X

নেকড়ে মানব

নেকড়ে মানব

নেকড়ে মানব

                                    বাপ্পাদিত্য মুখোপাধ্যায়

প্রতিবারের মতো এবারেও বর্ষার জল জঙ্গলের পুকুর দুটোতে জমা হতে না হতেই আগমন হল ওদের। রাতের অন্ধকারে ঘরের ভেতর থেকেই উধাও হতে শুরু করল ছাগল ভেড়া। এই সব প্রান্তিক গ্রামগুলোতে সন্ধা নামলে বাইরে তেমন কাউকে দেখা যায় না। নটা বাজতে না বাজতেই ঘুমিয়ে পড়ে পাড়াটা। তারপর যখন সবাই ঘুমের গভীরে, তখন ওরা নিঃশব্দে আসে…

আমাদের গ্রামে এখনো বিদ্যুৎ আসেনি। বারান্দায় বসে হ্যারিকেনের পাতলা আলোতে শরৎচন্দ্রের ‘শ্রীকান্ত’ পড়ছিলাম। বাবা; মা; ঠাকুমা; ভাই সবাই ঘুমিয়ে গেছে ঘণ্টা খানেক আগেই। আমি একা একা হাঁটছি শ্রীকান্ত আর ইন্দ্রনাথের সঙ্গে। উপন্যাসটা পড়তে এতটাই ভাল লাগছে যে, আমার ইচ্ছে করছে না ঘুমোতে যেতে। এখন মাছ চুরি করতে যাচ্ছে শ্রীকান্ত আর ইন্দ্রনাথ। টানটান উত্তেজনা বুকের ভেতর। ঠিক এমন সময় কিসের যেন একটা বিচ্ছিরি গন্ধ পেলাম। প্রথমে ভেবেছিলাম ইঁদুর কিংবা টিকটিকি পচার হবে হয়তো। কিন্তু খানিক বাদেই বুঝতে পারলাম, গন্ধটা চেনা গন্ধ নয়। ইঁদুর বা টিকটিকি পচার তো হতেই পারে না।

বইটা বন্ধ করে বেশ জোরে জোরে কবার নিঃশ্বাস নিলাম। হ্যাঁ, বেশ ভুরভুর করে আসছে গন্ধটা। কিন্তু কিছুতেই বুঝতে পারলাম না গন্ধটা কিসের। হঠাৎ আমার চোখ পড়ল বাড়ির বেড় দেওয়া ভাঙা প্রাচীরটায় উপর। মনে হল ছায়ামূর্তির মতো কিছু যেন একটা বসে রয়েছে প্রাচীরটায়। অন্ধকারে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে না। হ্যারিকেনটাকে সামনে এনে দেখার চেষ্টা করলাম। তবুও দেখা গেল না।

কয়েক মিনিট চুপচাপ বসে থাকার পর হঠাৎ করেই বাড়ির উঠোনে নিঃশব্দে নেমে এলো ছায়ামূর্তিটা। এবার হ্যারিকেনের আধমরা আলোতেও বেশ পরিষ্কার দেখতে পেলাম প্রাণীটাকে। বুঝতে পারলাম আমাদের বাড়ির ছাগলটাকে তুলে নিয়ে যাওয়ার জন্যেই এসেছে নেকড়েটা। হ্যারিকেনের হালকা আলোতেও ঝকঝক করছে ওর দাঁতগুলো।

কয়েক মিনিট ভয়ে জড়সড় হয়ে শ্বাপদটার দিকে চেয়ে বসে রইলাম। ভয়ে আমার গলাটা শুকিয়ে এসেছে। কাউকে ডাকার মতো ক্ষমতা নেই এখন।কেন যেন মনে হচ্ছে, নেকড়েটা ছাগলটাকে নয় আমাকে দেখছে। বসে বসেই খানিকটা পিছিয়ে ঘরে ঢোকার চেষ্টা করলাম আমি।

