X

সম্পূর্ণ প্রেমের উপন্যাস

প্রেমের উপন্যাস– কেন প্রেম। ভালবাসায় ভরিয়ে দেওয়ার মতো এক অসাধারণ প্রেমের গল্প আছে কেন প্রেম উপন্যাসে। যা পাঠকের মনকে সিক্ত করে দেয় সহজে।

কেন প্রেম সম্পূর্ণ প্রেমের উপন্যাস

                                     – বাপ্পাদিত্য মুখোপাধ্যায়

প্রেমের উপন্যাস, কেন প্রেম

কেন প্রেম উপন্যাসটি কলকাতা বইমেলা ২০১৬ তে পুস্তক আকারে প্রথম প্রকাশ পায় অসময় প্রকাশনী থেকে। পরে উপন্যাসটি রেওয়া, শারদকৃতি, সাহিত্য সম্পদ এই তিনটি পুরস্কারে পুরস্কৃত হয়।

।।১।।

‘গুরু মালটা এদিকেই আসছে। আজকে শালাকে কেলিয়ে বৃন্দাবন দেখাব।’

‘থাক অত বাহাদুরি দেখাতে হবে না। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ফিলিপ্স কোম্পানির বডিটা ভালকরে দেখেছিস কখনো। আবার বলে বৃন্দাবন দেখাবে।’

‘তাহলে কি আমরা হিঁচড়ের মতো হাততালি দেবো বসে বসে ? আর ওই শালা বৌদিকে বিয়ে করে হানিমুনে গিয়ে ইয়ে করবে। দেখো গুরু ওসব সহ্য হবে না মাইরি বলছি।’

‘এখন চুপটি করে থাক জগা। সময় হলে ঝোপ বুঝে কোপ বসাব। সেদিনের অপমানটা ভুলিনি আমি। যেদিন ছোবল মারব সেদিন চাষার ব্যাটা ঠিক বুঝবে এই রোহিতের লেজে পা দিলে কতটা বিষ হজম করতে হয়।’

চন্দন রকে বসে থাকা জগা আর রোহিতের দিকে না তাকিয়েই সোজা লাইব্রেরির দিকে চলে যায়। ছেলে দুটো অনেক দিন থেকেই পিছনে লেগেছে চন্দনের। প্রথম প্রথম নতুন কলকাতায় এসে একটু ভয় ভয় করত এখন আর এসবে তেমন কিছুই মনে হয় না। এমনিতেই আজকে ট্রাফিকজ্যামের জন্য তার কলেজে ঢুকতে অনেকটা দেরি হয়ে গেছে। হয়তো লাইব্রেরিতে অপেক্ষা করে করে তুলি বোর হয়ে বসে আছে। চন্দন ভাল মতোই জানে এই জগা রোহিতকে সামলানোর চেয়ে অভিমানী তুলির মান ভাঙানো কতটা কঠিন। এই তো কদিন আগেই চন্দনকে রোহিতের সাথে ঝগড়া করতে দেখে ফেলেছিল তুলি। তারপর এক সপ্তাহের বেশি কথা বলেনি। এই লোফার মার্কা ছেলে গুলোকে তুলি খুব ভয় পায়। এরা কখন কী করে বসে নিজেরাই জানে না।

লাইব্রেরিতে ঢুকতেই চন্দন দেখে, তুলি আনমনে বসে আছে জানালার বাইরের দিকে তাকিয়ে। জানালার ফাঁক দিয়ে সামান্য রোদ এসে পড়েছে তুলির গালের উপর। তাতে করে তুলির গালটাকে আরও বেশি আপেল রাঙা দেখাচ্ছে। সামনের বেয়াড়া কয়েকটা চুল ফুরফুর করে উড়ছে চোখের পাতার সামনে। তুলির সেদিকে কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। সে এখন প্রকৃতি পাঠে ব্যস্ত। তুলির দৃষ্টি পথের দিকে চন্দনের চোখ পড়তেই ওর দুচোখে ভেসে ওঠে মাটির কলশি কোলে নিয়ে নদীর থেকে স্নান সেরে মায়ের বাড়ি ফেরার প্রতিদিনের ছবিটা। চন্দন আরও দেখতে পায় অনেক দূরে বটগাছের ছায়ার নিচে যেন গ্রামের গরুর পালটা চরে বেড়াচ্ছে। নদীর ধারের বাঁশ ঝাড় গুলোর নিচে ডাহুক ডাহুকী ছুটে বেড়াচ্ছে আপন মনে। ঘরের পেয়ারা গাছটার এক্কেবারে উপরের ডালটায় চড়ে কাঠবেড়ালিটা মিট মিট করে চাইছে ওর দিকেই। চোখ দুটো জলে ভরে আসে চন্দনের। বিধবা মা আর সোনাঝুরি গ্রামটা এখন অনেক দূরে এই কলকাতা শহরের থেকে। অনেক দিন হয়ে গেছে চন্দন গ্রামে যায়নি। সেই যে বৈশাখ মাসে বাড়ির থেকে ছুটি কাটিয়ে এসেছে তারপর আর যাবার সুযোগ হয়নি। এখানে শুধু পড়া পড়া আর শুধুই পড়া। এখন অবশ্য আরেকটা কাজ জুটেছে এই তুলির সাথে স্বপ্নের জীবনে চলতে থাকা। এই চলার যেন কোনো শেষ নেই। সৃষ্টি লগ্ন থেকেই চলছে এই চলতে থাকা। ‘চন্দন এই চন্দন’ তুলির ডাকে আনমনা চন্দন নিজের গ্রামের লাল মাটির রাস্তার থেকে আবার কলকাতায় এসে দাঁড়ায় এক ঝটকায়। ‘কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলি বলত ? কখন থেকে দেখছি চুপচাপ জানালার বাইরের দিকে তাকিয়ে আছিস।’

‘আসলে তুইও তো ওই নীল সবুজে ডুবেছিলি তাই আমিও কয়েক মিনিট…’

চন্দনের মুখের থেকে কথাটা কাড়িয়ে নেয় তুলি, ‘মোটেই না। আমি অনেকক্ষণ থেকে দেখছি তুই এক দৃষ্টিতে জানালার বাইরে তাকিয়ে আছিস।’

‘আসলে জানিস তুলি লাইব্রেরির এই জানালাটা দিয়ে বাইরের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কখন যে নিজের গ্রামে চলে যাই খেয়ালেই থাকে না। মায়ের জন্য মনটা হুহু করতে থাকে। আমার যখন গ্রামের কথা আর মায়ের কথা খুব মনে পড়ে আমি তখন এখানেই ছুটে আসি।’

‘তোর চোখের জল দেখেই বুঝতে পেরেছিলাম তোর মনটা তোর মায়ের জন্য কাঁদছে। গ্রামটাকে খুব মিস করিস বল ?’

‘হুম, তা করি বইকি। আমি দেরি করে এলাম বলে তোর রাগ হয়নি ? আমি ভেবেছিলাম তুই রেগে আগুন হয়ে থাকবি।’

‘রাগ হয়নি আবার! হাত দুটো তোর চুলের অপেক্ষায় উশখুশ উশখুশ করছিল। কিন্তু যখন দেখলাম তোর চোখ ছলছল করছে। তখন কেন জানিনা আমারও ভীষণ কান্না কান্না পাচ্ছিল।’

‘যাক কেও তো আছে আমার চোখের জল দেখলে যার অন্তত কান্না কান্না পায়।’

‘একদম হেঁয়ালি করিস না। সত্যি বলছি তোর মন খারাপ থাকলে আমার ভেতরেও ঠিক কেমন যেন একটা হতে থাকে। ঠিক বোঝাতেই পারবো না। তোর হয় কিনা জানি না। বিশ্বাস কর তোর মন ভাল না থাকলে আমার কিছুই ভাল লাগে না।’

চন্দন তুলির ডান হাতটা ধরে বইয়ের রেক গুলোর আড়ালে নিয়ে যায়। আলতো ভাবে বুকে জড়িয়ে ধরে বলে, ‘আমার পাগলীটা।’ নির্জন লাইব্রেরিতে দুজন দুজনকে জড়িরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। তুলির তুলতুলে দু’বুকের ছোঁয়ায় চন্দনের সারা শরীরে একটা তৃপ্তির ঢেও খেলে যায়। মনের না বলা কথার বলাকা গুলো নীল আকাশে উড়তে থাকে ঝাঁকে ঝাঁকে। চন্দন তুলির গলায় আর ঘাড়ে দু’ঠোঁটের ছোঁয়ায় ফুল একে চলে আপন মনে। তুলিও চোখ দুটো বন্ধ করে ডুবে যায় সংসার স্বপ্নের খেলায়। জানালার ওপারে একটা পাখি তখন শিশ দিচ্ছে আপন মনে।

চন্দন জানে তুলি তার কাছে অধরা স্বপ্নের মতো। যাকে দেখা যায়। হৃদয়ে অনুভব করা যায়। ছোঁয়াও যায় কিন্তু পাওয়া যায় না। ‘তুলিরা’ সব চাওয়া পাওয়ার বাইরে। চন্দনের সম্পত্তি বলতে গ্রামের বিঘা তিনেক জমি। একটা টালির ছাওয়া মাটির ঘর আর বিধবা মা। আগে পাঁচ বিঘা জমি ছিল। কলকাতা পড়তে আসার সময় দু’বিঘা জমি বেচতে হয়েছে। হয়তো বাকিটাও বেচতে হবে। যখন চন্দন চোখ বন্ধ করে, দেখতে পায় ওর মা খুব ভোরে উঠে কুয়াশার ভেতর কাঁপতে কাঁপতে হেঁটে যাচ্ছে জঙ্গলটার দিকে। পাতা কুড়িয়ে আনার জন্য। আবার কখনো দেখে কাঠের ধোঁয়ার আড়ালে শাড়ির খুটে চোখের জল মুছতে মুছতে মুড়ি ভেজে যাচ্ছে আপন মনে। সারারাত চন্দনের ঘুম আসে না। মায়ের মুখটা যতই মনে পড়ে ততই সে ছট ফট করতে থাকে বিছানায়। ভোররাতে ভেজা বালিশে মুখ গুঁজে কখন যে ঘুমিয়ে পড়ে নিজেরই মনে পড়ে না।

আজকে রাতেও ঘুম আসেনি চন্দনের। যতবার তুলির মুখটা মনে পড়েছে ঠিক ততবারেই মায়ের করুণ মুখটা ভেসে উঠেছে দু’চোখের আয়নায়। পায়ের তলার মাটিটা যেন দিন দিন পাথুরে হয়ে যাচ্ছে। শেকড় আর কিছুতেই ভেতরে যেতে চায় না। হটাৎ মোবাইলটা বেজে উঠতেই ঘুম ভেঙে গেল চন্দনের, ‘হ্যালো’ বলতেই ওপার থেকে তুলির ঘুম জড়ানো আদুরে কণ্ঠ ভেসে আসে, ‘গুড মর্নিং চানু। উমম্ম আ…। আমার সোনাটা। কালকে কথা বলতে বলতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম বুঝতেই পারিনি। প্লিজ রাগ কোরো না, লক্ষ্মী সোনা আমার।’ চন্দনের কাছ থেকে হাঁ না কোনো উত্তর না পেয়ে তুলি আবার চুমু খায়, ‘উমা, উমা, উমা এবার বাবুর রাগ কমেছে নিশ্চয়ই।’ কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বলে, ‘এই কথা বলছিস না কেন? এত অভিমান করতে হয় বুঝি। প্লিজ চুপ করে থাকিস না। কী হল ? ঐ পাগল, ধুর ভাল্লাগে না। কথা বলবি না তো ? আমি ফোনটা রেখে দিচ্ছি কিন্তু। এক দুই তি…ইন। ধুর মনে হয় ঘুমিয়ে পড়েছে আবার।’ ফোনটা কেটে দেয় তুলি। চন্দনের কান কোথায় আর মোবাইল কোথায়। হ্যালো বলেই আবার কেলিয়ে পড়েছে বেচারি।

এবারের জন্মদিনে তুলিই চন্দনকে মোবাইলটা উপহার দিয়েছে। চন্দনের ফোন করার মতো তেমন নেইও কেও। মাঝে মাঝে পাশের বাড়ির অরুণ কাকুকে ফোন করে মায়ের সাথে কথা বলে। তাও আবার সব দিন কল করলে পাওয়াও যায় না। অরুণ কাকু ব্যস্ত মানুষ হাটে বাজারেই দুপয়সা রোজগারের জন্য ঘুরে বেড়ায়। একবার তুলির সাথেও মায়ের কথা বলিয়েছে চন্দন। তুলিই কথা বলার জন্য জেদ করেছিল সেদিন। চন্দন না করতে পারেনি।

কিছুক্ষণ পর আবার মোবাইলটা বেজে ওঠে। না কোনো কল আসেনি এবার। এলার্ম বাজছে। চন্দন সকাল নটায় এলার্ম দিয়ে রাখে। যদিও রোজেই তুলির কলেই ঘুম ভাঙে তবুও মাঝে মাঝে ফোনে কথা বলার পর আবার ঘুমিয়ে পড়ে। তখন এলার্মটা কাজে লাগে। এলার্মের শব্দ শুনেই ধড় ফড় করে ওঠে বসে চন্দন। একবার দেওয়াল ঘড়িটার দিকে তাকিয়েই এক ছুটে ব্রাশ নিয়ে বাথরুম। বাথরুম থেকেই চিৎকার করে বলে, ‘কাকিমা ভাত বেড়ে দাও এখুনি আসছি।’

প্রথমে হোস্টেলেই উঠেছিল চন্দন কিন্তু রোহিতদের জ্বালায় ওখানে টিকতে না পেরে কয়েক মাস হল এই বাড়িতে…। রান্না বান্নারও কোনো ঝামেলা নেই এখানে। নিচের কাকিমা ওটুকু করেই দেন রোজ। তার অবশ্য একটা কারণ আছে। উনার একমাত্র ছেলে লন্ডন পড়তে গিয়ে আর ফিরে আসেনি। এখন বাড়িতে প্রাণী বলতে তিনজন, বুড়ো বুড়ি আর চন্দন। এতে চন্দনের একটা সুবিধা হয়েছে, উনারা ভাঁড়ার জন্যও কোনোদিন তাড়া দেন না আর বাড়িতে ভাল-মন্দ কিছু খাবার হলেও তার জন্য এক্সট্রা পয়সা নেন না।

কলেজের দেরি হয়ে যাচ্ছিল বলে কোনো রকমে দুটো গিলে নিয়েই বেরিয়ে পড়ে চন্দন। রাস্তায় চলতে চলতেই তুলিকে কল করার চেষ্টা করে। রিং হয়েই যায়। তুলি কল ধরেও না করেও না। বাসের সিটে বসে আবার তুলিকে ফোনে ধরার চেষ্টা করে। এবারেও রিং হয়েই যায়। ভেতরে ভেতরে একটা দুশ্চিন্তার মেঘ জমতে থাকে। চন্দন জানে আজকে না হয় কালকে তুলিকে হারাতেই হবে তবুও তুলিকে হারানোর কথা ভাবলেই বুকটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে ওঠে। আরও বেশ কয়েকবার কল করেও যখন কোনো উত্তর এলো না তখন নিজেই ঠিক করল একবার তুলির বাড়িতেই যাবে।

তুলির মুখেই চন্দন অনেকবার শুনেছে বেলঘরিয়ায় নেমে ‘শীতলছায়া’ যাব বললেই যে কেও দেখিয়ে দেবে বাড়িটা। তুলির দাদু ঠাকুমার নামে নাম রাখা হয়েছে বাড়িটার। তুলির মুখে শোনা কথা মতো বেলঘরিয়ায় নেমে চন্দন একজন রিক্সা ওয়ালাকে জিজ্ঞেস করে শেষ পর্যন্ত এসে দাঁড়ায় তুলিদের বাড়িটার সামনেই। বাইরে বিরাট গ্রিলের দরজা। দরজা পেরিয়ে আঁকা বাঁকা রাস্তার দুপাশে ফুলের বাগান। তিনতলা ঝকঝকে সাদা বাড়িটাকে দূর থেকে দেখে মনে হচ্ছে যেন স্ফটিক পাথরের বাড়ি। এক্কেবারে তিনতলার উপরের দিকে লাল রঙে বড় বড় করে লেখা, ‘শীতলছায়া’

তুলিরা বড়লোক শুনেছিল। কিন্তু এতটা বড়লোক সেটা জানত না। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে হাঁ করে বাড়িটার রূপ গিলছিল চন্দন এমন সময় মোটা গোঁফ ওয়ালা ওমরেশ পুরি মার্কা একটা লোক এসে জিজ্ঞেস করল, ‘এই যে চাঁদু অনেক্ষন থেকে দেখছি মেছো বেড়ালের মতো বাড়িটার দিকে তাকিয়ে আছো বলি ধান্দাটা কী শুনি।’ লোকটার চেহারা দেখেই চন্দনের ইচ্ছে করছিল ছুটে পালিয়ে যেতে। সেটা যখন সম্ভব নয় তখন বাধ্য হয়েই তাকে বলতে হল, ‘তুলি। মানে গিয়ে হল কী আমি আর তুলি এক সঙ্গেই পড়ি…’

লোকটি চন্দনকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই বলল, ‘তা এটা তো আর কলেজ নয় ? এখানে কেন শুনি।’

লোকটার কথায় চন্দন আরও বেশি করে ঘাবড়ে গিয়ে বলে, ‘না মানে আজকে তুলি কলেজে আসেনি কেন সেটাই জানতে এসেছিলাম। ওর শরীর…’

‘হাঁ শরীর ভালই আছে। তবে তোমার যে মাথাটা গেছে সেটা বুঝতে পারছি।’

‘কেন, আমি এমন কী করলাম!’

‘আজকে রবিবার। তা বাছাধন তুমি সব রবিবারেই কলেজে যাও ? না এবারেই প্রথম ?’

‘ও আজকে রবিবার! তাই বলি তুলি কেন… আচ্ছা তাহলে আমি যাই।’ কথাটা বলেই চন্দন পালিয়ে যাওয়ার জন্য পিছিন ঘুরতেই লোকটা চন্দনের বাঁ হাতটা খপ করে ধরে ফেলে, ‘যাবেই তো কিন্তু তার আগে এটা তো প্রমাণ হোক তুমি মালটি ঠিক কে ? যদি তুলি দিদিভাই বলে তোমাকে চেনে না তাহলে মা কালী বলছি তুমি বাছা নিজেও নিজেকে চিনতে পারবে না।’ কথা গুলো বলতে বলতেই লোকটা চন্দনকে টেনে ভেতরের দিকে নিয়ে যেতে থাকে। চন্দনের তখন ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থা। এমন হবে জানলে ও হয়তো বাপের জন্মেও তুলির বাড়ির পথে পা মাড়াত না।

বাড়িটার সামনে দাঁড় করিয়ে লোকটা হাঁক দেয়, ‘দিদিভাই ও দিদিভাই একবারটি নিচে আসুন। দিদিভাই ও ও ও দিদিভাই।’ এতক্ষণে চন্দন তুলির গলা শুনতে পায়, ‘কী হল ভৈরব এত চিল্লাচ্ছিস কেন?’

তুলির গলা শুনেই চন্দন আবেগে উত্তেজনায় চিৎকার করে বলে, ‘তুলি দেখ না এই লোকটা আমাকে ধরে রেখেছে কিছুতেই যেতে দিচ্ছে না।’ অচেনা গলা পেয়ে এবার একটা ছিপছিপে মেয়ে ছুটে দোতলার বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। একটা অচেনা ছেলেকে ভৈরব ধরে আছে দেখেই বলে, ‘এই ভৈরব ওরে ছাড়িস না আমি নিচে আসার আগে। চোর দেখার আমার কত দিনের সাধ।’ কথাটা বলেই বারান্দা থেকে মেয়েটা অদৃশ্য হয়ে যায়। ভৈরব নামের লোকটা সঙ্গে সঙ্গে চন্দনের দুটো হাতকেই বেশ শক্ত করে ধরে।

চন্দনের গলা শুনেই দৌড়ে এসে তুলি ওদের দুজনের সামনে দাঁড়ায়। ভৈরব যে ভাবে পাঁঠা ধরার মতো চন্দনকে ধরে আছে সেটা দেখেই হো হো করে হেসে ফেলে তুলি। চন্দন বিরক্ত হয়ে বলে, ‘লজ্জা করে না তোর হাসতে। এই ষাঁড়টাকে বল আমাকে এক্ষুনি ছেড়ে দিতে।’ ততক্ষণে ঐ ছিপছিপে মেয়েটিও এসে পৌঁছে গেছে, ‘ছাড়বি না ভৈরব ওরে পুলিশের হাতে তুলে দেবো। দেখ দেখ কেমন তেল মেখে এসেছে। দেখবি ভৈরব যেন পুচকে না পালিয়ে যায়।’ ভৈরব ভালোভাবে চন্দনের হাত দুটোকে বাগিয়ে ধরে। মেয়েটিরেই বা দোষ কী, চন্দনের গায়ের ঘাম রোদে চিকচিক করছে তেলের মতোই। তুলি তখনো হেসেই চলেছে। শেষ পর্যন্ত যখন ভৈরব বুঝতে পারে ছেলেটি মিথ্যে বলছে না তখন ছেড়ে দেয়।

আজকে চন্দন প্রথম বার তুলির বাড়ি গিয়ে যে বিপদের মুখে পড়েছিল তা তার সারা জীবন মনে থাকবে। কিন্তু ঐ যে কথায় বলে যার শেষ ভাল তার সব ভাল। তুলির বাড়িতে ভৈরব আর ঐ কাজের মেয়ে অনিমা ছাড়া কেও ছিল না। তুলির বাবা মা আর দাদা তিন জনেই বেরিয়েছিল ডাক্তার রঞ্জিত গাঙ্গুলির বাড়ি। রঞ্জিত বাবু তুলির বাবার কলেজ জীবনের বন্ধু। বাড়িতে কারু কিছু হলেই ওনার ডাক পড়ে। তুলির মায়ের কোমরের ব্যথাটা আজকে একটু বেড়েছিল তাই ডাক্তার দেখানোর সাথে সাথে একটু বেড়াতে যাওয়ার জন্যই তুলির পরিবার গিয়েছিল রঞ্জিত বাবুর বাড়িতে।

তুলি ফোন না ধরায় চন্দন কত কী ভেবে ভেবেই না অস্থির হয়েছিল কিন্তু শেষে পর্বতের মূষিক প্রসব। তুলির নতুন এন্ড্রয়েড মোবাইলের স্কিন খারাপ হয়েছে। হাত থেকে বারান্দায় পড়ে। তাই ওটা কাজ করছিল না সকালের পর থেকে। যাইহোক চন্দনের কিন্তু দিনটা দারুণ কেটেছে। অনিমার হাতের নরম নরম গরম লুচি পাঁঠার মাংস থেকে শুরু করে তুলির তুল তুলে বুকে সুড়সুড়ি দেওয়া পর্যন্ত কোনটাই আজকের মেনু থেকে বাদ যায়নি। ঘরে ফেরার পরেও তুলির পেঁজাতুলা সাদা মেঘের মতো নরম বুকের ছবিটাই বারবার মনে পড়ে যাচ্ছিল চন্দনের। সন্ধ্যার দিকে ইচ্ছে করছিল তুলিকে ফোন করে আরও একটু…। কিন্তু সেটা যখন সম্ভব নয় তুলির হতচ্ছাড়া মোবাইলটার জন্য তখন আর ভেবেই বা লাভ কী!

এমনিতেই তো চন্দন রাতচরা। ঘুম আসতেই চায় না তারপর আজকে আবার যা যা দেখিয়েছে তুলি তাতে করে ভোরের দিকেও ঘুম আসবে বলে মনে হয় না। চন্দনের বদলে যদি বঙ্কিমচন্দ্রের নবকুমার থাকত তাহলে অবশ্যই আজকে বলত, ‘আহা কী দেখিলাম জন্ম জন্মান্তরেও ভুলিব না।’

ছাতে দাঁড়িয়ে জ্যোৎস্নায় স্নান করতে করতে চন্দন দু’কানে কুড়িয়ে নিচ্ছিল দূর থেকে ভেসে আসা ডাহুকের মন কাড়ানো সুরটুকু। মাঝে মাঝেই খুব ইচ্ছে করে মা আর তুলিকে নিয়ে অনেক অনেক দূরে কোথাও পালিয়ে যেতে। যেখানে শুধু সবুজ প্রকৃতি। নীল আকাশ। বরফে ঢাকা শুভ্র রঙের পর্বত। সন্ধ্যা বেলায় ঝাঁকে ঝাঁকে বুনোহাঁস উড়ে যাবে ঝিলের দিকে। জঙ্গল থেকে সমবেত সুরে ডাকবে শেয়াল গুলো। জ্যোৎস্না রাতে পিউ কাঁহা পাখির সুরে ঘুম জড়িয়ে আসবে চোখের পাতায়। থেকে থেকে ডেকে উঠবে বনমোরগ। আর ভাবতেই পারে না চন্দন। এর বেশি ভাবতে গেলেই ওর যে কান্না পেয়ে যায়। মনে পড়ে যায় মরা বাপটার কথা। গ্রামের না খেতে পাওয়া মানুষ গুলোর কথা। আর মনে পড়ে শ্যামা দিদির কথা। শ্যামা দিদি বলত, ‘বড় হলে তোকে লিয়্যা একবার দার্জিলিং যাব। ওখানে নাকি প্রকৃতি পরীর মতো নাইম্যা আইচে।’ বড় আর হয়নি শ্যামা দিদি। মেয়ে মাংস লোভী হায়না গুলো তাকে বড় আর হতে দেয়নি। শরীরে আগুন লাগিয়ে পুড়ে মরেছিল শ্যামা। তাই নিজের সীমার বাইরে ভাবতে পারে না চন্দন। সীমা পেরোলেই তো শ্যামা দিদির স্বপ্নের জায়গা। চন্দন যে ওর শ্যামা দিদির স্বপ্ন গুলোও চুরি করতে চায় না।

ছাতের উপর দাঁড়িয়ে চন্দন দেখতে পায় অনেক দূরে একটা তারা খসে পড়ল। তারা খসে পড়তে দেখলেই চন্দন হাত জোড় করে বলে, ‘সবাই যেন খুব ভাল থাকে ভগবান।’ এই কথাটা চন্দনকে ওর মা শিখিয়েছিল ছোট বেলায়। চন্দনও ওর মায়ের মতোই বিশ্বাস করে তারা খসে পড়ার সময় কিছু চাইলে সেটা নাকি পাওয়া যায়। এই রাত গুলোকে চন্দন খুব ভালবাসে। বিকেল পালিয়ে যাবার পর সন্ধ্যা যখন আঁচল পেতে বসে, চন্দনের একটা আনন্দ হয় ভেতরে ভেতরে। সেই ছোটবেলায় বাড়ির উঠোনে শুয়ে তারা চিনতে চিনতে কখন যে রাতটা ওর বন্ধু হয়েছে ও নিজেই জানতে পারেনি। কলকাতায় আসার আগে চন্দনকে যখন ওর মা বলেছিল, ‘খোকা অত দূরে কেমন কইর‍্যা থ্যাইকতা পারবি তুই ?’ চন্দন বলেছিল, ‘কুথায় দূর মা ? এই চাঁদ আর তারা গুলা তুমিও দেখত্যা পাবে আমিও দেখত্যা পাব তাহলে আর দূর কুথায়?’ গ্রামের বাড়িতে চন্দনও আর পাঁচ জনের মতোই বাঁকড়ি ভাষাতেই কথা বলে। ছেলের কথা শুনে চন্দনের মা চন্দনকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে কপালে চুমু খেয়ে বলেছিল, ‘সত্যি তুই বিধবা মায়ের নদেরচাঁদ।’ আর কিছু বলতে পারেনি চন্দন একটা উপছে আসা  কান্নার সুর শুধু চেপে গিয়েছিল বারবার।

আজকে রাতে তুলিরও ঘুম আসছিল না কিছুতেই। সেও নিজের শোবার ঘরের জানালায় চোখ রেখে শুয়ে শুয়ে দেখছিল ফুটফুটে শিশু তারা গুলোকে। কোল বালিশটাকে দুপায়ের মাঝে জড়িয়ে লাজুক লাজুক স্বপ্নে ডুবছিল উঠছিল বারবার। চন্দনের ছোঁয়ায় শরীরে শিহরণ আগেও খেলেছে তুলির। অথচ আজ সকালের ছোঁয়াটা কেমন যেন অন্যরকম লেগেছিল। শরীরের বাঁশিতে ‘ফু’ দেওয়ার আগেই যেন শরীরে সুর এসে গিয়েছিল আজ। চন্দনের শরীর থেকে ভেসে আসা পুরুষ পুরুষ গন্ধটা কোথায় একটা দোলা লাগিয়ে গেছে তুলির ভেতরে। কোল বালিশটা দুপায়ে আরও জোরে চেপে ধরে তুলি। আলতো ভাবে ঠোঁট দুটোকে বালিশে ছুঁয়িয়ে বলে, ‘লক্ষ্মী চানু আমার। আমার সোনাটা।’ কথাটা বলেই কী যেন ভাবে মনে মনে তারপর নিজে নিজেই লজ্জায় রাঙা হয়ে ওঠে।

প্রেমের উপন্যাস,- কেন প্রেম। অসাধারণ এক প্রেমের গল্প

।।২।।

দেখতে দেখতে দিন গুলো যেন শরতের মেঘের মতো ভেসে যাচ্ছিল। হাসি কান্না আদর অভিমানের উপর দাঁড়িয়ে চন্দন আর তুলির প্রেমটাও বট গাছের মতো ঝুরি নামাচ্ছিল ধীরে ধীরে। কিন্তু ‘সব দিন কাহারো সমান নাহি যায়।’ অনাগত সন্ধ্যায় মন্থর ভাবে শিকারি চিতার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল বিরহ। তারপর সেটা শেকড়ে শেকড়ে পাতায় পাতায় রসে রসে প্রবাহিত হয়ে প্রেমের গাছটাকেই আধমরা করে ছাড়ল যেন। স্বপ্নের জাল গুলো যে এমন ভাবে নিমেষেই ছিঁড়ে যাবে সেটা হয়তো তুলি বাঁ চন্দন কেও ভাবেনি। কিন্তু বিরহ তো আর বলে আসে না! প্রেমের ফলটা পাকার আগেই যদি ডাল থেকে পড়ে যায় তাহলে মনটা যেন কিছুতেই মেনে নিতে পারে না। মনে হয় যেন শুরুতেই সব শেষ হয়ে গেল। তবে এখানে ওই ভয়টা নেই। কারণ চন্দন আর তুলির প্রেমটা এত সহজে শেষ হবে বলে শুরু হয়নি।

রোহিত যে শেষ পর্যন্ত এমন করবে সেটা তুলি বা চন্দন দুজনের কেওই ভাবেনি কোনোদিন। চন্দন আর তুলির প্রায় খান দশেক অন্তরঙ্গ ছবি তুলে সেগুলো তুলির বাড়ির ঠিকানায় পোষ্ট করে দিয়েছিল রোহিত। চন্দন আর তুলির ছবি তোলাটাও তো কোনো বড় ব্যপার নয়। ওরা সব সময় তো মানিক জোড় হয়েই থাকত। কখনো লাইব্রেরি কখনো কলেজের ছাত তো কখনো কলেজের ক্যান্টিন আবার কখনো গেটের বাইরে তারাদার দোকান। ভগবান জানেন কবে রোহিত ছবি গুলো তুলেছিল। চন্দন বা তুলি কেও বুঝতেও পারত না যে রোহিত ছবি গুলো তুলেছে। যদি না সেদিন ওদের দুজনকে দেখে ও বলত, ‘গেম ইজ ওভার।’ সেদিনেই চন্দন বুঝে গিয়েছিল কিছু একটা হতে চলেছে। তুলিকে বলেও ছিল সাবধান হবার জন্য কিন্তু তুলি পাত্তায় দেয়নি। সেদিন যদি তুলি সাবধান হত তাহলে হয়তো ছবি গুলো বাড়ির ভেতর পর্যন্ত ঢুকতই না।

অগত্যা তুলির কলেজ বন্ধ। মোবাইল বন্ধ। বাইরে বার হওয়া বন্ধ সব বন্ধ হয়ে গেল এক ঝটকায়। ভাগ্যিস সিনেমা নয় নতুবা তুলির বাবার পাঠানো ষণ্ডা মার্কা গুণ্ডারা এসে কামারের ঘা বসিয়ে যেত চন্দনের মাথায়।

তবে যে মারপিট হয়নি তা নয় দুএক সিন হয়েছে বইকি। যদিও রোহিতের কিছুই হয়নি চামচা জগার একটা হাতের হাড় আর গোটা তিনেক দাঁত গেছে। চন্দন দেখতে দেবাননের মতো গোবেচারা হলে কী হবে মাড়ভাত খাওয়া শরীরের জোর যাবে কোথায়। কিন্তু এখন সমস্যা হল জগাই মাধাইকে মেরে তো আর রাধা প্রেমের বিরহ মিটবে না।

গত কয়েক দিনের মতোই আজকেও কলেজে এসে গুম মেরেই বসেছিল চন্দন। এমন সময় ‘কত দিন দেখিনি তোমায়’ গানটা গুনগুন করতে করতে ক্লাসের ভেতরে রোহিত ঢুকতেই চন্দন কেমন যেন ক্ষেপে যায়। এমনিতেই এখন ওর মণিহারা ফণীর দশা। হাতি মশা যাকে পাবে তাকেই দংশন করারই কথা। রোহিত রুমে ঢুকতে না ঢুকতেই চন্দন উঠে গিয়ে ওর কলার ধরে সেই রাম পেঁদানি যেটা পাবার পর এখনো ক্লাসে ফেরেনি জগা। যতক্ষণে অন্যান্য বন্ধুরা বেঞ্চ থেকে উঠে এসে চন্দনকে ধরে সরিয়েছে ততক্ষণে রোহিত লুটিয়ে পড়েছে মেঝেতে। ক্লাসের কেও ভাবতেই পারেনি রোহিতের মতো জিমে গিয়ে সিক্স প্যাক বানানো দামাল রাখাল বালককে গোপালের মতো সুবোধ চন্দন কয়েক ঘুসিতেই পেড়ে দেবে।

আরও আশ্চর্য লাগল এটা দেখে, যখন রোহিত উঠে দাঁড়াল। কে বলবে যে রোহিত মার খেয়েছে! দুহাতের আঙুলের ফাঁক দিয়ে চুল গুলোকে পিছনের দিকে চালান দিতে দিতে এমন ভাবেই উঠে দাঁড়াল যেন তেরেনাম-২ এর শুটিং করছিল এতক্ষণ মেঝেতে পড়ে। উঠে দাঁড়িয়েই, ‘আবে তুই আমাকে…’ কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল কিন্তু ওর কথাটা শেষ করার আগেই চন্দন কথা কাড়িয়ে নিয়ে বলল, ‘চুপচাপ বাড়ি চলে যা নতুবা তোর বাড়ির লোককে আসতে হবে তোকে কোলে করে নিয়ে যাবার জন্য। ন্যাংটো বয়স থেকে পাথুরে মাটির বুকে হাল চালানো হাত এই দুটো।’ হাতদুটো দেখায় চন্দন। আবার বলে, ‘যেদিন মাথাটা বিগড়ে যাবে সেদিন কিন্তু তোর পেটে হাতের হাল চালিয়ে দেবো। যদি তুলি আর ক্লাসে না আসে তাহলে তোর ছবিও দেওয়ালে ঝুলবে মনে রাখিস। চল এবার ফুট এখান থেকে।’ কিছু শোনা না গেলেও রোহিত যে বিড়বিড় করে একটা শব্দহীন বাণ মেরেগেল সেটা সবাই বুঝতে পারল।

