X

আসামী যেদিন আমি

www.amarsahitya.com

আসামী যেদিন আমি


বাপ্পাদিত্য মুখোপাধ্যায়


১২-ই ফাল্গুন 
শেষ পর্যন্ত সবার সন্দেহটাই মিলে গেল। মায়ের ব্রেন ক্যান্সার।
বিশ্বাস করুণ ত্রুটি রাখিনি চিকিৎসার। জমি থেকে ঘটি বাটি
যা ছিল সব হয় বন্ধক নয় বিকিয়ে গেল। মূর্খ নই বেকার বলে
জানতাম বাঁচবে না। তবু যে মা। যখন ঘোরের ভেতরে
মা ভুল বকত, দেখত বাবা এসে দাঁড়িয়ে আছে বিছানার ধারে।
দুহাত বাড়িয়ে নাকি ডাকত বাবা। কিংবা যখন যন্ত্রণায় মুক্তি
চেয়ে মা বলত, ‘হে কৃষ্ণ এবার নাও আর যে সহ্য হয় না’
তখন মায়ের দু’চোখ দিয়ে জল ঝরত দরদর করে। 
ঘরে ফাটা পয়সা ছিল না আর। মায়ের চিকিৎসার কেমোথেরাপি খরচ, 
ওষুধ, ডাক্তার দেখাতে যাওয়ার গাড়ি ভাড়া, কিচ্ছু ছিল না।
তারাদের দিকে তাকালে দেখতে পেতাম- পড়ন্ত বিকেলে 
মা চাপা কলের থেকে জল নিয়ে আসছে কলশি ভরে। কপালে
ঝিক ঝিক করছে সিঁদুরের টিপ। আমার খুব কান্না পেত।
আমি সারা রাত জেগে মায়ের যন্ত্রণাকাতর ঘুমন্ত মুখের দিকে
তাকিয়ে স্মৃতি সঞ্চয় করতাম। আগামীর একলা পথের জন্য।
২১-শে আষাঢ়
সকাল নটা নাগাদ মা নাকে তুলো গুঁজে ধূপের গন্ধ ছড়িয়ে
শেষ বার পায়ের পাতায় আলতা মেখে জীবনের ওপারে চলে গেল।
কয়েকটা মেঘ মাথায় নিয়েও যখন মায়ের নাভি মণ্ডল পুড়ে ছাই
তখন বিকেল চারটা পেরিয়ে গেছে। শুনলাম তিন পোয়া দোষ পেয়েছে মা। 
চণ্ডীপাঠ করাতে হবে। সব কাজ যেদিন শেষ হল 
তখন আমার নিজের ঠিকানা বলেও কিছুই রইল না। শেষ আশা 
নিশা কবেই জানিয়ে গেছে, -‘বাবা সরকারি চাকরি করা ছেলে চায়।’
২৫-শে আষাঢ়
মেঘলা বিকেলে বেরিয়ে গেলাম রূপসীবাংলা এক্সপ্রেস ধরে খড়গপুর
ট্রেনেই পরিচয় হল কাদের ভাই এর সাথে। কাদেরভাই সেদিন আমার 
বিনা টিকিটের ফাইন ভরে ছিল। তাঁর হাত ধরেই চাকুলিয়া এসেছিলাম।
তারপর ?
বিশ্বাস করুণ আমরা কেওই মানুষ মারব বলে জন্মাইনি। 
অভাব অজুহাত স্বভাব যাই বলুন। বিশ্বাস করুণ বা নাই করুণ সত্যি সেদিন
মানুষ মারতে বোম ছুড়িনি। আমরা গুলিও চালাতাম না যদি না পুলিশ
মিথ্যে জালে কাদের ভাইকে ডেকে কপালে মৃত্যু এঁকে দিত। সত্যি
সেদিন চটকলে আমাদের কেও ধর্ষণ করেনি। সেদিন বৃষ্টি ভিজেও 
রঞ্জিকা একটা দাবী নিয়ে লোলুপ নেতাদের কাছে গিয়েছিল। ও শুধু আমার 
স্বপ্ন সঙ্গিনী ছিল না। ও ছিল কাদেরভাই এর পর আমাদের বিচক্ষণ দলনেত্রী।
