একুশের কবিতা

একুশ শতকের কবিতা আলোচনা সমালোচনা

একুশের কবিতা: প্রকৃতি 

“অভিশাপ দিয়েছে পাড়ার লোক

তোর সঙ্গে আমার ভালবাসা হোক -কবি রুদ্র গোস্বামীর এই দুটো লাইন থেকেই বোঝা যায় আধুনিক কবিতা বা একুশের কবিতা মানেই জটিলতা নয়। একুশের কবিতা কিছুটা বেপরোয়া কিন্তু বেয়াদব নয় কখনই। একুশের কবিতা সোশাল মিডিয়ায় জন্মানো টেস্টটিউব বেবি,- বলে যারা ভাবে তারা ভুল। এখনো একুশে আগুন আছে যা প্রমিথিউসের মতো বিপ্লব এনে দিতে পারে। হোক না একুশের কবি আজ ঘরে ঘরে।

সময় আর সমাজের সঙ্গে-সঙ্গেই সাহিত্যেরও গতিপথ পাল্টায়। তাই বর্তমান ইন্দ্রজালিক দুনিয়ায় সোশাল মিডিয়া ঘিরে কবিতার চর্চা হলে খারাপ তো কিছু হয় নি। বরঙ কবি আজ পাঠকের মুখোমুখি বসে আছে সবুজ বাতি জালিয়ে, এটা তো পজেটিভ দিক। 

একুশের কবিতায় যখন আমরা রোমান্টিকতা খুঁজি তখন হয়ত সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের নীরাকে পাই না ঠিকই কিন্তু একুশের কবিতা প্রেমহীন নয়। যেখানে “প্রেম” শব্দটাই আজ পরিবর্তিত সেখানে কবিতা তো বদলে যাবেই। আমরা শ্রীজাত কিংবা বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতায় যে প্রেম পেয়েছি তা তো অচেনা নয়। বিভাস সরকারের কবিতা কি বিংশ শতকের থেকে খুব বেশি দূরে? 

যেখানে এক প্রেমিক বা প্রেমিকা একই সঙ্গে একাধিক কানে ফিসফিস করে “ভালবাসি” বলে সেখানে কবিতা না বদলে গেলেই তো হতবাক হতে হত।

শ্রীজাতর জনপ্রিয় কবিতা যে ছেলেটি বন্ধু নয় এর দিকে যদি তাকাই তাহলে বাস্তবের চেনা মুখগুলোই তো চোখে ভেসে উঠে,-

  রাক্ষসেরা বন্ধু সেজে আসে।

পাহাড়চুড়ােয় থমকে থাকে হাওয়া…

ঠোঁট খুলে যায়। বুকদুটো দু’পাশে

কামড়ে ধরে চুমু খাওয়ার আওয়াজ।

 

চুল খােলাচুল দিগন্তে ডাক পাঠায়

মেঘের সেনা ঘােড়ার পিঠে সওয়ার

রক্ত গিয়ে ছিটকে লাগে ছাতায়

দরকার কী, এমন শ্রাবণ হওয়ার

যে সময়ে দাঁড়িয়ে ভালবাসা প্রেমের ঠিকানা পায় না সেই সময়ের রোমান্টিক কবিতা এমনটাই হওয়া উচিৎ। 

যখন সময় হাসনুহানায় হারিয়ে যাওয়ার নয়, যখন বিশ্বাস ভাঙবে বলেই বিশ্বাস করতে ভয় তখন কবি কবিতাকে কাপড় পরিয়ে তো কলাবউ সাজাতে পারেন না, কবিতা তাই স্বাভাবিক ভাবেই হেঁটে যায় হাই হিল পরে ভালবাসার বুকের উপরে।    

সময় পাল্টেছে বলেই একুশের কবিতা পাল্টেছে, একুশের কবিতার প্রকৃতি কিছুটা হলেও আগের থেকে আলাদা। আধুনিক সভ্যতার ছাপ পড়েছে একুশের কবিতায়। এখন লন্ডন দূরে নয়। ভিডিও কলে পাশাপাশি ভারত আমেরিকা। এখন ফেসবুক টুইটারের যুগ। তাই একুশের কবিতার ভাবমূর্তি অনেকটা আকাশের মতো আপেক্ষিক। 

বিভাস রায়চৌধুরীর বিশ্বাস কবিতাটার দিকে তাকালে অনেক কিছুই ঠিকঠাক ধরা পড়ে,-

একুশ শতকের কবিতা,- প্রকৃতি

       বিশ্বাস

অনেক গাছের নীচে তুমি নেই কোনওদিন…

হাওয়া এসে ঘুরে যায়

জল থেকে চুপচাপ উঠে আসে হাঁস

 

পৃথিবী বিশ্বাস চায়… একটু বিশ্বাস…

 

কত গাছ অপেক্ষা করছে

এক জীবন… দুই জীবন!