রোহিত যাবার পরেও হাইবেঞ্চের উপর বসে চন্দন ফোঁস ফোঁস করছিল। জয়ি চন্দনের কাঁধে হাত রেখে সান্ত্বনা দেবার সুরে বলল, ‘চিন্তা করিস না চন্দন সব ঠিক হয়ে যাবে। এত মাথা গরম করিস না। প্রিন্সিপ্যাল জানলে ফালতু ঝামেলায় জড়িয়ে যাবি। তাছাড়া তুই তো জানিস রোহিত কেমন ধরণের ছেলে, পথে ঘাটে কিছু একটা করে দিলে তখন কে দেখবে তোকে।’ কাঁধের থেকে জয়ির হাতাটা নামিয়ে চন্দন বলে, ‘ওসবের ভয় পাই না। ভয় তুলিটাকে নিয়ে। মেয়েটা বড্ড বদমেজাজি কখন কী করে বসবে ও নিজেই জানে না। আজকে কতদিন হয়ে গেল একটাও খবর পাইনি। তবে তোরা দেখিস তুলি যদি ক্লাসে না ফেরে তাহলে রোহিতের কী হাল করি। ওকে আমি…’

‘ধুর পাগল। কিচ্ছু করবি না তুই। কারুর কোনো ক্ষতি করবি না। মাথাটা ঠাণ্ডা রেখে কয়েকটা দিন অপেক্ষা কর দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে।’ জয়ির কথাটা শেষ হতে না হতেই ক্লাসে প্রবীর স্যার ঢুকে পড়লেন। সব্বাই নিজের নিজের জায়গায় গিয়ে চুপ করে বসে পড়ে। প্রবীর স্যার ক্লাসে ঢুকেই শুরু করলেন ‘হাঁ তাহলে কালকে তোমারা কতটা লিখেছিলে ? হাঁ পেয়েছি, নৌকা খণ্ড পর্যন্ত। আচ্ছা আজকে তাহলে…’ সবাই খাতা পেন বের করে লিখতে শুরু করল।

অনেক দিন থেকেই রোহিত একটা সুযোগের অপেক্ষা করছিল। সেদিন যখন কোনোদিকে না তাকিয়ে চন্দন সোজা লাইব্রেরির পথে চলে গিয়েছিল তখনই রোহিতের মনে হয়েছিল আজকে একটা সুযোগ পেলেও পেতে পারে সে। হয়েও ছিল তাই। চন্দন তুলির গলা আর ঘাড়ের জাদুতে যখন ডুবেছিল তখনেই রোহিত ছবি গুলো তুলেছে। তুলির কলেজ বন্ধ হয়ে যাক এটা অবশ্য রোহিত কখনই চায়নি। তাতে তার লাভও নেই কিছুই। আসলে রোহিত ভেবেছিল তুলির বাবা হয়তো চন্দনের কিছু একটা ব্যবস্থা করবে। যাই হোক না কেন মোটকথা তুলির এখন কলেজ আসা বন্ধ।    

কলেজ থেকে ফেরার পথে সোজা বাড়ি না গিয়ে জয়ির সঙ্গে চন্দন হাঁটতে হাঁটতে গঙ্গার ধারে গিয়ে দাঁড়ায়। বর্ষার জলে নদীটা বেশ গর্ভবতী মায়ের মতো ফুলে ফেঁপে উঠেছে। চন্দনকে জয়ির প্রথম থেকেই ভাল লাগত। কিন্তু বলতে পারেনি কোনোদিন। যখন বলার মতো সাহস জন্মাল তখন চন্দন তুলির হয়ে গেছে। জয়ির মনের এই ফিলিংস টুকু ওর একান্তই আপনার। কেও জানে না, জয়ি নিজেই কাউকে জানতে দেয়নি। জয়ি এখন আর চন্দনকে নিয়ে স্বপ্নও দেখে না। জয়ি বিশ্বাস করে পরের ভালবাসাকে চোখের পাতায় নিয়ে ঘুমানোটাও পাপ। চোখের জলের সাথেই জয়ির যুবতী দিনের প্রথম পুরুষ ধুয়ে মুছে পরিষ্কার হয়ে যাবে হয়তো একদিন। কিন্তু তবুও যে কেন মনটা এখনো ডুকরে ডুকরে ওঠে বুঝতে পারে না জয়ি। গঙ্গার চঞ্চল ঢেও গুলো এসে ওদের পা ধুয়িয়ে দিয়ে যাচ্ছিল বারবার। জলের উপর সন্ধ্যার পাতলা প্রলেপ পড়তে না পড়তেই বেশ কিছু ছেলে মেয়ে এমনকি বেশ বয়স ভারী কিছু লোকও জুটে গেল গঙ্গার ধারে। ওরা দুজনে একটু সরিয়ে এসে নির্জনে গিয়ে বসে। ওপারের বড় বড় বাড়ি গুলোতে একটা একটা করে আলো ফুটে উঠছে মন্থর গতিতে। তুলিকে নিয়ে কথা বলতে বলতেই চন্দন উত্তেজনায় কখন যে জয়ির ডান হাতটাকে চেপে ধরেছিল কে জানে। কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে ওদের দুজনকে পেরিয়ে যাওয়ার সময় একটা ছেলে হটাৎ যখন ‘কেন তুমি সরে আছো দূরে…’ গানেই কলিটা গেয়ে উঠল তখন খানিকটা লজ্জিত হয়েই চন্দন জয়ির হাতটা ছেড়ে দেয়। এটাতে জয়ি যেন আরও বেশি লজ্জা পেয়ে যায়। চন্দনও বেশ কিছুক্ষণ কথা না বলে চুপচাপ বসে থাকে। ভেতরে ভেতরে হালকা হওয়ার চেষ্টা করে।

জয়ি চুড়িদারের ওড়নাটাকে আঙুলে পাক দিতে দিতে দূরের নৌকা গুলোকে দেখছিল। যাত্রী বোঝাই করে নৌকা গুলো যেন কোথায় চলে যাচ্ছে কোন অচেনা স্বপ্নের দেশে। এমন সময় আবার একটা ছেলে মেয়ে ওদের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করতে করতে পেরিয়ে যায়। ছেলে মেয়ে দুটোর দিকে একবার তাকিয়ে জয়ি যখন চন্দনের দিকে তাকায় দেখে তখন চন্দন ওর দিকেই তাকিয়ে আছে অপলক ভাবে। চোখ নামিয়ে নেয় জয়ি।

আরও বেশ কিছুক্ষণ নীরবে বসে থাকার পর ওরা দুজনে হাঁটতে হাঁটতে যখন পাকা রাস্তায় এসে পৌঁছোল তখন বড় রাস্তা ধারের দোকানের সব আলোই জ্বলে উঠেছে। হাঁটতে হাঁটতেই নীরবতা ভঙ্গ করে চন্দন জয়িকে জিজ্ঞেস করে, ‘জয়ি বাড়ি ফিরতে এতটা দেরি হয়ে গেল তোর বাড়িতে আবার চিন্তা করবে না তো ?’

‘আমার বাড়িতে আবার চিন্তা! সারা রাত বাড়ি না ফিরলেও হয়তো কেও জানতেই পারবে না।’ আনমনা ভাবেই কথা গুলো বলে যায় জয়ি। বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে জয়ি আবার বলে, ‘আসলে আমি যেখানে থাকি সেটাকে বাড়ি না বলে হোটেল বললে বোধ হয় মানানসই হবে। নকল সম্পর্ক গুলোকে খাঁটি ভাবার অভিনয় করেই আমি জীবনটা কাটিয়ে দিচ্ছি। হয়তো পুরো জীবনটা এভাবেই কেটে যাবে।’ কথা গুলো বলতে বলতে জয়ির দু’চোখের কোনায় জল এসে থাকলেও থাকতে পারে।

আলো অন্ধকার রাস্তায় চন্দনের সেটা চোখে পড়ে না। ‘জানিস চন্দন মা মারা যাবার তিন মাস পার হতে না হতেই বাবা আবার বিয়ে করল। মাঝে মাঝেই আমার মা রাতের বেলায় জানালার ধারে দাঁড়িয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকত। কাঁদত। কিন্তু তখন মায়ের রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকার কারণ বা কান্নার কারণ কোনোটাই বুঝতে না পারলেও এখন ঠিক বুঝতে পারি। আসলে বাবা মাকে কোনোদিনেই ভালবাসেনি ভালবেসেছিল আমার মামাবাড়ির সম্পত্তিটাকে। সেটা যখন ফুরিয়ে গেল মায়ের কদরও ফুরিয়ে গেল।’

চন্দন কিছুই বলে না শুধু শক্ত করে জয়ির হাতটা ধরে। ব্যস্ত কলকাতা দেখতে পায় না একটা হাতের ভেতর দিয়ে কেমন ভাবে আরেকটা হাতে ভরসা আর বিশ্বাসের স্রোত প্রবাহিত হয়ে যাচ্ছে নিজেদের অজান্তেই। ‘আচ্ছা চন্দন আমি একবার যাব তুলির বাড়ি ?’ চন্দন যেন কোথায় ডুবে আছে। কিছুই শুনতে পায়নি। জয়ি চন্দনের হাতটা ধরে একবার ঝাঁকুনি দিয়ে আবার বলে, ‘কিরে হাঁ কিংবা না কিছু একটা বল। আমি তুলির বাড়ি গিয়েই না হয় একবার ওর খবর নিয়ে আসি।’

চন্দন উদাসীন ভাবেই বলে, ‘মনে হয় না বিশেষ কোনো লাভ হবে।’

‘লাভ না হোক ক্ষতি তো কিছু হবে না,’ জয়ি বলে। চন্দন আর কিছুই বলল না শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল মাত্র।

চন্দন আর তুলির প্রেমটা সবে মাত্র অঙ্কুরোদ্গম পেরিয়ে কয়েকটা সবুজ পাতা মেলেছিল। সদ্য জন্ম নেওয়া প্রেম যখন প্রকৃতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। একটু একটু করে শেকড় চালান দিচ্ছে মাটির ভেতর ঠিক সেই সময় আছড়ে পড়ল কালবৈশাখী। যে প্রেম শুরুতেই বড় রকম ধাক্কা পায় তার গভীরতা কিন্তু একটু বেশিই হয়ে থাকে। এর একটা যুক্তি সঙ্গত কারণ আছে অবশ্যই। নতুন নতুন প্রেমে একে অপরকে চিনতে জানতে অনেক সময় লাগে। এই সময় একে অপরের সব কিছুকেই পছন্দ করে। এই সময় অভিমান হয় কিন্তু ঝগড়া হয় না বললেই চলে। এটা প্রেমের পরিচয় পর্ব। কোনো ভুল বোঝাবুঝি থাকে না, ঝগড়া থাকে না, মতের অমিল থাকে না প্রেমের শুরুর দিকে। এমন নিষ্পাপ শিশুর মতো ভালবাসাকে হত্যা করলে ব্যথা তো বেশি হবেই। তুলি চন্দনও এর বাইরে নয়। প্রেমের শুরুর দিকে যখন শুধু প্রজাপতি আর ফুল ফুল খেলা মনের ভেতর, তেমন সময়েই যদি সব হারিয়ে বসার ভয়ে কুঁকড়ে যেতে হয় তাহলে কষ্টের মাত্রা তো… থাক এগুলো আমাদের ভাবনা নয়। এর জন্য দার্শনিক আছেন মনোবিজ্ঞানীরা আছেন। কোন প্রেমে কষ্ট বেশি কোন প্রেমে কম এসব বিচার উনারা করবেন। তুলি আর চন্দনের প্রেমে আমাদের কাজ, ‘শুধু দেখো আর খুশি হও মনে’ এর বাইরে কিছুই করার নেই। আমরা নীরব দর্শক মাত্র। তবে এটুকু অবশ্যই বলব, তুলি আর চন্দনের প্রেমটা অন্তর্বাহী নদীর মতো। এর শুরু শেষ দুটোই আর পাঁচটা নদীর থেকে একটু আলাদা। আবার এই দুজনের মাঝে দাঁড়িয়ে জয়ি। দেওয়ালের মতো না সেতুর মতো সেটা পরে জানা যাবে।

                            ।।৩।।

বিরহের সময় কিছুতেই কাটতে চায় না। দিন গুলো যেন থেমে থেমে চলে। চন্দনের গালে শ্যাওলার মতো দাড়ি গুলো দেখলে যে কেও বলে দিতে পারবে তুলির সাথে ওর আজও যোগাযোগ হয়নি। হাঁ একদিন জয়ি তুলির সাথে দেখা করতে গিয়েছিল বটে কিন্তু দেখা হয়নি। তুলি নাকি ওর মায়ের সাথে আসাম বেড়াতে গেছে। কথাটা কতটা সত্যি সেটা জয়ি বা চন্দনের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়। বর্তমানের সাথে তাল মিলছে না চন্দনের আজকাল। না সময়ে খাওয়া না স্নান না কোথাও যাওয়া আর ঘুম ? সেটা তো বরাবরেই অধরা স্বপ্ন মাত্র। আজকে বাড়িতে এক্কেবারেই মন টিকছিল না বলেই একটু বেরিয়েছিল বাজারের দিকে। বাজার থেকেই সোজা চলে গিয়েছিল নবপল্লি পেরিয়ে হৃদয়পুরের রাস্তায়। বেশ ফাঁকা জায়গাটা। চন্দন এর আগে এদিকটায় কোনোদিনেই আসেনি। পড়ন্ত বিকেলের হালকা হলুদ আলোতে মেহগিনি গাছের পাতা গুলো চকচক করছে। দূরের একটা গাছে বসে আপন মনে ডাকছে বউ কথা কও পাখিটা। অন্যদিন হলে চন্দনের মনটা ভরে উঠত কানায় কানায়। সেই মনটাই যেন নেই আজ আর। মনটার উপরে মর্চের প্রলেপ পড়ে গেছে। এত কম সময়ের মধ্যেই যে জীবনের হিসেব গুলো এমন ভাবে এলোমেলো হয়ে যাবে সেটা বিশ্বাস করতেই পারে না চন্দন। কালকেই যে ডালটা ফুলে ফুলে ভরেছিল সেটা যেন একটা দমকা হাওয়াতেই খালি হয়ে গেছে।

সবুজ ঘাসের উপর বসে পড়ে চন্দন। বারবার মনটাকে বোঝায় সব ঠিক হয়ে যাবে সব ঠিক হয়ে যাবে। মনটা শুনেতে চায় না কিছুতেই। মনের ডাকে শান্ত নীরব চোখ দুটো সাড়া দেয় শুধু। তুলি চাইলে এত দিনেও একটা ফোন করতে পারতো না ? তুলি কি তাহলে সত্যিই ভুলে গেল ? তুলির সাথে ওর বাড়ির লোক খারাপ কিছু করছে না তো ? তুলি কি তাহলে এই সম্পর্ক থেকে… এমন হাজার হাজার প্রশ্ন দলা পাকিয়ে উঠছে মনের ভেতর। যে গুলোর উত্তর মিলছে না কিছুতেই। আসলে এই সব প্রশ্নের উত্তর তৈরি হবার আগেই প্রশ্ন তার পথ পালটে ফেলছে বারবার। মনের অদৃশ্য নাট্যশালায় যে নাটকটা এখন চন্দনের ভেতরে চলছে সেটাতে মিলনের দৃশ্য আসছে না কিছুতেই।

তুলির কথা ভাবতে ভাবতেই চন্দনের শরীরটা একটা সময় এলিয়ে পড়েছিল সবুজ ঘাসের নরম বিছানায়। হৃদয়পুর ষ্টেশন থেকে মাঝে মাঝে এক আধটা ট্রেনের হর্ন ভেসে আসছিল শুধু। চন্দনের অগোচরেই সন্ধ্যা নামল হামাগুড়ি দিয়ে। আকাশের পর্দাটা চিরে চিরে বেরিয়ে পড়ল এক একটা তারার মুখ। তারা গুলোর দিকে চাইতেই বাড়ির উঠোনটার কথা মনে পড়ে গেল। মনে পড়ে গেল মায়ের করুণ মুখটা। খুব ইচ্ছে করছিল একবার মায়ের সঙ্গে কথা বলতে। তবুও অরুণ কাকুকে ফোন করল না চন্দন। আজকে জীবনের জ্বালা গুলোকে খুবলে খুবলে কষ্ট পেতে বড্ড ইচ্ছে করছে ওর। হয়তো জীবনের কষ্ট গুলোকে চুষতে চুষতে উপভোগ করাটাকেই বাঁচা বলে। একবার জন্ম নিয়ে একজন মানুষকে কোটি কোটি বার মরতে হয়। কাছা কাছি কয়েকটা শেয়াল ডেকে উঠতেই চন্দন উঠে দাঁড়ায়। বেচারি কাকিমা হয়তো খাবার আগলে বসে থাকবে। নিজের জন্য না হোক ঐ কাকিমার জন্য চন্দনকে দুবেলা দুমুঠো খেতেই হয়। হালকা চালে চলতে শুরু করে চন্দন।

অন্যান্য দিনের মতোই আজকেও কর্ম ব্যস্ত হৃদয়পুর ষ্টেশন চত্বরটা। যে যার ট্রেনের জন্য ছোটাছুটি করছে এদিক সেদিক। মাইকে বার বার ভেসে আসছে একটা যান্ত্রিক নারীর কণ্ঠ। বনগাঁ থেকে শেয়ালদা যাবার ট্রেন কত নম্বর প্ল্যাটফর্মে আসছে সেটায় তিনটে ভাষায় জানানো হচ্ছে বারবার। চন্দন নিজের ভেতরে ডুবেই পার হয় ষ্টেশনটা। ধীরে ধীরে নারী কণ্ঠটা হালকা হতে হতে বাতাসে মিলিয়ে যায়।

বাড়ি ফিরে খাওয়া দাওয়ার পর সবে একটু বসেছে ওমনি মোবাইলটা বেজে উঠে। চন্দন মোবাইলটা হাতে নিয়ে দেখে অপরিচিত নাম্বার। মুহূর্তে বুকের ভেতরে একটা উত্তেজনার ঢেও খেলে যায়, ‘হ্যালো কে তুলি ? হ্যালো হ্যালো।’

‘নারে দেবদাস আমি পারু বলছি।’ কথাটা বলেই খিল খিল করে হেসে ওঠে জয়ি।

‘অপরিচিত নাম্বার তো তাই আমি ভেবেছিলাম তুলি হতে পারে।’

‘না না এটা আমার ভোডার নাম্বার। এটাও সেভ করে রাখিস। আর শোন না একটা দারুণ খবর আছে। আগে বল কী খাওাবি ?’

চন্দন একটু ভাবার ভান করে বলে, ‘আচ্ছা খবর যদি মনের মতো হয় তাহলে ব্যারাকপুর গিয়ে দাদা বৌদির বিরিয়ানি।’

জয়ি আরেকবার হেসে নিয়ে বলে, ‘আজকে বীরাটির মোড়ে তুলির সাথে দেখা হয়েছিল। ও আর ওর মা বিগ বাজারে এসেছিল।’

‘তোর সাথে কিছু কথা হয়নি ওর ?’ চন্দন জিজ্ঞেস করে।

জয়ি এবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, ‘হয়েছে। তুলিও ভাল নেই। চোখের তলায় যেন কালি পড়ে গেছে মেয়েটার। কালকে তুলি ওর মায়ের সাথে দক্ষিণেশ্বর পূজা দিতে যাবে। তুই সকালেই চলে যাস। ঠিক কখন যাবে সেটা বলার আগেই ওর মা চলে এল।’

চন্দনের গলাটা অকারণেই ভারী হয়ে আসে, ‘জয়ি তুই যাবি কালকে আমার সাথে ? প্লিজ না বলিস না। প্লিজ প্লিজ।’

জয়ি আবার খিল খিল করে হেসে ওঠে, ‘তুই না এক্কেবারে বাচ্চাদের মতো। আচ্ছা যাব। তবে দেখিস যেন ঘুম থেকে উঠতেই নটা না বেজে যায়। বার হওয়ার আগে একটা কল করে নিস। এই বাবা আসছে। এখন রাখলাম কালকে দেখা হচ্ছে। বাই। ভালভাবে থাকিস।’ হড়বড় করেই লাইনটা কেটে দেয় জয়ি। আজকে অনেকদিন পরে চন্দনের মুখে একটু খুশির রেখা দেখা গেল। ভেতরে একটা চাপা উত্তেজনা কাজ করছে ঠিকেই কিন্তু তবুও কোথায় যেন ভেতরটা একটু হালকা লাগছে বলেই মনে হল ওর।

চন্দন আর জয়ি যখন দক্ষিণেশ্বর পৌঁছুল তখন সকাল সাড়ে আটটা। তখনো মন্দিরে তেমন ভিড় হয়নি। রাস্তা ধারের দোকান গুলো নিজের নিজের জিনিশ পত্র সবেমাত্র সাজিয়ে বসেছে। চন্দন জয়িকে জিজ্ঞেস করে, ‘চা খাবি?’ জয়িও না বলে না। চায়ের দোকানে বসে বসেই দুজনে দুজনার জীবন দর্শন শোনায় দুজনকে। চন্দন অবশ্য জয়ির কথায় কান পেতে রাখলেও চোখ পড়েছিল রাস্তার উপরেই। মনটাও ছট ফট করছিল তুলিকে দেখার জন্য। দক্ষিণেশ্বরের পুরো পরিবেশটাই যেন কেমন মায়া জড়ানো। মনে হাজার চঞ্চলতা নিয়েও মানুষ এখানে এসে একটা শান্তি অনুভব করে। হয়তো তাই হাজার হাজার মানুষ কেবল মাত্র এক টুকরো শান্তির খোঁজে ঘর বাড়ি পরিবার পরিজন সব হেলায় ফেলে কোথায় চলে যায় কোন অচেনা শান্তির খোঁজে। যারা একবার শান্তির সুর শুনেছে দুকান পেতে তারা আর থাকতেই পারেনি ঘরের কোনায়। চন্দন তো বলেই ফেলে, ‘দেখ এখানেও মানুষের ভিড় নেহাত কম নয় তবুও মন জুড়ান একটা বাতাস বইছে পুরো এলাকাটা জুড়ে।’ জয়ি কিছুই বলে না শুধু চোখের পাতা দুটোকে চন্দনের মুখের উপর তুলে ধরে। সবার শান্তির জায়গা তো আর একই রকম হয় না। তাইতো কেও শরীরে শান্তি খোঁজে কেও আবার মনে। অনেকেই ঘরেই শান্তি খুঁজে নেয় অনেকেই আবার নীল নির্জনে।

বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই মায়ের ভক্তের সংখ্যাও বাড়তে শুরু করল হুহু করে। কিন্তু তুলি কোথায়? যার জন্য এত দূরে আসা তারেই তো দর্শন নেই। জয়ি বলে, ‘চল না ফালতু ফালতু এখানে বসে না থেকে আমরাও লাইনে দাঁড়াই। তুলি আসতে আসতে আমাদের পূজা দেওয়া হয়ে যাবে।’ চন্দন ডান হাতের আঙুলের ফাঁকে বাঁ হাতের আঙুল গুলো ঢুকিয়ে একটা মড়মড় শব্দ করে বলে, ‘আমি স্নান করেই আসিনি। তুই পূজা দিবি তো দে। আমি না হয় এখানেই বসি কিছুক্ষণ।’

পূজা দেওয়া জয়ির আর হল না। দ্বিতীয় কাপ চা শেষ হতে না হতেই তুলি আর ওর মা নামল একটা কালো রঙের কার থেকে। তুলি গাড়ি থেকে নামতে না নামতেই চন্দনের সাথেই প্রথমে চোখা চোখি হয়ে গেল। হয়তো কালো কাঁচের আড়াল থেকে তুলি চন্দনকে আগেই দেখে নিয়েছিল। তুলি গাড়ি থেকে নামতেই চন্দন লক্ষ্য করল তুলির শারীরিক পরিবর্তনটা। জয়ি ঠিকেই বলেছিল, তুলি ভাল নেই। কেমন যেন রোগা রোগা হয়ে গেছে মেয়েটা। দূরের থেকে যদিও দেখা গেল না তুলির চোখের তলায় কালি পড়েছে কিনা। তবে এটুকু ভালই বোঝা গেল, তুলি ভাল নেই। তুলির সাথে দূরত্ব বজায় রেখে চন্দন আর জয়িও পূজা দেওয়ার লাইনে দাঁড়ায়। কথা বলার সুযোগ বলতে এই লাইনে দাঁড়িয়েই নতুবা…

চন্দনকে কথা বলার সুযোগ তুলি নিজেই করে দেয়। মায়ের ঠিক পিছনেই দাঁড়িয়েছিল তুলি। কিন্তু ধীরে ধীরে মায়ের থেকে অনেকটাই পিছনে চলে এল একটা সময়। একজন একজন করে মানুষকে সামনে এগিয়ে যাবার সুযোগ করে দিচ্ছিল তুলি। একটা সময় ঠিক তুলির পিছনেই চন্দন। কোনো রকম ভনিতা না করেই তুলি বলল, ‘তোর হাতে খুব বেশি হলে তিনমাসের মতো সময় আছে তার ভেতরে যদি আমাকে নিয়ে পালিয়ে যেতে পারিস তো ভাল নতুবা…’ কথাটা শেষ করতে পারেনি তুলি। নিঃশব্দ কান্নায় কথা গুলো তলিয়ে যাচ্ছিল ঠোঁটের ভেতরেই। চন্দনের দুচোখ বেয়েও গড়িয়ে নামছিল শান্ত শীতল জলের ধারা। ভক্তের লাইনটা যখন মন্দিরের সিঁড়ি গুলোর খুব কাছে চলে এসেছে তখন চন্দন তুলির হাতটা শক্ত করে ধরে বলে, ‘একবার দেখা করতে পারবি তুলি ? অনেক কান্না কুড়িয়ে রেখেছি তোকে দেবো বলেই।’ তুলি কথা বলতেই পারে না। দুটো ঠোঁটকে প্রাণপণে চেপে কোনো রকমে কান্নাটাকে লোকানোর চেষ্টা করে।

বাড়ি যাওয়ার সময় তুলি বারবার পিছনের দিকে তাকিয়ে দেখছিল চন্দনকে। চন্দনও তুলির চোখের ভেতরকার কথা গুলোকে পড়ার চেষ্টা করে। ধীরে ধীরে গাড়িটা সামনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। চন্দনের খুব ইচ্ছে করে গাড়িটার পিছনে পিছনে ছুট্টে যেতে। মনে হয় গাড়িটা যেন ওর ভেতর থেকে কিছু একটা ছিঁড়ে নিয়ে চলে যাচ্ছে অনেক অনেক দূরে কোথাও। তুলিদের গাড়িটা দৃষ্টি পথের বাইরে হারিয়ে যাওয়ার পরেও চন্দন বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে শূন্য রাস্তাটার দিকে।

‘তুলিকে ওটা কী বল্লিরে তুই ? কান্না না কী কুড়িয়ে রেখেছিস ওকে দিবি বলে ?’ রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে কথাটা জিজ্ঞেস করে জয়ি।

চন্দন জয়ির মাথায় হালকা একটা টোকা মেরে বলে, ‘তুই তাহলে আমার পিছনে দাঁড়িয়ে আমাদের কথা শুনছিলি?’

‘বারে আমার সামনে দাঁড়িয়ে তোরা বিরহ রস পান করবি আর আমি চোখ কান বন্ধ করে রাখব। এই তুলি কি বলল দেখা করতে পারবে ?’

‘ও সব কথা তাহলে… যাক একটু হলেও ভদ্রতা আছে তোর।’

‘আমি না শুনলেও আমার পিছনের মেয়েটা বোধ হয় সবেই শুনেছে।’

‘তাহলে ওকেই জিজ্ঞেস করলে তো পারতিস। ওই বলে দিত তুলি দেখা করবে কী করতে পারবে না।’

‘বলবি না সেটা বল। বুঝি বুঝি সবেই বুঝি তোর এখন ভয় হচ্ছে পাছে আমি দেখা করার দিন কাবাব মে হাড্ডি হয়ে যাই।’

‘ফালতু বকিস না তো। তুই না থাকলে আজকে দেখাই হত না। সত্যি তোর এই উপকারটা আমি সারা জীবন মনে রাখব। আজকে আমার কাছে তেমন টাকা নেই। তবে এই মাসের টিউশনের বেতনটা পেলেই তোকে বিরিয়ানি খাওয়াব।’

‘ধুর রাখ তোর বিরিয়ানি। ওটা আমি এমনি বলেছিলাম। চল না আজকে আমার বাড়ি যাবি। অন্যদিন তো বলতেও পারি না। আজকে বাড়িটা এক্কেবারে ফাঁকা। কেও নেই। আজকে না হয় আমিই তোকে চিলিচিকেন করে খাওয়াবো। যাবি আমাদের বাড়ি ?’ জয়ির বাড়ি যাবার কথা শুনেই চন্দনের মনে পড়ে যায় প্রথমবার তুলির বাড়ি যাবার দিনটা। ভৈরবের কথা মাথায় এলেই এখনও চন্দনের হাসি পায়। সেদিনের তুলি আর আজকের তুলিতে যেন কত হাজার মাইলের তফাত হয়ে গেছে। চন্দনের কাছ থেকে কোনো উত্তর না পেয়ে জয়ি আবার বলে, ‘কী কোনো উত্তর দিলি না যে ?’ চন্দন উত্তর দিতেই যাবে এমন সময় একটা লোফার গোছের ছেলে ‘ভাল মালটা পটিয়েছ গুরু’ কথাটা বলেই ওদের দুজনের মাঝ দিয়ে মোটর বাইকে সাঁই করে পেরিয়ে যায়। চন্দন কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল কিন্তু ততক্ষণে ছেলেটা হাওয়া হয়ে গেছে। রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে চন্দন বলে, ‘শালাকে যদি পেতাম না ওর টুঁটি ছিঁড়ে পকেটে ভরে দিতাম।’

জয়ি চন্দনের পাশে এসে অসহায়ের মতো বলে, ‘এরা রক্তবীজের বংশ একটাকে মারবি তো আরও দশটা গজিয়ে যাবে।’

চন্দনের রাগটা তখনো কমেনি সে আগের সুরেই বলল, ‘এমন মারব এমন মারব যে দশটা গজানো তো দূরের কথা এক জনকে মেরেই দশ জনকে সোজা করে দেবো।’

চন্দনের রাগ দেখে এবার জয়ি হেসেই ফেলে। হাসির ফোয়ারা কমলে বলে, ‘আচ্ছা সে না হয় পরে হবে। এখন বল আমার বাড়ি যাবি, কি যাবি না?’ চন্দন ঘাড় নেড়ে যাবার সম্মতি দেয়।

দোতলায় জয়ির রুমে বসে বসেই জয়ির জমানো বই গুলো এক একটা হাতে নিয়ে দেখছিল চন্দন। রবীন্দ্রসমগ্র থেকে শুরু করে স্মরণজিৎ চক্রবর্তী পর্যন্ত কেও বাধ নেই জয়ির জমানো লাইব্রেরিতে। কত রকমের বই কত কত নাম না জানা কবি লেখকের ছড়াছড়ি। রুমটাও দারুণ ভাবে সাজিয়ে গুছিয়ে রেখেছে জয়ি। পূর্বদিকের জানালা দিয়ে তাকাতেই চোখে পড়ে একটা পুকুরের কোনায় একটা প্রকাণ্ড বটের গাছ। পুকুরটাতে অনেকেই স্নান করছে। চন্দনের মনে হল কোথাও যেন ঠিক এমন একটা বাড়ির জানালা দেখেছে সে। কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারল না ঠিক কোথায় দেখেছে। ‘সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের শ্রেষ্ঠ কবিতা’-র বইটা হাতে নিয়ে জানালাটার ধারে এসে দাঁড়ায় চন্দন। উলটে পালটে দেখে দুএকটা কবিতা। এমন সময় গ্লাসে করে কোল্ডড্রিঙ্ক নিয়ে জয়ি ঘরে ঢুকে বলে, ‘কিরে সুনীল সাগরে ডুব দিয়েছিস নাকি?’ চন্দন তখনো জানালার দিকেই তাকিয়ে মনে করার চেষ্টা করছে এমন ছবি সে কোথায় দেখেছে। জয়ি কাঁচের গ্লাসটা টেবিলের উপর নামিয়ে চন্দনের পাশে এসে দাঁড়ায়। পুকুরটা পেরিয়েই একটা ছোট্ট জঙ্গল। কত রকমের পাখি উড়ছে জঙ্গলের গাছ গুলোর উপর।

শেষ পর্যন্ত থাকতে না পেরে চন্দন জয়িকে বলে, ‘জানিস কেন জানিনা আমার মনে হচ্ছে এই জানালার কপাট ওই পুকুর, পুকুরে মানুষ জনের স্নান সবেই আমার খুব পরিচিত।’ জয়ি এক গাল হেসে বলে, ‘দেখিস আবার যেন বলিস না পূর্বজন্মে এই বাড়িটা তোর ছিল।’

জয়ির সাথে হাসি ঠাট্টায় মেতে অনেকদিন পরে চন্দন আবার নিজেকে আগের মতো স্বাভাবিক মনে করে। মনের ভেতরকার ঘুমিয়ে পড়া পাখিটা যেন আবার শিশ দেয়। চন্দন জানত না জয়ি কবিতা লেখে বলে। শুধু চন্দন কেন হয়তো বা কেওই জানে না। আসলে কিছু কবিতা মানুষ শুধু নিজের জন্যই লেখে। সেখানে নিজের ছোট ছোট সুখ দুঃখ হাসি কান্নায় ভরাক্রান্ত হয়ে থাকে কবিতার ভেতরটা। চন্দন সোফায় বসে একটা একটা করে কবিতা পড়ছিল আর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা জয়ির লাজুক মুখটার দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছিল মাঝে মাঝে।

“নীরবে ভালবাসা

নীরবে কাছে আসা

নীরবে নীরবে চাওয়া

নীরবে হারিয়ে তারে

নীরব হয়ে যাওয়া”

কবিতার লাইন কটা পড়ার পরে চন্দন জয়িকে বলে, ‘হে দেবী আপনার সরবতা দেখিয়া কে বুঝিবে আপনি এতটা নীরব প্রেমিকা।’

‘সবটাতেই তোর ফাজলামি। সেদিন স্যার বলল মনে নেই ? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন কবিতার ভেতর কবিকে খোঁজা বৃথা।’ হাসতে হাসতেই কথা গুলো বলে জয়ি।

‘আমি কবিতার ভেতর কবিকে খুঁজছি না কবির ভেতর কবিতাকে খুঁজছি।’

‘ধুর ভাল্ললাগেনা, তোর না সবেতেই একটু বাড়াবাড়ি। আমার কবিতা গুলো নিয়ে হেঁয়ালি করবি না বলছি।’

‘কবিতা নিয়ে করছি না তো কবিকে নিয়ে…’ কথাটা শেষ করতে না দিয়েই জয়ি চন্দনের চুলের মুঠিটা টেনে ধরে বলে, ‘নে আমাকে নিয়ে হেঁয়ালি কর এবার।’

চন্দন জয়ির কোমরটা ধরে একটা টান দিতেই জয়ি চন্দনের কোলের উপর পড়ে আর জয়ির বাঁধন হারা বুক দুটো সজোরে চন্দনের বুকে ধাক্কা খেয়ে নেচে ওঠে। মুহূর্তের মধ্যেই জয়ি নিজেকে সামলে নিয়ে চন্দনের কোল থেকে উঠে জানালার ধারে গিয়ে দাঁড়ায়। সেকেন্ডের ভেতর এমন একটা ঘটনা ঘটে যাওয়ায় দুজনেই যেন কেমন কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে পড়ে। কিছুক্ষণ মৌন থাকার পরে পরিবেশটাকে স্বাভাবিক করার জন্য চন্দন আবার জয়ির কবিতা গুলো পড়তে শুরু করে।

চন্দন খেয়াল করে জয়ির কবিতায় মাঝে মাঝে এক রাজপুত্র ঘোড়ায় চড়ে আসা যাওয়া করেছে। আবার হেঁয়ালির সুরেই চন্দন জয়িকে বারবার জিজ্ঞেস করে ছেলেটির কথা। জয়ি পারে না বলতে ‘তুই, তুইয়েই তো আমার সেই স্বপ্নে দেখা রাজপুত্র। যে রোজ রাতে এসে কান্না হয়ে আমার কবিতায় ঝরে পড়ে।’ শুধু জয়ি কেন অতিবড় মূর্খ মেয়েও হয়তো ভুল করে বলত না কবিতার ভেতরকার রাজপুত্রের পরিচয়। কে জানে তাতে হয়তো একজন ভাল বন্ধুকেই হারাতে হতে পারে।

এক একটা কবিতা চন্দনের মনেও হালকা হাওয়া লাগিয়ে যায়। ‘শেষ যাত্রা’ নামের কবিতাটা পড়ার পর জয়ির মতোই চন্দনের চোখ দুটোও বাস্পিত হয়ে আসে,

       ‘যে চলেছে খেয়া দিয়ে

সন্ধ্যা নামার সুরে

পাঁজরা কাঁপা একতারাতে

কাঁদিয়ে মাঠ দূরে ।

হাত নাড়িয়ে বুক পুড়িয়ে

যতই ডাক তারে

সে কি আর ফেরে ?