নেকড়েটাও এগিয়ে এলো কয়েক পা । হ্যারিকেনের আলোয় ওকে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে এবার। সাইজ কুকুরের চাইতেও অল্প বেশি। অনেকটা পাহাড়ি কুকুরের মতো। গোটা গায়ে ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া কালো লোম। বোটকা একটা গন্ধে মম করছে বাড়িটা। ওর দৃষ্টি আমার উপর। হয় আমাকে আক্রমণ করার কথা ভাবছে নয় তো হ্যারিকেনটাকে ভয় পাচ্ছে। আমি ঘামছি ভেতর ভেতর। এত সামনে থেকে মৃত্যু এর আগে কখনো দেখিনি।

নেকড়েটা আরও এক পা এগিয়ে এলে আমি শক্ত করে হ্যারিকেনের সরু হাতলটা ধরলাম। নেকড়েটাও থমকে দাঁড়াল এবার। তারপর পিছন দিকে মুখ ঘুরিয়ে কিছু যেন একটা বোঝার চেষ্টা করল। ঠিক এমন সময় আমাদের বেড়ের বাইরে থেকে, ‘আ-উ-হ্-হ্-হ্-উ-উ…’ শব্দে ডেকে উঠল আরেকটা নেকড়ে। বাবার ঘুমটা ভেঙে গেল ওই শব্দে। কিন্তু বাবা বাইরে বেরিয়ে আসার আগেই পালিয়ে গেল নেকড়েটা। প্রাচীরের যে ভাঙা জায়গাটা দিয়ে ঢুকেছিল সেই জায়গাটা দিয়েই বেরিয়ে গেল জন্তুটা।

[দুই]

পরদিন ভোরে ঘুমটা ভাঙল পাশের বাড়ির সাঁওতাল বৌয়ের কান্নার আওয়াজে। বুঝতে পারলাম গতরাতে হয়তো ওদের ছাগল কিংবা ভেড়া তুলে নিয়ে গেছে নেকড়েতে। ওদের মতো গরীব মানুষের কাছে একটা ছাগল বা ভেড়া যথেষ্ট মূল্য রাখে। চৈত্র-বৈশাখ মাসে যখন জলের অভাবে কোথাও কাজ জোটে না ? তখন ওরা ওই ছাগল-ভেড়া বেচেই সংসার চালায়।

ওরা ঘরে দেশি মদ বানায় বলে গন্ধে কেউ ওদের বাড়ি যেতে চায় না। তবুও শেষ পর্যন্ত বৌটার কান্নার আওয়াজে থাকতে না পেরে মা একবার গেল ওদের বাড়ি। ফিরে এলো মিনিট কয়েকের ভেতর। মায়ের মুখটা দেখেই বুঝতে পারলাম বড়সড় কিছু একটা হয়েছে। হাঁপাচ্ছে মা। কথা বলার শক্তিটুকুও নেই। মাকে কিছু জিজ্ঞেস না করেই আমি ওদের বাড়ি ছুটলাম। বেশ ভিড় জমেছে ওদের বাড়িতে।

গিয়েই যা দেখলাম আর শুনলাম সেটা কোনওদিন ভোলার মতো নয়। ওদের ঘর ঢুকেই সবার চোখ যেদিকে সেদিকে তাকাতেই দেখতে পেলাম, ঘরের ভেতর থেকে উঠোন পর্যন্ত টাটকা রক্তের দাগ। বৌটার সাত মাসের বাচ্চাটাকে তুলে নিয়ে গেছে নেকড়েতে। টিনের কপাটের ফাঁক দিয়েই ঘরে ঢুকেছিল নেকড়েটা। ছাগল ভেড়া যেমন ছিল তেমন আছে। ওদের কোনও ক্ষতি হয়নি। এতক্ষণে বুঝতে পারলাম, একটা নেকড়ে যখন এদের ঘরে কাজ করছিল তখন আরেকটা নেকড়ে পাহারা দিচ্ছিল আমাকে।