এত শূন্যতায় বেঁচে থাকতে ভাল্লাগে না কারও

 

যেসব গাছের নীচে তুমি নেই কোনওদিন,

একাই দাঁড়িয়ে থাকি…

 

কী একটা বিশ্বাস ফিরে আসতেও পারো…

 

  • একুশের কবিতা রেখেঢেকে গোপন করে লেখা নয়। এই সময়ের কবিতায় সাদাকে সাদা কালোকে কালো খুব সহজেই বলা হয়েছে। মানুষ যেমন তাকে তেমন ভাবেই আঁকা হয়েছে। 

তাই জয় গোস্বামীর মাতাল বাপবেটা নুনের অভাবে দুই ভাই হয়ে যায়।

 

  • আসলে বর্তমান সমাজে অক্সিজেনের বড্ড অভাব আর সেই অভাবটা একুশের কবিতার প্রতিটা লাইনে ফুটে উঠেছে।   

  

 তবে একুশের কবিতার কিছু ত্রুটি বা ভ্রান্তি আমাদেরকে সত্যিই ভাবায়। আধুনিক কবিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- রূপকের ব্যবহার। পরিমিত রূপক শব্দ আধুনিক কবিতার শরীরকে ঋদ্ধ ও মজবুত করে। 

শব্দচয়নকে নান্দনিক করে তোলে। তবে তার সার্থক ব্যবহার বাঞ্ছনীয়। রূপক ব্যবহারে যত্নবান  ও সতর্ক না হলে কবিতার শরীর মেদবহুল এবং অনর্থক হয়ে পড়ে। 

সমকালীন কিছু কবিতায় লক্ষ্য রাখলে দেখা যায়, আধুনিকতা বা উত্তর-আধুনিকতার নামে অপ্রয়োজনীয় এবং সার্থকহীন রূপকের ব্যবহার বিরামহীনভাবে ব্যবহার হচ্ছে। 

এর ফলে কবিতা তার নিজস্ব বলয় থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে অন্য গোচরে, যা কবিতার পাঠকের জন্য হুমকিস্বরূপ। কবিতাকে এমন জটিল  বা শব্দবিভ্রাট করে পাঠকের সামনে হাজির করলে কবিতার পাঠকপ্রিয়তা ক্রমেই হারাবে।

আলোচনার শেষে আমি বাপ্পাদিত্য মুখোপাধ্যায় এর একটি দিয়ে শেষ করব।

বাপ্পাদিত্য মুখোপাধ্যায়ের কবিতা  

খেয়া ঘাটের মাঝি

আর কয়েক পা পেরিয়ে গেলে নতুন জীবন

আর একটা হৃদয় পেলে জুড়ে যাবে ভেঙে যাওয়া মন

আমি বর্ষায় পুড়তে থাকা শানবাঁধানো শ্মশানের ঘাটে

এক দুই তিন… কর গুনে গুনে মিত্যু লিখে রাখি

আমি তো খেয়া মাঝি। শুধু এপার হতে ওপার

তোমার এক জীবন বিশ্রাম নেওয়া শেষ…?

অবশিষ্ট কাজটুকু আমার পড়ে থাকে।

কে আর মনে রাখে ? আমি রোজ রাতে দেখি

ধোঁয়ার কুণ্ডলী বেয়ে উড়ে যায় অচিন পাখি আরেক শরীরে।

শৈশব-কৈশোর-যৌবনের বনে মুধু শেষ হলে

শরীরের উঠোনে হামা দিয়ে বার্ধক্য নামে

তারপর…? আমি বাকি পথটুকু পার করে দিয়ে আসি।

যে মেয়েটি গোলাপ হাতে এসে বলেছিল, ‘ভালবাসি, তোমাকেই ভালবাসি’

একদিন নাকে তুলো গুঁজে ধূপের গন্ধ মেখে সারা শরীর ফুলে ঢেকে

ওপারে গেছে। হয়তো উপরে গেছে।

আমি অপেক্ষায় থাকি

যেদিন শ্মশানে আঁতুড়ে মিলন হবে ?

সেদিন আবার শিস দেবে অচিন পাখি।

 

আরও Top 15 Bangla kobita for love > Bengali Shayari

Spread the love

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.