যে চলেছে খেয়া দিয়ে

সন্ধ্যা নামার সুরে

আর কতদিন এমন ভাবে

মায়ার জালে মিথ্যা চালে

জড়িয়ে তারে রাখতিস !

ফুলের মধু শূন্য করে

মৌমাছি হয়ে গেছিস উড়ে

তবে আজ কেনরে

মৌচাকেতে পাক দিস

বৃথায় তারে ডাক দিস,

যে চলেছে খেয়া দিয়ে

সন্ধ্যা নামার সুরে ।

কবিতা ডাইরি রাখার পর জয়িদের পুরো বাড়িটাই ঘুরে ফিরে দেখেছিল চন্দন। কলকাতার এই সব বড়লোকি মডেলের বাড়ি গুলো দেখতে ওর খুব ভাললাগে। জয়ির বইয়ের টেবিলের উপর বাঁধিয়ে রাখা একটা ছবি দেখে ‘তোর সঙ্গে এরা কারা ?’ জিজ্ঞেস করাতে চন্দন প্রথববার জেনেছিল জয়ির এক দাদা আছে। যখন জয়ির মা মারা যায় তখন ওর বড় মামা জয়ির দাদাকে নিয়ে চলে যান। জয়ির বড় মামার কোনো ছেলে মেয়ে ছিল না এখন জয়ির দাদাই সেই অভাব পূরণ করছে। জয়ির মুখে ওর দাদার গল্প শুনতে শুনতে মাঝে মাঝেই চন্দনের শ্যামা দিদির কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল। সেটা যদিও চন্দন জয়িকে বলেনি। জয়ির বাড়ি থেকে ফেরার আগে চন্দন শুধু বলেছিল ওকে একবার পুকুরের ওই দিকের জঙ্গলটায় নিয়ে যাবার কথা। জয়ি বলেছে, ‘পরেরবার যখন আসবি তখন ঠিক নিয়ে যাব।’

প্রেমের গল্প প্রেমের কবিতা বা প্রেমের উপন্যাস বাদে আজকালের ছেলে মেয়েরা কেন bangla choti golpo পড়ে বুঝি না

                 ।।৪।।

আজকে বাড়িতে ঢুকে কাকিমাকে চন্দন বলেই দিয়েছে ওর জন্য রান্না না করতে। অনেকদিন পরে মনপুরে খেয়েছে জয়ির বাড়িতে। পেটপুরে তো যে কোনো দিনেই খাওয়া যায় কিন্তু মনপুরে খাওয়ার জন্য মনটাকে ভালথাকা খুব জরুরি। আজকে অনেকদিন পরে তুলিকে দেখে চন্দন খুব খুব খুবই খুশি। সেই কবে শেষবার দেখেছিল তারপর আজকে দেখা। কিন্তু এই খুশির ভেতর মাঝে মাঝেই একটা দুশ্চিন্তার মেঘ জমা হচ্ছে মনের ভেতর। তুলি বলেছে তিন মাসের ভেতর কিছু একটা করতে নতুবা…। শুধু এই কথাটা মনে পড়ে গেলেই বুকের ভেতরটা কেমন যেন দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে ওর। তুলি দেখা করতে পারবে বলেও কথা দেয়নি। তবে বলেছে চেষ্টা করবে। চন্দন ভাল মতোই জানে এখন তুলির পক্ষে দেখা করা কতটা কঠিন। তবুও যে তুলি দেখা করব বলেছে সেটাই অনেক।

আজকে তুলিরও বেশ হালকা লাগছে এটা ভেবেই যে চন্দন ছেলেটার কিছু থাক বা নাই থাক একটা মন আছে আর সেখানে শুধুই তুলির জন্য ভালবাসা জমানো আছে। একটা মেয়ের এর চেয়ে বেশি আর কী চাই তার ভালবাসার মানুষের কাছ থেকে। বাড়ি ফিরেই তুলি প্রথমে মন্দিরের থেকে আনা ফুলটা চন্দনের একটা ছবির সাথে বইয়ের পাতার ভেতর লুকিয়ে রাখে। এই বইটার ভেতরে চন্দনের দেওয়া অনেক কিছু ছোট ছোট অনুভূতি লুকিয়ে রেখেছে তুলি। এই বইটা তুলির কাছে অনেকটা জাদুঘরের মতো। চন্দনের ফেলে দেওয়া পার্কের টিকিট থেকে শুরু করে চন্দনের চুল পর্যন্ত অনেক কিছুই আছে এই জাদুঘরে। একলা মন কাঁদানো রাতে কতবার এই বইটা তুলির শয্যা সঙ্গী হয়েছে তার হিসেব নেই। বইটা রেখে দেওয়ার পর আবার কী একটা ভেবে বইটা তুলে নেয়। তারপর ফরফর করে কয়েকটা পাতা উলটিয়ে কিছু একটা খোঁজার চেষ্টা করে। বেশ কিছুক্ষণ এইভাবে খোঁজার পর শেষ পর্যন্ত তুলির আঙুলের টানে চন্দনের একটা ছবি বেরিয়ে আসে। এই ছবিটাই তুলিকে প্রথম দিয়েছিল চন্দন। ছবিটা হাতে নিতেই সেই ডোরাকাটা দিন গুলো মনে পড়ে যায়। সেদিন কেই বা জানত তুলির মতো মর্ডান মেয়ে প্রেমে পড়বে গ্রামের গন্ধ গায়ে লেগে থাকা একটা সাদামাটা ছেলের। কলেজের প্রথম ক্লাসে যেখানে আর পাঁচটা ছেলে নিজেদেরকে পাগলু কিংবা দিওয়ানা বানিয়ে এন্ট্রি মারল সেখানে চন্দন প্রবেশ করল আঁতিপাঁতি কবির পোশাকে। প্রথম প্রথম চন্দনকে সবাই গোপনে চাষা বলেই সম্বোধন করত। এমনকি তুলিও। কেবল মাত্র জয়িই যা চন্দনের সাথে কথা বার্তা বলত বন্ধুর মতো। কিন্তু ওই যে বলে প্রেম আর প্রতিভা বেশিদিন চাপা থাকে না। ধীরে ধীরে কারুরেই বুঝতে বাকি রইল না, ছেলেটা যথেষ্ট প্রতিভাবান।

তুলি বইটার ভেতর থেকে চন্দনের ছবিটা টুক করে বেরকরে নিয়ে বুকের অন্তর্বাসের ভেতর ঢুকিয়ে নেয়। তারপর বইটাকে নিজের জায়গায় রেখে শরীরটাকে গড়িয়ে দেয় বিছানায়। এখন ওর মা আসবে না। এই সময়টা ওর মা রান্না ঘরেই ব্যস্ত থাকে। দুচোখ বন্ধ করে চন্দনের ছবিটাকে বুকের ভেতর বোলাতেই এক অদ্ভুত শিহরণ জাগে তুলির শরীরে। ঠিক যেন চন্দন সেদিনের মতো তুলির খোলা বুকে আঙুল দিয়ে পাগল পাগল খেলা খেলে যাচ্ছে। কিছুক্ষণের ভেতরেই একটা মধুর অসোয়াস্তি ছড়িয়ে পড়ে সারা শরীরে। বুক দুটো যেন উষ্ণতায় ফেটে পড়তে চায় বারবার। নাক মুখ দিয়ে ঘন ঘন শ্বাস পড়তে থাকে। ইচ্ছে করে এক ছুট্টে চন্দনের কাছে চলে যেতে। কিন্তু চন্দনের কাছে চলে যাবার মন্ত্র যে তুলির জানা নেই।

শরীরের ভেতরকার সুনামি শান্ত হবার পর যখন তুলি চন্দনের ছবিটা বইয়ের ভেতর রেখেদিয়ে বিছানায় আসে তখন অকারণেই তুলির ডাগর দুটো চোখে আবার জলোচ্ছ্বাস দেখা যায়। জানালার বাইরের আকাশে তখন ফিকে রঙ ধরেছে। রোহিতের উপর ভীষণ রাগ হয় তুলির। শয়তানটা যে এমনটাও করতে পারে ভাবতেই পারেনি তুলি। উচ্চমাধ্যমিকের ইংরেজি টিউশনের সময় থেকে আদাজল খয়ে পিছনে লেগেছিল রোহিত। ও হয়তো ভেবেছিল একেই কলেজে একেই বিষয়ে পড়ার সুবাদে তুলির মনেও একদিন রঙ ধরবে। কিন্তু যেদিন বুঝল সে গুড়ে বালি পাখির মনে বন্য সুর লেগেছে। সেদিন থেকেই শুরু হল তুলির খুশি গুলোকে মাড়িয়ে দেওয়ার খেলা। তখনো কলকাতার মাটিতে চন্দন সেই চাষাই। তাই রোহিতদের অত্যাচার গুলো সহজেই হজম করে নিয়েছিল চন্দন। প্রথম দিকে শহুরে আবহাওায় চন্দন নিজেকে ঠিক মেলে ধরতেই পারছিল না। তাই তুলির মনচুরির অপরাধে রোহিতের অত্যাচার গুলো মুখবুঝেই গিলতে হয়েছিল তাকে। এতে তুলির মনে চন্দনের প্রতি টান আরও বেড়েছিল। সেই দিনটার কথা তুলির খুব মনে পড়ে, যেদিন তুলির মনে প্রথমবার চন্দনের ছোঁয়া লাগে। দিনটা ছিল ইন্টার কলেজ কবিতা আবৃতি প্রতিযোগিতার দিন। বিচারকের আসনে ছিলেন স্বনামধন্য কবি অজয় গোস্বামী। প্রতিবারের মতো সেবারেও ঘোষক রঞ্জন তিওয়ারী। আসর জমে উঠেছিল কবিতার লহরে লহরে। মাঝে মাঝেই অজয় গোস্বামী মুগ্ধ হয়ে নড়ে চড়ে বসছিলেন। কখনো বা হাততালিও দিচ্ছিলেন অন্যান্যদের সঙ্গেই। তুলি জয়ি মধুরিমা মল্লিকা সবাই সেদিন ‘শাড়ি’ সবাই সেদিন বাঙালী। এমনকি রোহিত জগা রঞ্জনরাও চুড়িদার পাঞ্জাবীর ভেতরে ঢুকে বাঙালী হয়ে উঠেছিল সেই দিনটাতে।

সেদিনেই হটাৎ করেই রঞ্জন ঘোষণা করেছিল, ‘এবার কবিতা পাঠ করতে আসছে আমাদেরই প্রিয় বন্ধু চন্দন রায়।’ এক মুহূর্তের জন্য সব চুপ। পিছনের দিক থেকে কে যেন ফিসফিস করে বলে উঠেছিল, ‘আরে চাষার তো নামেই ছিল না। ব্যাটা আজকে পুরো খাল হয়ে যাবে।’ ঈশ্বর মনে হয় সবাইকে খাল করে আনন্দ উপভোগ করতে পছন্দ করেন না। চন্দন স্টেজে এসেই সবার প্রথমে ধন্যবাদ দিয়েছিল রঞ্জনকেই, ‘আবৃতি প্রতিযোগিতায় আমার কোনো নামেই ছিল না তবুও যে প্রিয় বন্ধু রঞ্জন আমাকে এখানে ওঠার একটা সুযোগ করে দিল তারজন্য সবার প্রথম আমি ওকেই ধন্যবাদ জানাব।’ এই কথাটা বলার পর মাননীয় অথিতি এবং কলেজের অধ্যক্ষ থেকে শুরু করে কলেজের সাধারণ কর্মচারী দেরও শ্রদ্ধা জানিয়েছিল চন্দন। কোনো প্রস্তুতিই ছিল না সেদিন ওর। থাকার কথাও নয়। হাতেও ছিল না কোনো বই কিংবা কাগজের টুকরো। তবুও চন্দনের গলার কারুকার্যে কবিতার কলকল্লোল ধরা পড়ল শুরুর লাইন থেকেই। কখনো ঝড় উঠল তো কখনো বা ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি। চন্দন আবৃতি করেছিল জীবনানন্দ দাশের ‘আট বছর আগের একদিন’ কবিতাটা।

যখন চন্দন কাব্যরসের ভেলায় চড়ে এসে পৌঁছাল সেই বিখ্যাত লাইন গুলোতে,-

“নারীর হৃদয়-প্রেম-শিশু-গৃহ-নয় সবখানি;

অর্থ নয়, কীর্তি নয়, সচ্ছলতা নয়-

আরো এক বিপন্ন বিস্ময়

আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতর

খেলা করে,

আমাদের ক্লান্ত করে

ক্লান্ত-ক্লান্ত করে;

লাশকাটা ঘরে

সেই ক্লান্তি নাই;

তাই

লাশকাটা ঘরে

চিৎ হ’য়ে শুয়ে আছে টেবিলের’পরে”

                    তখন অজয় গোস্বামী স্বয়ং উঠে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন। মুহূর্তের জন্য হলেও সবাই ভুলে গিয়েছিল সেই চাষা কবিতা আবৃতি করছে। এরপর কী হয়েছিল সেটা মনে হয় আর বলে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। সেদিনেই প্রথম তুলি এগিয়ে এসে হাত বাড়িয়ে বলেছিল, ‘আমি তুলিকা চক্রবর্তী। আমি এই কবিতাটা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের কণ্ঠে বহুবার শুনেছি। তবে আজকের শোনাটা অম্লান হয়ে থাকবে। আপনার যদি আপত্তি না থাকে তাহলে আমাকে বন্ধু করতেই পারেন।’

ঠোঁটে একটা হাসির রেখা টেনে চন্দন বলেছিল, ‘চাষার সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে আপনার যদি আপত্তি না থাকে আমার তাহলে আপত্তি কীসের?’ চন্দনের কথায় তুলির দুটো গালেই লজ্জায় রাঙিয়ে গিয়েছিল সেদিন। বেশ কিছুক্ষণ কোনো কথা বলতেই পারেনি তুলি। ঠিক সেই সময় জয়ি না এসে পড়লে হয়তো ওদের দুজনকে আরও কিছুক্ষণ নীরবতা পালন করেই থাকতে হত।

          এরপর কবে যে ওরা আপনি থেকে তুমিতে নেমে তুই-এ পৌঁছে গেল সে খবর মনেহয় কারুরেই তেমন জানা নেই। তবে হাঁ সেদিনের পর থেকেই তুলি আর চন্দনকে কখনো কলেজের ছাতে, কখনো লাইব্রেরিতে, কখনো সপিং মলে কিংবা সিনেমা হলে প্রায়েই দেখা যেত।

বিছানায় শুয়ে শুয়ে চন্দনের কথা ভাবতে ভাবতেই কখন যে ঘড়ির কাটা একটার ঘর পেরিয়ে গেছে তুলির খেয়ালেই নেই। আজকে যদিও মন্দির যাবার সুবাদে স্নানের কাজটা আগেই চুকে আছে তবুও অনান্যদিন এই সময়টাতে তুলি মায়ের সাথে রান্না ঘরেই থাকে। আজকে তুলির আর রান্নাঘরে যেতে একটুও ইচ্ছে করছিল না। আজ অনেকদিন পর চন্দনকে দেখে স্মৃতিপাখি গুলো যেন ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে এসে বসছে মনের আকাশে। বিছানা ছেড়ে ছাতের উপরে এসে দাঁড়ায় তুলি। চারদিকটা আলোয় ভরে আছে। ওর খুব ইচ্ছে করে চন্দনকে একটা ফোন করতে। কিন্তু সেই উপায় নেই এখন আর। পাশের বাড়ির ছাতের উপর দুটো পায়রা নিজেদের খুনসুটিতে ব্যস্ত। একটা আরেকটার পিঠের উপর চড়ে চঞ্চুতে করে আরেকটার ঘাড়ে ঘষা দিচ্ছে। তুলির শরীরটাও আবার যেন কেমন কেমন করতে থাকে। মনের ভেতর কী একটা ভাবনার উদয় হতেই নিজে নিজেই লজ্জা পেয়ে যায় তুলি। পায়রা গুলোর দিকে তাকিয়ে আপন মনেই হাসতে থাকে। বাড়ির পাশেই যে দুটো বড় বড় দেবদারু গাছ মাথা উঁচু করে তিনতলার ছাতটাকে ছুঁয়ে ফেলেছে তারেই একটাতে বসে একটা কাঠঠোকরা পাখি আপন মনে ঠুক ঠুক করছিল বেশ কিছুক্ষণ ধরে। তুলি এদিক সেদিক ঘোরাঘুরি করে পাখিটাকে খোঁজার চেষ্টা করে। দেখতে পায় না। পায়রা গুলো তখনো নিজেদের প্রেমালাপেই ব্যস্ত। ছাতের থেকেই দেখা যাচ্ছে ভৈরব একটা বড় কাঁচি হাতে বাগানের আগাছা গুলোর মুণ্ডপাত করছে আপন মনে। গেটের বাইরের বড় রাস্তায় গাড়ি গুলো চলে যাচ্ছে যে যার গন্তব্যের দিকে। তুলির মনে হয় সবারেই একটা কর্মময় জীবন আছে কেবল মাত্র ওরেই যেন জীবনের গতিটা হটাৎ করে থেমে গেছে বড় কোনো গিরিখাদের কাছে এসে। দিন দিন আত্মবিশ্বাসটাও যেন কেমন কমে যাচ্ছে। সেই কলেজের হৈ হৈ দিন গুলোকে এখন স্বপ্ন বলেই মনে হয় তুলির।

যদিও তুলির মা যতটা কঠোর হবার ভান করে ততটা কঠোর যে নয় সেটা তুলি ভাল মতোই জানে। তাই ইচ্ছে করলেই তুলি ফেসবুকে গিয়ে আড্ডা দিতেই পারে কিন্তু চন্দনের যে কোনো ফেসবুক নেই তাই তুলিরও ইচ্ছে করে না ফেসবুকে গিয়ে নিজেকে ডুবুয়ে রাখতে। এই বিশালাকার বাড়িটার থেকে তুলির ছুটে পালিয়ে যেতে ইচ্ছে করে খুব। কিন্তু কোথায় পালিয়ে যাবে! তুলি ভাল মতোই জানে বাইরের অবস্থাটা কতটা ভয়ংকর। চন্দনের কিছু যদি একটা মাসকাবারি আয় থাকত তাহলে না হয় কোথাও পালিয়েই যেত তুলি। কিন্তু সেটা যখন নেই তখন আর ভেবেই বা কী হবে। চন্দন বলত সময়ে সব ঠিক হয়ে যাবে। যখন বাড়িতে কিছুই জানত না তখন তুলিরও মনে হত বাড়িতে মেনে নিলেও নিতে পারে। কিন্তু এখন আর সেটা ভাবারও কোনো রাস্তা নেই। তুলির বাবা পরিষ্কার বলেই দিয়েছেন তুলি চাইলে সারা জীবন অবিবাহিত হয়েই জীবন কাটাতে পারে কিন্তু ওই ছেলের সাথে বিয়ে কিছুতেই নয়। তুলি জানে ওর বাবা কোনো বিষয়ে একবার না করলে সেটাতে হাঁ আর তিনি করেন না। চন্দনকে ছেড়ে অন্য পুরুষের সাথে জীবন কাটানোর কথা ভাবলেই চোখ দুটো জলে ভরে আসে তুলির। ভাবতেই পারে না চন্দন ছাড়া আর কারুর ওর শরীরটাকে স্পর্শ করার কথা। মাঝে মাঝে চন্দনকে নিয়েও একটা আতঙ্ক কাজ করত, আজকে চন্দনের চোখের দিকে তাকিয়ে তাও খানিকটা ভরসা পেয়েছে তুলি। তবুও তো পুরুষ মন! জয়ির মনে কী আছে তুলি ঠিক বুঝতে পারে না কিন্তু জয়ি যেন কেমন করে তাকায় চন্দনের দিকে। কেমন যেন হেসে হেসে কথা বলে এইসব সাতপাঁচ ভাবনায় ওর বুকের ভেতরটা তিরতির করে কাঁপতে থাকে। ঝাপসা কুয়াশার ভেতর দাঁড়িয়ে দিকভ্রান্ত পথিক যেমন পথ চিনতে পারে না তুলিরও ঠিক তেমনেই মনে হয়। বারবার মনটাকে বোঝানর চেষ্টা করে সময়ে সব ঠিক হয়ে যাবে কিন্তু যতই সময় পেরেয়ি যায় মনটাও যেন ততই আশাহত হয়ে পড়ে। তুলির মা তুলিকে নিচের থেকে বারবার চিৎকার করে ডাকেন। সে ডাক আজকে তুলির কানে এসে পৌঁছোয় না কিছুতেই। চন্দনকে দেখার পর থেকেই মনটা যেন কোনো সুদূর ডাকের প্রতীক্ষা করে আছে।

হাজারটা bangla choti golpo একটা ভাল প্রেমের উপন্যাসের সমান হতে পারে না

                       ।।৫।।

আজকে সন্ধ্যার দিকে আকাশ কালো হয়ে আসায় চন্দন ওর ছাত্র গুলোকে ছুটি দিয়ে দিয়েছিল আধ ঘণ্টা আগেই। সাড়ে আট’টা বাজতে না বাজতেই শুরু হল মুশল ধারায় বৃষ্টির সঙ্গে বজ্রপাত। লাইনটা চলে যাওয়ায় ঘরময় ছড়িয়ে পড়ল একটা ভ্যাপসা অন্ধকার। মাঝে মাঝেই বিদ্যুতের ঝলকানিতে ঘরটা আলোকিত হয়ে আবার পরের মুহূর্তে আঁধারে হারিয়ে যাচ্ছে। একটা চেয়ার নিয়ে দরজার সামনে বসে চন্দন দেখছিল বৃষ্টি আর বিদ্যুতের খেলা। এক ঝলক আলো ফুটে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই গুড় গুড় গুড় গুড় শব্দ। ছোটবেলায় বিদ্যুতের শব্দে চন্দনের যখন খুব ভয় করত তখন ও মায়ের কোলে মুখ গুঁজে চুপটি করে শুয়ে থাকত। বিদ্যুতের শব্দ না থামা পর্যন্ত চন্দনের মুখে একটিও শব্দ বার হত না তখন। যখন কিছুটা বড় হয়েছে ওই ক্লাস এইট নাইন হবে হয়তো তখন স্কুলের বাংলা স্যার সুবোধ বাবু চন্দনকে পড়ার জন্য ‘চাঁদের পাহাড়’ উপন্যাসটা দিয়েছিলেন। চন্দন উপন্যাসটা পড়া শুরু করেছিল বর্ষার সময়। হ্যারাকিনের পাতলা আলোয় রাত জেগে পড়ত চন্দন। পড়তে পড়তে হারিয়ে যেন আফ্রিকার গভীর অরণ্যে। কখনো নিজেকে শঙ্কর মনে হত কখনো আবার দিয়াগো আল্ভারেজ। বাংলা স্যারের দৌলতেই মাধ্যমিকের আগেই চন্দনের অনেক রোমাঞ্চকর গল্প উপন্যাস পড়া হয়ে গিয়েছিল। বর্ষার সময় যখন পুকুর, খাল, বিল, ডোবা গুলো থেকে বেঙের চিৎকার ভেসে আসত তখন একটা অদ্ভুত আনন্দ হত ওর মনের ভেতর। তবে ‘চাঁদের পাহাড়’ নয় চন্দনের বেশি ভাললেগেছিল জিম করবেটের শিকার কাহিনি গুলো আর শক্তিপদ রাজগুরুর লেখা ‘বনে বনান্তরে’। চন্দনের মুখে বারবার ‘বনে বনান্তরে’ উপন্যাসটার নাম শুনত তুলি। পরে একদিন চন্দনকে না জানিয়ে নিজেই কলেজস্ট্রিট গিয়ে বইটা কিনে পুরোটা হজম করার পর গল্পটা শুনিয়ে চন্দনকে চমকে দিয়েছিল।

প্রায় এক ঘণ্টা পরে মেঘের দল অন্যত্র চলে গেলে একটা একটা করে তারা বেরিয়ে এল চন্দনের জানালার বাইরের আকাশে। সেদিন মন্দিরে তুলি দেখা করার কথায় সম্মত হলেও এই তিন চার দিনে আর কোনো খোঁজ খবরেই পায়নি চন্দন। একবার ভেবেছিল তুলিদের বাড়ির দরজার সামনে গিয়ে ঘুরে আসবে। অন্তত তাতে যদি চোখের দেখা হয়। কিন্তু অসময়ের বৃষ্টিপাত চন্দনের পুরো পরিকল্পনাটাই নষ্ট করে দিয়েছে। ছেঁড়া ফাটা সুখ দুঃখের দিন গুলোই বসে বসে কল্পনা করছিল চন্দন এমন সময় নিচের কাকিমা উপরে উঠে এলেন। কাকিমাকে উপরে আসতে দেখে বেশ একটু ঘাবড়েই যায় চন্দন। এখনো তার দুমাসের বাড়ি ভাড়া দেওয়া বাকি আছে। যদিও ভাঁড়ার জন্য কাকু বা কাকিমা কেওই কোনোদিন চন্দনকে কিছুই বলেননি। কাকিমা উপরে এসেই চন্দনকে জিজ্ঞেস করেন, ‘হাঁ বাবা শরীর টরীর ভাল আছে তো ? কদিন ধরেই ভাবছিলাম তোমার কাছে একবার আসব। তুমি যখন খাবার খেতে নিচে যাও প্রায়শই তোমার কাকু থাকেন তাই কথাটা আর জিজ্ঞেস করা হয়ে উঠেনি।’

চন্দন কাকিমার কথাটা ঠিক বুঝতে পারল না তবুও বলল, ‘হাঁ কাকিমা শরীর ভালই আছে।’

ভদ্রমহিলা চন্দনের মাথায় হাত বুলিয়ে আবার জিজ্ঞেস করলেন, ‘তাহলে এমন মনমরা হয়ে থাকো কেন বাছা ? কোনো কিছু সমস্যা হলে বলবে আমাকে। আমি তো সেই তোমার মায়ের মতোই। তুমি বাড়িটায় আছো বলেই ভেতরটা তাও খাঁ খাঁ করে না আর। আমাদের মলয় মনে হয় আর এদেশে ফিরবে না। মেমসাহেবের সঙ্গে বিয়েথা করে হয়তো সুখের সংসারে ডুবে বুড়া মা বাপটারে ভুলেই গেছে।’ কথাগুলো বলতে বলতেই ভদ্রমহিলা শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখের জল মোছেন। চন্দন কী বলে সান্ত্বনা দেবে তার ভাষা খুঁজে পায় না। চুপচাপ কাকিমায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। ভদ্রমহিলা একটু বিরতি নিয়ে নাকের জল টেনে আবার বলেন, ‘বাড়ির অমতেই তোমার কাকু আমাকে ঘরে তুলেছিলেন। কেও মেনে নেয়নি তখন আমাকে। আমার বাপের বাড়ি ব্রাহ্মণ পরিবার ছিল না বলেই। আমার সাথে শ্বশুর বাড়ির কেওই দুটা কথা পর্যন্ত কইত না। তোমার কাকু যখন আমাকে নিয়ে বাড়ি ছাড়ে তখন মলয় চারমাস পেটে। অভাবের কথা ভেবেও আমরা বাচ্চা নিতে পিছুপা হইনি। রাতদিন তোমার কাকু পরিশ্রম করে করে ব্যবসায় যখন দাঁড়াল তখন মলয় সবে বড় স্কুলে গেছে। একমাত্র ছেলেকে বিদেশে পাঠানোর একটুও ইচ্ছে ছিল না আমার। বাইশ বছর বয়সে মলয় সেই যে বিদেশে গেল আর ফেরেনি।’ একটু থেমে তিনি আবার বলতে থাকেন, ‘প্রথম প্রথম চিঠি দিত। বছর তিনেক পরের থেকে সেটা কমতে শুরু করল। হটাৎ একদিন শুনলাম বিয়ে করেছে। তোমাকে বোঝাতেই পারব না বাবা সেদিন এই বুকটাতে কেমন বেজেছিল। বিয়ের কথা শোনার পর তোমার কাকু আর চিঠি দেননি বেশ কয়েক মাস। যতই হোক ছেলে তো তাই তোমার কাকুই আবার চিঠি দিল বৌমাকে নিয়ে বাড়ি ফেরার জন্য। না ওরা বাড়ি ফিরল, না আর কোনো চিঠি এল। তারপর অনেক চিঠি পাঠিয়েছি ঐ ঠিকানায় কিন্তু কোনো উত্তর আসেনি।’ কাকিমার কথা শুনতে শুনতে চন্দনের নিজের মায়ের মুখটাই বারবার মনে পড়ে যাচ্ছিল।

একটা সময় চন্দন কাকিমার হাত দুটো শক্ত করে ধরে বলে, ‘দেখবেন কাকিমা সময়ে সব ঠিক হয়ে যাবে। আপনার ছেলে একদিন না একদিন ঠিকেই ফিরে আসবে। এখন হয়তো…’

ভদ্রমহিলা চন্দনকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই বললেন, ‘সেই সময়টা আসার অপেক্ষাতেই তো বাবা এতদিন কাটালাম। বাকি জীবনটাও এমন ভাবেই হয়তো কেটে যাবে। তোমাকে আবার রাতের বেলায় জ্বালাতে এলাম বলে যেন বিরক্ত হও না বাবা। যত দিন খুশি তুমি আমার বাড়িতেই থেকো।’ কথা গুলো ভাঙা গলায় কোনো রকমে বলেই ভদ্রমহিলা ধীরে ধীরে নিচে চলে গেলেন। চন্দনের উত্তরের জন্য অপেক্ষাও করলেন না আর।

কাকিমার কথা গুলো শোনার পর থেকেই চন্দনের নিজের মায়ের কথা গুলো খুব মনে পড়তে শুরু করে। যেদিন চন্দন কলকাতায় এল ঠিক তার আগের রাতে ওর মা বলেছিল, ‘বাবা লতুন জায়গা সাবদানে থাকিস। ট্রেনে বাসে কেও কিচ্ছু দিলে যেন আবার খ্যাইতে যাস না। দিনকাল ভাল্লয় মোটেই। দেখিস এমন কুনো কাজ কুরিস না যাতে কেও বলতে পারেক অমুকের ব্যাটা কলকাতায় যাইয়ে উমন কাজ কইর‍্যা আইছে।’ চন্দন বুঝতে পেরেছিল ওর মা কোন কাজের কথা বলছে। কিন্তু এখন চন্দন কী করবে ? সে তো সেই নিষেধের কাজটাই করে ফেলেছে। হটাৎ ঘরের আলোটা জ্বলে উঠতেই সারা ঘরটা ঝলমল করে উঠে। আলোটা এসে চন্দনের জটিল ভাবনা গুলোতে যেন একটা আশা জাগায়। টেবিলের উপর জ্বলতে থাকা মোমবাতিটা নিভিয়ে ড্রয়ারের ভেতর রাখতে গিয়ে চন্দনের চোখ পড়ে পাথরের একটা রাধাকৃষ্ণের মূর্তির উপর। এই মূর্তিটা চন্দনকে ওর শ্যামাদিদি দিয়েছিল। চন্দন মূর্তিটা ড্রয়ার থেকে বেরকরে অপলক ভাবে তাকিয়ে থাকে। শ্যামাদিদি বলেছিল, ‘ভাই যকন কুনু বিপদে পড়বি তকন এই রাধাগোবিন্দকে বলিস দেখবি সব ঠিক হইয়ে যাবেক। আমি তো সেদিন রাধাগোবিন্দকে ভোর বেলাতেই বইল্যা ছিলাম, হে ভগবান আজকে যেন নাড়ুদের কুইল গাছের নিচে অনেক কুইল পইড়্যা থাকে। ঐ যে যেদিন তোকে নুন নঙ্কা মাখ্যাই এক বাটি দিয়েছিলাম। সেদিন রাধাগোবিন্দকে না বইললে কুইল পাইতমই না।’ রাধাগোবিন্দের মূর্তিটা চন্দনকে দিয়ে দেওয়ার জন্যই হোক বা অন্য যে কোনো কারণেই হোক না কেন মেয়েটার চরম সর্বনাশের সময় ওকে বাঁচানোর মতো কেওই সেদিন ছিল না।