খবরটা আতঙ্কের মতো এই গ্রাম থেকে ওই গ্রাম ছড়িয়ে পড়ল। অনেকেই সত্যমিথ্যা জানার জন্য এলো আমাদের গ্রামে। দুপুরের দিকে এলো পুলিশ আর ফরেস্টের লোক। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সমাধান কিছুই হল না।

সারা গ্রাম জুড়ে ঘনান্ধকার আতঙ্কের ছায়া নেমে এসেছে আজ। দিনের আলোতেও সব কেমন যেন থমথমে। একা একা ঘুরছে না কেউ। ফরেস্টের লোক জানিয়ে গেছে নেকড়ে ধরার মতো মজবুত নেট ওদের কাছে নেই। নেটের জোগাড় করতে আরও কটা দিন সময় লাগবে। কিন্তু কটা দিন অপেক্ষা করার মতো সময় কোথায় ? তাতে হয়তো আরও বড়সড় কোনও বিপদ হয়ে যাবে।

নানান ভাবনার ভিড়ে ডুবে আছি এমন সময় দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে কে যেন ডাকল আমাকে, ‘রাজু বাড়িতে আছিস ?’

গলাটা চেনা চেনা মনে হলেও ঠিক বুঝতে পারলাম না। বাইরের সদর দরজা খুলে বেরিয়ে এসে দেখি রঞ্জিতদা। হঠাৎ রঞ্জিতদা গ্রামে ফিরবে এটা কিন্তু ভাবিনি। তিন বছর হল গ্রামের বাইরে রঞ্জিতদা। বরাবর ডাকাবুকো স্বভাবের ছেলে ও। ভয়ডর ওকে ছুঁতে পারেনি। ক্রিকেট খেলতে গিয়ে পাশের গ্রামে কার মাথা ফাটিয়ে সেই যে পালিয়ে গিয়েছিল আর ফেরেনি। এতদিন কোথায় ছিল তাও জানি না।

‘কিরে চমকে গেলি মনে হচ্ছে ?’ জিজ্ঞেস করল রঞ্জিতদা।

কাঁচুমাচু করে বললাম, ‘না না চমকাইনি তো। চমকাবো কেন ? আসলে হঠাৎ তোমাকে দেখে…’

‘নিজের ঘরে নিজের গ্রামে এলেও কি বলে করে আসতে হবে ?’

‘সেটা কেন, আমি কি তাই বললাম ?’

‘ছাড় ওসব। হ্যাঁরে কালকে তো শুনলাম তোদের বাড়িতেও নেকড়ে ঢুকেছিল! তা ভাল করে দেখেছিস ? না কুকুর বিড়াল দেখে ভয় পেয়ে…’

‘না না মা কালী বলছি…’

‘কালীর কাছে কিন্তু শেয়াল থাকে।’

‘শেয়ালের চেয়ে অনেক বড় বুঝলে।’ বিরক্ত হয়ে বললাম।

‘রাগ করছিস কেন ? আমি তো মজা করছিলাম। ওদের বাড়িতে গিয়ে যা দেখলাম… বাড়ি ফিরে মনটাই খারাপ হয়ে গেল।’

‘ফরেস্টের লোক এসেছিল, বলেছে কয়েকদিন পর জাল নিয়ে এসে…’

‘ধুর নিকুচি করে তোর ফরেস্টের লোকের। ওরা অমন বলে, করে না কিছুই। ওরা এসে নেকড়ে ধরে নিয়ে যাবে ওই আসাতে থাকলে গ্রামে আর লোক থাকবে না। একবার যখন মানুষ রক্তের স্বাদ পেয়েছে তখন নেকড়েগুলোও আর চুপ থাকবে না এই কদিন।’

‘কিন্তু উপায়ও তো নেই ?’