যখন চটকল থেকে রঞ্জিকা রাতেও ফিরল না। আমরা গেলাম ভোর রাতে
গিয়ে দেখি রক্ত মাখামাখি রঞ্জিকা নিথর ভাবে ধূলায় পড়ে আছে।
সেদিন থেকেই বোবা দুটো চোখ দুমড়ে মুচড়ে গেছে জ্বলন্ত জীবন যন্ত্রণায় 
১২-ই কার্তিক
আমার বন্ধুক থেকে তিনটা বুলেট চেটেছিল তিনটা কদর্য কপাল
ওই ছিল আমার প্রথম প্রতিশোধ। দূরের জঙ্গল দিকে চাইলেই যে দেখতাম
রঞ্জিকা সাঁওতাল শিশুদের বন্দুকের বর্ণপরিচয় শিক্ষা দিতে ব্যস্ত। ঝাপসা হয়ে
আসত আমার দু’চোখ। তারপর গোগ্রাসে হাঁড়িয়া গিলে টলে টলে 
চলে যেতাম নদীটার ধারে। ডুবন্ত সূর্য টাকে দেখে মনে হত 
মায়ের কপাল রাঙিয়ে যাওয়া সেই সিঁদুরের টিপ। 
দূরের শেয়ালের সুরে পা ফেলে যখন সন্ধ্যা নামত কাজুবাদাম জঙ্গলে! 
মনে পড়ত গ্রামের কথা, মায়ের কথা, নিশার কথাও।
২২-শে কার্তিক
কুন্তলের সাথে ভাত খেতে বসেছি সবে। সেদিনই ছিল আমাদের 
আত্ম সমর্পণ করার দিন। নিজে এসে ধরা দিলে চাকরি। সঙ্গে নাকি
শাস্তিটাও মোকুব হয়ে যাবে। কিন্তু! মিনিট কয়েক বাদে কুন্তলের কপাল
বেয়ে রক্তের ধারা গড়িয়ে নামলো ভাতের থালায়। প্রায় তিন ঘণ্টা
গুলি ছোড়া ছুড়ি করে যখন অবশিষ্ট আমরা তিনজন শহীদ হতে বাকি 
ওপার থেকে ভেসে এলো সমাচার আত্মসমর্পণ। নিরুপায় তখন 
তাই একে একে ধরা দিলাম অন্ধ বিচারের বন্ধ পিঁজরায়। ধিক্কারে। 
তারপর ?
২৪-শে কার্তিক
প্রবীণ বিচারক রায় দিলেন ৩০২ নং ধারায় কলমের করুণ মুখ ভেঙে।
ওরা কাঁদল। আমি হাসলাম। উন্মাদের মত হো হো করে হাসলাম।
উচ্চ আদালতে মাথা ঠুকিনি আর। এটাই আমার দারিদ্রতার শ্রেষ্ঠ বিচার। 
১৫-ই অঘ্রাণ
কালকেই মিটে যাবে অভাবের যত নিদারুণ নির্মল জ্বালা। তাই তো
আমি এখনও হাসছি ধীর পায়ে এগিয়ে আসছি ফাঁসির দড়ির দিকে।
আমি ক্ষুদিরাম কিম্বা ভগৎ সিং নই যে আপনারা চিরদিন মনে রেখে দেবেন
জানি আমি,- দুদিন আমাদের নিয়ে শুধু ব্রে-কিং নিউজ তারপর পত্রিকাতেও ফিকে।
১৬-ই অঘ্রাণ
এখন দুহাত পিছনে বাঁধা। পাশে বিমর্ষ ফাঁসুড়েকে দেখা যায়।
গলার দড়িতে প্রিয় কলার গন্ধ পাচ্ছি পরিষ্কার।
কালো কাপড়ে মুখটাও এবার ঢাকা পড়ল। গলাটা বন্ধ হয়ে আসছে গরম নিশ্বাসে।
সামনে কেও নেই। অন্ধকার। বিশ্বাসে দাঁড়িয়ে আমার মা। হাত নাড়িয়ে ডাকছে আমায়।   
admin:

This website uses cookies.

Read More