জীবনের সুখ দুঃখ হাসি কান্নার কথা ভাবতে ভাবতেই চন্দনের অনেক রাত হয়ে গেল ঘুম আসতে। চোখ বন্ধ করার কিছুক্ষণ পর চন্দন দেখল নাড়ুদের কুল গাছটা পাকা পাকা কুলে ভরে আছে। নিচেও পড়ে আছে প্রচুর। কুল গাছের তলায় দাঁড়িয়েই দেখা যাচ্ছে চন্দনদের বাড়ির টালির চালাটা নতুন টিনে ছাওয়া হয়ে গেছে। ওর মা ঘরের দাওয়ায় বসে চশমা পরে গল্পের বই পড়ায় ব্যস্ত। হটাৎ শ্যামাদি ডাকল, ‘চন্দন এই কুইল গাছের তলায় আয় অনেক পাকা পাকা কুইল পইড়্যা আছে।’ চন্দন কুল গুলো কুড়িয়ে কুড়িয়ে পলিথিনের প্যাকেটে ভরে রাখছে। শ্যামাদি কুড়িয়ে রাখছে আঁচলে। কুল কুড়োতে কুড়োতে শ্যামাদি কখন তাঁতিদের পুকুরটা পেরিয়ে গেছে চন্দন খেয়াল করেনি। এমন সময় ঝোপের ভেতর লুকিয়ে থাকা কয়েক জন লোক এসে শ্যামাদির হাতদুটো খপ করে ধরে ফেলল। তারপর হাত ধরে টানতে টানতে জঙ্গলটার দিকে নিয়ে যেতে লাগল। চন্দন ছুটে শ্যামাদির কাছে যাবার চেষ্টা করে কিন্তু পা’দুটো যেন স্লিপ করে যাচ্ছে বারবার। ছুটতে গিয়েও কিছুতেই ছুটতে পারল না। হটাৎ চন্দন খেয়াল করল দূরের থেকে শ্যামাদিকে যেন তুলির মতো দেখাচ্ছে। না, না তুলির মতো কেন! ওটা তো হুবুহু তুলিই। তুলি ‘হেল্প হেল্প’ করে চিৎকার করছে কিন্তু সাহায্য করার জন্য কেও ছুটে আসছে না। লোক গুলো গায়ের জোরে তুলিকে সম্পূর্ণ নগ্ন করে পাশবিক অত্যাচার শুরু করতেই চন্দন চিৎকার করে ডাকল, ‘তুলি-ই-ই-ই  তুলি-ই-ই-ই’ এমন সময় কে যেন পিছন দিক থেকে এসে চন্দনের মাথায় রড দিয়ে আঘাত করল। আঘাত পেয়ে পড়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গেই চন্দনের পকেট থেকে কুল গুলোও ছড়িয়ে পড়ল ঘাসের উপর। চন্দন ছট ফট করে গোঙাতে লাগল। তবুও কেও এল না। এমন সময় চন্দন দেখল রোহিতের মতোই দেখতে একটা লোক ওর গলা বরাবর একটা ধারালো অস্ত্র তুলে ধরেছে। চন্দন গলাটাকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে ‘না আ আ’ বলতেই ঘুমটা ভেঙে গেল ওর। সারা শরীর ঘামে ভিজেগেছে। বিছানার থেকে নেমে ঢক ঢক করে এক গ্লাস জল খেয়ে চুপচাপ বসে পড়ে চন্দন। মাথাটা যেন কেমন ভারী হয়ে আছে। এমন ভয়ংকর স্বপ্ন এর আগে কখনই দেখেনি চন্দন। বেশ কিছুক্ষণ পাইচারি করার পর চন্দন আবার শুয়ে পড়লেও সারা রাত ওর আর ঘুম এল না। বারং বার স্বপ্নের মুখ গুলো ওকে তাড়িয়ে বেড়াতে লাগল বাকি রাতটুকু।

ভোরের দিকে হয়তো চোখটা লেগে গিয়ে থাকলেও থাকতে পারে। মোবাইলের রিংটোনটা বাজতেই বিছানা থেকে উঠে বসল চন্দন। তন্দ্রা মেশানো গলাতে ‘হ্যালো’ বলতেই ওপার থেকে ভেসে এল অরুণ কাকুর গলা। অরুণ কাকু জানালেন চন্দনের মায়ের শরীর মোটেই ভালোনেই। অতএব যত শীঘ্র সম্ভব চন্দন যেন বাড়িতে পৌঁছোয়। সামনেই কলেজের পরীক্ষা তার উপর আবার তুলিকে নিয়ে সমস্যা চলছে ওদিকে মায়ের শরীর খারাপ সব মিলিয়ে যেন মাথা ঘুরতে শুরু করল চন্দনের। এখন যাই হোক বাড়ি তো ওকে যেতেই হবে তাই আর দেরি না করে একজন স্টুডেন্টকে কল করে জানিয়ে দিল চন্দন, ‘আমি এই কয়দিন থাকব না। ফিরলে তোদের জানাব। বাকিদের জানিয়ে দিস।’ ফোনটা রেখেই চন্দন ফ্রেস হয়ে নিচে কাকিমাকে জানিয়ে এল যে ও কদিন থাকবে না বলে। কাকিমার কাছ থেকে ফিরে এসে হাতের কাছাকাছি যা ছিল সব ব্যাগের ভেতরে পুরে বাড়ির জন্য রওনা দিল চন্দন।

এই প্রেমের উপন্যাসটি শেষ পর্যন্ত পড়ার পর আপনি আরও প্রেমের উপন্যাস প্রেমের গল্প প্রেমের কবিতা খুঁজবেন। bangla choti আর ভাল লাগবে না।

                         ।।৬।।

পড়ন্ত বিকেলে চন্দন যখন ছাতনা ষ্টেশন নামল তখনো চড়াই পাখি গুলো ষ্টেশন চত্বরে তাদের দিনের শেষ ধুলাখেলায় মগ্ন। বাসের জন্য প্রতীক্ষা না করেই চন্দন হাঁটতে শুরু করল গ্রামের দিকে। অনেকদিন পরে বাড়ি ফেরার সুবাদে হাঁটতে চন্দনের বেশ ভালই লাগছিল। কলকাতায় তো এমন লালমাটির বুকে হাঁটার সুযোগ জোটে না। হাঁটতে হাঁটতেই চন্দন দেখল অনেক দূরের শাল পলাশের জঙ্গলের সাথে লুকোচুরি খেলছে ওর গ্রামটা। সারা এলাকা জুড়ে চলছে সবুজ বিপ্লব। কলকাতায় এত সবুজ নেই। এত প্রাণ নেই। পথ চলতে চলতেই পাশের গ্রামের নবারুণ কাকার সাথে দেখা হয়ে গেল। নবারুণ কাকা সাইকেলে করে ছাতনা বাজারে যাচ্ছিলেন। ভালমন্দ খবরা খবর বলতে গিয়েই তিনি জানালেন, ‘গত মাসে সুবোধ মাস্টার দেহ রাইখ্যাছেন। অনেকদিন ধইর‍্যা রোগে ভুগছিলেক।’  চন্দনের মনটা ভরাক্রান্ত হয়ে গেল এক মুহূর্তে। বাড়ি ফেরার সেই গতিটাও কমে এল ক্রমশ। সেই ‘চাঁদের পাহাড়’ সেই ‘জিম করবেট’ সেই ‘বনে বনান্তরে’ সব যেন এক নিমেষে কেমন ঝাপসা হয়ে গেল এক চিলতে যন্ত্রণার অন্ধকারে। ট্রেনে আসতে আসতেই মনে মনে কত গল্প বেঁধেছিল চন্দন সুবোধ স্যারকে বলার জন্য। ভেতরটা কেমন যেন খালি খালি লাগছে এখন ওর। ‘চন্দন সাহিত্যের রস যদি সত্যই পেতে চাস তাহলে কলকাতাকে ভেতর থেকে উপভোগ করিস। কলকাতা শুধু কলকাতা নয়রে কলকাতা হল বাংলা সাহিত্য চাষের মাটি। তুই তো সাহিত্য নিয়েই পড়তে যাচ্ছিস তাই বললাম। এখন নয় পরে ঠিক বুঝবি কেন তোকে এখানের কলেজ ছেড়ে কলকাতায় যেতে বলেছি।’ চন্দন কলকাতা আসার আগে যখন সুবোধ মাস্টারকে প্রণাম করতে গিয়েছিল তখন কথা গুলো তিনি চন্দনকে বলেছিলেন। চন্দন এখনো বুঝতে পারেনি কেন কলকাতায় পড়তে যেতে বলেছিলেন সুবোধ মাস্টার। তবে চন্দন এটুকু বুঝতে পেরেছে ঠিকেই কলকাতা ঠিক যেন কলকাতা নয় কলকাতা যেন অন্য কিছু। যাদেরকে কলকাতার নেশায় পায় তারাই কলকাতার প্রকৃতি বোঝে যাদের সেই নেশা লেগা না কলকাতা তাদের জন্য নয়। কলকাতা যেন একটা ছোটো গল্প যার শেষ হয়েও শেষ হয় না কোনোদিন।

চন্দন আনমনা ভাবে হাঁটতে হাঁটতে কখন যে কালাঝরিয়ার সেই ফুটবল খেলার মাঠটা পেরিয়ে এসেছে সেটা খেয়ালেই করেনি। আর মাইলটেক পথ পারহলেই গন্ধেশ্বরী নদী। তারপরেই শুশুনিয়া পাহাড়ের ঢালে শাল পলাশে ঘেরা চন্দনদের গ্রাম সোনাঝুরি। আগে নাকি এই এলাকায় শাল পলাশের চেয়েও সোনাঝুরি গাছ অনেক বেশি ছিল তাই গ্রামটার এমন নাম করণ।

নদীটার কাছে এসে দাঁড়াতেই চন্দনের চোখ পড়ল পূব দিকের পাড়টার উপর। আগের বারে যখন বাড়ি এসেছিল তখনো ওখানটায় সেই মস্ত বড় লেদা পলাশের গাছটা ছিল। এবার সেটা আর নেই। হয়তো কেও কেটে নিয়ে গেছে নয় বর্ষায় পাড় ভেঙে তলিয়ে গেছে। ওই গাছটায় চড়ে চন্দন তার বন্ধুদের সাথে ঝাঁপ মারত গন্ধেশ্বরীর বুকে। আবার কখনো কখনো একলা একলাই ছিপ হাতে নিয়ে বসে থাকত গাছটার উপর। চন্দন এই গন্ধেশ্বরী নদীর গল্প তুলিকেও শুনিয়েছে বহুবার। রাতের বেলায় ফোনে কথা বলতে বলতে মাঝে মাঝেই চন্দন চলে আসত গন্ধেশ্বরীর গল্পে। এখন সূর্য পশ্চিমে ঢলে গিয়ে লাল হয়ে ঝুলছে পশ্চিমের লাল-নীল আকাশে। নদীর শান্ত জলের ধারাও অনেকটা রক্তের লালিমা ধারণ করেছে এখন। চন্দন পিঠের থেকে ব্যাগটাকে বালির উপর নামিয়ে নদীর জলে পা ডুবিয়ে বসে। নদীর উত্তর দিকের পাড়ের কলা গাছ গুলোতে প্রচুর কলা ধরে আছে। বাঁশঝাড় গুলোর ভেতর থেকে ভেসে আসছে বাউরী পাড়ার ভবঘুরে মোরগ গুলোর কোঁকড়োকোঁক কোঁকড়োকোঁক শব্দ। এই মোরগ গুলো মানুষে খেতে পায় কম শেয়ালের পেটেই যায় বেশি। চন্দন্দের ঘরেও এক সময় বেশ কয়েকটা মোরগ ছিল। ওরাও নদীর বাঁশঝাড় থেকে শুরু করে শুশুনিয়া পাহাড়ের উপর ঘুরে বেড়াত। সেবার ধারা পরবের সময় যখন চন্দনের মামা মামি এসেছিল তখন দুটো কাটা হয়েছিল। বাকি গুলো শেয়ালে কটাশে খেয়েছে। নদীর ধারে বসে বসেই চন্দন স্মৃতি মন্থন করছিল আপন মনে। এক সময় সূর্যটাও দিনের কাজ সেরে বাড়ি ফিরে গেল। ভরা যৌবন নিয়ে নেমে এল সন্ধ্যা। নদীর চরে ছড়িয়ে পড়ল অন্ধকার। দুপায়ে বালি মাখতে মাখতে চন্দন চলতে লাগল ঘরের পথে।

বাড়ির সামনে এসেই বেশ একটু ঘাবড়ে গেল চন্দন। গ্রামের দু’একটা ঘরে লাইট জ্বললেও বাকি ঘর গুলো অন্ধকারে আত্মসমর্পণ করে নীরব অভিমানে ডুবে আছে। এই সব গ্রাম গুলোর এটাই নিয়তি। বিজলিবাতি ঘরে ঘরে ঢুকলেও বিদ্যুৎ বিলের নির্মম পরিহাসে এরা অর্থের অভাবে অন্ধকারেই ডুবে থাকে। সরকার এদেরকে ভোটার ছাড়া এর বেশি কিছুই মনে করে না। নেতার ছদ্মবেশে এখানে অভিনেতারা ভিড় জমায় প্রতিশ্রুতির পশরা সাজিয়ে। তারপর যেই ভোট পার হল অমনি নটে গাছটিও মুড়োল। এই সব দিন আনা দিন খাওয়া মানুষ গুলো অন্ধকারের সঙ্গে লড়াই করেই বাঁচে। চন্দন কল্পনায় কলকাতার সাথে নিজের গ্রামটাকে মেলাতে গিয়ে নিজেই হাসে মনে মনে।

এই জন্যই হয়তো তুলিকে একদিন বলেছিল, ‘তুই ঠাণ্ডা ঘরের আলু। তুই কি টালির ঘরে থাকতে পারবি ? পারবি আমার বাঁকুড়া জেলার বাঁকড়ি ভাষাটাকে আপন ভাবতে ?’

উত্তরে তুলি বলেছিল, ‘যদি আমার খুব কষ্ট হয় তখন তুই আরও বেশি বেশি ভালবেসে আমাকে শীতল করে রাখিস। আর তুই যদি কলকাতার ভাষায় কথা বলতে পারিস তাহলে আমিই বা বাঁকড়ি শিখতে পারবো না কেন।’

চন্দন জীবনটাকে মাটির খুব কাছ থেকে দাঁড়িয়ে দেখেছে তাই ও ভাল মতো জানে আবেগে ফোটা ফুল অন্ধকার আসার ভয়েই ঝরে পড়ে। তবুও আর পাঁচজন প্রেমিকের মতো চন্দনও কোথাও না কোথাও ঠিকই ভাবে হয়তো তুলি আর পাঁচটা মেয়ের থেকে আলাদা হয়তো তুলি সব মানিয়ে নিতে পারবে সহজেই।

ঘরে ঢুকেই চন্দন দেখে ওর মা মাটির মেঝেতে মাদুর পেতে শুয়ে আছে। টিমটিম করে একটা আধমরা বাল্ব জ্বলছে ঘরের কোনায়। মুড়ির টিন, কাঠের উনুন, জলের কলশি, ছড়ান ছিটানো কয়েকটা থালা, বাটি, গ্লাস সব যেন দীর্ঘদিনের নীরবতা পালনে ক্লান্ত। মায়ের এমন অসুখ, ঘরের এমন ভাঙাচোরা অবস্থা আর ছেলে ডুবেছিল রাধাবিরহে! এটা ভাবতেই চন্দনের বুকের ভেতরটা গুমরে কেঁদে ওঠে। পিঠের ব্যাগটাকে দেওয়ালের একটা পেরেকে টাঙিয়ে রেখে মায়ের মাথার সামনে বসে আস্তে করে ডাকে চন্দন, ‘মা, অমা এখন কেমন আছ ?’ বেশ কিছুক্ষণ মায়ের কোনো সাড়া শব্দ না পেয়ে একটু ভয় পেয়ে যায় চন্দন। আবার ডাকে, ‘মা, অ-মা বলি কথা কস না কেন ?’ চন্দনের মা এবার নড়ে চড়ে ওঠে। চন্দনের মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু যেন খোঁজার চেষ্টা করে। তারপর ধীরে ধীরে বলে, ‘খোকা তুই আবার পড়া ফেইল্যা কেন আলি বাবা। আমার তেমন কিচ্ছুই হয় নাই। ওই কদিন ধইর‍্যা একটু জ্বর আইচে।’ কথা গুলো বলেই চন্দনের মা ঘড় ঘড় শব্দে কাশতে থাকে। চন্দন মাকে কথা বলতে বারণ করে। কিন্তু কে শোনে কার কথা চন্দনের মা আবার বলতে থাকে, ‘গেল মাসে তোর বাংলা মাস্টার সগগে গেল। গাঁয়ের একটাই ভাল মানুষ ছিল সেটাকেও ভগবানের দরকার পইড়লেক। তোর একটা চাকরি বাকরি হলে ঘরে বৌ আইন্যা আমিও সগগে যাতি পাইরব।’ কথা গুলো বলতে বলতেই এবার খুব বেশিই কাশছিল চন্দনের মা। চন্দন দেখল সে মায়ের কাছে বসে থাকলে ওর মা কিছুতেই চুপ করবে না। ওর মা আবার কিছু একটা বলতেই যাচ্ছিল কিন্তু চন্দন কথা বলতে নিষেধ করতেই কী যেন ভেবে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপ করে গেল। চন্দন বুঝতে পারছিল মায়ের শরীর খুব খারাপ। চন্দন কী খেয়েছে না খেয়েছে কখন বেরিয়েছে কিছুই এক বারও জানতে চাইল না।

চন্দন নিজেই বাড়ির বাইরের কল তলায় গিয়ে হাত মুখ ধুয়ে খাবার জল নিয়ে আসে। বাড়িতে খাবার বলতে কয়েক মুঠো মুড়ি ছাড়া আর কিছুই নেই। চন্দন নিজে খাবে না মায়ের জন্য রেখে দেবে বুঝতে না পেরে মুড়ি কটা নিয়ে চুপ করে বসে থাকে। এমন সময় সদর দরজায় টর্চের লাইট মারে কেও। চন্দনদের বাড়িটা রাস্তার একটু ভেতর দিকেই তাই সন্ধ্যার সময় সাধারণত এই দিকে বিশেষ দরকার না পড়লে কেও তেমন আসা যাওয়া করে না। ‘চনা আইছিস নাকি ?’ কথাটা বলেই অরুণ বাবু ভেতরে ঢুকলেন। চন্দন একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বলে, ‘হাঁ কাকু আপনার ফোন পাইয়েই চলে আইলম।’

‘হাঁ সেটা ভালই কইর‍্যেছিস। তোর মায়ের শরীরটা টুকুও ভাল নাই। আমার মনটায় হইল্যেক যে চনা আইসতে পারে তাই ভাইবলম টুকু ঘুইর‍্যা আসি। যদি আবার চনা আসে তখন কী খাবেক না খাবেক। লে বাপ এই রুটি তরকারি টুকু রাখ। তোর কাকি তোর লাইগ্যা কইর‍্যা দিছে।’ কথাটা বলেই অরুণ বাবু রুটি চার খানা আর তরকারির বাটিটা চন্দনের হাতে দেন। চন্দন একটু ইতস্তত বোধ করলেও মনে মনে ভাবে, যাক কেও তো গ্রামে আছে যাকে আপন ভাবা যায়। চন্দনের হাতে রুটি তরকারিটা দিয়েই অরুণ বাবু আবার বললেন, ‘তা হ্যাঁরে বাপ কইলকাতায় রোজগারপাতি কেমন হৈইচ্ছে ?’

‘কাকু আমি তো এখন পড়াশুনা করছি। রোজগারট কুথায় পাব এখন ।’

অরুণ বাবু মুখে চু চু একটা শব্দ করে বলেন, ‘না, না উডা তো আমিও জানি। কিন্তু কইলকাতায় কি আর টাকার অভাব বটে রে ? লোকে বলে উখানে নাকি টাকা উইড়্যা বেড়ায় ধ্যইরতে পাইরলেই হৈচ্ছে।’

‘ধুর কুথাও কিছুই নাই। গাঁয়ের মানুষ উখানে যাইয়ে গা গতরে খাইটে দুপয়সা কামায়।’

চন্দনের কথা শুনে অরুণ বাবু যেন কেমন মনমরা হয়ে যান। টর্চের লাইট ফেলে ভেতরটা একবার দেখার চেষ্টা করেন। হয়তো মনে মনে ভেবেছিলেন চন্দন কলকাতা থেকে অনেক কিছু নিয়ে আসবে। যতই তিনি হাটে বাজারে ঘুরে বেড়ান না কেন তবুও তো সেই গ্রামের ‘আনপড়’ মানুষ। আর প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষের কাছে কলকাতায় থাকা মানেই টাকার বালিশে মাথা রেখে ঘুমানোর মতোই। তাই সে কলকাতায় থেকে চাকরি করুক কিংবা পড়াশুনা। কলকাতায় থাকে অথচ সে টাকা রোজগার করছে না কথাটা এত সহজে কেওই হজম করবে না।

অরুণ বাবু বেশ কিছুক্ষণ মৌন থাকার পরে আবার বলেন, ‘ইটা অবশ্যি তুই ঠিক কথাই কইছিস পড়াশুনা কত্যে কত্যে কী আর বেশি কামাই হয়। অত চিন্তাট করিস না আইজকে হাজার দশেক হইচ্ছে উটাই কাইলকে দেখবি পঁচিশ পঞ্চাইস হবেক। আর হঁ কথায় কথায় কাজের কথাট তো বলাই হয় নাই। কাইল দুপুরে তোকে তোর কাকি আর তনি বার বার কইর‍্যা যাইতে বইলেছে কাইল দুপুরে আমার ঘরেই ভাত খাবি। আর কেও যদি বলে তো বলবি অরুক কাকা আগাম বইল্যা গেছে। অনেক রাইত হলেক রে বাপ আইজকে চলি। রুটি তরকারি গুলাইন খাইয়্যা লিস।’ কথাটা বলেই অরুণ বাবু ঝড়ের বেগে চলে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে যান। চন্দনকে হাঁ না কিছুই বলার সুযোগ টুকুও দিলেন না তিনি।

রাত্রি বেলায় চন্দন ওর মাকে কোনো রকমে মুড়ি গুলো খাইয়ে দেয়। রুটি তরকারি খেলে পাছে অম্বল হয় তাই নিজেই রুটি তরকারিটা খেয়ে নেয়। খওয়ার পর্ব শেষ হলে থালা বাটি ধুয়ে রেখে বাইরের বারান্দায় খাটিয়া পেতে বসে। সোনাঝুরি গ্রামের আকাশে তখন একফালি চাঁদ উঠেছে। পাতলা জ্যোৎস্নার চাদর মুড়ে ঘুমিয়ে পড়েছে শুশুনিয়া পাহাড়টা। চন্দনের বাড়ির উঠোনে বসে শুশুনিয়া পাহাড়টা পরিষ্কার দেখা যায়। আজকে হালকা হালকা কুয়াশা থাকার জন্য পাহাড়টাকে ততটা পরিষ্কার দেখা যদিও যাচ্ছে না তবুও বোঝা যাচ্ছে। কেও হয়তো কাছের কোনো ধান ক্ষেতে কীটনাশক থাইমেট ছড়িয়েছে তারেই একটা উগ্রগন্ধে বাতাসটা ভরে আছে। বসে বসে চন্দন অরুণ কাকুর বলে যাওয়া প্রতিটা কথাই ভাবছিল। চন্দনের রোজগার মাসে দশ হাজার হলে তো ভাবনাই ছিল না। তুলির সাথে সুন্দর একটা সংসার পাতাই যেত। একটা সময় চন্দন নিজেও ভাবত কলকাতা মানেই প্রচুর টাকা। এখন বুঝতে পারে কোথাও কিছুই নেই শুধু নদীর এপার আর ওপার। কলকাতাও যা সোনাঝুরি গ্রামও তাই। সেই মুষ্টিমেয় লোকের হাতেই টাকা আছে। বাকিরা সব কলুর চোখ বাঁধা বলদের মতো ঘুরেই মরছে।

রোমান্টিক প্রেমের গল্পে সাজানো উপন্যাস কেন প্রেম

                                   ।।৭।।

আজকে সকাল থেকেই তুলির মাথাটা খুব ব্যথা করছিল তাই নটা বাজতে গেল তবুও ওর বিছানা ছাড়ার কোনো লক্ষণ দেখা গেল না। ঘর বন্দি থেকে থেকে এখন জীবনটার প্রতি একটা বিরক্তি চলে এসেছে। না পারছে হাসতে না পারছে কাঁদতে। মাঝে মাঝে ওর খুব ইচ্ছে করে চন্দনের বুকে মাথা রেখে অঝোরে কেঁদে হালকা হতে। কালকে রাতে অনেক কষ্টে যদিও বা মায়ের মোবাইলটা নিয়েছিল ভাবল চন্দনকে একটা কল করবে কিন্তু ওই যে কথায় বলে দাতা দেয় তো বিধাতা দেয় না। ওর মায়ের মোবাইলে একটা রিং করার মতোও পয়সা ছিল না। অথচ অন্য সময় পাঁচশ সাতশ করে টাকা থাকে। সময় খারাপ হলে এমনটাই হয়। ভাবল ভালমানুষি দেখিয়ে মায়ের মন জয় করে আবার কলেজে ফিরতে পারবে। না, তার কোনো লক্ষণেই নেই। এমনকি পরীক্ষা গুলোও দিতে দেবে না মনে হয়। মাঝে মাঝে তুলি ভাবে রোহিতকে সামনে পেলে খুন করে ফেলবে। ওর জন্যই আজকে এত জ্বালা যন্ত্রণা। কেমন দিন ছিল আর কেমন হল। সকালে যখন ওর মা ঘুম থেকে তোলার জন্য এসেছিলেন তখনই তুলি জানিয়েছে ওর খুব মাথা ব্যথা করছে কদিন থেকেই। একবার ডাক্তার দেখানো দরকার। কিন্তু ওর মা শুনলে তো! বরং মাথা ব্যথার কথা শুনে বলে গেলেন, ‘ওসব বাহানা চলবে না আর তোর। ভাবিস না সেদিন দক্ষিণেশ্বরে আমি কিছুই দেখেনি। আবার ডাক্তার দেখাতে নিয়ে গেলে সেখানেও ওই ছেলে এসে ঠিক জুটবে সে আমি ভালই জানি। বেশি বাড়াবাড়ি হলে তোর বাবা হয় তোর ডাক্তার কাকুকে ডেকে আনবে নয় নিজে গিয়ে দেখিয়ে আনবে।’ তাই বাধ্য হয়েই তুলি এখনো বিছানাতেই।

এদিকে জয়ি কালকে বিকেল থেকে চন্দনকে ফোন করে যাচ্ছে কিন্তু প্রতিবারেই, ‘আপনি যে নাম্বারে কল করেছেন সেটি এখন পরিসীমা সীমার বাইরে আছে। অনুগ্রহ করে পুনরায় চেষ্টা করুণ অথবা কিছুক্ষণ পরে আবার ডায়েল করুণ,’ এই এক কথা শুনে শুনে বিরক্তি চলে এসেছে জয়ির। কলেজে পরীক্ষার ডেট দিয়ে দিয়েছে এদিকে চন্দনের কোনো পাত্তাই নেই। জয়ি ভেবেছিল সাহিত্যের ইতিহাস পেপারটায় চন্দনের কাছে একটু সাহায্য নেবে কিন্তু চন্দনের কোনো খোঁজ নেই বলেই এখন নিজেকেই বেজার মুখে সব বানাতে হচ্ছে। সকালের দিকে জয়ি একবার ভেবেছিল তুলির বাড়ির থেকে ঘুরে আসবে পরে আবার নিজেই কী সব ভেবে আর যায়নি।

মোবাইলটা হাতে নিয়ে আরেকবার চন্দনকে কল করার চেষ্টা করে জয়ি কিন্তু এবারেও সেই একই প্যানপ্যানানি। বিরক্ত হয়ে মোবাইলটা বিছানার উপর ছুড়ে দিয়ে জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। জানালার ওপারে তখন ব্যস্ত পৃথিবী। পুকুর ঘাটে কেও স্নান করছে কেও আবার স্নান সেরে বাড়ির পথে চলেছে। রবীন্দ্রনাথ যে কী করে এমন পুকুর আর বট গাছের দিকে তাকিয়েই সারাবেলা কাটিয়ে দিতেন উনিই জানেন। ঘড়ির কাঁটার দিকে আড়চোখে একবার তাকিয়ে দেখে জয়ি, দশটা বেজে পনের মিনিট। নিজের মনেই বিড়বিড় করে বলে, ‘চন্দন আসবে কিনা কে জানে তুলির তো কোনো সম্ভাবনাই নেই ধুর একা একা কলেজ গিয়ে কী হবে ? একটু বরং মানিকের পদ্মানদীর মাঝিকেই দেখি।’

কিছুক্ষণ বইটার পাতা উলটে পালটে শেষ পর্যন্ত বইটাকেও মোবাইলটার পাশে ছুড়ে দিয়ে সোফার উপরে চুপচাপ বসে পড়ে জয়ি। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, ‘ব্যাটা যেমন কুবের তেমন কপিলা। মালা একাই পুড়ে পুড়ে মরছে।’ ‘পদ্মানদীর মাঝি’ উপন্যাসে মানিক বাবু মালাকে বড়ই অসহায় করে দিয়েছিলেন। তার মনের সাথে শরীরটা কিছুতেই পেরে উঠত না। সব দিক দিয়েই সে সর্বহারা তার সবেই আছে অথচ কিছুই নেই। একটা নখ দিয়ে আরেকটা নখের থেকে রঙ তুলতে তুলতে হাজার রকমের চিন্তা আসছিল জয়ির মাথায়। কিছুতেই যেন আজ আর ওর মন সাথ দিচ্ছে না। তুলি আর চন্দনের সম্পর্কের কথাটা ভাবলেই কোথায় যেন একটা চাপা কষ্ট হয় জয়ির। আবার এই কষ্টের কথাকে মন থেকে মেনে নিতে গেলে নিজের মনটাকেই নিজের কাছে ছোট বলে মনে হয়। এটা নারী মনের এক নিদারুন জ্বালা। সে যেমন পারে না ভালবাসার মানুষকে অন্যের সাথে দেখতে আবার এটাও পারে না নিজের ভালবাসার মানুষকে তার ভালবাসার মানুষের কাছ থেকে আলাদা করার কথা ভাবতে। প্রেমের ক্ষেত্রে পুরুষজাতির সঙ্গে নারীজাতি এখানেই একটা ফারাক গড়ে নিয়েছে অন্তরে অন্তরে।

সকাল থেকে মায়ের কাশিটা একটু বেড়েছিল বলে চন্দন বেশ চিন্তায় পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু এখন মা অনেকটা সুস্থ থাকায় ও নিজেও বেশ খানিকটা স্বস্তি বোধ করে। তবে মাকে যে একবার গোবিন্দনগর হাসপাতালে দেখাতে নিয়ে যেতেই হবে সেটা ভালই বুঝতে পারছিল চন্দন। কিন্তু নিয়ে যাব বললেই তো আর নিয়ে যাওয়া হবে না। কিছু না হোক গাড়ি ভাঁড়ার টাকাটা তো তাকে জোগাড় করতেই হবে। এখন সেটায় বা পায় কার কাছে! কিছু না কিছু বন্ধক দিলে যদি বা কেও দুপয়সা দিত অথচ এখন এক টুকরো জমি ছাড়া বন্ধক দেবার মতো আর কিছুই নেই ওর কাছে। হয়তো শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়েই ওই জমি টুকুই…

বেলা একটা বাজতে না বাজতেই চন্দন নদীতে কয়েকটা ডুব দিয়ে এসে জামাকাপড় পরেই অরুণ কাকুর ঘরের দিকে রওনা দেয়। ঘর খানা বেশ বাগিয়েছেন অরুণ বাবু সেটা কিন্তু মানতেই হবে। ঘরে ঢুকেই চন্দন দেখে উঠনের উত্তর পশ্চিম দিকে অরুণ কাকু বিরাট গোয়াল ঘরের চালা নামিয়েছেন। দুটো বড় মাপের গরু ভেতরে দাঁড়িয়ে চুবি খাচ্ছে মনের আনন্দে। চন্দনকে দেখতে পেয়েই তনিমা বেশ জোর গলায় বলে ওঠে, ‘ও-মা চন্দনদা আইছে।’ কথাটা বলেই তনিমা ছুটে ভেতরের ঘরে চলে যায়। কয়েক সেকেন্ড পরেই একটা চেয়ার নিয়ে ফিরে এসে বলে, ‘এই এখানটায় বস চন্দনদা। সেই কত্তদিন পরে এলি বল। আমি তো ভেবেছিলাম…’ কথা গুলো বলার আর সুযোগ পেল না তনিমা তার আগেই ওর মা মুখ ভর্তি কথা নিয়ে বেরিয়ে আসে রান্না ঘর থেকে, ‘তুই বকবক কত্যে পালেই বাকি সব ভুইল্যা যাস। ছেলেটা এতেক দিন পরে বাড়িতে এল টুকু জল দিবি তা না বকবক কইর‍্যা যাচ্ছিস। বস বাবা বস। বাছা আমার কত দিন পরে এল। মুক খানা শুকাই চুন হইয়ে গেছে। তা কলকেতায় কত্ত পরিশ্রমের কাজ কইরতে হয় তবেত দুটা পয়সার মুক দেখা।’ চন্দন এর উত্তরে কী বলবে কিছুই খুঁজে পায় না। চেয়ারের উপর বসে চুপ চাপ গরু গুলোর চুবি খাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে।

আর যাই হোক চন্দন এদের কথাবার্তা শুনে এটুকু বুঝতে পারছিল এরা সবাই ভাবছে চন্দন কলকাতায় অনেক টাকা রোজগার করে। এর চেয়েও বড় কথা হল, এটা ভাবছে বলেই ওকে এত খাতির যত্ন করছে। নতুবা যারা অসময়ে মুখ ফুটে কোনোদিন জিজ্ঞেস করেনি ‘কেমন আছিস ?’ তারা আজকে এত খাতির যত্ন কখনই করত না।

ভাত খেতে বসে চন্দনের কোথাও যেন এই মানুষ গুলোর জন্য একটা কষ্ট হচ্ছিল। এখন ভুল বুঝে ওরা চন্দনকে মাথায় তুলে নিয়েছে কিন্তু যখন সত্যিটা জানবে তখন হয়তো পায়ে মাড়িয়ে দিতেও দ্বিতীয় বার ভাববে বলে মনে হয় না। এই আদিখ্যেতার আরেকটা কারণ তনিমাও হতে পারে। চন্দন কলকাতা যাবার আগে যখন ওর কলকাতা যাওয়া নিয়ে কথা বার্তা চলছিল সেই সময় অরুণ বাবু চন্দনের মাকে কথায় কথায় বলেছিলেন, ‘বৌদি আজকে গোপালদা বাঁইচ্যা থাইকলে কত খুশিই না হতেন। ছেলে কইলকাতায় যাচ্ছে পড়াশুনা কইরতে কত গব্বের কথা। যাদের টাকা পয়সা আছে তাদের ঘরের ছেইলারাও যাতি পারে না তায় তোমাদের তো… । যাই হোক আজকে দাদা থাইকলে হয়তো তোমাদের চনার সাথে আমাদের তনির পাকা কথাটা সাইর‍্যা রাইখ্যা দিত।’ বাড়ির ভেতরে বসেই চন্দন কথা গুলো শুনেছিল সেদিন। আজকে হটাৎ মনে পড়ে যেতেই মনে হল, সত্যই যদি তেমন কোনো ভাবনা নিয়ে এরা এত খাতির করছে তাহলে ? ফিলামেন্ট কাটা বাল্বের মতো মুখটা ঝাপসা হয়ে যায় চন্দনের। তনির মুখের সাথে তুলির মুখটা মেলাতে গিয়ে চন্দনের বুকটা ছ্যাঁক করে ওঠে। আড়চোখে তনির দিকে একবার তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করে চন্দন। মেয়েটা নির্লজ্জের মতো হাঁ করে তারদিকেই তাকিয়ে আছে। চন্দন তাকাতেই ফিক করে হেসে ওঠে তনি। চন্দন মুখটা অন্যদিকে ফিরিয়ে নেয়।

ভাত খেয়ে হাত ধোয়ার পরেই চন্দন বাড়ি ফেরার জন্য ব্যস্ত হলে তনিমার মা বলে, ‘এখন বাড়ি যাইয়্যা কী কইরবে বাবা তোমার বাড়িতে পাখাও নাই তো। যতই হোক কইলকাতায় থাকা ছেইলার কষ্ট হবেক বইকি। তারচাইয়্যা তুমি বরং তনির সাথে দোতলায় যাইয়ে ফেনের তলায় টুকু বিশ্রাম কর। পরে ক্ষণ আমি নিজে যাইয়্যা তোমার মাকে দুটি ভাত তরকারি খাউয়্যাই দিইয়্যা আইসব খন।’ চন্দন কিছু একটা বলতেই যাচ্ছিল কিন্তু সেটা আর বলতে ইচ্চে করল না বলেই চুপচাপ বসেই রইল।