‘নেই কেন ? গ্রামের এতগুলো লোক মিলে কটা নেকড়েকে মারতে পারবে না! আমি একাই পালামৌতে চিতা মেরেছিলাম। একটা চিতা রোজ আমাদের গোটারিতে ঢুকে ছাগল তুলে নিয়ে যাচ্ছিল। দুমাসে সতেরটা ছাগল সাবাড় করে দিয়েছিল। ফরেস্ট অফিসে বারবার জানিয়ে, লিখিত দিয়ে, কিছুতেই কিছু হয়নি। একদিন মালিক পাটনার চোরাই মার্কেট থেকে একটা রাইফেল কিনে নিয়ে এসে আমকে দিয়ে জিজ্ঞেস করল, পারবে ? বলেছিলাম, আজকেই ওর খেল শেষ। সেদিন আসেনি চিতাটা। পরের রাতে ওকে ফুটিয়ে দিলাম। তিনজন কুলিকে সঙ্গে নিয়ে গোটারির বাইরেই পুঁতে দিলাম শয়তানটাকে। কেউ কিছুই জানল না। মালিক খুশি হয়ে রাইফেলটা আমাকে দিয়ে দিয়েছিল।’

এতক্ষণ হ্যাঁ করে রঞ্জিতদার গল্প শুনছিলাম আর জিম করবেটের গল্পগুলো মনে করছিলাম। করবেট পড়তে পড়তে কল্পনায় আমিও অগুনতি বাঘ মেরেছি। কিন্তু চিঁড়াখানার বাইরের বাঘ আজও দেখিনি। আর রঞ্জিতদা বলে কিনা…!

‘বিশ্বাস হল না তাই তো ?’

আমি এখনো হ্যাঁ করেই আছি। তাই বিশ্বাস হয়েছে কি হয়নি বোঝাতে পারলাম না।

‘বিকেলে আমার বাড়ি আসিস কয়েকটা জিনিস দেখাব।’

[তিন]

বিকেল পর্যন্ত আর ধৈর্য ধরল না আমার। দুপুরের খাবার খেয়েই ছুটলাম রঞ্জিতদার বাড়ি। ঘরে ঢুকে দেখলাম জানালার পাশে চেয়ার নিয়ে বসে দূরের জঙ্গলটার দিকে তাকিয়ে কিছু যেন ভাবছে রঞ্জিতদা। খানিকক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম। রঞ্জিতদার কোনও হেলদোল নেই। তারপর কীভাবে জানি না আমার আগমন টের পেলো রঞ্জিতদা। জানালার ওপারে তাকিয়েই জিজ্ঞেস করল, ‘ভাত খেয়েছিস ?’

‘হ্যাঁ খেয়ে এসেছি। কিন্তু তুমি কেমন করে বুঝলে যে আমি এসেছি।’

‘গন্ধে।’ কথাটা বলে আমার দিকে তাকিয়ে হাসল রঞ্জিতদা।

‘তোমার খওয়া হয়েছে ?’ জিজ্ঞেস করলাম।

‘হ্যাঁ নিজেই দুটি ভাত ফুটিয়ে খেলাম।’ গলাটা ভারী মনে হল রঞ্জিতদার। সেই কবে ঘরে আগুন লেগে এক রাত্রিতে ওর মা বাবা মারা গেছে। তখন আমি অনেক ছোট। সেই থেকেই রঞ্জিতদা একা। পরের বাড়িতে কাজ করে মানুষ।

‘আজকে রাতে আমাদের বাড়িতে খেয়ে নিও, কষ্ট করে রান্না করতে হাবে না।’

‘না না আজকে রাতে খাওয়ার কোনও গল্প নেই। ভাত করাই আছে। বিকেল সন্ধ্যায় খেয়ে বেরিয়ে পড়ব।’

‘আজকেই চলে যাবে তুমি ?’

‘আরে ধুর পালামৌ যাবার কথা বলছি না। বিকেল সন্ধায় দিকে আমি জঙ্গলে যাব। তুই বুঝতে পারছিস না মানুষ খেকো নেকড়ে কতটা ভয়ানক। ওরা আবার আসবে। মেরে না ফেললে বারবার আসবে।’

‘পাগল হয়েছ ? তুমি একাই পারবে নাকি!’

