyasagar Rachana for madhyamik and HS
  • সাহিত্য আলোচনা

Ishwar Chandra Vidyasagar Rachana for madhyamik and HS

Ishwar Chandra Vidyasagar Rachana is very important for all classes এবছর Madhyamik 2020 এবং Uchch Madhyamik 2020 এর জন্য Ishwar… Read More

1 week ago
bangla choties app download android
  • Bangla choti

bangla choties app download android

[smartslider3 slider=2] If you want to bangla choties app download android then please visit here. Bangla choties app available here.… Read More

1 month ago
bangla serial and bangla serial video
  • Bangla serial

bangla serial and bangla serial video

Bangla serial :- আপনি কি Bangla serial দেখতে বা Bangla serial video দেখতে খুব ভালবাসেন? তাহলে এই লেখাটা আপনার জন্য।… Read More

1 month ago
Bangla Kobita 1970-2020
  • Bangla kobita
  • Bangla Kobita abritti
  • Bangla love kobita

Bangla Kobita 1970-2020

Bangla kobita আশির দশক থেকে বর্তমান পর্যন্ত বিভিন্ন ধারায় প্রবাহিত। বাংলা কবিতার দিক বদল হয়েওছে একাধিক শক্তিশালী কবির হাত ধরে।… Read More

1 month ago
Loading...