তনিমা নিজে যেমন দেখতেই হোক না কেন নিজের শোয়ার ঘরটা কিন্তু বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করেই রেখেছে। লাইটের নিচে একটা হাসি মুখের শিশুর ছবি। তার পাশেই একটা গোলাপ বাগানের ছবি। এছাড়া এদিক সেদিক দেব, কোয়েল, জিৎ, শ্রাবন্তিরাও ঝুলে আছে দেওয়ালের দোলনায়। চারদিকে এত ছবি টাঙানো আছে তবুও বাড়িটাকে বেখাপ্পা লাগছে না। তনিমা নিজেই চন্দনকে এক একটা ছবি দেখিয়ে দেখিয়ে বলে যায় কোনটা কোথা থেকে কিনে এনেছে। শুধুকি তাই তনিমা কবে কখন কী হাতের কাজ করেছে সেগুলো দেখাতেও বাকি রাখে না। চন্দনকে নিজের ঘরে পেয়ে আজকে ভীষণ খুশি তনিমা। কোন জিনিশটা দেখলে চন্দন খুশি হবে আর কোন জিনিশটা চন্দনের পছন্দ হবে না সেই ভাবনাতেই মেয়েটা যেন মজে গেছে। বাড়িতে রাখা পাথরের মূর্তি থেকে শুরু করে নিজের ছোটবেলার খেলার পুতুল সবেই তনিমা চন্দনকে দেখাচ্ছে এটা ভেবেই, পাছে জীবনে এমন সুযোগ আর কোনোদিন না আসে। এই অশিক্ষিত মেয়েটার হাতে বানানো কোনো জিনিশ যে চন্দন হাতে নিয়ে নেড়ে চেড়ে দেখতেও পারে কোনোদিন সেই ভাবনাই হয়তো ওর ছিল না। তাই হয়তো এতখানি খুশি হয়ে দেখাচ্ছে সব। চন্দন একটা পোড়ামাটির নারী মূর্তি নিয়ে নেড়ে চেড়ে দেখতে দেখতে ভাবছিল একটা মানুষের মন কতটা নিষ্পাপ হলে তবেই এমন শিল্প সৃষ্টি করতে পারে। চন্দনের খুব ইচ্ছে করছিল মূর্তিটা তুলির জন্য নিয়ে যেতে। দিনরাত পুতুলের বিয়ে দিতেই ব্যস্ত আধপাগলি মেয়েটা যে নিজেই এত সুন্দর মূর্তি বানাবে একদিন চন্দন কেন না দেখলে হয়তো কেওই বিশ্বাস করবে না। চন্দন একবার তনিমার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখে, তনিমার মুখে তখনো সেই পবিত্র হাসিটা লেগেই আছে। এমন ভাবে চন্দন কোনোদিনেই তাকায়নি তনিমার দিকে।

চন্দন অরুণ কাকুর বাড়ির থেকে বেরিয়ে সোজা বাড়ি না গিয়ে ফরেস্টের পুকুর পাড়ে গিয়ে বসে। আজকে ও অনেকদিন পরে বুনোহাঁস দেখছে আবার। পাখি গুলো এই সময়েই পুকুরটাতে আসে প্রতি বছর। কোথা থেকে হেমন্তের গন্ধ পেয়ে এরা যে আসে চন্দন জানে না। ছোটবেলায় দেখত একজন টুপি পরা লোক বন্ধুক নিয়ে এসে শর ঝোপের আড়ালে ওত পেতে বসে থাকত বুনোহাঁস মারার জন্য। কোনো কোনো দিন গুলি ছুড়ে মেরেও নিয়ে যেত দু’একটা। গুলির শব্দে পুরো জঙ্গলটা যেন কেঁদে উঠত। চন্দনেরও কান্না পেত খুব। গুলি বিদ্ধ হাঁসটা হাওয়ায় ছিন্ন পালক উড়িয়ে ছট ফট করতে করতে একটা সময় শান্ত হয়ে যেত। ঐ দিন গুলো চন্দনের আজও চোখে ভাসে। বাবার মুখে শুনেছিল ঐ টুপি পরা লোকটা শুশুনিয়ার ফরেস্ট রেঞ্জার অফিসার ছিলেন। আজকে হাঁস গুলো যেন নিরাপদ। তিতির পাখির পায়ের সাথে পা মিলিয়ে ওরাও মনের আনন্দে ছুটে বেড়াচ্ছে পুকুরটার ধারে ধারে। পুকুরের মাঝটা শালূক আর পদ্ম ফুলে ভরে আছে। ফুল গুলোর দিকে তাকিয়ে চন্দন হারিয়ে যায় মধ্যমগ্রামের সেই নিরালা পুকুরটায়। তুলিই ওখানে একদিন নিয়ে গিয়েছিল। প্রকৃতির সবুজ কোলে সেদিন ওরা ছাড়া আর কেওই ছিল না। কলকাতার কাছাকাছি যে এমন নির্জন নীরব নিরালাও থাকতে পারে সেদিনেই প্রথম জেনেছিল চন্দন। ছোট ছোট হলুদ ঘাস ফুল তুলির চুলের খোপায় লাগিয়ে দিতে দিতে চন্দন সেদিন যেন কোথায় হারিয়ে যাচ্ছিল মাঝে মাঝেই। সেদিনেই প্রথমবার চন্দন তুলির কোলে মাথা রেখে বলতে পেরেছিল, ‘এমন জীবনের লোভে আমিও সব ছেড়ে দিয়ে তোর সাথে অনেক দূরে কোথাও হারিয়ে যেতে পারি।’ তুলি কোনো কথা বলেনি সেদিন। চন্দনের ভালবাসায় ভরা চোখের পাতায় নিজের ডাগর চোখ দুটো পেতে রেখেছিল শুধু। তারপর লজ্জিত চোখ দুটোকে নেত্র পল্লবে ঢেকে ঠোঁট দুটোকে প্রথমবার সমর্পণ করেছিল চন্দনের ঠোঁটে। চার ঠোঁটের ভেতরদিয়ে ভালবাসার মধু অনায়াসে এপার ওপার করেছিল সেদিন। সেদিন পিউ কাঁহা ডেকেছিল। সেদিন ফুল ফুটেছিল। সেদিন তুলি হাত দুটোকে আকাশের দিকে ছুড়ে দিয়ে চিৎকার করে বলেছিল, ‘আমি তোকে খুব খুব খুব ভালবাসি চন্দন।’ তুলির শান্ত শীতল ভালবাসায় অল্প উষ্ণতার ছোঁয়া দিয়ে চন্দন বলেছিল, ‘যদি হারিয়ে যাই আমরা। যদি ফুরিয়ে যায় এদিনের মুহূর্ত গুলো। যদি বিরহের বাতাস লেগে যায় আমাদের ভালবাসার গায়ে। যদি তুই বড়লোকি খেয়ালে সব কিছু খেলার ছলে…’ নরম ঠোঁটের বাধায় আর একটা কথাও তুলি বলতে দেয়নি সেদিন চন্দনকে।

সেদিনেই তুলি প্রথমবার সব হারানোর ভয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে চন্দনের বুকে মাথা রেখে বলেছিল কুমারী জীবনের সব চেয়ে বড় কথাটা, ‘আমাকে এক চিলতে সিঁদুর জীবন দিবি চন্দন ?’ কেঁদেছিল সেদিন চন্দনও। তুলিকে বুকে জড়িয়ে পাগলের মতো চুমু খেয়েছিল। সেদিন প্রকৃতির নরম বিছানার গভীর থেকে আরও গভীরে তলিয়ে গিয়েছিল দুটো স্বপ্ন দেখা শরীর। দুটো স্বপ্ন দেখা মন। বাড়ি ফেরার সময় সূর্যের লালিমাটাকে সঙ্গী করে হাঁটতে হাঁটতে চন্দন তুলির হাতে হাত রেখে কথা দিয়েছিল সারা জীবন এক সঙ্গে কাটাবে বলে। সুখে দুঃখে সাথে সাথে থাকবে বলে। ফুলঝরা মরশুমের সময় ফুল যেমন কাউকে কিছুই না বলেই ঝরে যায় ঠিক তেমন ভাবেই যখন কোনো প্রেম ভাঙে তখন কোনো প্রতিশ্রুতিকে মনে রেখে ভাঙে না। সে নিজের খেয়ালেই ভাঙতে থাকে। চন্দন বা তুলি কারুরেই কথা গুলো অজানা নয় তবুও যে শপথের সময় বলা প্রতিটা শব্দই কোথায় যেন মানুষ একটা সান্ত্বনা দিয়ে এসেছে আজীবন। হয়তো তাই হাজার না পাওয়ার ভেতরেও অনেক কিছু পাওয়া থেকেই যাই। আর সে গুলোই স্মৃতিসাথী হয়ে মানুষকে ব্যর্থ জীবনে বাঁচার রসদ জুগিয়ে যায় বাকি জীবনটুকু।

ভাল প্রেমের গল্প উপন্যাস কবিতা পড়ুন

                           ।।৮।।

তুলির মা হয়তো সেদিন চন্দনের সঙ্গে জয়িকে দেখেননি নতুবা আজকে তিনি কিছুতেই তুলির সঙ্গে জয়িকে দেখা করতে দিতেন না। সেদিন তুলিকে কিছু জিজ্ঞেস করার সুযোগ পায়নি জয়ি। তুলিদের আসাম যাওয়া ব্যপারটা নিয়েও জয়ির মনে সন্দেহ ছিল। হটাৎ করে যদি তুলিকে নিয়ে ওর মা আসাম চলেই যেতেন তাহলে নিশ্চয় এত জলদি ফিরে আসতেন না। তবে সেদিন বীরাটির মোড়ে তুলির সাথে দেখা না হলে জয়ির পক্ষে জানা সম্ভব হত না ওরা সত্যি আসাম গেছে না পুরোটাই বানানো গল্প।

কথার কথায় জয়ি জানতে পারে তুলি বাড়িতেই ছিল সেদিন। একটা জিনিশ জয়ির মাথায় এল না কিছুতেই কেনই বা সেদিন তাকে ভেতরে ঢুকতেই দেওয়া হল না আর আজকে কেনই বা কেও কিছু বলল না! নানান ভাবনায় জড়িয়ে জয়ি মনে মনে একটু সতর্ক হবার চেষ্টা করে। হতেই পারে আজকে জয়িকে তুলির সঙ্গে দেখা করতে দেওয়ার কোনো বিশেষ কারণ আছে। মানুষ কখন কোন চক্রান্ত যে করে বসে সেটা বলা ভার।

‘তোর সঙ্গে চন্দনের যোগাযোগ আছে জয়ি।’ তুলি জানতে চাইল।

‘হাঁ যোগাযোগ তো ছিল কিন্তু এই কদিন থেকে ওকে ফোন করলেই পরিসীমার বাইরে বলছে। কিছুই বুঝতে পারছি না। বাড়ি গেলেও তো বলেই যেত। কলেজেও আসেনি কদিন। শরীর খারাপ টারাপ হল নাকি জানি না।’

‘নারে শরীর খারাপ হলে তো ফোনে পাওয়া যেত। আমি আজকে সকালে একবার সুযোগ পেয়ে চেষ্টা করেছিলাম। পাইনি। ওর বাড়িতে কিছু হল নাকি। এমনিতেই ছেলেটা ভীষণ চাপা কিছু বলতেই চায় না। তার উপর এখন আবার এই রকম পরিস্থিতি।’

‘আমাকে তো চন্দন সবেই বলে। তেমন কিছু হলে নিশ্চয় বলেই যেত। বাড়ি গেলে তোকে না বলুক তবে আমাকে না বলে যাবে না জানি।’

জয়ির ধারল কথায় কোথায় যেন একটা রাগ হয় তুলির। তবুও যতটা সম্ভব নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে। তুলি ভাল মতোই জানে জয়িকে যে কোনো সময় দরকার হতেই পারে। এমন সময় তুলির মা মিষ্টি জল নিয়ে ভেতরে ঢোকেন। তুলিও কথা পালটে অন্য প্রসঙ্গে কথা বলতে শুরু করে। তুলির মা চলে গেলে দুজনেই আবার আগের আলোচনায় ফিরে আসে। তুলি জয়ির কথায় ধারে কাছে না গিয়ে বলে, ‘কলজের দিন গুলো বাড়িতে বসে বসে খুব মিস করিরে। মনে হয় যেন কত বছর হয়ে গেছে কলেজে যাইনি। সেই ক্যান্টিনের আড্ডা, ক্লাস ছেড়ে ছাতে গিয়ে গল্পের ভেতর ডুব মারা…’

তুলিকে কথা শেষ করতে না দিয়েই জয়ি বলে, ‘ছাতের কথা বলতেই মনে পড়ল। হাঁরে তুইকি এখনো সিগারেট খাস ? না এখন ছেড়ে দিয়েছিস। সত্যি ভাবলে অবাক হয়ে যাই তোর মতো একটা উগ্র আধুনিকা মেয়ে কেমন করে চন্দনে মজে গেল। চন্দনের সমস্যা হতেই পারে সেটা পরের কথা। তোর কোনো সমস্যা হয় না ?’

আর সহ্য হয় না তুলির তাই মুখ দিয়ে বেরিয়ে যায় ভেতরের কথা কথা গুলো, ‘না সমস্যা কেন হবে। আর চন্দনের সমস্যা হয় বলেও তো মনে হয় না। সিগারেট আমি সখে খেতাম মাঝে মধ্যে। ওটা তো নেশা করার জন্য নয়। অনেকেই শুনেছি লুকিয়ে লুকিয়ে ছাতের জল ট্যাংকের পিছনে গিয়ে টান মারে। আমি সেটা করতাম না। জানতাম চন্দনের খারাপ লাগবে তাই কবেই খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি। আসলে নিজেকে চন্দনে ডোবাতে পেরেছি বলেই নিজের গর্ব হয়। ও নিশ্চয় আমার ভেতরে তেমন কিছু দেখেছিল নতুবা আমাকে ভালবাসবে কেন বল ? একটা সময় চন্দনের পিছনে তো অনেকেই পড়েছিল। সেটা আমার থেকে তুই কোনো অংশে কম জানিস না। তাও চন্দন শুধু আমাকেই চেয়েছে। এটাই তো অনেক বড় কিছু পাওয়া।’

তুলির শেষ দিকের কথা গুলোতে জয়ির আঁতে ঘা লাগে। যদিও জয়ি নিজেই প্রথম থেকে তুলির লেজে পা দিয়ে মজা নেবার চেষ্টা করছিল। তাই ছোবলটাও খেতে হল ওকে শান্ত ভাবেই। জয়ি ঐ সব কথা না তুললে হয়তো তুলিও এই সব কথা বলত না। তুলি জয়ির চোখের লালিমা দেখেই বুঝতে পারে ওর কথা গুলো জয়ির গভীরে কোথাও আঘাত করেছে। তাছাড়া জয়ির নিজের বলতেও কিছুই নেই। বাবা থেকেও না থাকার সমান। সব মিলিয়ে মেয়েটা ভীষণ একাকীত্বে ভোগে। তুলির ভেতরে হটাৎ যেন মন কেমনের একটা হাওয়া বয়ে যায়। তাই গলার সুরটা একটু নরম করে আবার বলে, ‘জানিস তো জয়ি যেদিন রোহিতের পাঠানো ছবি গুলো বাড়িতে এল সেদিন থেকে যে আমার উপরদিয়ে কী ঝড় যাচ্ছে তোকে বোঝাতেই পারব না। না পারছি খেতে না পারছি ঘুমোতে। দিন দিন বুকের ভেতর যেন দুশ্চিন্তার পাহাড় গজিয়ে উঠছে। সত্যি বলছি এখন আর কিছুই ভাল্লাগে না। সব হারানোর একটা ভয় আমাকে পেয়ে বসছে প্রতি মুহূর্তে।’

‘ধুর এত চাপ নিস না তো। সব ঠিক হয়ে যাবে। শুধু সময়ের অপেক্ষা।’ জয়ি তুলির হাত দুটো ধরে সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করে।

‘জানি না কেন ভীষণ ভয় ভয় করে। মনে হয় সব শেষ হয়ে যাবে। চন্দনকে হারাবার কথা ভাবলেই বুকের ভেতরটা তোলপাড় করে ওঠে। আমি ওকে খুব…’ আর কান্নাটাকে চেপে রাখতে পারে না তুলি।

জয়ি তুলির মাথাটা নিজের বুকে জড়িয়ে বলে, ‘ছিঃ বাচ্চা মানুষের মতো কাঁদে না। তোদের ভালবাসা যখন পবিত্র তখন তোদেরকে কেও আলাদা করতেই পারবে না। ভোর আসার আগে অন্ধকার একটু বেশিই গাড় হয়। দেখিস সব ঠিক হয়ে যাবে।’

‘কী জানি হয়তো তোর কথাটাই ঠিক। তবুও জানি না কেন যে মনে হয় চন্দন আমার ভাগ্যে লেখাই নেই। রোহিতকে আমি কোনোদিন ক্ষমা করব না কোনোদিনও…’ আবার কান্নায় ভেঙে পড়ে তুলি।

জয়িও চন্দনকেই মনে মনে ভালবেসে এসেছে তবুও আজকে তুলিকে দেখে ওর যেন তুলির জন্য কোথাও একটা চাপা কষ্ট হয়। হয়তো তাই একটু আগেই যে মেয়ে দুটো ঠাণ্ডা লড়াইয়ে মেতেছিল তারাই আবার একে অপরকে জড়িয়ে জীবনের ঠিকানা খোঁজে। এই নারীর মন বোঝা সত্যি বড় সোজা কথা নয়। এরা যে বিনাশের কথা ভাবতে ভাবতেই কেমন করে সৃষ্টির পথে হাঁটে হয়তো এরা নিজেরাও জানে না। জয়িকে দেখলেই সেটা পরিষ্কার বোঝা যায়।

জয়ি তুলির আসাম যাওয়ার কথাটার ব্যপারে কিছু আর জানতে চাইল না। তুলির ঘর থেকে বেরনোর আগে ওর গাল দুটোতে আলতো ভাবে টান মেরে বলে, ‘আমি তোকে হিংসেও করতে পারি না তোর মুখটা এতটাই মিষ্টি। তবে কোনোদিন সুযোগ পেলে আমি গোপনে গোপনে তোকে খুব হিংসে করব।’ জয়ির কথায় তুলির মুখে এক টুকরো হাসির ঝিলিক দেখা যায়। বিকেল বেলার মিষ্টি আলোতে তুলির দাঁত গুলো মুক্তর মতো চকচক করতে থাকে।

     জয়ি চলেগেলে তুলির মা তুলির ঘরে এসে বলেন, ‘দেখ তুলি ছেলেটা কে, কী, কেমন ওসব শুনে যখন কোনোলাভ নেই তাই শুনতেও চাই না। তোর বাবা তোর জন্য ভালছেলের সন্ধান করছেন। তেমন ছেলে পেলেই তোর বিয়ে দিয়ে দেবো। তাই যত তাড়াতাড়ি ছেলেটার কথা ভুলবি তোরেই মঙ্গল। কদিন আগেও কে না কারা তোর খোঁজে এসেছিল আমি ভৈরবকে আগাম বলেই রেখেছিলাম তোর খোঁজে কেও এলে যেন বলে দেয় বাড়িতে নেই আসাম বেড়াতে গেছে। দুদিন ধরে দেখছি তোর শরীর মন কোনোটাই ভালনেই তাই মেয়েটাকে বাড়িতে ঢুকতে দিয়েছি। তোর বাবা শুনলে এতেও বকাবকি করবে আমাকে। আমার বিশ্বাস তুই এমন কিছু করবি না যাতে আমাদের মুখ দেখতে লজ্জা হয়। গেল বছর তোর দাদার সঙ্গে যা হয়েছিল সেটা এত জলদি ভুলে গেলিই বা কেমন করে ? এই বয়সে ও রকম প্রেম ট্রেম হয় আবার সময়ের সাথে সব ভুলেও যায় মানুষ। তোরেই দেখছি একটু বেশি রকম বাড়াবাড়ি। যেটা সম্ভব নয় সেটা নিয়ে ভেবে কী হবে। আমি নিচে গিয়ে হরলিক্স পাঠিয়ে দিচ্ছি অনিমার হাত দিয়ে। আর হ্যাঁ আজকে যেন একটুও পড়ে না থাকে।’

মা চলে যাবার পরেই তুলি দরজাটা বন্ধ করে চুপচাপ শুয়ে পড়ে। বলতে পারে না, জীবনে এমনো কষ্ট থাকে যেটা ভুলে গেলেই আরও বেশি কষ্ট হবে। মায়ের কথা গুলো শোনার পরেই যেন মাথার পিছন দিকটা আবার হালকা হালকা ব্যথা করতে শুরু করে। এখনো অন্ধকার নামতে বেশ দেরি আছে তবুও তুলির মনে হয় সব যেন অন্ধকারে ঢাকা পড়েছে। যেন আর কোনোদিনও আলো ফুটে উঠবে না।

এদিকে দেখতে দেখতে এক একটা করে দিন পেরিয়ে যাচ্ছে। চন্দনের হাতে এখন যা টাকা আছে সেটা দিয়ে বেশিদিন চলার কথা নয়। ওদিকে পরীক্ষা এগিয়ে আসছে। কিন্তু মায়ের শরীরটা এমন ভাবেই  দুর্বল হয়ে পড়ছে যে এই অবস্থায় মাকে একা ফেলে কিছুতেই কলকাতায় যাওয়া সম্ভব নয় চন্দনের পক্ষে। কদিন ধরে ওর মা আবার ভুল বকতে শুরু করেছে। কখনো দেখে চন্দনের বাবা মাথার কাছে এসে বসে আছে। আবার কখনো দেখে শ্যামা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ডাকছে। কদিন ধরেই চন্দন মাকে গোবিন্দনগর হাসপাতাল নিয়ে যাব নিয়ে যাব করেও পসার জোগাড় করতে পারেনি। তেমন ফসল হয় না বলেই চন্দনের জমিটাও কেও বন্ধক নিতে চাইছে না। এদিকে মোবাইলটায় পর্যন্ত নেটওয়ার্ক নেই। শহরের চেয়ে বেশ কিছুটা দূরের এই সব জঙ্গল ঘেরা গ্রাম গুলোতে সব কোম্পানির নেটওয়ার্ক এসে পৌঁছোতে পারে না। এই অসময়ে চন্দনের পক্ষে সিম চেঞ্জ করাও সম্ভব নয়। একবার চন্দনের মনে হয়েছিল গ্রামের কারু ফোন থেকে জয়িকে একটা কল করে কিছু সাহায্য চাইলে কেমন হয় ? পরে নিজেরেই মনে হয়েছে ভালহয় না। চন্দন টাকা চাইলে না বলা তো দূরের কথা বরং যত চাইত তার চেয়ে অনেক বেশিই দিত জয়ি। কিন্তু চন্দনের মন শেষপর্যন্ত সায় দেয়নি তাতে।

আজকে দুপুর থেকেই ওর মায়ের বুকে অসহ্য যন্ত্রণা শুরু হয়। অনেক ডাকাডাকি করেও দুপুরের পর মায়ের মুখে কোনো শব্দ বার করতে পারেনি চন্দন। সকাল থেকে এক দানা খাবারও নামেনি গলা দিয়ে। টাকার অভাবে যখন বাঁকুড়া নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয় তখন শেষ পর্যন্ত চল্লিশ টাকায় চুক্তি করে এক কবিরাজকেই নিয়ে আসে বিকেলের দিকে। হাতের নাড়ি চোখের পাতা পরীক্ষা করে কবিরাজ মশাই কয়েকটা ভেষজ ওষুধ চন্দনের হাতে দিয়ে বলে যান কালকে সকাল পর্যন্ত যদি বুকের ব্যথা না কমে তাহলে তাঁকে যেন আরেকবার খবর দেওয়া হয়। সকালে তিনি এসে দেখে যাবেন এবং অন্য ওষুধ দিয়ে যাবেন। তার জন্য তাঁকে কুড়ি টাকা দিলেই হবে। এই ২০১৪ সালে দাঁড়িয়ে মাকে কবিরাজ দেখানো ছাড়া দ্বিতীয় কোনো রাস্তা নেই ভেবেই চন্দনের চোখে বাস্প জমতে থাকে। বিকেলের দিকে পয়সার জন্য বেরিয়েছিল চন্দন কিন্তু তাতে তেমন কিছুই লাভ হয়নি।

হালকা হিমের ছোঁয়া পড়েছে বলেই চন্দন রাত্রিতে বাইরের উঠোনে না শুয়ে মায়ের পাশেই মাদুর বিছিয়ে শুয়ে পড়েছিল আজকে। এক টুকরো জ্যোৎস্না এসে পড়ছিল মায়ের মুখের উপর। ডাহুক ডাহুকী গুলোর তখনো ঘুম আসেনি। ওরা ডাকছিল নিজের খেয়ালেই। মাঝে মাঝে শেয়ালের সুরে সুর মিলিয়ে ডেকে উঠছিল গ্রামের কুকুর গুলোও। মায়ের কাশির শব্দে ঘুম আসছিল না চন্দনেরও। তবে ভোরের দিকে তন্দ্রা এসে থাকলেও থাকতে পারে। হটাৎ মায়ের হাতের ছোঁয়া পেয়ে উঠে বসে চন্দন। জানালা দিয়ে ভেসে আসা জ্যোৎস্নার আলোতে দেখতে পায় মায়ের অপলক ঘোলাটে ডাগর চোখ দুটো। মায়ের কপালে হাত রেখে অনুভব করার চেষ্টা করে আবার জ্বর এসেছে কিনা। না, কপালটা যথেষ্ট ঠাণ্ডা। এবার একটু নিশ্চিন্ত বোধ করে চন্দন। চুপিসারে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে আসে। বুকের ভেতরে কে যেন গুম গুম করে মাদল পিটিয়ে যাচ্ছে। ওদিকে তুলি যে কী করছে কেমন আছে ঈশ্বর জানেন। এভাবে এখানে কতদিন কাটাতে হবে তাও জানা নেই চন্দনের। মায়ের মুখের দিকে তাকালে আর কোথাও যেতে ইচ্ছে করে না। মায়ের মুখেই তো চন্দনের শৈশব কৈশোর আঁকা আছে। দূরের কোনো গ্রামে বাউল গান হচ্ছে হয়তো তারেই একটা মৃদু সুর ভেসে আসছে। সুরটা শোনা গেলেও গানটা কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। যেদিক থেকে সুরটা ভেসে আসছে সেদিকটা আন্দাজ করে কান দুটোকে পেতে গানটা শোনার চেষ্টা করে। তবুও কিছুই শোনা যায় না। ঠাণ্ডা পড়ার এই সময়টা থেকেই কাঠের আগুনকে ঘিরে সারা রাত্রি জুড়ে বাউল গান চলতে থাকে এদিককার গ্রাম গুলোতে। এই লোকসঙ্গীত শিল্পটা হাঁপাতে হাঁপাতে এখনো কোনোরকমে বেঁচে আছে। তবে বেশি দিন বাঁচবে বলে মনে হয় না। অত্যাধুনিক বাদ্যযন্ত্রের চাপে বাউলের একতারা একদিন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করবে। যদি না করে তাহলে এই শিল্পটাকে একদিন খুন হতে হবে।

উঠোনের এদিক সেদিক করেও যখন চন্দন কোনো ভাবেই বুঝতে পারল না গানের লাইন গুলো তখন খানিকটা মনমরা হয়েই ঘরে এসে আবার শুয়ে পড়ে। ওর মা তখনো টালির চালের দিকে তাকিয়েই আছে। চন্দন ওর মাকে দু’একবার জিজ্ঞেস করে জল খাবে কিনা ? ওর মা কোনো উত্তর দেয় না। অপলক ভাবে শুধু তাকিয়েই থাকে।

মায়ের পাশে শুয়েই সেই ছোটবেলার মতো হটাৎ আজকে আবার চন্দনের ঘুম এসে যায়। কত বছয় হয়ে গেছে এমন ভাবে ঘুময়নি চন্দন। মায়ের শরীর থেকে ভেসে আসা সেই শৈশবের গন্ধটা আজকে আবার একবার পায় চন্দন। তারপর সকালে যখন ঘুম ভাঙে তখন ওর বিস্ময়ের সীমা থাকে না আর। মা তেমন ভাবেই ঘোলাটে চোখে তাকিয়ে আছে টালির চালের দিকে। দু’একটা মাছি ভন ভন করছে চোখের সামনে। বেশ খানিকটা জোর গলাতেই চন্দন ডাকে ‘মা, ও-মা, মা’ কিন্তু…

চন্দন ঘরের থেকে ছুটে বেরিয়ে যায়। অরুণ কাকুর বাড়ি গিয়ে উনাকে ডেকে নিয়ে আসে। চন্দনের উৎকণ্ঠা দেখে তনিমা তমিমার মা দুজনেই আসে পিছু পিছু। চন্দন মাকে ধাক্কাদিয়ে আরও জোরে চিৎকার করে করে ডাকে এবারেও প্রকৃতির নিষ্ঠুর নিয়মে মায়ের আর সাড়া পায় না চন্দন। একবার অরুণ কাকুর মুখের দিকে একবার কাকিমার মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ব্যপারটা জানার চেষ্টা করে চন্দন। তখন আর জানার মতো কিছুই নেই। পুরোটাই তখন অজানা জগতের হাতে চলে গেছে।

অরুণ বাবু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ‘নিজেকে সামলা চনা। তোকেই সব কাজ কইরত্যে হবেক। জন্ম মিত্তু কী কারুর হাতের জিনিশ র‍্যে উসব দেবতাদের খেল। উঠে পড় চনা উঠে পড়। যা বাউরী পাড়ায় যাইয়্যা দেক কাট কাটার মতো কাউকে পাইস কিনা।’

চন্দনের তখনো ঘোর কাটছে না কিছুতেই। আরও কয়েকবার মায়ের হাতটা ধরে নাড়া দেয় কিন্তু মায়ের কোনো সাড়া শব্দ পায় না।

নাকে তুলো গুঁজে ধূপের গন্ধ ছড়িয়ে মা যখন চলে যাচ্ছে নদীর দিকে তখনো চন্দনের চোখে এক ফোটা জল নেই। কিছু বুঝে ওঠার আগেই যেন সব কেমন তালগোল পাকিয়ে গেছে। তখনো যে চন্দনের বিশ্বাস হচ্চে না ওর মা আর নদীর থেকে মাটির কলশি কাঁখে কোনো দিনেই ফিরে আসবে না। ‘মা’ নামের জাগর প্রদীপটা যেন কেও ফু দিয়ে নিভিয়ে দিল এক নিমেষেই।

একটা সময় শেষ ধোঁয়ার কুণ্ডলীটাও সুদূর আকাশে মিলিয়ে যায়। নদীর থেকে স্নান সেরে ফেরার সময় খোল কীর্তনের করুণ সুরে শেষ পর্যন্ত চন্দনের নিথর চোখে কয়েক ফোটা জল এসে গেলেও মনটা তখনো বুঝতেই পারছে না ‘মা’ নামক জীবনের একটা এত বড় অধ্যায় কী ভাবে অনুগল্পের মতো শেষ হয়ে গেল। কখন কীভাবে ওর মা চলে গেল ওকে একলা ফেলে সেটা হয়তো চন্দনের অজানাই থেকে যাবে চিরদিন।

একটি প্রেমের গল্প বা প্রেমের কবিতা কিংবা প্রেমের উপন্যাস আপনার মনে যতটা আনন্দ দিতে পারে bangla choti… গল্প আপনার মনকে ততটাই বিপথে নিয়ে যেতে পারে।

                     ।।৯।।

মায়ের মৃত্যুর পর দুটো দিন পার হতে না হতেই চন্দন দেখল জীবনের আরেকটা রঙ। যেদিন চন্দনের মা মারা গেল সেদিন সন্ধ্যায় যারা চন্দনের অবিভাবকের ভার নিতে ছুটে এসেছিল তারা যখন জানতে পারল, চন্দনের কোনো রোজগার নেই এটাই চূড়ান্ত সত্য তখন তারাও ছায়ার মতোই হারিয়ে গেল একে একে। জীবনে অনেক ডোরাকাটা দিন দেখেছে চন্দন তবুও বর্তমানের সাথে যেন সেই দিন গুলোর কোনো তুলনাই চলে না। কদিন আগেই যে অরুণ কাকু চন্দনকে বাড়ি এসে নেমন্তন্ন করে গিয়েছিলেন সেই অরুণ কাকুই চন্দনের মা মারা যাবার পর এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়লেন যে চন্দনের বাড়ি আসা তো দূরের কথা চন্দন বাড়িতে গেলেও দুটো কথা বলার সময় পেলেন না। বাধ্য হয়েই চন্দনকে মাত্র কুড়ি হাজার টাকায় অবশিষ্ট তিন বিঘে জমি বিক্রি করতে হল। কিন্তু কুড়ি হাজার টাকায় কেমন ভাবে মায়ের শ্রাদ্ধ শান্তি হবে মাথায় ঢুকল না চন্দনের।

দেখতে দেখতে আরও দুটো দিন কেটে গেল হেলতে দুলতে। দশ দিনের দিনে ঘাটের কাজ। এগার দিনে শ্রাদ্ধ। মায়ের শেষ কৃত্যের দিনটা যতই এগিয়ে আসছে ততই চন্দনের নিজেকে পাগল পাগল বলে মনে হচ্ছে। সামান্য চিঁড়ে আর অল্প গুড় নিয়ে আজকে সবে খেতে বসেছে। মুখে দিতেই যাবে এমন সময় শুনল দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে অরুণ কাকু ডাকছেন, ‘চনা, এই চনা বলি ঘরে আছিস ?’ অসময়ে অরুণ কাকুর গলা শুনে চন্দনের বেশ আশ্চর্য ঠেকল। তাই হ্যাঁ না কিছু বলার আগে হটাৎ অরুণ কাকুর শুভাগমনের কারণটা হাতড়ে দেখার চেষ্টা করল মনে মনে একবার। অরুণ বাবু কোনো উত্তর না পেয়ে আবার ডাক দিলেন, ‘কী রে ঘুমাই পড়্যাছিস নাকি?’ এবার চন্দন উত্তর দেয়, ‘না কাকু খ্যাইতে বইস্যাছি।’ অরুণ বাবু কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলেন, ‘আচ্ছা আগে খ্যাইয়া লে।’ চন্দন খেতে খেতেই শুনতে পায় বাইরে যেন অরুণ কাকুর সাথে কারা ফিসফিস করে কথা বলছে। কোনো রকমে চিঁড়ে গুলো শেষ করে বাইরে বেরিয়ে এসেই ভূত দেখার মতো চমকে যায় চন্দন। অরুণ বাবুর ঠিক পাশেই জয়ি দাঁড়িয়ে আছে। চন্দনের মুখ দিয়ে একটাও কথা বার হল না আর। অরুণ বাবুই বললেন, ‘তোর কলেজের বন্ধু। আমকে কাইল রাইত্যে ফোন কইর‍্যাছিল আমিই সব বইল্যাছি ইখানকার ঠিকানা দিয়্যাছি। হ্যাঁ দেখ আইজকেই চইল্যা আইস্যাছে।’

জয়ি চন্দনের দিকে ছলছল চোখে তাকিয়ে দেখছিল শুধু। গাল ভর্তি দাড়িতে ঢাকা মুখ। খালি গায়ের উপর গামছা জড়ানো। হাঁটু পর্যন্ত ধুতি। এই লোকটার সাথে পরিচিত চন্দনের কোনো মিলেই খুঁজে পেল না জয়ি। এই কটা দিনেই চন্দন যেন বুড়ো হয়ে গেছে। চন্দনের বিস্ময় তখনো কাটেনি। জয়ি যে কোনোদিন ওর বাড়ি আসবে এটা মনে হয় কল্পনাতেও ভাবেনি চন্দন। সে যাই হোক চন্দন আর জয়ির ভাব মূর্তি দেখে অরুণ বাবু হন হন করে বাইরে চলে গেলেন। চন্দনের বুঝতে বাকি রইল না নাটকের পরবর্তী অধ্যায়টা। অরুণ বাবু বাইরে চলে গেলে অভিমানের সুরে জয়ি বলল, ‘এই তো বন্ধু। একটা খবর দেবার প্রয়োজন পর্যন্ত মনে করলি না।’

‘ভুল বুঝিস না। আসলে আমাদের গ্রামে নেটওয়ার্কের খুব সমস্যা তো তাই…’

‘থাক না চন্দন ওই সব আর নাই বা শোনালি। ইচ্ছে থাকতে হয়। বন্ধু বন্ধু বললেই তো আর বন্ধু হওয়া যায় না। যাক এসব নিয়ে কথা বলার এটা সময় নয়। আগে সব ভালই ভালই পেরিয়ে যাক পরে এই সব নিয়ে আলোচনা হবে।’

‘কিন্তু তুই অরুণ কাকুর নম্বর পেলি কোথায় ?’