‘অনেককেই বলেছিলাম। সব ভিতুর ডিম। কেউ রাজি হল না। দাঁড়া তোকে কয়েকটা জিনিস দেখাব বলেছিলাম না ? দেখাচ্ছি।’

কথাটা বলেই রঞ্জিতদা বড় মতো একটা ব্যাগের চেন খুলল। তারপর প্লাস্টিকে মোড়া কয়েকটা জিনিস নিয়ে এসে আমাকে বলল, ‘এগুলো কি জানিস ?’

আমি কৌতূহল নিয়ে উঁকি দিলাম প্ল্যাস্টিকের পুঁটলিটায়। ‘সেই চিতাটার কথা বলছিলাম না ? এগুলো ওটারই নখ দাঁত আর লোম। এবার বিশ্বাস হল ? আমি মিথ্যে কথা বলি না। রাইফেলটাও এনেছি। সন্ধায় দেখাব।’

‘সন্ধায় ? সন্ধায় তো তুমি বললে জঙ্গলে যাব।’

‘হ্যাঁ যাব। ভাবছি তোকেও নিয়ে যাব। যদি তুই ভায় না পাস তো।’

আমি ঢোক গিলে বললাম, ‘ভয় তো পাই না, কিন্তু বাড়ি থেকেই তো যেতে দেবে না।’

‘সেটা আমার উপর ছেড়ে দে। তোর ইচ্ছে আছে কি ?’

‘ইচ্ছে তো আছে কিন্তু বাড়িতে…’

‘ওটা বললাম তো আমার উপর ছেড়ে দে। তুই যাবি কি ?’

‘আমার যে রাইফেল নেই।’

‘তুই তো শিকার করতে যাচ্ছিস না যে তোর রাইফেল থাকবে। তুই শিকার করা দেখতে যাচ্ছিস। তোর যাতে কিছু না হয় সেই দায়িত্ব আমার।’

এবার আমার আর না বলার উপায় নেই। খুব যে ভয় লাগছে তা নয়। কালকে রাতে অত কাছে নেকড়েটা দেখেও আমি খুব একটা ভয় পাইনি। আসলে অন্ধকারে জঙ্গলে যাইনি কখনো, অন্ধকার জঙ্গলের রূপ আমার অচেনা। সেটাই ভয়ের।

[চার]

যখন রঞ্জিতদার সঙ্গে বের হলাম তখন অন্ধকার জাঁকিয়ে বসেছে গ্রামের বুকে। রাস্তায় লোকজন তো দূরের কথা কুকুর বেড়াল পর্যন্ত চোখে পড়ল না। হাঁটতে হাঁটতে গ্রামের প্রান্তে এসে প্রাচীন বটগাছটার কাছে দাঁড়ালাম আমরা। এই বটগাছটার অল্প দূরেই একটা ভাঙা শিবের মন্দির। আমাকে রাস্তায় দাঁড়াতে বলে কেন জানি না রঞ্জিতদা ভাঙা মন্দিরটার দিকে এগিয়ে গেল। যাওয়ার আগে শুধু বলে গেল, ‘ব্যাগটা রইল। আমি এক মিনিটের ভেতর আসছি। তুই এখানেই দাঁড়া।’

বাবা রঞ্জিতদার বাড়িতে থাকার অনুমতি না দিলে হয়তো আমার আসা হত না। একলা থাকতে ভয় করবে, এই অজুহাতে আমার বাবার কাছে আমাকে সঙ্গে রাখার অনুমতি নিয়েছে রঞ্জিতদা। বাবাও না বলেনি। ওদের বাড়িটা যদিও এতদিন ফাঁকা পড়েছিল তবুও আমাদের বাড়ি থেকে ওদের বাড়ির কপাট-জানালা এখনো মজবুত।

মিনিট কয়েকের ভেতর রঞ্জিতদাকে দেখতে পেলাম। অন্ধকারে ঠিকঠাক দেখতে না পেলেও বুঝতে পারলাম রঞ্জিতদা কিছু একটা টেনে নিয়ে আসছে। কাছে আসতেই দেখলাম, একটা ছাগলকে টেনে আনছে রঞ্জিতদা। ছাগলটার মুখ গামছা দিয়ে বাঁধা। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ছাগলটা কোথায় পেলে ?’

অন্ধকারে বোঝা না গেলেও মনে হল রঞ্জিতদা হাসল, ‘ওসব জেনে তোর লাভ নেই। এবার চল। এই ছাগলটাই আমার টোপ। তবে ছাগলটার গায়ে আঁচড় দেওয়ার আগেই…’ কথাটা অসম্পূর্ণ রেখে আঙুলের কায়দায় গুলি করার স্টাইল করল রঞ্জিতদা।

অন্ধকারে হাঁটতে হাঁটতে আমরা গন্ধেশ্বরী নদীর কিনারায় এসে পৌঁছলাম। চারদিকটা অন্ধকারে ভরে আছে। রাতচোরা পাখি আর ঝিঁঝিঁর ডাক অন্ধকারটাকে গভীর করেছে আরও। বড়-বড় গাছগুলোর মাথায় বক আর শকুনের বাসা। ওরা ডানা ঝাপ্টাচ্ছে মাঝে মাঝে।

‘চল ওদিকটায় একটা মস্ত বটগাছ আছে। ওটার ডালে আরামে বসে থাকা যাবে। ছাগলটাকে ফাঁকায় কোনও গাছে বেঁধে রাখব, তাহলে নিশানা ফসকাবে না।’

বটগাছটা এতটাই মোটা যে আমার চড়তে সমস্যা হচ্ছিল। রঞ্জিতদা আমাকে ঠেলে তুলে দিল উপরে। তারপর একটু কষ্ট করে নিজেও উঠে পড়ল। রঞ্জিতদা ভুল বলেনি, গাছটার ডালগুলোও বেশ মোটা। আরামে বসে থাকা যাবে। বট গাছটার পাশেই একটা তেঁতুল গাছ। গাছটার ডালে ডালে বাদুড় ঝুলছে। আর কিছুক্ষণ পর ওরা হয়তো খাবারের সন্ধানে বেরোবে।

রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রূপ পাল্টাতে শুরু করল জঙ্গলটা। শুরু হল শেয়ালের ডাক। একবার নেকড়ের ডাকও কানে এলো। রঞ্জিতদা ব্যাগের ভেতর থেকে রাইফেলটা বের করে রেডি করল এবার। সম্ভবত সাইলেন্সর লাগানো রাইফেল। কয়েক মিনিটের ভেতর কালকে রাতের সেই বোটকা গন্ধটা নাকে এসে ধাক্কা মারল আমার। বুঝতে পারলাম কাছাকাছি কোথাও নেকড়ে এসেছে। ছাগলটা এখান থেকে পরিষ্কার দেখাচ্ছে। ওর কাছাকাছি কোনও নেকড়ে নেই। অপেক্ষা করে আরও কয়েক মিনিট কাটল আমাদের।

বোটকা গন্ধটা যেন বারেক্কে বাড়ছে এবার। গন্ধটা আসছেও চারদিক থেকে। ছাগলটা মনে হয় কিছু দেখতে পেয়েছে! ম্যাঁ-হ্যাঁ- হ্যাঁ, ম্যাঁ-হ্যাঁ-হ্যাঁ শুরু করেছে এতক্ষণে। রুদ্ধশ্বাস ভাবে গাছের ডালে বসে আছি দুজন। ছাগলটার কাছে কোনও নেকড়ে এলেই ফায়ার করবে রঞ্জিতদা। এতক্ষণে চোখে পড়ল একটা নেকড়ের উপর। না একটা নেকড়ে নয়, দুই… তিন… চার… নিজের চোখকেই যেন বিশ্বাস হচ্ছে না। প্রায় দশ বারটা নেকড়ে। রক্ত-জোনাকির মতো ওদের চোখগুলো জ্বলজ্বল করছে। ভয়ে জড়ো হয়ে ছাগলটা এদিক ওদিক ঘুরে ফিরে দেখছে।