‘ঐ যে বললাম ইচ্ছে থাকতে হয়। ওটাই আসল।’

‘আচ্ছা বাবা আমার জানানোর ইচ্ছেছিল না এটাই তো ? তুই জিতেছিস আমি হেরেছি। এবার ভেতরে আয়।’

‘এখানে আবার হারা জেতা এল কোত্থেকে ? তাছাড়া যে খেলাতে আমার নামেই নেই সেই খেলা আমি জিতব কেমন করে। যাই হোক হার জিতের গল্প পরে হবে এখন একটু রেস্ট করি।’

‘তুই কি রুপসীবাংলা এক্সপ্রেসে নামলি।?’

জয়ি কোনো উত্তর না দিয়ে শুধু ঘাড় নেড়ে সম্মতি জনায়।

‘তুই এমন ভাবে এখানে চলে এসেছিস তোর বাড়িতে…’ চন্দনকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই জয়ি বলে, ‘প্লিজ চন্দন বাড়ি বাড়ি করিস না তো। জানি এটা গ্রাম শহর নয়। হটাৎ করে একটা মেয়ের এখানে চলে আসাটাকে গ্রামের মানুষ ভাল চোখে দেখবে না। কিন্তু তাই বলে এমন একটা খবর পাবার পরেও নিশ্চয় চুপ করে ঘরে বসে থাকা যায় না। আর তুই যেটাকে বাড়ি বলিস আমি সেটাকে বাড়ি মানতেই পারি না। শুধু মাত্র চারটা দেওয়াল আর একটা ছাত দিয়ে বাড়ি হয় না। তোর এমন একটা বিপদ আর আমি কেবল মাত্র বাড়ির জন্য…। ছাড় ওসব তোর বোঝার কথা নয়।’

জয়ির উত্তেজনা দেখেই চুপ করে গিয়েছিল চন্দন। কিন্তু একটা কথা কিছুতেই মাথায় ঢুকছিল না, জয়ি কী শুধু মাত্র বন্ধুত্বের জন্য এমন ভাবে পাশে এসে দাঁড়াল আজকে নাকি…! একটা মেয়ে একলা একলাই কলকাতার থেকে এত দূরে ছুটে এল নিজের পরিবার কথা ভাবল না। এখানে আসার পর কী হবে সে কথাও ভাবল না। এখান থেকে যাবার পর কী হবে এটাও কী একবারও ভাবেনি! চন্দনের ভেতরে ঠিক কেমন কেমন যেন একটা হতে শুরু করে। বিশেষ করে রাতের সময় কে কোথায় শোবে ? আর তুলি যখন শুনবে এই সব ঘটনা গুলো! এই দুটো ভাবনাই যেন বেশি করে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াতে লাগল চন্দন কে।

তুলি শুনলে খারাপ ভাববে। গ্রামের মানুষ পাঁচ রকম পাঁচটা কথা বলবে এগুলো যেমন সত্যি ঠিক একই রকম ভাবে এটাও সত্যি যে, জয়ির এখানে আসায় চন্দনের বেশ খানিকটা ভরসা বেড়েছে। তাছাড়া যখন চন্দনের মা রইল না তখন আর কীসের জন্য গ্রামে থাকবে ও ? এখানে থাকলেই বরং হাজার হজার স্মৃতির অত্যাচারে পাগল হয়ে যাবে। মায়ের শ্রাদ্ধ শান্তি নিয়ে যে দুশ্চিন্তার মেঘটা মনটাকে ভারী করে রেখেছিল সেই মেঘটা জয়ির এসে পড়ায় অনেকটাই কেটে গেছে।

বিকেলের দিকে চন্দন ভাবছিল একটু বাজার থেকে ঘুরে আসবে। জয়ির জন্য কিছু না কিছু তো খাবারের ব্যবস্থা করতেই হবে। ঘরের দাওয়ায় বসে কী আনবে না আনবে তারেই একটা লিস্ট তৈরি করছিল চন্দন এমন সময় কানে একটা গানের কলি ভেসে এল,

“আমি তোর মনের ভেতর ডুইব্যা ডুইব্যা মুক্তা খুঁজে আনি।

তোর চোখের কোনে জোয়ার ভাটা সে তো আমার চোখের পানি”

গানটা চন্দনের চেনা গান। সুরটাও পরিচিত। আনন্দ বাউল এই গানটা গাইতে গাইতেই পথ পেরিয়ে যেত। কোথাও বাউল গানের পালা থাকলে আনন্দ বাউলকে দর্শকের কথা রাখতে এই গানটা একবার গাইতেই হত। গত তিন বছর হল আনন্দ বাউল মরেছে। এখন ওর বৌ বিন্দি আনন্দ বাউলের বাঁধানো গান গুলো গেয়ে গেয়েই ভিক্ষা মেগে বেড়ায়। পাড়ার ছেলেরা বিন্দির নাম দিয়েছিল ৯৮.৩ এফ এম। এমন নাম দেওয়ার একটাই কারণ, বিন্দি এক টুকরো করে গান গায় আর এই গ্রামের ঐ গ্রামের হট হট খবর গুলো শুনিয়ে যায়। বিন্দি গানটা গাইতে গাইতেই ভেতরে ঢুকল। বিন্দিকে দেখেই চন্দনের মুখটা আমশির মতো শুকিয়ে যায়। গানের একটা লাইনও এখন তার কানে ঢুকছে না। চন্দন ভাল মতোই জানে বিন্দি এসেছে খবর নিতে। নতুবা আজকে চন্দনের বাড়িতে আসার আর কোনো কারণ থাকতেই পারে না। বাড়িতে লোক মারা গেলে সেই বাড়িতে শ্রাদ্ধ শান্তি না মেটা পর্যন্ত কেও ভিক্ষা করতে আসে না।

গানটা শেষ হবার পর বিন্দি একতারাটা মাথায় ঠেকিয়ে বলে, ‘আমি সবেই শুইন্যাছিরে বাছা। আমাকে দেইখ্যা তোর অত ভয় পাবার কিছুই নাই। আমি ঠিকেই জানি তুই এখন কী ভাইবত্যাছিস। আমি আসার পথেই খিড়কি দিয়্যা দেইখ্যাছি কইলকাতার থেকে আসা মাইয়্যাটা ঘর ভেতরে শুইয়া আছে। আমার তো কুনো ছ্যাওাল নাই। আগুন দিবারও কেও নাই। তুই যে বাছা মায়ের জন্য সব বেইচ্যা দিয়া ছেরাদ্দের খরচ জোগাড় কইর‍্যাছিস সেইটা শুনেই তোকে দেখত্যা আ্যইলম। এই পঞ্চাইশ টাকাট রাখ। যদি কুনু কামে লাগে।’ কথাটা বলেই বিন্দি শাড়ির খুটের থেকে একটা পঞ্চাশ টাকার নোট বের করে উঠনের উপর নামিয়ে দিয়েই আবার গান গাইতে গাইতে বেরিয়ে যায়।

চন্দন ছল ছল চোখে শুধু তাকিয়ে থাকে বিন্দির যাবার পথের দিকে। জীবনের অঙ্ক গুলো কেমন যেন জটলা পাকিয়ে যাচ্ছে। এক একটা মানুষ যেন এক একটা সংখ্যা। আর এক একটা অঙ্কে তাদের এক এক রকম মান। যে বিন্দি সারা জীবন মানুষের কুৎসা গুলোকে কুড়িয়ে কুড়িয়ে ছড়িয়ে বেড়িয়েছে সেই বিন্দিই আজকে এমন একটা কাজ করে গেল যেটা হয়তো নিজের চোখে দেখেও কেও কেও বিশ্বাস করবে না।

চন্দন খেয়াল করেনি কখন জয়ি তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। এখনো ওর যেন ঘোর কাটেনি। উঠোনে পঞ্চাশ টাকার নোটটা তেমন ভাবেই পড়ে আছে। অনেক দূরে যেখানে লাল মাটির রাস্তাটা দিগন্তে মিশেছে সেখানে এখনো দেখা যাচ্ছে একটা ছায়া মূর্তি একতারা উঁচিয়ে হেঁটে যাচ্ছে বাড়ির পথে।

‘মহিলাটি কেরে চন্দন ? উনার গানের গলায় মনটা কেমন উদাস হয়ে গেল। গানের মানেটাও কত গভীর।’ জয়ির কথায় চন্দনের ধ্যান ভাঙলে তাকিয়ে দেখে জয়ি শাড়ি পরেছে। তবে শাড়ি পরার ধরণ দেখেই চন্দন বুঝতে পারে জয়ি শাড়ি পরায় পরিনত নয়। উঠোনে পড়ে থাকা পঞ্চাশ টাকার নোটটা কুড়োতে কুড়োতে চন্দন বলে, ‘পাশের গ্রামের বিন্দি। উনার স্বামী বাউল ছিল। স্বামী মরার পর এখন নিজেই গান গেয়ে ঘুরে বেড়ায়। মায়ের শ্রাদ্ধের জন্য পঞ্চাশ টাকা সাহায্য দিয়ে গেল।’

‘উনার বয়স তো প্রায় পঞ্চাশের কাছাকাছি হবে বলেই মনে হল তাহলে তুই যে নাম ধরে বিন্দি বলছিস।’

জয়ির মুখের দিকে তাকিয়ে চন্দন বলে, ‘ছেলে বুড়ো সবাই তাই বলে। সেটা শুনে শুনে আমারও অভ্যাস হয়ে গেছে। আর তুই হটাৎ শাড়ি পরলি চুড়িদার আনিসনি ?’

‘কেন শাড়িতে ভাললাগছে না ?’

‘না না সেটা কেন। আসলে তুই যা পরিস তাতেই তোকে মানিয়ে যায়। কিন্তু…’

‘কী কিন্তু ?’

‘আমার বাড়িতে তো বড় আয়না নেই নতুবা নিজেই বুঝতে পারতিস।’

চন্দনের কথা শুনে নিজের বুক পেটের দিকে একবার চোখ বোলায় জয়ি। তারপর ছুটে ঘরের ভেতরে ঢুকে যায়। ব্লাউজের বোতাম খোলা। শাড়ির ফাঁক দিয়ে পুরো নাভি মণ্ডল দেখা যাচ্ছে। চন্দন মুচকি হেসে আবার বাজার থেকে কী কী আনতে হবে সেই ফর্দ নিয়ে বসে পড়ে। সব ঠিক ঠাক লেখা হয়ে গেলে চন্দন জয়িকে বাইরে ডাকে ওর জন্য বাজার থেকে কিছু আনতে হবে কিনা জানার জন্য। জয়ি আর লজ্জায় বাইরে আসে না। ভেতর থেকেই বলে ওর জন্য কিছুই আনতে হবে না। জয়ির একলা থাকতে ভয় করবে হয়তো এটা ভেবেই চন্দন বলে, ‘আমি বাজার যাবার পথে তনিমাকে আমাদের বাড়ি পাঠিয়ে দেবো।’

‘সেটা আবার কে ? না না আমি একাই থাকতে পারব কাউকে পাঠাতে হবে না।’

‘আচ্ছা আমি বেরোলাম’

চন্দন যাবার কিছুক্ষণ পরেই তনিমা এসেছিল। অপরিচিত জায়গায় জয়ির ভয় ভয় করতেই পারে এটা ভেবে চন্দন তনিমাকে পাঠিয়েই দিয়েছিল। তাছাড়া আজকে বাজার থেকে ফিরতে দেরি হবে জানত চন্দন। তনিমার সাথে কথা বলতে বেশ ভালই লাগে জয়ির। ও কখনই তেমন ভাবে কোনো গ্রামের মেয়ের সাথে কথা বলেনি এর আগে। তনিমার মুখেই জয়ি চন্দনের ছোট বেলার অনেক গল্প শোনে। সোনাঝুরি গ্রামের মানুষদের গল্প শোনে। গ্রামটার দারিদ্রতার গল্প শুনতে শুনতে মাঝে মাঝেই জয়ির ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠে। জয়ির এক পিসির বিয়ে হয়েছে গ্রামেই তাই সেই সুবাধে জয়ি ছোট বেলায় দু’একবার গ্রামে গেছে ঠিকেই কিন্তু কারু সাথেই তেমন মেলামেশার সুযোগ হয়নি। ছাতনা ষ্টেশন থেকে আসার পথেই গ্রামকে এত নিবিড় ভাবে প্রথম দেখেছে জয়ি। শরৎচন্দ্র মানিক বন্ধোপাধ্যায়ের উপন্যাসে পড়া সেই সব গ্রামের ছবি গুলো আজকে চন্দনের বাড়ি আসার পথে বারবার ধরা দিচ্ছিল জয়ির চোখে। তনিমার মুখে এই সোনাঝুরি গ্রামের গল্প শুনতে শুনতে সেই ছবি গুলোই আরও পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছিল শুধু।

চন্দন বাড়ি ফেরার পর জয়ি জানায় রাত্রিতে তনিমার বাড়িতে থাকবে বলে। তনিমার মা নাকি জয়িকে রাত্রিতে ওদের বাড়িতেই থাকা খওয়ার জন্য বলেছে। কথাটা শুনে চন্দন নিজেও যেন বেশ কিছুটা স্বস্তি অনুভব করে। অবিবাহিত যুবক যুবতীর এক সঙ্গে রাত কাটানো কেওই ভাল নজরে দেখত না। অযথা একটা বদনাম রটে যেত। জয়ি ঠিক কেমন ভাবে এখানে এল, অরুণ কাকুর ফোন নম্বর কোথায় পেল এখনো জানে না চন্দন।

জয়িকে প্রশ্ন করতেই জয়ি বলল, ‘আসলে অনেক দিন থেকেই তোকে ফোনে পাচ্ছিলাম না এদিকে পরীক্ষা এগিয়ে আসছে অথচ তুই কলেজেও আসছিস না। তাই শেষ পর্যন্ত তোর ভাড়া বাড়িতেই গেলাম। ওই ঠিকানাটা তো আমার জানাই ছিল। ওখানে গিয়ে জানতে পারলাম তোর মায়ের শরীর খারাপ তুই বাড়ি চলে গেছিস। ওই বাড়ির কাকিমার কাছেই তনিমার বাবার ফোন নম্বরটা পেলাম। বাকিটা উনিই বললেন।’

খানিকটা বিস্ময়ের সাথেই চন্দন আবার জানতে চাইল, ‘বাড়িতে বলে এসেছিস ?’

‘অবশ্যই বলে এসেছি। তবে এটা বলিনি কোথায় কার কাছে যাচ্ছি। শুধু এটুকুই বলেছি, বান্ধবীর বিয়ে। ফিরতে কদিন দেরি হবে। তুই তো আমার বাড়ির ব্যাপারে জানিস ওরা কেওই চিন্তা করবে না। তবে হ্যাঁ হটাৎ করে এখানে চলে এসে তোকে সমস্যায় ফেলে দিলাম।’

চন্দন একটা ব্যাঙ্গের হাসি হেসে বলে, ‘আমার আবার সমস্যা। আমার আগে পিছে কেওই নেই এখানে আর। কিছু সম্পর্কের খোলস পড়ে আছে শুধু।’

‘এই শোন না তোকে তো বলাই হয়নি। আমি কদিন আগে তুলির বাড়ি গিয়েছিলাম।’

‘তারপর কেমন কী দেখলি। তোকে বাড়িতে ঢুকতে দিয়েছিল ?’

‘আরে সেটাই তো আশ্চর্য লাগছে। জানিস তুলিটা না দিন দিন কেমন ভেঙে পড়ছে। মেয়েটা খুব সমস্যাতে আছেরে।’

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চন্দন চাঁদটার দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ তারপর বলে, ‘জানিস জয়ি সেই কোন ছোট বেলায় বাবা আর শ্যামাদি চলে গেল। তারপর থেকে মাকেই পৃথিবী বলে জেনেছি। দেখ আমার ভাগ্যটা কেমন অসময়ে মা ও ফাঁকি দিয়ে গেল। মাকে বাঁকুড়া নিয়ে গিয়ে ডাক্তার দেখানোর মতো টাকাও জুটল না আমার। এক রকম ভাবে বিনা চিকিৎসাতেই মা চলে গেল। বুঝতেই পারিনি মা এমন ভাবে চলে যাবে বলে। আসলে আমি এখনো বিশ্বাস করতেই পারছি না যে মা আর ফিরবে না কোনোদিন। হয়তো তাই কাঁদতেও পারছি না। কান্না আসছেই না আমার। জানিস সেদিন আমি মায়ের পাশেই শুয়ে ছিলাম। কখন যে কী করে কী হয়ে গেল বুঝতেই পারলাম না। মা কেন এমন করল বলত! আআ-মি আমি কী কোনো…’ কান্নায় চন্দনের কথা গুলো জড়িয়ে যায়। জয়ি কিচ্ছু বলে না। চন্দনের কেঁদে হালকা হওয়া দরকার নতুবা ছেলেটা আর ঘুরে দাঁড়াতেই পারবে না।

মিনিট কয়েক পরে চন্দন নিজেকে সামলে নিয়ে আবার বলে, ‘এখন তুলিকে নিয়েও স্বপ্ন দেখতে ভয় হয়। আসলে মানুষ তখন কষ্ট পায় যখন তার কোনো স্বপ্ন ভাঙে। জানি একদিন তুলিও হারিয়ে যাবে। কিছু প্রেম পরের বিছানায় গিয়েই শেষ হয় জানিস। আমাদের প্রেমটাও তেমনেই বলতে পারিস। তুলিও অন্য কারুর আমানত আমি শুধু আগলে আগলে রাখছিলাম।’

‘বেশি ফালতু বকিস না তো। তুলি তোরছিল আছে তোরেই থাকবে। তুলি আর পাঁচটা মেয়ের মতো নয়। ও কখনই অন্য ছেলেকে বিয়ে করবে না। ওর বাড়ির লোক হাজার চেষ্টা করলেও না।’

‘আসলে কোনো মেয়েই আর পাঁচটা মেয়ের মতো নয় বলেই তো যত সমস্যা। ছাড় পরের কথা পরে ভাবা যাবে। তবে আমি আর স্বপ্ন দেখতে চাই না। নিজের কাজ গুলো শুধু ঠিক ঠিক করে যেতে চাই। তারপরে যেটা হবে সেটা মেনে নেওয়া ছাড়া তো আর কোনো উপায় নেই।’

জয়ি কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল কিন্তু চন্দন বাধা দিয়ে বলল, ‘একটা গান শোনাবি জয়ি ?’

চন্দন হটাৎ করে এমন ভাবেই জয়িকে গান শোনানোর আপদার করে বসল যে জয়ি না করতেই পারল না, ‘কী গান শোনাব বল ?’

‘তোর পছন্দ মতো যা খুশি কিছু একটা শোনা’

জয়ি কিছুক্ষণ চিন্তা করে শেষ পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথের ‘যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে’ গানটাই গাইল। গানটা তুলি কলেজের রবীন্দ্রজয়ন্তী পালনের দিনে গেয়েছিল। চন্দনের চোখ দুটো আবার জলে ভরে আসে। অন্ধকারে সেটা আর জয়ির চোখে পড়ে না।

জয়ি তনিমার সঙ্গে ওদের বাড়ি চলে যাবার পর যখন চন্দন রাত্রির আহার সেরে বাইরের দাওয়ায় এসে বসেছে তখন চাঁদের আলো সোনাঝুরি গ্রামটাকে রুপোলী রঙে ঢেকে ফেলেছে যথারীতি। জ্যোৎস্নার আতরে ভিজতে ভিজতে চন্দনের ফেলে আসা দিন গুলোর কথা যতই মনে পড়ে যাচ্ছিল ততই চোখ দুটো যেন চিকচিক করে উঠছিল সব হারানোর অভিমানে। জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে কোথায় যেন একটা ক্লান্তি গ্রাস করছে চন্দনকে। এখন শৈশবের সেই নানা রঙের দিন গুলো এমন সব স্মৃতি যা শুধুই কাঁদায়। চাঁদটার দিকে তাকিয়ে কী যেন বিড়বিড় করে বলে চন্দন। কত না বলা অভিমানের কথা জমা হচ্ছে দিন দিন আবার সেগুলো বুদ্বুদের মতো হারিয়ে যাচ্ছে একে একে। এখন তুলির কথা ভাবতেও ভয় হয় চন্দনের। পাছে শেষ সম্বল টুকুও হারিয়ে ফেলতে হয় সব হারানোর মরশুমে। এই অল্প বয়সের জীবনেই যেন কত গুলো জীবন কাটানো হয়ে গেছে ওর। চাঁদটা আলতো ভাবে সরতে সরতে একটা সময় বাঁশঝাড় পেরিয়ে পেয়ারা গাছটার আড়ালে চলে গেলে বাড়ির উঠোনটা অন্ধকারে ঢাকা পড়ে যায়। শুধু কিছু অচল তারা স্বপ্নের মতো মিটমিট করে জ্বলতে থাকে রাতের আকাশে।

এই প্রেমের উপন্যাস সম্পর্কে আপনার মতামত জানাবেন। আপনার মতামত যথেষ্ট গুরুত্ব রাখে আমাদের কাছে।

                          ।।১০।।

কাজে কাজেই বাকি কটা দিন কেটে গেল। জয়ি না থাকলে চন্দনের একার পক্ষে সমস্ত দিক সামলাতে খুবেই সমস্যা হয়ে দাঁড়াত। এই কটা দিনেই জয়ি গ্রামটার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে বেশ। চন্দন যখন গলায় গামছা জড়িয়ে বাড়িতে বাড়িতে নেমন্ত্রন করে বেড়িয়েছে তখন জয়ি একা হাতেই ঘরের কাজ গুলোকে সেরেছে নিপুন ভাবে। তবে হ্যাঁ এই ব্যাপারে তনিমাও সাধ্য মতো জয়িকে সাহায্য করে গেছে। এ কথা নে মেনে উপায় নেই। এই কয়েকটা দিনের ব্যস্ততায় জয়ি বা চন্দন কেওই কলকাতাকে তেমন ভাবে মনে করার সময় পায়নি। জয়ির জায়গায় অন্য কোনো মেয়ে থাকলে এই কয়েকটা দিনে চন্দনকে আপন করার একটা অদৃশ্য প্রয়াস অবশ্যই করত যেটা জয়ি নিজের অজান্তেও করেনি। মেয়েটা যেন কোন অলৌকিক শক্তিতে নিজের ভালবাসার সীমারেখা নিজেই টেনে দিয়েছে। যেটাকে অতিক্রম করার চেষ্টা করেনি একবারও। হয়তো শুধুমাত্র জয়িরাই পারে এমন ভাবে কাছে এসে দূরের থেকে ভালবেসে যেতে।

আজকে চন্দনের মায়ের শ্রাদ্ধ শান্তির কাজ সারতে সারতে দুপুর গড়িয়ে গেল। ত্রিপল টাঙিয়ে ছোট্ট প্যান্ডেলের মতো করে যেদিকটায় খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল সেদিকে একটি বার তাকাবারও সময় পায়নি চন্দন আজকে। সেই চন্দনের চেহারার সাথে আজকের চন্দনের চেহারার অনেকটাই ফারাক। নাড়া মাথা, দাড়ি গোঁফ পরিষ্কার ভাবে কামানো। দেহের গৌর বর্ণও খানিকটা শ্যামলা হয়ে এসেছে। চন্দনের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে থকাতে জয়ির চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে আসে। চন্দনের সেই সমুদ্র রঙের স্বপ্নিল চোখ দুটো যেন কঠিন বাস্তবের আঘাতে রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে। চন্দনের চোখে চোখ পাততেই আজকাল ভয় ভয় করে জয়ির। কলেজের সেই শান্ত চাষা নামের ছেলেটা যেন জীবনের জ্বালায় পুড়তে পুড়তে কঠিন হয়ে গেছে। মায়ের পিণ্ড তর্পণ করার সময় যখন চন্দনের সাথে জয়ির চোখা চোখি হয় ভয়েই চোখ সরিয়ে নিয়েছিল জয়ি।

সমস্ত ক্রিয়া কর্ম মিটে যাবার পর যখন ঘরটা একটু নিরিবিলি হয়েছে তখন চন্দন এসে জয়িকে বলে, ‘আমার এখানের কাজ প্রায় শেষ। কালকের জন্য সামান্য কিছু লেগাচার বাকি আছে সেগুলো মিটিয়েই পরশু কলকাতায় ফিরে যাব। এখানে থাকলে আমি আমার আমিত্ব টুকুও হারিয়ে ফেলব মনে হয়। কলকাতায় ফিরে না গেলে আমার মাতৃদায় মিটবে না। মাকে তো কিছুই দিতে পারলাম না অন্তত মাকে দেওয়া কথা গুলো রাখার চেষ্টা করব। অন্তত নিজের ভেতরে কোথাও একটা শান্তি থাকবে।’ চন্দনের কথা গুলো শোনার পর জয়ি ঠিক কী বলবে খুঁজে পায় না তাই চুপ করেই দাঁড়িয়ে থাকে। জয়িকে চুপ করে থাকতে দেখে চন্দন আবার বলে, ‘আমার জন্য এই কটা দিনে তোর পড়াশুনার অনেক ক্ষতি হয়ে গেল তাই না রে ?’ জয়ি এবারেও চুপ করেই দাঁড়িয়ে থাকে। এখানকার জীবনটা ছেড়ে যেতে জয়ির মন সায় দেয় না। কোথায় যেন একটা বাজে। চন্দন হয়তো কোনোদিন জানতেই পারবে না এই কটা দিনে জয়ি কেমন ভাবে কাল্পনিক সংসার পেতে বসেছিল। তাই হটাৎ করে এই সংসার ভেঙে কলকাতায় ফেরার কথা শুনেই ওর বুকটা ধড়াস করে ওঠে। কীসের একটা ভয় যেন পেয়ে বসে জয়িকে ।

সারা দিনের ক্লান্তির পর যখন চন্দন একটু শুয়েছে তখন জয়ি চুপিসারে বাইরে বেরিয়ে আসে। তারপর পায়ে পায়ে এগিয়ে যায় গন্ধেশ্বরী নদীটার দিকে। আজকে মনটা কেন যে এত উতলা হয়ে উঠছে বুঝতে পারে না জয়ি। খুব কাঁদতে ইচ্ছে করছে আজকে। একান্ত আপন কিছু একটা হারানোর ভয়ে ভেতরটা যেন কুঁকড়ে গেছে। নদীর জলে পা ডুবিয়ে বসে পড়ে জয়ি। গত পরশুদিন তনিমার সাথে নদীর ধারে এসেছিল একবার কিন্তু সেদিন মনটা এত উতলা ছিল না। একদৃষ্টিতে দূরের কলা গাছ গুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে দুচোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। আর কান্নাটাকে চেপে রাখতে না পেরে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে জয়ি। ওড়না দিয়ে চোখের জল মুছতে মুছতে বিড়বিড় করে বলে, ‘আমকে কেন তুলি করলে না ভগবান ? কেন তুমি আমাকে জয়ি করলে শুধুই হেরে যাবার জন্য ?’ ওড়নাটাকে মুখে চাপা দিয়ে কাঁদতে থাকে জয়ি।

পশ্চিমের আকাশে সূর্যটা ডুবতে শুরু করলে উঠে দাঁড়ায়। চোখে মুখে নদীর জলের ঝাপটা নিয়ে ওড়নায় মুখটা ভালকরে মুছে নেয়। তারপর নদীটাকে উদ্দেশ্য করে আবার বলে, ‘এই মুহূর্তটুকু শুধু তোমার আর আমার মধ্যেই গোপন থাক। বিদায়, ভাল থেকো বন্ধু।’ যে পথ দিয়ে এসেছিল আবার সেই পথ ধরেই চলতে থাকে জয়ি। নদীটা তেমন ভাবেই নীরবে পড়ে থাকে। এখন বেশ খানিকটা হালকা লাগে জয়ির নিজেকে। যেন একটা চাপা যন্ত্রণা বুকের থেকে সরে গেল।

জয়ি যখন ঘরে ঢুকল চন্দন তখনো ঠিক তেমন ভাবেই ঘুমিয়ে আছে। চন্দনকে আর জাগাতে ইচ্ছে করল না জয়ির। সারাদিন ছেলেটার যে কী ধকল গেছে জয়ির থেকে সেটা আর কেই বা বেশি জানে। চন্দনের নিষ্পাপ মুখটার দিকে তাকিয়ে থাকে জয়ি। ও হয়তো কোনোদিন জানতেই পারবে না এই ঘুমন্ত মুখটা মনে করে করে জয়ির কত রাত কেটে যাবে। মাঝে মাঝে জয়ির মনে হয় চন্দন সবেই জানে সবেই বোঝে কিন্তু কিছু করার নেই দেখেই না বোঝার অভিনয় নয় টুকু করে যায় বাধ্য হয়ে। ঘুমের ঘোরে চন্দন পাশ ফিরতেই জয়ি কয়েকপা পিছিয়ে দাঁড়ায়। পাছে চন্দনের চোখ পড়ে যায় ওর উপর। চন্দনের ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে জয়ি যে জীবনের কী মূল্যবান রত্ন চুরি করছে সেটা হয়তো জয়ি ছাড়া আর কারুর পক্ষেই জানার কথা নয়। তবুও জয়ি চায় না এখন চন্দন তাকে দেখে ফেলুক। এমন একটা স্মৃতি সঞ্চয় মুহূর্তকে দুচোখে ধরে রাখার সুযোগ হয়তো জয়ি আর পাবে না কোনোদিন।

চন্দনের যখন ঘুম ভাঙে তখন সবে সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নেমেছে। ঘুম থেকে উঠেই চোখে মুখে জল দিয়ে কাঠের চেয়ারটা টেনে উঠোনে গিয়ে বসে চন্দন। ঘরের হালকা আলোতে মনটা যেন আরও বেশি করেই খারাপ হয়ে পড়ে। এখনো চন্দনের চোখে মুখে ক্লান্তির ছাপ লেগেই আছে। জয়ি দুকাপ চা বানিয়ে নিয়ে এসে এক কাপ চন্দনের হাতে দিয়ে অন্যটায় চুমুক দিয়ে বলে, ‘এই প্রথম বার স্টোভে চা বানালাম জানিস’

চন্দন চায়ের কাপে মুখ দিতে দিতেই একবার জয়ির দিকে তাকিয়ে আবার চোখ নামিয়ে নেয়। জয়ি কিছু বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করে, ‘কিরে চাটা ভাল হয়নি ?’

‘না ভালই তো হয়েছে।’

‘তাহলে কিছু বললি না যে ?’

জয়ির কথার ধরনে হেসে ফেলে চন্দন, ‘তুই না এক্কেবারে বাচ্চাদের মতো।’

‘বারে প্রথম বার স্টোভে চা বানালাম ভাবলাম একটু প্রশংসা ট্রশংসা করবি তা না আবার বলে কিনা আমি নাকি বাচ্চাদের মতো। তবে যাই বল বাচ্চাদের মতো হলে অনেক কিছুই না বুঝে না যেনে নিশ্চিন্তে থাকা যেত। জীবনের জটিল জিনিশ গুলোকেও সহজ বলেই হজম করে নিতে পারতাম।’

‘মানে ?’ জয়ির কথা গুলোর মাথা মুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারে না চন্দন।

‘মানে কিছুই না। ঐ বললি না বাচ্চাদের মতো তাই বললাম আরকি।’

‘তুই কখন যে কী বলিস ভগবান জানেন। তোকে বোঝা আমার কম্ম নয় সেটুকু ভালই বুঝতে পারি।’

‘এটা অবশ্য তুই ঠিকেই বলেছিস। সবাই যদি সবাইকে বুঝতে পারে তাহলে তো অবুঝদের কোনো কদরেই থাকে না। তাই কেও কেও হয়তো অবুঝ হয়ে থাকতে ভালবাসে। আবার কেও কেও ভয় পায় পাছে তাকে কেও বুঝে ফেলে। মাঝে মাঝে নিজেকে না বোঝাতে পারার জন্যেও বেশ আনন্দ হয়। সবাই সব বুঝে গেলে সমস্যা বাড়ে বয় কমে না।’

চায়ের কাপটা চেয়ারের তলায় রেখে চন্দন বলে, ‘কী হয়েছে বল তো ? দার্শনিকদের মতো ভারী ভারী কথা বলছিস। তোর কথা গুলো সবেই আমার মাথার উপর দিয়ে বিমানের মতো উড়ে যাচ্ছে।’

‘কিছুই তো হয়নি কিছু হলে তো ভালই হত। আসলে সবার সাথে সব কিছু হয় না। ছাড় এসব কথা, পরশু কখন রওনা দিবি ঠিক করেছিস ?’