প্রথম বারের জন্য ফায়ার করল রঞ্জিতদা। কিছুই হল না। না গুলির শব্দ, না আহত নেকড়ের যন্ত্রণার শব্দ। আরও একটা গুলি করল রঞ্জিতদা, আরও একটা… কিন্তু একটা গুলিও লাগল না নেকড়ের গায়ে। এবার এক এক করে নেকড়েগুলো ঝাঁপিয়ে পড়ল ছাগলটার উপর। একবার ম্যাঁ-হ্যাঁ… করেই থেমে গেল ছাগলটা।

জ্যান্ত অবস্থাতেই ছাগলটাকে ছিঁড়ে খেতে শুরু করে দিয়েছে নেকড়েগুলো। ছটফট করছে ছাগলটা। এমন বীভৎস দৃশ্য আমি এর আগে দেখিনি। হাত পা কাঁপছে আমার। মনে হচ্ছে মাথা ঘুরিয়ে নীচে পড়ে যাব। নিজেকে সামলানোর জন্য রঞ্জিতদার হাতটা খপ করে ধরলাম। রঞ্জিতদার হাতটা ধরতেই ভয়ে ঠাণ্ডা হয়ে গেল আমার সারা শরীর। মুহূর্তের জন্য যেন বন্ধ হয়ে গেল আমার শরীরের রক্ত প্রবাহ। যেন রঞ্জিতদার হাত নয়, একটা নেকড়ের হাত ধরেছি আমি।

এর পরের ঘটনা কয়েক জন্ম হয়তো মনে থাকবে আমার। তখনো আমার জ্ঞান ছিল, যখন দেখলাম রঞ্জিতদা বিশালাকার এক নেকড়ে মানুষে পরিণত হয়েছে। আকাশের এক ফালি চাঁদটার দিকে মুখ উঁচিয়ে দুহাত তুলে নেকড়ের মতোই চিৎকার করল রঞ্জিতদা, ‘আ-উ-হ্-হ্-হ্-উ-উ…’, ধারালো ছুরির মতো ঝকঝক করে উঠল নেকড়ে রূপী রঞ্জিতদার দাঁত আর নখগুলো। রাইফেলটাও ছুঁড়ে ফেলে দিল মাটিতে। তারপর নিজে ঝাঁপিয়ে নামল গাছের থেকে। গাছ থেকে ঝাঁপিয়ে নেমেই লম্বা একটা লাফ দিয়ে কামড়ে ধরল একটা নেকড়ের গলা। কয়েকবার ঝটপট করে শেষ হয়ে গেল নেকড়েটা। আবার উপরের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করল নেকড়ে মানব, ‘আ-উ-হ্-হ্-হ্-উ-উ…’

আমার আর কিছুই মনে নেই। যখন আমার জ্ঞান ফিরল তখন আমি বট গাছটার নীচে শুয়ে আছি। আমাকে ঘিরে আমার বাবা, মা, গ্রামের সবাই। জানি না ওরা কীভাবে খবর পেয়েছে। তের-চোদ্দটার মতো ক্ষতবিক্ষত নেকড়ের লাশ পড়ে আছে আমার আসে পাশে। আধ খাওয়া ছাগলটাও পড়ে আছে অল্প দূরেই। কিন্তু রঞ্জিতদা ? আমি ঘাড় ঘুরিয়ে ভিড়ের ভেতর রঞ্জিতদাকে খোঁজার চেষ্টা করলাম, কিন্তু ওকে কোথাও দেখতে পেলাম না। ও হয়তো ওর পালামৌর ডেরায় ফিরে গেছে।

[সমাপ্ত]

admin :

This website uses cookies.