একটু চিন্তাকরে চন্দন বলে, ‘না এখনো কিছুই ঠিক করিনি তবে ভাবছি সকালের ট্রেনেই যাব।’

জয়ি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ‘আচ্ছা’ বলেই চেয়ারের তলা থেকে কাপটা নিয়ে ঘরের ভেতরে চলে যায়।

আজকে জয়ির কথাবার্তা চালচলন বেশ অদ্ভুত লাগে চন্দনের। জয়িকে এমন ভাবে কথা বলতে এর আগে কখনই দেখেনি চন্দন। এই কয়েকটা দিন কাজে কাজে কেটে যাওয়ায় মেয়েটার দিকে তেমন ভাবে তাকানোর সুযোগও পায়নি। মনে মনে ভাবে, জয়ি বলেই সম্ভব নয়ত কাউকে তেমন কিছু না জানিয়ে দুম করে কলকাতার থেকে সোনাঝুরি চলে আসা মোটেই মুখের কথা নয়। পথে ঘাটে বিপদের সম্ভাবনা তো আছেই সাথে হাজার রকমের কলঙ্কের ভয়। একবার কলঙ্ক রটে গেলে সেটার থেকে আর মুক্তি নেই। মানুষ যদি একবার বলার সুযোগ পেয়ে যায় তখন চামড়ার মুখে কিছুই আটকায় না। মেয়েটা যে কেন এত বড় একটা রিক্স নিল ভগবান জানেন। কিছু একটা হয়ে গেলে তখন যে কী হত কে জানে। যে রকম দিনকাল চলছে তাতে যদি যদি ট্রেনে বাসে কিছু একটা…। চন্দনের গায়ের রোম গুলো দাঁড়িয়ে যায়। তবে একথা চন্দন নিজেও ভালই বুঝতে পেরেছে জয়ি পাশে না থাকলে এত নিপুন ভাবে সবকিছু সামাল দেওয়াও সম্ভব হত না। চন্দনের তো নিজের বলতে তেমন কেওই নেই মামা মাসি পিসি যাদের আছে তাদের না হয় আলাদা ব্যাপার কিন্তু চন্দনের মতো যাদের সব থেকেও সম্পর্ক শূন্য জীবন তাদের কাছে এমন একটা দিনে জয়ির মতো কেও না থাকলে চলেও না। মনে মনেই জয়িকে একটা ধন্যবাদ দেয় চন্দন।

চায়ের কাপ দুটোকে বালতির জলে ধুয়ে ঠিক জায়গায় সাজিয়ে রাখে জয়ি। জয়ি নিজেও কোনোদিন ভাবেনি এমন ভাবে হুট করে চন্দনের বাড়ি চলে আসতে পারবে বলে। চন্দনের মায়ের খবরটা পাবার পরেই জয়ির ভেতরটা কেমন যেন ডুকরে ডুকরে কেঁদে উঠছিল বারবার। জয়ি নিজেকে কিছুতেই সামলাতে পারছিল না। যতই চন্দনের একটা কল্পিত করুণ মুখের ছবি চোখে ভাসছিল ততই যেন বুকের ভেতরে একটা অচেনা ঢেও আছড়ে পড়ছিল। শেষ পর্যন্ত থাকতে না পেরেই চন্দনের বাড়ি আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সেদিন জয়ি। এমন ভাবে চন্দনের বাড়ি আসাটা ঠিক হচ্ছে কিনা সেটা যে জয়ি ভাবেনি তা নয় বরং গভীর ভাবেই ভেবেছে কিন্তু কোনো কূলকিনারা খুঁজে না পেয়েই শেষ পর্যন্ত…। এখানে না এলে হয়তো বা একদিন জয়ির ভালবাসায় ভাটা পড়ে যেত। এখানে আসার পরে জয়ির সুপ্ত ভালবাসার শেকড় আবার মাটির গন্ধ পেয়ে পাতা মেলতে শুরু করেছে।

স্কুল জীবনে রমেন নামের একটা ছেলে অফার করেছিল জয়িকে। তখন জয়ি দশম শ্রেণির ছাত্রী। জয়ির যে ছেলেটাকে ভাললাগত না তা নয়। কেবল মাত্র বাবা নামক একটা ভয়ের জন্যই সেদিন জয়ি ছেলেটাকে হ্যাঁ বলতে পারেনি। আজকে যখন বাবা নামের ভয়টা কেটে গেছে চিরদিনের মতো তখন প্রেম মুখ বাঁকিয়ে বসেছে নিজের খেয়ালে। তুলি যদি জয়ির বান্ধবী না হত তাহলে হয়তো জয়ি একবার হলেও চন্দনকে কাছে টানার চেষ্টা করত। কিন্তু তুলিকে ঠকাতে এক বিন্দুও ইচ্ছে করে না জয়ির। এটুকু বুঝতে পারে চন্দন তুলিকে ছাড়া থাকতেই পারবে না। তুলি যদি চন্দনকে ছেড়েও চলে যায় তবুও চন্দনের সরল মনটাতে তুলির ছোঁয়া থেকেই যাবে। তাই তো জয়ির মাঝে মাঝেই নিজেকে তুলি ভাবতে খুব ইচ্ছে করে। এতে আর কিছু না হোক অন্তত কিছুটা রঙের ছোঁয়া তো পাওয়া যায়। একটা সময়ের কথা জয়ির খুব মনে পড়ে তখন ওই ক্লাস সেভেন এইট হবে হয়তো। ওর মা তখন কথায় কথায় বলত, ‘জয়ি যখন প্রেমে পড়বি সবার আগে আমাকে বলিস। তোর বাবা জানলে…।’ জয়ি তখন মনে করত প্রেম মানে বনে জঙ্গলে পাহাড়ে পর্বতে নাচতে নাচতে গান গেয়ে বেড়ানো। কিন্তু সমস্যা হল জয়ি গান টুকটাক গাইতে পারলেও নাচতে পারত না এক্কেবারেই। এখন যে পারে সেটা কিন্তু নয়। তবে তখন জয়ির খুব চিন্তা হত যদি সে কোনো ছেলের সঙ্গে প্রেম করে তাহলে নাচবে কেমন করে। জয়ির ভয় যত না বাবাকে ছিল তারচেয়ে অনেক বেশি ভয়ছিল নাচতে না জানার জন্য। একবার নিজের নাচ শেখার ইচ্ছে মায়ের কাছে প্রকাশ করে এক নৃত্য শিক্ষিকাকেও বাড়িতে আনিয়ে নিয়েছিল জয়ি। কবিকল্পা না কবিপ্রিয়া কিছু একটা নামছিল ওই নাচ শেখাতে আসা দিদিটার। জয়ি মাঝে মাঝে খেয়াল করত ওই দিদিটা ফোনে একটা ছেলের সাথে কথা বলত। আর ফোন রাখার ঠিক আগে, ‘লাভ ইউ টু’ বলে চারদিকটা ভালকরে দেখে টুক করে একটা চুমু দিয়েই ফোনটা রেখেদিত। জয়ি বুঝতে পেরেছিল দিদিটা প্রেম করে। একদিন কৌতূহল চাপতে না পেরে বলেই ফেলেছিল, ‘আচ্ছা দিভাই তুমি যার সঙ্গে প্রেম কর তার সাথে কোথায় কোথায় নাচতে যাও ?’ আজকে হটাৎ করে কথাটা মনে পড়ে যেতেই ঠোঁটের ফাঁকে একটুকরো লাজুক হাসি ফুটে ওঠে জয়ির। নিজেই নিজের মাথায় একটা গাঁট্টা মারে।

আজকে সেই কিশোরী বেলার দিন গুলো খুব মনে পড়ে যাচ্ছিল জয়ির। খেয়ালেই ছিল না সন্ধ্যা পেরিয়ে কখন রাত এসেছে। প্রতিদিনের মতো অরুণ বাবুর সঙ্গে তনিমা যখন জয়িকে ডাকতে এল তখন রাত্রি নটা পেরিয়ে গেছে। সারাদিনের ক্লান্তির পর জয়ির চোখেও মিষ্টিমধুর ঘুম গড়িয়ে আসছিল। তাই আর দেরি না করেই তনিমাদের সঙ্গে বেরিয়ে গেল জয়ি। চন্দন তখনো সেই চেয়ারেই বসেছিল। জয়ি যাবার পর ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ল চন্দন। আজকে আর কিছুই মুখে দিতেও ইচ্ছে করল না। শরীরটা যেন কেমন ভার ভার লাগছে। কিছুক্ষণ শুয়ে শুয়ে এপাশ ওপাশ করার পর যখন ঘুম ধরল না তখন আবার বাইরেই বেরিয়ে এল চন্দন। কেমন যেন অস্থির অস্থির লাগছে ভেতরটা। সব যেন কেমন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। মনে মনে কিছু একটা হিসেব করছে চন্দন যেটা মিলছে না কিছুতেই। আর যতই মিলছে না অস্থির ভাবটা যেন ঠিক ততই বেড়ে যাচ্ছে। আর তো মাত্র একটা দিন তারপর আবার কলকাতা আবার ব্যস্ততা আবার সেই দুচোখের জলে পুড়তে থাকা জীবন। বাড়িতে এসে যে চন্দনকে পুড়তে হয়নি তা তো নয় বরং এই কয়েকটা দিনে জ্বলে পুড়ে সব শেষ হয়ে গেছে। এখন বাঁচার সম্বল বলতে তুলি। কিন্তু পরিস্থিতি এমনই যে যেকোনো মুহূর্তে সব ভেঙে চুরমার হয়ে যেতে পারে। তখন অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই থাকবে না।

আবার ঘরের ভেতরেই ফিরে আসে চন্দন। কেন যেন আজকে মনটা উতলা কোনো কিছুই ভাল লাগছে না আজকে। ঘরের জানালার পাল্লা গুলো খুলে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকে। রাতটাও যেন চন্দনের মতো একলা আজকে। অনেক দূরে কোথাও পিউ কাঁহা পাখিটা ডেকে চলেছে একই সুরে। অন্যান্য দিন এই সুরটাই বেশ মিষ্টি লাগে চন্দনের কিন্তু আজকে যেন সেটাও ভাল লাগছে না। আসলে মন ভাল না থাকলে কোনো কিছুই তখন ভাললাগে না। জীবনের রঙ গুলো কেমন যেন ফিকে হয়ে আসে।

একদিকে মায়ের মৃত্যুর যন্ত্রণা অপরদিকে প্রেমিকাকে হারানোর ভয় দুই মিলিয়ে এমন অবস্থায় দাঁড়িয়ে পড়েছে চন্দন যেখান থেকে কিছুতেই নিজেকে নিজের মতো গুছিয়ে নিতে পারছে না। বারবার মনের মধ্যে করাল বদনা মেঘের উদয় হচ্ছে। এই বুঝি সব ধুয়ে মুছে গেল। এমন মানসিক অবস্থায় দাঁড়িয়ে জীবনকে জীবনের মতো করে দেখা বড় সোজা কথা নয়। এই এক জীবনেই অনেক গুলো জীবন কাটিয়ে ফেলেছে চন্দন। তাই জীবন সম্পর্কে তার অভিজ্ঞতা নেহাত কম নয়। তবুও তো স্বপ্নরা জেগে থাকে বাঁচার রশদ নিয়ে অন্ধকারে প্রদীপের আলোয়। তবুও তো মাঝে মাঝেই মনে হয় এবার ভোর হয়ে এল বুঝি। কিন্তু কোথায় ভোর ? কবে হবে তার শুভাগমন! নাকি এখন সবে সন্ধ্যা! কিছুই বুঝতে পারে না চন্দন। আসলে সব কিছু বোঝার পরেও যেটুকু না বোঝা হয়ে থেকেই যায় সেটাই তো অন্ধকার। সেই ছোটবেলার থেকেই চন্দন এই আন্ধকারের হাত ধরে হেঁটে চলেছে আলোর সন্ধানে। তবে এতদিন এই চলার পথে ‘মা’ নামের একটা দিক নির্ণায়ক নক্ষত্র ছিল। আজকে আর সেটা নেই। এখন শুধুই অন্ধকার। এখন নিজের ভেতরের ভাবনা গুলোতে উঁকি দিতেও ভয় ভয় করে। কিন্তু এমনটা তো হবার কথা ছিল না তবু যে কেন এমন হয়ে যায় কেও জানে না!

সারাদিনের এত ক্লান্তি দু’চোখে এত তন্দ্রা তবুও ঘুমটা বারবার ছিঁড়ে যাচ্ছিল জয়ির। আর তো মাত্র একটা রাত সেটা পেরিয়ে গেলেই আবার কলকাতার কল্লোলিত জীবন। হয়তো আর কোনোদিনেই এই সোনাঝুরি গ্রামে আসা হবে না জয়ির। একটা অচেনা অজানা গ্রামে দুম করেই চলে এসেছিল জয়ি। আসার আগে এক বারের জন্যেও ভাবেনি তার হটাৎ এসে পড়ায় কী হতে পারে। আসতে ইচ্ছে করেছিল তাই এসেছে এর চেয়ে বেশি কিছুই যুক্তি ছিল না এখানে আসার পিছনে। এখন যতই যাবার সময় গড়িয়ে আসছে ততই যেন মনটা গ্রামটাকে আঁকড়ে ধরতে চাইছে। এখানে আসার পরেই প্রথমবার একটা জীবন বাঁচার জন্য জয়ির লোভ হয়েছে। কিন্তু কী হবে এই লোভ করে! কী হবে এই গ্রামটাকে ভালবেসে! চন্দনের মাটির ঘরটাকে নিজের রঙে সাজিয়ে! সবেই তো হারাবে আর একটা দিন পরেই।

‘তুমি এখনো ঘুমাওনাই দিদি ?’

হটাৎ করে তনিমা জেগে যাওয়ায় একটু বিব্রত হয়ে পড়ে জয়ি। রাত্রির একাকীত্বটা এখন একলা একলা উপভোগ করতেই বেশি ভাল লাগছিল। ‘নারে ঘুমটা ভেঙে যাচ্ছে বারবার।’ ভাঙা ভাঙা গলাতেই উত্তর দিল জয়ি।

‘তুমি কাইন্দত্যা ছিলে ?’

‘ধুর পাগলী কাঁদবো কেন, নতুন এলাকার জলে কদিন ধরেই স্নান করছি তো তাই হয়তো গলাটা একটু ধরেছে। তোরও ঘুম আসছে না বুঝি ?’

‘না না একটা স্বপন দেইখ্যা ঘুম চলি গেল্যেক।’

‘তা কী স্বপ্ন দেখছিলি শুনি।’

‘স্বপনের কী আর মাথা মুণ্ডু থাকে। তুমি শুইনল্যা খারাপ পাবে।’

‘খারাপ কেন পাব স্বপ্ন তো স্বপ্নই। বরং তুই না বললেই জানবো তুই আমাকে মুখেই দিদি বলিস ভরসা করতে পারিস না।’

কথাটা সহজ সরল তনিমার বুকে কাঁটা ফুটিয়ে দেয়। একটুক্ষণ ভেবে নিয়ে বলে, ‘দ্যাখো বইলত্যা বলছ তাই বলচি। পরে আবার বইল না তোর মনটা কত ছোট।’

‘না বলব না বল।’

‘আমি স্বপন দেখত্যা ছিলাম তুমি আমার পুতুল গুল্যাইন চুরি কইর‍্যা পলাই যাইচ্ছ।’

‘তাই নাকি ?’ তনিমার কথাতে হেসে ফেলে জয়ি। মনে মনে ভাবে কত মানুষ নিজের সামান্য টুকুকেই আগলে রাখার জন্য স্বপ্নেও পাহারা দেয়। আবার কত মানুষ হাত গুটিয়ে সর্বস্ব হারাতে দেখে চোখের সামনে।

জয়িকে হাসতে দেখে লজ্জা পেয়ে যায় তনিমা। ভাবখানা এমন যেন নিজের বোকা বোকা স্বপ্নটা ইচ্ছে করেই দেখে ফেলেছে।

‘তা তুই বুঝি ওই পুতুল গুলোকে খুব ভালবাসিস। পাছে কেও নিয়ে যায় এটা ভাবলেই তোর ভয় হয়।’

‘তুমি লিবে ?’

‘নিতে চাইলেই দিবি বুঝি ?’

‘একটা বাদে।’

‘কোনটা ?’

‘সকালে দেখাব। ওটা শুদু চনাদার জন্যি।’

‘ও তাই।’ আর কথা বাড়ায় না জয়ি। তনিমা আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু জয়ি ঘুম পেয়েছে বলেই পাশ ফিরে শুয়ে পড়ে। চন্দনের সঙ্গে তনিমার বিয়ের কথা হয়েছিল এটা একদিন চন্দন নিজেই বলেছিল জয়িকে। সেদিন হালকা ভাবেই কথাটা নিয়েছিল জয়ি। তনিমাকে নিয়ে জয়ির মনে কোনো হিংসাও নেই কারণ জয়ি ভাল মতোই জানে এই বিয়ে হবে না। তবুও আজকে তনিমার মুখ থেকে চন্দনকে নিয়ে এমন কিছু শুনতে ইচ্ছে হল না যাতে করে মনটা আবার খারাপ হয়ে যায়। বেশ কিছুক্ষণ পরে জয়ির দুচোখের জল বালিশে আলপনা আঁকতে শুরু করল যখন তনিমা তখন ঘুমিয়ে গেছে। হয়তো বা আবার স্বপ্ন দেখছে।

ভাল প্রেমের গল্প প্রেমের কবিতা প্রেমের উপন্যাস ভাল মানুষ হতে শেখায়   ।

                      ।।১১।।

হাওড়া ষ্টেশন থেকে বেরিয়েই চোখে মুখে রৌদ্রের ঝাঁঝ অনুভব করল চন্দন। চুলের অভাবে মাথা থেকে গরম ঘাম গড়িয়ে পড়ছে দু’কানের পাশদিয়ে। ওড়নায় মুখটা মুছল জয়ি। হাওড়ার বাস স্ট্যান্ড জানান দিচ্ছে কেন কলকাতা কল্লোলিনী তিলোত্তমা। ছোট বড় হরেক রঙের গাড়ি গুলো পোকার মতো কিলবিল করে পেরিয়ে যাচ্ছে ঝুলন্ত ব্রিজটার উপর দিয়ে। জয়ি চন্দনকে জিজ্ঞেস করে, ‘L 238 -এ উঠবি তো ?’

চন্দন যেন নিজের ভেতরেই কোথাও ডুবেছিল শুনতে না পাওয়ার মতো করে বলে, ‘হ্যাঁ কী বললি ?’

‘বললাম L 238 -এ উঠবি তো ?’

‘হুম। ওটাতেই ভাল। তুই কিছু খাবি ? সেই ভোরে বেরিয়েছিস কিছু না খেয়েই। বললাম ঝালমুড়ি খেতে তাও তো খেলি না।’

‘ধুর ওসব ট্রেনে বাসের খাবার খেতে আমার ইচ্ছে করে না। ওদের হাতের কোনো ঠিক থাকে নাকি।’

‘তাহলে এখানে কিছু খাবি তো খেয়ে নে।’

‘না না আমার এখন খেতে ইচ্ছে করছে না। তুই কিছু খেলে খেতে পারিস।’

‘আমার তো বাইরের খাবার…’

‘সরি সরি একদম খেয়ালেই ছিল না। তোর তো এক বছর বাইরের খাবার খাওয়া চলবে না। আচ্ছা কালকে কি কলেজে আসবি। পরীক্ষার তো আর বেশি দেরি নেই।’

চন্দন একটু ভেবে বলে, ‘দেখি এলে তোকে ফোন করে জানিয়ে দেবো।’

‘এই শোন না, যদি কালকে কলেজে না যাস তাহলে আমার বাড়ি আসবি একবার ? সেদিন বলেছিলি না জঙ্গলটা দেখতে যাবি।’

‘কোন জঙ্গলটা ?’ মনে করার চেষ্টা করে চন্দন।

‘আরে আমার ঘরের জানালা দিয়ে যে পুকুরটা দেখা যায় তার ওপারের জঙ্গলটা।’

‘ও-হো এবার মনে পড়েছে। আচ্ছা যদি কলেজে যেতে ইচ্ছে না করে তাহলে অবশ্যই যাব।’

বাসটা চলতে শুরু করতেই দুজনে দুজনার জায়গায় বসে পড়ে। মাঝে আর কোনো কথা হয় না। জয়ি নেমে পড়ার পর চন্দন বাকি রাস্তাটা জানালার ওপারে চোখ পেতেই কাটিয়ে দেয়। পাশে বসে থাকা লোকটাও নিউ ব্যারাকপুরে নেমে পড়ার পর বাকি রাস্তাটুকু সিটে হেলান দিয়েই এসেছে চন্দন।

ঘরে পৌঁছেই বাইরের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে চন্দন দেখে কাকু কাকিমা কেওই বাড়িতে নেই। কোথাও বেরিয়েছে হয়তো। কাঁধের ব্যাগটাকে আলমারিতে রেখে মোবাইলটা চার্জে বসায়। তারপর জামা প্যান্ট পালটেই শরীরটাকে বিছানায় গড়িয়ে দেয়। সারা ঘরটা যেন কেমন একটা ভ্যাপসা গন্ধে ডুবে আছে। তবুও ক্লান্ত শরীরটাকে টেনে উঠিয়ে আর জানালা খুলতে ইচ্ছে করে না। খানিক বাদেই ক্লান্ত চোখের পাতা ঘুমে জড়িয়ে আসে।

   এদিকে এই কটাদিনে তুলির শরীর মন দুটোই আরও বেশি করেই ভেঙে পড়েছে। বদ্ধ খাঁচার ভেতর কারেই বা এতদিন ভাললাগে। এদিকে মাথা যন্ত্রণাটা মাঝে মাঝেই মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। খাবারের প্রতি রুচিটাও কমে আসছে দিন দিন। অকারণেই গা’বমি বমি করে। যদিও রঞ্জিত কাকু বলেছেন, ‘ভয়ের কিছুই নেই’ এই ‘ভয়ের কিছুই নেই’ কথাটাতেই যেন কেমন একটা আঁশটে ভয়ের গন্ধ পেয়েছে তুলি। নতুবা তিনি সি টি স্ক্যান করিয়েছেন কেন ? বলা তো যায় না কীসের থেকে কখন কী হয়ে যায়। যদিও তুলির বাবার এসব নিয়ে মোটেই মাথা ব্যথা নেই। তিনি ব্যবসা ফেলে সংসারের দিকে তাকাতে সময়েই পান না। তাই বাড়ির সব সমস্যা তুলির মাকে একাই সামাল দিতে হয়। এই সংসারের জন্যেই ইচ্ছে থাকলেও চাকরি করা হয়ে ওঠেনি তুলির মায়ের। যদিও এই নিয়ে উনার বিন্দুমাত্র অনুশোচনা নেই। তুলি আসার পর উনাকে আর কোনোদিনেই সময় কাটানোর উপকরণ খুঁজতে হয়নি। তুলিও এতদিন পৃথিবী বলতে মা’কেই যেনে এসেছে। মায়ের বাইরেও যে পৃথিবী বলে কিছু একটা বস্তু ঘুরছে সেটা চন্দন জীবনে না এলে এত জলদি হয়তো জানাই হত না। কিন্তু তুলি দেখেছে, মা যেন কেমন পালটে যাচ্ছে দিন দিন। রাতের বেলায় একলা একলা ছাতে দাঁড়িয়ে কী যেন ভাবতেই থাকে। তুলির চোখে চোখ পড়লেই মায়ের চোখ দুটো কেন যেন বাস্পিত হয়ে ওঠে। মা কি তাহলে লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদে ? জানে না তুলি। জানার চেষ্টাও করেনি কোনোদিন। মায়ের মুখটা চন্দনের সঙ্গে সংসার গড়ার মাঝে কোথায় যেন অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। হয়তো তাই ইচ্ছে করেই আর মায়ের প্রতি দুর্বলতা বাড়াতে চায় না তুলি। ঘরের আর পাঁচটা আসবাবের মতোই যখন রক্তের সম্পর্কটাও ফেলে যেতে হবে একদিন তখন আর মায়া বাড়িয়ে কী লাভ ?

সময় কাটানোর জন্য প্রতিদিনের মতো আজকেও শক্তিপদ রাজগুরুর ‘বনে বনান্তরে’ বইটা বুকের উপর নামিয়ে শুয়ে শুয়ে পড়ছিল তুলি। বইটা পড়তে পড়তে মাঝে মাঝেই ও হারিয়ে যায় চৈতন সিংহের হাতে হাত ধরে। উপন্যাসের বীভৎস রস পান করতে করতে শরীরে কাঁটা দিয়ে ওঠে। কোল বালিশটাকে আরও জোরে জড়িয়ে ধরে একটা একটা করে পাতা পেরিয়ে যায় তুলি। এতবার পড়ার পরেও উপন্যাসটার রোমাঞ্চকতায় বিন্দুমাত্র খামতি হয়নি। চৈতন সিংহের মতোই তুলিরও নিজেকে একা বলেই মনে হয়। পার্থক্য শুধু অবস্থানের। একজনের জঙ্গলটাই ঘর তো অন্যজনের ঘরটাই জঙ্গল। আজকেও উপন্যাসটা পড়তে পড়তে তুলি এমন ভাবেই কালো অক্ষর গুলোর ভেতরে ঢুকে গিয়েছিল যে হটাৎ করে দরজায় টোকা পড়তেই চমকে ওঠে। এমন সময় সচরাচর দরজায় টোকা পড়ে না। বিছানা থেকে উঠে গিয়ে দরজাটা খুলে দেখে, চায়ের কাপ নিয়ে ভৈরব দাঁড়িয়ে আছে। ‘তুই চা নিয়ে এলি যে ?’ জিজ্ঞেস করে তুলি।

চায়ের কাপটা টেবিলে নামিয়ে ভৈরব বলে, ‘কী করব আজকে ঘরের ভেতরটাও তো আমাকেই সামলাতে হবে। আজকে পাটরানী ছুটি নিয়েছেন।’

‘কেন ?’

‘শরীর ভাল নেই।’ কথাটা বলেই ভৈরব দরজা ভেজিয়ে বাইরে চলে যায়।

দিনকে দিন তুলির চায়ের নেশাটা বেড়েই চলেছে। এতে অবশ্য ওকে খুব একটা দোষ দেওয়া চলে না। সারাদিন বাড়িতে বসে বসে এখন বিরক্তি চলে আসে। খাবারের প্রতিও রুচি নেই। মাঝে সাঝে একটু চা হলে ভালই লাগে। বইটা বালিশের পাশে রেখে বিছানা থেকে নেমে চায়ের কাপ হাতে জানালার ধারে এসে দাঁড়ায়। শরীরটা কেমন যেন ম্যাজম্যাজ করছে। শুয়ে বসে সময় কাটানো জীবনে একটা দিন মানে তো এক সপ্তাহের কম নয়। সময় যেন কাটতেই চায় না। আজকে ওর মা কী এক বিশেষ কাজের জন্য রঞ্জিত বাবুর বাড়িতে গেছেন। কদিন ধরেই তুলি লক্ষ্য করছে মাঝে মাঝেই ওর মা রঞ্জিত কাকুর বাড়ি ছুটে যাচ্ছে। একলা একলা বিরাট ঘরটাতে তুলির নিজেকে মাঝে মাঝে ভূত বলে মনে হয়। যদিও ইচ্ছে করলেই এমন দিন গুলোর সুযোগ নিয়ে ও বাইরে বেরিয়ে যেতেই পারে কিন্তু সেটা করে না কেবল মাত্র একটা আশাতেই, হয়তো মায়ের মনটা একদিন বদলাবে। তবে সেই দিনটা কবে আসবে তুলির জানা নেই। হয়তো বা কোনোদিনেই আসবে না। তবুও জানালার ওপারে তাকালেই কেন যেন হাজার হাজার স্বপ্ন ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে এসে চোখের পাতায় বসে।

আজকেও জানালার ওপারে চোখ এঁটে তুলি দেখতে পায়, বড্ড দুষ্টু হয়েছে ওদের মেয়ে ছোঁয়া। কিছুতেই খাবার খেতে চায় না। চন্দনের শুধু অফিস অফিস আর অফিস। চন্দনের উপর অভিমান হয় তুলির। মনে মনে বিড়বিড় করে বলে, ‘কেমন বাবা কে জানে, কচি মেয়েটার জন্যেও সময় নেই। ফিরুক অফিস থেকে আজকে আর কথাই বলব না।’ কথা গুলো মনে মনে উচ্চারণ করেই হাসি পেয়ে যায় তুলির। গাল দুটো লালচে গোলাপি হয়ে ওঠে। এইসব দুষ্টু মিষ্টি কল্পনা করেই পূবের সূর্যকে পশ্চিমে চালান করতে হয় তুলিকে। ‘মেয়েবেলা’র পুতুল খেলার মতোই ‘যুবতীবেলা’র এই কল্পনার খেলা খেলতে তুলির যে খুব খারাপ লাগে তা কিন্তু নয়। তবে সব সময় তো আর কল্পনা আসে না। কখনো কখনো কল্পনা গুলো দুঃস্বপ্নের রঙ মেখে ধরা দেয়। তখন খুব ভয় করে।

একটা সময়ছিল যখন তুলির মন খারাপ থাকলেই রবি ঠাকুরের গানের ভেতর ডুব মারত। আজকে তো আর মোবাইল নেই তাই সেই সুযোগটাও নেই। শুধু তুলি কেন অনেক ঝাড় খাওয়া প্রেমিক প্রেমিকা বুকের ঝাল আর চোখের জল লোকানোর জন্য রবি ঠাকুর গানে নিজেকে ভুলিয়ে রাখে। ভাগ্যিস রবি ঠাকুর ছিলেন তাই কত ঘা খাওয়া বাঙালী নিজের বৈতরণী পার করেছে গানে গানে। নতুবা হয় সিলিং থেকে নয় বিষাক্ত মধু পান করে ইহ জীবনের ভবলীলা সাঙ্গ করত। তুলির যদিও এই সবে এলার্জি তবুও বলা যায় না মৃত্যু কখন কাকে কুবুদ্ধি দিয়ে ঝুলিতে ভোরে নিয়ে যায়। ‘দিন গুলি মোর সোনার খাঁচায়’ গানটা শুনতে শুনতেই তুলির দাদা ওকে একদিন বলেছিল, ‘এই সব ভাটের জিনিসে জড়াবি না কোনোদিন নতুবা আমার মতোই দুঃখের গান চেটে চেটে দিন কাটাতে হবে।’ কিন্তু কে শোনে কার কথা। প্রেম যখন কাউকে টানে তখন তাকে দড়ি বেঁধে রাখলেও কোনো উপায় থাকে না। প্রেম আসে বসন্ত ঋতুর মতো ফুলের ডালি সাজিয়ে। সে কারু আহ্বানের অপেক্ষা করে না। আবার যখন যায় তখন শুধু কালবৈশাখী। কোনোকিছু দিয়েই তাকে ঠেকানো যায় না।

মাঝে মাঝে আয়নায় নিজের মুখটাকেই অচেনা বলে মনে হয় তুলির। সেই মিষ্টি মুখটাকে যেন আয়নার প্রতিবিম্বের সাথে মেলানো যায় না। একটা সময়ছিল যখন তুলি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের পাশে চন্দনকে দেখতে পেত। এখন নিজের মুখটা দেখতেই ইচ্ছে করে না। দিন গুলো দিন দিন কেমন যেন বর্ণহীন হয়ে গেছে। এখন শুধু জানালায় বসে শেষটা দেখার সময়। চন্দনের সাথে কাটানো দিন গুলো এখন নিছক স্মৃতি মাত্র বাস্তবের মাটিতে তার মুল্য কেওই বোঝে না। প্রেমের টকমিষ্টি স্বাদটাও যেমন প্রেমিক প্রেমিকা একলাই উপভোগ করে ঠিক তেমন ভাবে প্রেমের ঝাল কিংবা তেতো স্বাদটাও ওই দুজনকেই উপভোগ করতে হয়। এই নিয়মটাই প্রেমের আদি থেকে আজও চলে আসছে। একটা সময় থাকে যখন আলো অন্ধকার রহস্যময় গলির বাঁকে বাঁকে দুটো প্রজাপতি মন উড়ে উড়ে বেড়ায়। ব্যাস ওটুকুই জীবন। তারপর যখন প্রেম নামক বৃক্ষটি বিচ্ছেদের ঝড়ে মুখ থুবড়ে পড়ে তখন একলা একলা ওই গলি গুলোতেই স্মৃতি বগলদাবা করে ঘুরে মরতে হয়। নতুবা বৃষ্টিকে রুমাল করে চোখের জল লুকিয়ে রাখতে হয়। যদিও তুলির জীবনে কোনো গলি নেই। কোনো বৃষ্টি ভেজার সুযোগ নেই। তবুও কল্পনায় সব এসে জমাট বাঁধে মনের ভেতর।

এদিক থেকে অবশ্য তুলির চেয়ে জয়ি স্মৃতি সঞ্চয় করেছে অনেক বেশি। সঞ্চয় বললে হয়তো ভুল বলা হবে স্মৃতি কুড়িয়েছে বলাটাই যুক্তি সঙ্গত। এতে কিছু হোক বা নাই হোক এদিকের স্মৃতি ওদিকে করে অন্তত আধটা জীবন অনায়াসের পার করে দেবে জয়ি। বাড়ি ফেরার পর থেকেই ওর দুচোখেও বারবার মেঘ জমা হয়েছে। দুপুরের দিকে দু’একবার বৃষ্টিও হয়ে গেছে। বালিশ ভেজানো বৃষ্টি। এক মুহূর্তে আপন হয়ে যাওয়া সোনাঝুরি গ্রামটা পরের মুহূর্তেই কেমন যেন পর হয়ে গেল। তবুও একটাই শান্তি একাকীত্বের দুপুরে স্মৃতির জানালা দিয়ে চাইলেই চন্দনের মাটির ঘরটা চোখে ভেসে উঠবে। চোখে ভেসে উঠবে সবুজে মোড়া সোনাঝুরি গ্রামটা আর সেই গন্ধেশ্বরী নদীটা। একটা জীবনের ভেতর দিয়েই মানুষ কতগুলো জীবন অনায়াসে কাটিয়ে দেয় নিজের অজান্তেই। ট্রেনে আসার সময় জয়ি চন্দনের চোখের দিকে তাকিয়ে যখন কিছু পড়ার চেষ্টা করেছে, দেখেছে ওই দুচোখে জয়ির জন্য শূন্যতা ছাড়া আর কিছুই রাখা নেই। তবুও তো স্বপ্নরা জেগেই থাকে আশার পাতায়। তবুও তো মানুষ জীবনটা কাটিয়ে দেয় কোনো এক কল্পিত ভোরের আসায়। বুকের ভেতর থেকে বুদ্বুদের মতো কান্না ভেসে এসেছে জয়ির গলায়। এই সব কান্না প্রকাশ পায় না শুধু মাছের কাঁটার মতো গলাতেই আঁটকে থাকে। বাড়ি ফেরার পরে কবিতার ডাইরিতে দুটো কবিতা লিখেছে জয়ি। এসব কবিতা কোনো পত্রিকায় প্রকাশ হয়তো কখনই পাবে না তবুও এই কবিতা গুলোর মুল্য কবিমন শুধু বোঝে। এ যেন প্রকাশের চেয়েও অনেক বেশি কিছু। প্রতিটা জীবনেই তো কত অপঠিত কবিতা ছোটগল্প থাকে কজনেই বা সেটা প্রকাশের চেষ্টা করে। আগামীর বাঁকে অতীতের সুতোতে যখন টান পড়বে তখন হয়তো চন্দনের ঘর সোনাঝুরি গ্রাম আর গ্রামের প্রান্তে লোকচক্ষুর আড়ালে বয়ে চলা গন্ধেশ্বরী নদীটা চোখের পাতায় ভেসে উঠবে বারবার। কিছু গল্প গল্প না হওয়ার যন্ত্রণা নিয়েই সারাটা জীবন থেকে যায়। জয়ির গল্পটাও হয়তো খানিকটা সে রকমই গল্প না হতে পারা একটা গল্প হয়ে থাকবে।

তবে জয়ি বা তুলির চেয়েও চন্দনের জ্বালাটা অনেক বেশি ওদের দুজনের ভাবনা গুলো চন্দনকে কেন্দ্র করেই ঘুরতে থাকে। কিন্তু চন্দনের তো তা নয়, সেই ছেলেবেলার থেকে একটার পর একটা মৃত্যু ওকে টুকরো টুকরো করে খুবলে খেয়েছে। যখনই চন্দন ভেবেছে এবার মেঘ কেটে সূর্য বেরিয়ে আসবে ঠিক তখনই আরও একটা কালো ভয়ঙ্কর মেঘ ভেসে এসে সব এলোমেলো করে দিয়ে গেছে বারবার। কলকাতায় আসার আগে খানিকটা উত্তেজনা ছিল। তুলি জীবনে এসে সেই উত্তেজনার স্রোতটাকে ত্বরান্বিত করেছিল আরও বেশি করে। তুলির চোখের পাতাতেই ভরদিয়ে স্বপ্ন এসে বসেছিল চন্দনের চোখের পাতায়। এখন শুধুই বুকভরা ক্লান্তিটুকু পড়ে আছে জীবনে। নীল আকাশের দিকে চাইলেও এখন মনে হয় এই বুঝি পশ্চিমের দিগন্ত জুড়ে কালো কালো মেঘ গুলো জমাট বাঁধবে। তারপর শুধুই ঝড় আর বৃষ্টি ছাড়া কিছুই থাকবে না।

ক্লান্ত চন্দন যখন চোখের পাতা খুলল তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল হব হব। খিদের চোটে পেটের ভেতরকার ইঁদুরটাও ডন দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে ভগবান জানেন। বাড়ির কাকু কাকিমা এখনো ফেরেনি। বিছানা থেকে উঠেই চোখে মুখে জল নিয়ে আবার জামা প্যান্ট পরে মোবাইলটা পকেটে ঢুকিয়েই বেরিয়ে পড়ে রাস্তায়। এতক্ষণে হয়তো আর কোনো হোটেলেই ভাত পাওয়া যাবে না। তবে ভাগ্যভাল হলে ছোটোবাজারের কাছে ‘আপনজন’ নামের যে হোটেলটা আছে সেখানে পাওয়া গেলেও যেতে পারে। অন্য হোটেলের দিকে আর না গিয়ে সোজা ‘আপনজনের’র পথে পা বাড়ায় চন্দন। হোটেলে ঢুকেই হটাৎ মনে পড়ে একবছর বাইরের দোকানে কিংবা হোটেলে খাওয়া চলবে না। একবছর কালাশৌচ। যেহেতু বাড়িতেই খাওয়ার ব্যবস্থা আছে তাই আর একবেলার জন্য বাইরে খেতে ইচ্ছে করে না চন্দনের। যতই খিদের চোটে চারদিকটা অন্ধকার হয়ে আসুক তবুও তো কিছু করার নেই। বাঙালীরা কিছু মানুক বা নাই মানুক আবেগে জড়ানো নিয়ম গুলো অন্তত মানার চেষ্টা করে যায়। এই আবেগ টুকুই তো আছে বাঙালীর। শেষ পর্যন্ত এক প্যাকেট বিস্কুট কিনেই বাড়ির পথে পা বাড়ায় চন্দন। কিছুদূর আসার পরেই ওর মনে হয়, ওই ঘরটাতে মোটেই ভাল লাগবে না এখন। তারচেয়ে বরং একবার ব্যারাকপুরের গান্ধীঘাটের দিকে গেলে কেমন হয় ? মন্দ হয় না। মনে মনেই গান্ধীঘাটেই যাবে বলেই ঠিক করে চন্দন।

গঙ্গার জলে পা’ডুবিয়ে বসে থাকতে যে চন্দনের খুব ভাল লাগছিল তা নয়। তবুও এখানে কীসের যেন একটা শান্তি বিরাজ করে। ছলাৎ ছলাৎ করে ছোট ছোট ঢেও গুলো চন্দনের পায়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ছিল। তখনো সন্ধ্যার কলকাতা জাঁকিয়ে বসেনি গঙ্গার ধারে। নদীর বুকে সন্ধ্যার পর্দা পড়তেই ভিড়টা ক্রমশ কমতে শুরু করে। এখন চন্দন ছাড়া তেমন কেওই নেই। সময় শেষ হয়ে এসেছে, ওকেও এবার ঘাটের বেরিয়ে আসতে হবে নতুবা গার্ড এসে পাঁচ রকম পাঁচটা কথা শুনিয়ে যাবে।

গলি রাস্তাটা পেরিয়ে এসে বড় রাস্তায় চড়তেই চন্দনের চোখ পড়ে চায়ের দোকানে বসে থাকা রোহিতের উপর। রোহিত হয়তো চন্দনকে দেখতে পায়নি। রোহিতের সঙ্গে আরও বেশ কয়েকটা ছেলে বসে বসে আড্ডা মারছে। চন্দন এদের কাউকেই চেনে না। রোহিতের বাড়িটা এদিকেই যেন কোথায় ছিল। ছেলে গুলো ওর পাড়ার বন্ধু হয়তো। চায়ের দোকানটার দিকে গেলে ফালতু ঝামেলা বাড়বে বলেই একটু ঘুর পথে হাঁটতে থাকে চন্দন। কিছুটা আসার পরেই শুনতে পায়, ‘চন্দন এই চন্দন’ বলে কে যেন পিছন থেকে ডাকছে। রোহিত নয় তো! প্রথমটায় চন্দন একটু ঘাবড়ে যায়। সেদিন কলেজে চন্দনের মার মুখবুঝেই সইতে হয়েছিল রোহিতকে। আজকে যদি নিজের এলাকায় একলা পেয়ে…। পিছন ফিরে তাকায় চন্দন।

‘কিরে এদিকে কোথায় এসেছিলি ?’ ঠিক চন্দনের পিছনে দাঁড়িয়েই কথাটা জিজ্ঞেস করে রোহিত।

কী বলবে প্রথমটায় বুঝে উঠতে পারে না চন্দন। একটু ভেবে বলে, ‘ঘরে বসে ভাল লাগছিল না তাই গঙ্গার ধারে এসেছিলাম।’

চন্দনের মাথার দিকে তাকিয়ে রোহিতের মুখটা কেমন যেন বিবর্ণ হয়ে যায়। চুপ করেই দাঁড়িয়ে থাকে রোহিত। চন্দন জিজ্ঞেস করে, ‘তুই এখানে কী করছিস ?’

‘আরে আমার তো এখানেই বাড়ি। জানতিস না ?’

‘হুম শুনেছিলাম কিন্তু ঠিক কোথায় জানতাম না।’

‘ও তাই বল। তা আমার উপর এখনো রেগে আছিস তাই না ? আসলে আমি কাজটাই এমন করেছিলাম যে,’ কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বলে, ‘ছাড় ওসব কথা, কী আর করা যাবে। যেটা করে ফেলেছি সেটা তো আর…’

‘তোর দোষ নেই। হয়তো তোর জায়গায় আমি থাকলে আমিও তেমন কিছুই করতাম। আসলে আমরা নিজের নিজের জায়গায় সবাই ঠিক।’

রোহিত চুপ করেই দাঁড়িয়ে থাকে। চন্দনকে ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। একটা ঠাণ্ডা বাতাস রোহিতের লম্বা চুল গুলোকে এলোমেলো করে দিয়ে যায়। খানিকটা রাস্তা দুজনে চুপ করেই এগিয়ে আসে। পথ চলতে চলতেই রোহিত মাঝে মাঝে চন্দনের মাথার দিকে তাকিয়ে দেখে।

‘যদি কিছু মনে না করিস তাহলে একটা কথা জিজ্ঞেস করতাম,’ চন্দনের মুখের দিকে তাকিয়েই কথা গুলো বলে রোহিত।

‘হাঁ বল না কী বলবি ?’

‘না মানে আমি জিজ্ঞেস করছিলাম তোর কিছু হয়েছে কি ?’

রোহিতের প্রশ্নটা ঠিক ধরতে পারে না চন্দন, ‘ঠিক বুঝলাম না।’

‘আমি জানতে চাইছিলাম তোর নাড়া মাথা কেন ?’

রোহিতের প্রশ্নটা শুনেই চন্দনের মুখটা কেমন যেন থম থমে হয়ে যায়। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, ‘কদিন হল মা মারা গেছে।’

রোহিত এমনই কিছু একটা উত্তর আসা করেছিল। তবুও সরাসরি প্রশ্নটা করে ফেলার জন্য ওর নিজেরেই কেমন যেন একটা লাগে। বেশ কিছুক্ষণ চুপ থাকার পরে বলে, ‘কারু কাছেই তেমন কিছু শুনিনি তো, সরি রে তোকে হয়তো কষ্ট দিয়ে ফেললাম।’

‘না না এতে কষ্ট পাবার আর কী আছে। কষ্ট যা পাবার সেটা তো এমনিতেও পেতেই হবে। আসলে খবরটা কেওই তেমন জানত না। আমার কথা ছাড় তোর খবর কী বল।’

‘আমার আবার খবর। ওই চলচে।’ উদাসীন ভাবে রোহিত দূরের লাইট গুলোর দিকে তাকিয়ে কথাটা বলে। বেশ কিছুক্ষণ আবার দুজনাই চুপচাপ। রোহিত একবার ভাবে তুলির কথা জিজ্ঞেস করবে কিন্তু পারে না। আসলে ও যা করেছে তারপর আর কিছু জানতে চাওয়াটা ওর মুখে মানাবে না।

‘জানিস চন্দন এমনটাও হতে পারে কল্পনাও করিনি। তোর আর তুলির কাছে আমি সারাটা জীবন অপরাধী হয়ে থেকে যাব। আসলে তখন যে কী হয়েছিল আমার ভগবান জানে।’

চন্দন কিছু না বলে চুপচাপ চলতে থাকে। এখন আর ঐসব নিয়ে আলোচনা করেই বা কী হবে। যা হবার তা তো হয়েই গেছে। এখন আর আপসোস করেও কোনোলাভ নেই। রোহিত আপসোস করলেই যে তুলিকে ওর বাড়ির লোক আবার কলেজে পাঠাবে সেটা তো নয়। তবে রোহিতের এই রূপটা দেখে চন্দনের কোথাও যেন একটা ভালোলাগে। আজকে গঙ্গার দিকে না এলে হয়তো চন্দন কোনোদিন জানতেই পারত না রোহিতের ভেতরেও একটা ভাল মানুষ বাস করে।

‘আমার বাস আসছে পরে কলেজে কথা হবে। আজকে চলি। নতুবা ফিরতে অনেক দেরি হয়ে যাবে।’

রোহিত কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল কিন্তু চন্দন কথাটা শেষ করেই ছুটে গিয়ে বাসে চেপে পড়ে। জনবহুল ব্যারাকপুরে রোহিত একাই দাঁড়িয়ে থাকে। আজকে ওর নিজেকে অনেকটা হালকা লাগছে। ভেতরে ভেতরে কোথাও যেন একটা পাপ বোধ কাজ করত। আজকের পর সেটা কিছুটা হলেও হয়তো কমে যাবে।

বাস থেকে নেমে ঘরে ফেরার পথে বেশ কিছুটা আসার পরেই চদনের চোখ পড়ল দুটো ছেলে মেয়ের উপর। দুদিকে বিনুনি বাঁধা সাদা-সবুজ পোশাকের মেয়েটা যে স্কুলের ছাত্রী সেটা বুঝতে পারলেও চন্দন ছেলেটার বয়সটা ঠিক আন্দাজ করতে পারল না। এখনো বাড়ি ফেরেনি মেয়েটা! স্কুলের পরেই টিউশন ছিল হয়তো বা। চন্দন ওদের দিকে তকিয়ে মনে মনে একবার হাসে। কেবল মাত্র যারা প্রেমের পাকে পড়ে ছট ফট করছে তারাই শুধু জানবে এই হাসিটার গভীর মানেটুকু। ছেলে মেয়েটা আপন খেয়ালে ফড়িং ফড়িং মন নিয়ে তিড়িং বিড়িং করতে করতে একটা গলির ভেতর ঢুকে পড়ে। চন্দন ওদের দিকে শেষ বারের মতো একবার তাকিয়ে নিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার চলতে থাকে হালকা হলুদ আলোয় মোড়া ফুটপাতের উপর দিয়ে।

বাংলা সেরা প্রেমের উপন্যাস

                      ।।১২।।

এই কয়েকটা দিনেও চন্দন আর কলেজে যায়নি। গল্প উপন্যাস কবিতার বই পড়েই কয়েকটা দিন কাটিয়ে দিয়েছে। বাইরেও তেমন ভাবে ঘুরতে যায়নি এই কয়েকটা দিনে। পড়ার ফাঁকে যতটুকু সময় পেয়েছে বাড়ির কাকিমার সাথেই গল্পকরে কাটিয়েছে। জয়ি অবশ্য ফোন করে কলেজে যাবার জন্য বলছিল বারবার কিন্তু চন্দনের ইচ্ছে করেনি। হতে পারে এই সময়টা ও একটু নিজেকে গুছিয়ে নিতে চায়। পরীক্ষা দেবার মতো মানসিকতাও এখন ওর নেই। বাড়ির কাকিমা যখন কলেজ যাবার কথা জিজ্ঞেস করেছে তখন চন্দন বলেছে, ‘কী হবে কলেজে যেয়ে! আজকে পশ্চিম বাংলায় প্রায় এককোটি শিক্ষিত বেকার। তাছাড়া দুদিন বাদে আমাকে তো এমনিই পড়া ছেড়ে কিছু না কিছু একটা করতে হবে।’ চন্দনের মুখের দিকে তাকিয়ে কাকিমা আর কিছুই বলতে পারেননি। শুধু অবাক হয়েছেন চেনা ছেলেটার মুখে অচেনা কথাগুলো শুনে। একদিন একবুক স্বপ্নের পাখি গ্রাম থেকে ধরে এনে কলকাতার আকাশে উড়িয়েছিল যে ছেলেটা সেই আজকে জীবন গাড়ির চাকায় মাড়িয়ে যেতে যেতে স্বপ্ন দেখতেই ভুলে গেছে।

বিকেলের দিকে আকাশটা কেমন যেন গুম মেরেছিল। হয়তো সন্ধ্যা-রাতের দিকে বৃষ্টি হলেও হতে পারে। তবুও চন্দন বেরিয়ে পড়ল। কোথায় যাবে কিছুই ঠিক নেই। যেদিকে দুচোখ টানবে সেদিকেই যাবে আজকে। তবে গঙ্গার দিকে নয়। গঙ্গার দিকে তাকিয়ে থাকলে কেন যেন কান্না পায় চন্দনের। এলোমেলো ভাবনা গুলোকে নাড়াচাড়া করতে করতেই হাঁটতে থাকে চন্দন। হটাৎ পকেটে রাখা মোবাইলটা বাজতে শুরু করে। অন্যমনস্ক ভাবেই ফোনটা ধরে চন্দন, ‘হ্যালো।’

‘একবার দেখা করতে পারবি চন্দন ? খুব আর্জেন্ট দরকার আছে।’ মোবাইলের ওপার থেকে জয়ির গলা ভেসে আসে। ওর গলাটা কেমন যেন কাঁপছে। একটা চাপা কান্না যেন জয়ির গলায় দলা পাকিয়ে আঁটকে আছে।

‘কেন কী হয়েছে ? বাড়ির কারু কিছু…?’ চন্দনের গলাটাও ভাবনায় ভারী হয়ে আসে।

‘না না বাড়ির সবাই ঠিকেই আছে। তুই একবার দেখা কর না প্লিজ…’ পরের কথা গুলো আর বুঝতে পারে না চন্দন। ফেঁপে ফুলে ওঠা কান্নায় জয়ির কথা গুলো কোথায় তলিয়ে যায়।

‘আরে কাঁদছিস কেন! কী হয়েছে বলবি তো নাকি। হ্যালো, হ্যালো। শুনতে পাচ্ছিস ? হ্যালো, হ্যালো…’ ফোনটা কেটে দিয়েছে জয়ি।

রাস্তার ধারের একটা গাছে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে চন্দন। ভয়ে বুকটা যেন কেমন কেমন তিরতির করে কাঁপতে থাকে। আবার কারু কিছু…! ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলেই ভয় পায়। এদিকে পশ্চিমের আকাশেও কালো করে মেঘ ধরেছে। মাঝে মাঝে এক একটা বিদ্যুতের ঝলক দেখা যাচ্ছে অনেক দূরের আকাশে। খানিক বাদেই হয়তো বৃষ্টি নামবে ঝমঝম করে। আজকে চন্দন ভিজবে বৃষ্টিতে। আজকে ওকে বৃষ্টিতে ভিজতেই হবে। হটাৎ গুড়ুম করে একটা শব্দ হতেই চমকে ওঠে চন্দন। কাছে পিঠেই কোথাও বাজ পড়ল হয়তো। গাছের তলার থেকে সরে এসে একপা একপা করে চলতে থাকে। পশ্চিমের আকাশটার চেয়েও বেশি ঘন কালো মেঘ জমে উঠছে এখন ওর মনের আকাশে।

জয়ির বাড়ি ঢোকার আগেই শুরু হল ঝমঝম করে বৃষ্টি। কালো পর্দা আঁটা রাস্তার উপর বৃষ্টির ফোটা গুলো নাচতে শুরু করল আপন মনে। আজকে ওদের দিন। আজকে ওরা মুক্ত মনে নাচ করে যাবে। জয়ির বাড়ির কাছে আসতেই চন্দন দেখতে পায় বাড়ির গ্রিলের সামনে দাঁড়িয়ে চন্দনের অপেক্ষায় জয়ি ভিজছে। তবে কী আজকে ওরও ভেজার দিন! হবে হয়তো। আজকে কলকাতা অন্ধকারে ডুবে গেছে। আজকে কলকাতা ব্যস্ততা হারিয়েছে। আজকে কলকাতাও ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়বে অনেক আগেই। আজকের এই বৃষ্টিতে কিছু মানুষ শুধু ভিজবে। যাদের হয়তো ভেজার কথা ছিল না।

একলা রাস্তার উপর চন্দনকে দেখতে পেয়েই ছুটে এগিয়ে আসে জয়ি। ও এখনো দুচোখের বৃষ্টিতে ভিজে যাচ্ছে। চন্দনের চোখেই শুধু কোনো বৃষ্টি নেই। আবার কোথাও যেন বাজ পড়ল আরেকটা। পড়ুক আজকে যত খুশি বাজ পড়ুক। এই বৃষ্টি যখন আর কিছুতেই থামবে না তখন বাজ গুলো কেন বাকি থেকে যায়।

চোখ মুখের জল দুহাতে মুছে জয়ি বলে, ‘চল আজকে তোকে সেই জঙ্গলটায় নিয়ে যাব।’

‘এই অন্ধকারে ?’

‘হাঁ অন্ধকারেই যাব আজকে। তোকেও আমার সঙ্গে যেতে হবে।’

চন্দন জয়ির কথার মাথা মুণ্ডু কিছু বুঝতে না পেরে স্ট্যাচুর মতো দাঁড়িয়ে থাকে। জয়িকে যেন কেমন অন্যরকম লাগছে আজকে। একটা অপঠিত ভয় চন্দনের চোখে মুখে ফুটে ওঠে। জয়ি চন্দনের মনের অবস্থা বুঝতে পেরে বলে, ‘ভয় নেই চল। ওখানে গিয়েই সব বলব।’

চন্দন আমতা আমতা করে বলে, ‘কিন্তু এখন তো অন্ধকার হয়ে এসেছে তার উপর আবার এমন বৃষ্টি।’

‘আজকে বৃষ্টি অন্ধকার দুটোরেই খুব দরকার ছিল চন্দন।’

‘প্লিজ হেঁয়ালি না করে বল তো ঠিক কী হয়েছে ?’

‘বললাম তো ওখানে চল। আরও অন্ধকার হয়ে আসুক আরও বৃষ্টি হোক আজকে।’

‘পাগলের মতো কথা বলিস না তো। এই দুর্যোগের সময় জঙ্গলে যাবি! ইয়ার্কি নাকি।’ বেশ বিরক্তির সুরেই কথা গুলো বলে চন্দন।

চন্দনের বিরক্তিতে বিন্দুমাত্রও বিচলিত হয় না জয়ি। চন্দনের চোখের দিকে তাকিয়ে শুধু বলে, ‘তুই ইচ্ছে হলে আসিস। না হলে ফিরে যাস। আমি গেলাম।’

‘আমি গেলাম মানে ?’

চন্দনের প্রশ্নের উত্তর না দিয়েই চলতে থাকে জয়ি। বাধ্য হয়েই চন্দনকেও পিছু নিতে হয়। পাকা রাস্তাটা দিয়ে কিছুটা এগিয়ে গেলেই ডান হাতে করে একটা কাঁচা রাস্তা নেমেছে। রাস্তাটা সোজা চলে গেছে ওই পুকুরটার দিকে। চন্দন জয়ির পিছনে পিছনে হাঁটতে থাকে। অন্ধকার আর বৃষ্টির আড়ালে রাস্তাটা তেমন বোঝা যাচ্ছে না। তবুও জয়ি হন হন করে হেঁটে যাচ্ছে পুকুরটার দিকে। পুকুরটা পেরিয়ে গেলেই এক চিলতে জঙ্গল। চন্দনের ভেতরকার দুশ্চিন্তা গুলো বুদ্বুদের মতো উঠছে আর ফেটে যাচ্ছে বারবার। কী বলবে জয়ি ? কী এমন কথা থাকতে পারে যার জন্য এই বৃষ্টিতে ভিজে অন্ধকারে শরীর ঢেকে জঙ্গলের দিকে নিয়ে যাচ্ছে চন্দনকে ? হাঁটতে হাঁটতে জয়ি আর একটাও কথা বলছে না। অন্ধকার যেন ক্রমশ জাঁকিয়ে বসছে কাঁচা রাস্তাটার দুপাশে। চারপাশ জুড়ে একটা সোঁদা মাটির গন্ধ ভেসে এসে নাকে ঝাপটা মেরে যাচ্ছে বারবার। থেকে থেকে বিদ্যুতের যে ঝলক ফুটে উঠছে তাতেই রাস্তাটুকু দেখা যাচ্ছে একবার করে। পুকুর পাড়ের উপর এসে দাঁড়িয়ে পড়ে জয়ি। ক্রমশ বৃষ্টিতে ভিজেতে ভিজতে দুজনেরেই এবার বেশ ঠাণ্ডা লাগছে। জয়ি এগিয়ে এসে চন্দনের বাঁ হাতটা ধরে টেনে নিয়ে গিয়ে একটা সিমেন্টের বেঞ্চের উপর বসিয়ে দেয়। নিজেও বসে পড়ে চন্দনের পাশেই। পুকুরের জলে বৃষ্টির ঝমঝম শব্দের সাথে তাল মিলিয়ে এবার কয়েকটা ব্যাং কোঁক ক্যাঁক করে ডাকতে শুরু করে।

‘আমি তোকে এখানে কেন নিয়ে এলাম ? কী এমন বলার আছে আমার ? এই সবেই ভাবছিস তাই তো ?’ এতক্ষণে মুখ খুলল জয়ি।

‘তা ভাবনাটা কী স্বাভাবিক নয় ?’ চন্দন জিজ্ঞেস করে।

‘তোকে এখানে ডেকে আনার কী কী কারণ হতে পারে বলে তোর মনে হয় ?’

‘তেমন কিছুই মাথায় আসছে না।’

‘তাও। আন্দাজে।’

‘আন্দাজ করতে পারছি না তো।’

‘আমার তোকে অনেক কিছু বলার ছিল সেগুলো আর কোনোদিনেই বলা হবে না। কিছু কথা না বলা থেকে যাওয়াই মনে হয় ভাল। তোর কী মনে হয় ?’ জিজ্ঞেস করল জয়ি। অন্ধকারে চন্দনের মুখটা ঠিক বোঝা গেল না।

খানিক চিন্তা করে চন্দন বলে, ‘তোর যদি তেমন কিছু বলার থাকে তুই বলতে পারিস।’

‘না আমি নিজের কথা বলার জন্য তোকে এখানে আসতে বলিনি। যা বলা হল না সেগুলো আমার ভেতরেই থাক। তোকে যা বলার জন্য ডেকেছি সেটা যদিও শোনার মতো এখন তোর মানসিক অবস্থা নয় তবুও তোকে শুনতেই হবে। যদি এটা সিনেমা হত তাহলে পরিচালক হয়তো আমার কথা গুলো গল্পের ক্লাইম্যাক্সের জন্য ছেড়ে দিতেন।’

‘জয়ি বারেক্কে বৃষ্টিটা বাড়ছে তাই যা বলবি…’

চন্দনকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই জয়ি বলে, ‘বৃষ্টিটা আরও বাড়বে চন্দন। থামবে না হয়তো কোনোদিন। আসলে ভেবেই পাচ্ছি না কীভাবে বলব কথা গুলো।’ কথা গুলো বলেই জয়ি মুখে দুহাত চাপা দিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে। চন্দন কী করবে ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। ব্যাং গুলো তখনো তেমন ভাবেই ডেকে যাচ্ছে। বৃষ্টি ছাড়ারও সম্ভাবনা নেই। চন্দন কোনো রকমে পকেটের ভেতর হাত ঢুকিয়ে মোবাইলটাকে বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচিয়ে রেখেছে। একটু কেশে গলাটাকে স্বাভাবিক করে নিয়ে জয়ি বলে, ‘আজকে তুলির মা এসেছিলেন।’

কথাটা শুনেই চন্দনের বুকটা ধড়াস করে উঠে। বুকের ভেতরে যেন একটা বিদ্যুতের ঝিলিক খেলে যায়। ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘হাঁ তারপর। তা তোর বাড়ির ঠিকানা জানলেন কেমন করে ?’

‘আমাকে ফোন করে জিজ্ঞেস করেছিলেন।’

‘কী বললেন উনি ? তুলির বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে এটাই তো ?’

‘তাহলে হয়তো কষ্ট পেতাম কিন্তু দুঃখ পেতাম না।’

‘মানে ?’

‘কিছু না। তুই তুলিকে নিয়ে দূরে কোথাও চলে যা চন্দন।’ কথাটা বলেই জয়ি আবার কাঁদতে থাকে। এখনো কিছুই চন্দনের কাছে পরিষ্কার হয়নি। বাইরের বৃষ্টি আর ভেতরের বৃষ্টিতে সব কেমন যেন ঝাপসা হয়ে আছে। জয়ি যে ঠিক কী বলতে চাইছে বুঝতে পারে না চন্দন। বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে ঠাণ্ডায় দাঁতে দাঁত লেগে যাচ্ছে। আবার একটা তীব্র আলোর ঝলক সঙ্গে সঙ্গে মেঘটা গুড় গুড় করে ডেকে ওঠে। চন্দনের যেন কেমন একটা ভয় ভয় করছে এবার। এমন অন্ধকার ঝড় বৃষ্টির রাতে জয়ি কী গোপন কথা বলবে ? আর তো হারানোর কিছুই নেই। সব তো গেছে। আজকে আবার নতুন করে কী হারানোর ভয় দেখাচ্ছে জয়ি! চন্দন জয়ির কাঁধটা ধরে একটা ঝাঁকুনি দেয়। জয়ি তখনো একই রকম ভাবে কেঁদেই চলেছে।

‘জয়ি রাত হয়ে আসছে। আমি ফেরার বাস পাব না। তোর বাড়িতেও চিন্তা করবে। যা বলবার কালকে সকালে না হয় বলিস।’

মুহূর্তে জয়ি নিজেকে সামলে নিয়ে বলে, ‘সবার জীবনে সকাল আসেনা চন্দন! তাই আর সকাল নয়। সকালের অপেক্ষা করলে অনেক দেরি হয়ে যাবে।’

‘তাহলে কী বলবি সেটা তো বল। সেই কখন থেকে কেঁদেই যাচ্ছিস।’ আবার বেশ বিরক্ত হয়েই এবার কথা গুলো বলে চন্দন। ভেতরে ভেতরে সহ্যের বাঁধটা এবার ভেঙে যাচ্ছে। নিজের মনটাকে শক্ত করে চন্দন। অনেক বড় কিছু শোনার জন্যে প্রস্তুত এখন ও।

কিন্তু জয়ি খুঁজে পায় না কীভাবে কথা গুলো চন্দনকে বলবে। আজকে যদি কেও জয়িকে বলত চন্দনকে প্রপোজ করার জন্য তাহলেও হয়তো এতবার ভাবতে হত না জয়িকে। চন্দনের একটা হাত নিজের বাঁহাতে শক্ত করে চেপে জয়ি বলে, ‘ম্যালিগন্যান্ট গ্লিওমাস নাম শুনেছিস ?’

‘না শুনিনি। কী ওটা ?’ জিজ্ঞেস করে চন্দন।

‘বিশ্বের ভয়ঙ্কর ব্রেন ক্যান্সারের একটা। এর চিকিৎসা হয় না বললেই চলে।’ কথাটা বলেই জয়ি আরও শক্ত করে চন্দনের হাতটা চেপে ধরে। দুজনেই বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ। কারু মুখ দিয়েই আর কোনো কথা বেরিয়ে এল না কয়েক মিনিট।

ডানহাতে করে চোখের জল মুছে জয়ি আবার বলে, ‘ভাইরাল থেরাপি চিকিৎসার মাধ্যমে রুগীকে কয়েক মাস বাঁচিয়ে রাখা গেলেও ভাইরাল থেরাপি সবাই সহ্য করতে পারে না। তাতে অনেক সময় দ্রুত বিপদের সম্ভাবনা বেড়ে যায়।’

জয়ির কথা গুলো যেন চন্দনের কানের ভেতর ঢুকছেই না। কে যেন প্রবল শক্তিতে ওর কান দুটো চাপা দিয়ে রেখেছে। বৃষ্টির ঝাপটা এসে লাগছে বারবার চোখে মুখে। জয়ি বুঝতে পারে চন্দন ভেতরে ভেতরে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। ইচ্চে করেই জয়ি খানিক সময় দেয় চন্দনকে সামলে নেবার। কিন্তু ওকে তো আজকে বলতেই হবে। চন্দন যত তাড়াতাড়ি নিজেকে সামলে নেয় ততই মঙ্গল। কিন্তু সত্যিই কী চন্দন নিজেকে সামলে নিতে পারবে কোনোদিন ? এটা না হয় প্রশ্ন হয়েই থেকে যাক।

‘তুলির মা আমার হাতে পঞ্চাশ হাজার টাকা দিয়ে গেছেন। তোর দরকার মতো আরও দেবে বলেছেন। তবে উনি চান না তুলি কিছু জানুক। এমন কী তোদের চলে যাওয়ার কারণ যে অন্যকিছু সেটাও যেন তুলি জানতে না পারে। তুলির বাড়ির অন্যান্যরাও কিছুই জানে না। জেনেও লাভ নেই। এই কয়েকটা মাস তুই যদি তুলিকে একটা নতুন জীবন…’

‘প্লিজ প্লিজ জয়ি তুই দয়া করে তোর মুখটা একটু বন্ধ কর। আমার মাথাতে কিছুই ঢুকছে না। কী সব বলছিস তুই এগুলো! আমার যে খুব ভয় করছে জয়ি। খুব কান্না পাচ্ছে যে আমার। একটু চুপকর আমার কিছুই শুনতে ভাল লাগছে না এখন।’ কান্নাভেজা গলায় কথা গুলো বলে চন্দন।

‘কিন্তু!’

‘আর কিন্তুর জন্য কী বাকি আছে। সবেই তো শেষ। দুদিন আগে মাকে চোখের সামনে তিল তিল করে মরতে দেখলাম আজকে তুই বলছিস একই রকম ভাবে তুলিকেও’ একটু দম নিয়ে বলে, ‘অসম্ভব। অসম্ভব আমি পারব না। কিছুতেই পারব না।’ জয়ির হাতের থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে খানিকটা দূরে গিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে চন্দন। জয়ি চন্দনের মুখটা দেখার চেষ্টা করে। অন্ধকার আর বৃষ্টিতে কিছুই দেখা যায় না।

‘কালকে তুলিদের বাড়িতে কেও থাকবে না। তোকে যেমন করেই হোক তুলিকে বুঝিয়ে বাড়ি ছাড়তে রাজি করাতে হবে। কিন্তু তুলি যেন কোনোদিনেই জানতে না পারে ওর কী হয়েছে। কোনোদিনেই যেন জানতে না পারে ওর বাড়ি ছাড়াতে ওর মা সাহায্য করেছিল। তাতে হয়তো…’ আর কথাগুলো শেষ করতে পারে না জয়ি।

‘তুই কেন আমাকে জোর করছিস জয়ি। আমি তো বলছি আমি পারব না।’ কাঁদতে কাঁদতেই কথাগুলো বলে চন্দন।

‘কাঁদার জন্য সারাটা জীবন তো পড়ে রইল চন্দন। এই কয়েকটা মাস না হয় একটু নকল হাসিই হাসিস। তাতে অন্তত শেষ কয়েকটা দিন তুলি…’

‘আমার সাথেই কেন এমন হয় জয়ি। আমি তো কোনোদিন কারু ক্ষতি করিনি। তবুও ভগবান কেন আমার সাথেই এমন খেলা বারবার খেলেন।’ চন্দনের কান্নার শব্দ বৃষ্টির শব্দকেও যেন ছাপিয়ে যায়। জয়ি চন্দনকে সান্ত্বনা দেবার মতো কোনো কথাই খুঁজে পায় না। শুধু চন্দনের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে অনেক দূরের আলো গুলোর থেকে কিছু একটা খোঁজার চেষ্টা করে। বৃষ্টিটা যেন আরও বাড়ছে। কিন্তু আর ঠাণ্ডা লাগছে না কারুরেই।

‘জানিস জয়ি অনেকের জীবনটাই এমন যে ইচ্ছে না থাকলেও নকল হাসি হেসেই অন্যের হাসি কুড়িয়ে আনতে হয়। যতই বলি না কেন আমি পারব না। তবুও তুলির এক টুকরো হাসির জন্য আমাকে পারতেই হবে। তুই বুঝবি নারে মানুষ কতটা অসহায় হলে এমন নকল হাসি হাসে। হাসব আমিও হাসব। এই তো দেখ না হাসছি। আর তো কাঁদার মতোও কিছুই রইল না।’ কথা গুলো বলেই কাঁদতে কাঁদতে বৃষ্টি ভেজা মাটির উপরেই লুটিয়ে পড়ে চন্দন। চন্দনের পাশে দাঁড়িয়ে জয়িও ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে।

একটা ঝড় পার হতে না হতেই আরেকটা ঝড় এসে চন্দনের সামনে দাঁড়িয়ে গেছে। ওর এখন ভেঙে পড়লে চলবে না। ওকে এই কয়েকটা মাস নিখুত অভিনয় করে যেতে হবে। এই কয়েকটা মাস তুলির সঙ্গে কাটিয়ে জীবনের বাকি পথ টুকুর জন্য অনেক এ্যালবাম সাজিয়ে রাখতে হবে। তারপর যখন আর তুলি থাকবে না তখন শুধু ওই এ্যালবামে মুখ গুঁজে পড়ে থাকবে চন্দন। হয়তো সেদিনও আরও একটা বৃষ্টির রাতে জয়ি এমন ভাবেই পাশে এসে দাঁড়িয়ে বলবে, ‘কাঁদার জন্য সারাটা জীবন তো পড়ে রইল চন্দন। এই কয়েকটা মাস না হয়…।’ কিন্তু চন্দন! ও শুধু একলা একলা বৃষ্টিতে পুড়ে পুড়ে শেষ হয়ে যাবে। কেও দেখতেও পাবে না। কেও জানতেও পারবে না কোনোদিন। ঠিক যেমন ভাবে একলাই পুড়ছে জয়ি। হয়তো সারাজীবন ওকেও একলাই পুড়তে হবে চন্দনকে ভালবাসার অপরাধে। আমারও জানা নেই ঈশ্বর চন্দন আর জয়ির জন্য কী লিখে রেখেছেন। তবে কেন জানি না বারবার মনে হচ্ছে তুলির জীবনে হটাৎ করে ক্যান্সার নামক সুনামির আছড়ে পড়ায় চন্দন আর জয়ির জন্য কোথাও একটা আশার আলো জ্বালিয়ে দিয়ে গেল। কিন্তু তুলি ? ওর তো অকালে ঝরে পড়ার কথা ছিল না। তুলিও তো চন্দনকে বুকে আগলেই বাঁচার স্বপ্ন দেখেছিল। স্বপ্ন দেখেছিল একটা ছোট্ট পরিবারের। ওর তো সব মিথ্যে হয়ে যাবে আর কয়েকটা মাস পরেই। আর পাঁচ জনের মতো আমিও নীরব দর্শক মাত্র। তুলিকে একটা জীবন দেবার মতো সাধ থাকেও সাধ্য আমারও নেই। সব শেষে আমিও শুধু এটুকুই বলতে পারি, সব প্রেমে বৃষ্টি শুধু ভেজায় না কোনো কোনো প্রেমে বৃষ্টি কান্না হয়ে পুড়িয়ে দেয়।

{প্রেমের উপন্যাসটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ}

আমাদের ওয়েবসাইট premergolpo.com এর তরফ থেকে আপনার জন্য অনেক অনেক শুভেচ্ছা ও ভালবাসা রইল।

মন বনাম শরীর

ছোট প্রেমের গল্প

End

This website uses cookies.